
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশের ১৯টি জেলা উপকূলীয় অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত। এর মধ্যে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, বরগুনা, ভোলা, নোয়াখালী ও কক্সবাজার বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যা দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক স্থানে পানযোগ্য পানি পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে নারীর মৌলিক চাহিদার ওপর। পরিবারে পানির যোগান, রান্না, সন্তান লালন-পালন ও দৈনন্দিন গৃহকর্মে প্রধান ভূমিকা পালন করে নারীরা। ফলে পানির সংকট, খাদ্যাভাব বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিঘাত তারা সরাসরি বহন করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানি পান করার ফলে উচ্চ রক্তচাপ, প্রসূতি জটিলতা, ত্বকজনিত রোগ ও কিডনি সমস্যা দেখা দিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, উপকূলীয় অঞ্চলের গর্ভবতী নারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা সমভূমির নারীদের তুলনায় দ্বিগুণ বেশি। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি পান করলে প্রি-এক্লাম্পসিয়া ও এক্লাম্পসিয়ার মতো প্রাণঘাতী রোগ দেখা দিতে পারে, যা মা ও নবজাতকের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া লবণাক্ত পানিতে গোসল করার কারণে অনেক নারীর ত্বক পুড়ে যায়, চুল পড়ে যায় এবং চুলকানিসহ নানা চর্মরোগে ভোগেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। লবণাক্ত মাটি ও পানির কারণে ধান, শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদন কমে গেছে। ফলে খাদ্যে বৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে, বাড়ছে অপুষ্টি। অপুষ্টি নারীর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে রক্তশূন্যতা ও অকাল বার্ধক্য দেখা দিচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানির অভাব এখন একটি বড়ো স্বাস্থ্যঝুঁকি। লবণাক্ত পানির কারণে টিউবওয়েল ও পুকুরের পানি প্রায় অযোগ্য হয়ে পড়ছে। নারীরা প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মিষ্টি পানি সংগ্রহ করে। এই পরিশ্রমজনিত ক্লান্তি, শরীরিকচাপ এবং ভারি জলের পাত্র বহন করার ফলে কোমর ব্যথা, পিঠ ব্যথা, এমনকি গর্ভপাতের মতো জটিলতা দেখা দেয়। এছাড়া, ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের পর যখন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে হয়, তখন পর্যাপ্ত টয়লেট ও স্যানিটেশন না থাকায় নারীদের স্বাস্থ্য ও মর্যাদা দুটিই হুমকির মুখে পড়ে। অনেক সময় মেয়েরা রাতে টয়লেট ব্যবহারের ভয়ে পানি না খেয়ে থাকে, ফলে তাদের প্রস্রাবের সংক্রমণ ও কিডনি সমস্যা দেখা দেয়।
জলবায়ু বিপর্যয়ে নারীরা শারীরিক ও মানসিক দু’দিক থেকে বড়ো আঘাত পায়। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, রোয়ানু বা আম্পানের পর বহু নারী তাদের ঘরবাড়ি, সম্পদ ও প্রিয়জন হারিয়েছে এবং দুর্যোগে বহু পুরুষ শহরমুখী শ্রমবাজারে চলে যায়, ফলে তখন তাদের কাঁধে পড়ে পরিবার টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব। এ চাপ, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার কারণে অনেক নারী হতাশায় ভোগে। গবেষণায় দেখা গেছে, উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের মধ্যে ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি ও ট্রমাজনিত মানসিক ব্যাধির হার ক্রমবর্ধমান। কিন্তু এখনো মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রামীণ পর্যায়ে প্রায় অনুপস্থিত। সামাজিক কাঠামো ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের কারণে নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপত্তাহীনতা, স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চনা ও আর্থিক অস্বচ্ছলতা তাদের সংকটে ফেলে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় অনেক নারী সংস্কার বা লজ্জা-সংকোচে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চান না, ফলে প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ কম থাকায় জলবায়ু অভিযোজন প্রক্রিয়ায় তাদের মতামত প্রায়শই উপেক্ষিত হয়।
বাংলাদেশ সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রভাব মোকাবিলায় নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ২০০৯ সালে প্রণীত এবং ২০২০ সালে হালনাগাদ করা Bangladesh Climate Change Strategy and Action Plan (BCCSAP), দেশের জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রমের মূল ভিত্তি। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী, বিশেষত নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা। লবণাক্ততার কারণে টিউবওয়েল ও পুকুরের পানির সমস্যার সমাধানে সরকার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে একাধিক প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে ট্যাংক ও সংরক্ষণাগার স্থাপন করা হচ্ছে। আর্সেনিক ও লবণমুক্ত গভীর নলকূপ স্থাপন করা হচ্ছে উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোতে। স্কুল ও আশ্রয়কেন্দ্রে নারীবান্ধব টয়লেট ও স্যানিটেশন সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। Safe Water Supply in Coastal Belt Project নামে একটি বিশেষ প্রকল্প বর্তমানে খুলনা, সাতক্ষীরা, ভোলা ও পটুয়াখালী জেলায় চলমান। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় উপকূলীয় এলাকায় Climate Resilient Health System গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু করেছে। সাইক্লোনপ্রবণ অঞ্চলে মোবাইল মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে, যারা দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে মাঠপর্যায়ে চিকিৎসা প্রদান করে। প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নারী ও শিশুবান্ধব স্বাস্থ্যক্যাম্প পরিচালিত হচ্ছে। প্রসূতি ও জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে দক্ষ ধাত্রী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তর স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে জলবায়ু অভিযোজন নির্দেশিকা চালু করেছে, যাতে স্বাস্থ্যকর্মীরা পরিবেশ-সম্পর্কিত রোগ সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারেন।
সরকার জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ ও Gender Action Plan on Climate Change অনুসারে নারী ক্ষমতায়নমূলক বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে, যেমন উপকূলীয় নারীদের জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রশিক্ষণ, লবণ-সহনশীল ধান, সবজি চাষ ও হাঁস-মুরগি পালন। স্থানীয় পর্যায়ে নারীদের নেতৃত্বে কমিউনিটি সচেতনতা দল (Women Climate Forum) গঠন। মাতৃত্বকালীন ভাতা, বিধবা ভাতা ও খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির আওতায় উপকূলীয় নারীদের অগ্রাধিকারভিত্তিক অন্তর্ভুক্তি। এনজিও ও সরকারি সংস্থার যৌথ উদ্যোগে নারী উদ্যোক্তা সহায়তা তহবিল, যা জলবায়ু-সহনশীল জীবিকা গড়ে তুলতে সাহায্য করছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় তার Standing Orders on Disaster (SOD)-এ নারীর নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সেবা বিষয়ক নির্দেশনা যুক্ত করেছে। প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে নারীস্বাস্থ্য কর্ণার চালু করা হয়েছে, যেখানে নারী চিকিৎসক ও ধাত্রী দায়িত্ব পালন করেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে স্যানিটারি সামগ্রী ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। দুর্যোগ-পরবর্তী সময় মোবাইল ক্লিনিক ও ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করা হয়, যেখানে নারীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও পুষ্টি পরামর্শ দেওয়া হয়। জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে অনেক নারী পরিবার ও সম্পদ হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। এ সমস্যা মোকাবেলায় সরকার সম্প্রতি Community Mental Health Programme চালু করেছে। উপকূলীয় জেলা হাসপাতালগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য কর্নার স্থাপন এবং ট্রমা–ভুক্তভোগী নারীদের কাউন্সেলিং সেবা দেওয়া হচ্ছে।
সরকার জলবায়ু-স্বাস্থ্য অভিযোজনে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। UNDP, WHO I FAO–এর সহায়তায় চলছে Health Adaptation to Climate Change in Bangladesh প্রকল্প। Green Climate Fund (GCF) I World Bank–এর অর্থায়নে উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু সহনশীল হাসপাতাল ও ক্লিনিক নির্মাণ হচ্ছে। Coastal Embankment Improvement Project (CEIP)–এর মাধ্যমে উপকূলীয় জনগণের জীবন ও স্বাস্থ্যসুরক্ষা জোরদার করা হয়েছে। নারী ও পরিবার পর্যায়ে জলবায়ু সচেতনতা গড়ে তুলতে সরকার একাধিক কর্মসূচি পরিচালনা করছে—কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে নারীস্বাস্থ্য, নিরাপদ পানি ও পুষ্টি বিষয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা সেশন চালু। স্কুল পাঠ্যক্রমে পরিবেশ ও জলবায়ু শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে মেয়েরা ছোটোবেলা থেকেই সচেতন হয়। স্থানীয় রেডিও ও টেলিভিশনে নারীস্বাস্থ্য ও জলবায়ু সচেতনতা বার্তা সম্প্রচার করা হচ্ছে। জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ২০১১-তে জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলার নির্দেশনা যুক্ত হয়েছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২১-২৫) নারী ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে জলবায়ু অভিযোজনকে অন্যতম কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেছে। জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পন পরিবর্তনের ফলে পৃথিবী ক্রমশ উষ্ণ হচ্ছে, আবহাওয়া আরও চরম হচ্ছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলো প্রকৃতি, বণ্যপ্রাণী, মানববসতি এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। মানুষের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ব্যাপক এবং দীর্ঘস্থায়ী। যদি আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না গ্রহণ করি, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। বিশেষজ্ঞরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে জলবায়ু সংকট হিসেবে বর্ণনা করেন। জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বব্যাপী মানুষের জন্যে একটি ভয়াবহ দুর্যোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি এখন আর শুধু পরিবেশগত বিষয় নয়। বিশ্বের আবহাওয়া পরিবর্তন বিশ্ব নিরাপত্তার বিষয় হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে। সকলেই জানেন, বিশ্বের আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রধান কারণ ভূমন্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে মেরু অঞ্চলে জমে থাকা বরফ দ্রুত গলতে শুরু করছে। এ বরফগলা পানি প্রবাহিত হয়ে নদনদী ও সাগরকে স্ফীত করে তুলছে। এ কারণে নদী ও সাগর তীরবর্তী অঞ্চল বেশি প্লাবিত হচ্ছে। প্লাবন, ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে ল-ভ- হচ্ছে মানুষের বসতবাটি; নষ্ট হচ্ছে কৃষি, মৎস্যচাষ তথা খাদ্য উৎপাদন। বিপর্যস্ত হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। এর ফলে মানুষের জীবন ও জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। মানুষ আর্থিকভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে। বাড়ছে দারিদ্র্য। ক্ষুধার্ত মানুষ আজ খাদ্যের জন্য দাঙ্গায় লিপ্ত হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্যবাহী বহরে আক্রমণ করছে আফ্রিকার ক্ষুধাপীড়িত মানুষ। আগামী দশকেই বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ জলবায়ুর বৈশ্বিক পরিবর্তনে চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পতিত হবে। বেশিমাত্রায় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের কারণে জলবায়ুর যে পরিবর্তন ঘটেছে তাতে বেশি ক্ষতি হয়েছে পানির। লোনা পানির আধিক্য বেড়ে যাওয়ায় সুপেয় পানির ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে গোটা বিশ্বে পরিবেশের বিপর্যয় ও জলবায়ুর পরিবর্তন বহুমাত্রিক রূপ ধারণ করেছে। কয়েক শত বছর আগে থেকেই বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে। জনসংখ্যার আধিক্য, শিল্পবিপ্লব, গাছপালা উজাড় করে দেওয়া, পাহাড় কাটা তথা প্রকৃতির বিরুদ্ধাচারণ করা থেকে বায়ু মন্ডলের উষ্ণতা বেড়েছে। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের জলবায়ুর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য এবং মৌলিক চরিত্রের ব্যাপক পরিবর্তন হচ্ছে। জলবায়ুর এই পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের মানুষ একের পর এক বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছে। পরিবেশ ও জলবায়ুর সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে না পারলে নানাভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। পরিবেশের সুরক্ষা মানুষের সুশৃঙ্খলের উপর নির্ভর করে। মানুষ যত পরমতসহিষ্ণু হবে জলবায়ুর পরিবর্তন হবে ইতিবাচক এবং পরিবেশের ভারসাম্য স্থিতিশীল থাকবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ হচ্ছে গ্রীনহাউজ এফেক্ট। শক্তি উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির পোড়ানোর ফলে বায়ুমন্ডলে কার্বনডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন, মিথেনসহ নানা ধরনের ক্ষতিকারক গ্যাস বৃদ্ধি পায় এবং এই গ্যাসগুলো আমাদের বায়ু মন্ডলকে উত্তপ্ত করে চলছে প্রতিনিয়ত। ফলাফল স্বরূপ মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাচ্ছে, যার কারণে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সমুদ্রের নিকটবর্তী নি¤œ অঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। বরফ গলে যাওয়ার কারণে মেরু অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন: এসিড বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি এই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে, অধিক পরিমাণে বৃক্ষ নিধন এবং নতুন নতুন শিল্পকারখানা প্রতিস্থাপন। এসব কারখানা প্রতিনিয়ত পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত করে চলেছে। এই সকল গ্যাস পরিবেশ এবং জলবায়ুর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। অন্যদিকে বৃক্ষের রয়েছে এই সকল ক্ষতিকর গ্যাস গ্রহণ করে সেগুলোকে অক্সিজেনে রূপান্তরিত করার ক্ষমতা। কিন্তু আমরা সেই বৃক্ষগুলোকে নিধন করে চলেছি। বনের পর বন উজাড় করে চলছে শিল্প কারখানা এবং নতুন নতুন ভবন তৈরি করার কাজ। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী আমরা মানুষরাই। তাই আগে আমাদের ভুলগুলো শুধরে নিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে প্রচুর পরিমাণে বৃক্ষ রোপণ করতে হবে এবং যে সব শিল্পকারখানা বায়ুতে বিষাক্ত ও ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমন করে, সেগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। অতঃপর আশা করা যায়, পৃথিবীর জলবায়ু কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে।
জলবায়ু পরিবর্তন বিভিন্ন নিয়ামকের উপর নির্ভরশীল, যেমন- জৈব প্রক্রিয়াসমূহ, পৃথিবী কর্তৃক গৃহীত সৌর বিকিরণের পরিবর্তন, ভূত্বক গঠনের পাততত্ত্ব আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত ইত্যাদি। তবে বর্তমান সময়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বললে সারা পৃথিবীর ইদানিং সময়ের মানবিক কার্যকর্মের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন বোঝায়, যা ভুমন্ডলীয় উষ্ণতা বৃদ্ধি করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, বাতাস ইত্যাদি পরিবর্তিত হয়। জলবায়ু ব্যবস্থার পরিবর্তনগুলির মধ্যে একটি সামগ্রিক উষ্ণায়ন প্রবণতা এবং আরও চরম আবহাওয়া অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন প্রাকৃতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করে, যেমন বনের দাবানল এবং মরুকরণ। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মানুষ নানাভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে খাদ্য ও মিঠা পানির উৎস হুমকির মুখে পড়তে পারে। আবহাওয়ার চরম পরিবর্তন বা সংক্রামক রোগের বিস্তারের মতো তীব্র প্রভাবের কারণে মানুষের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব পড়তে পারে। অর্থনৈতিক প্রভাবের মধ্যে রয়েছে কৃষি, মৎস্য এবং বনায়নের পরিবর্তন। উচ্চ তাপচাপের কারণে গ্রীষ্মম-লীয় অক্ষাংশের বহিরঙ্গনে ক্রমবর্ধমানভাবে বাধাগ্রস্ত করবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে দ্বীপ দেশ এবং উপসাগরীয় শহরগুলি প্লাবিত হতে পারে। কিছু গোষ্ঠীর মানুষ জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। যেমন দরিদ্র শিশু ও প্রান্তিক অধিবাসীরা। শিল্পোন্নত দেশগুলি যারা কার্বন ডাই অক্সাইডের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্গত করছে, তাদের বিশ্ব উষ্ণায়নের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলির তুলনায় বেশি সম্পদ রয়েছে। ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা স্থানচ্যুতি এবং অভিবাসনের দিকে পরিচালিত করতে পারে। গত কয়েক দশক ধরে পৃথিবী দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। এই উষ্ণায়নের ফলে আমাদের পরিবেশ এবং জীবজগতের উপর ভহাবহ প্রভাব পড়ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি মাটি শুষ্ক করে ফেলছে এবং দাবানলের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ভূমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে এবং খাদ্য উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রজাতির জীব বেঁচে থাকার জন্য শীতল অঞ্চলের দিকে পরিযায়ন করছে। স্থলভাগের অনেক প্রজাতি উঁচু অঞ্চলে চলে যাচ্ছে যেখানে তাপমাত্রা তুলনামূলক কম। সামুদ্রিক প্রাণীরা গভীর সমুদ্রে আশ্রয় নিচ্ছে, যেখানে পানি ঠান্ডা। যদি বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি বেড়ে যায় তবে প্রায় ১০% স্থলজ প্রজাতি মারাত্মকভাবে বিপন্ন হয়ে পড়বে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আমাদের গ্রহের জন্য একটি ক্রমবর্ধমান হুমকি। এটি ইতিমধ্যেই পৃথিবীর জলবায়ুর ব্যবস্থার সকল স্তরে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ১.১ ডিগ্রি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিচ্ছে। উদ্বেগজনকভাবে, এই পরিবর্তন পৃথিবী জুড়ে সমানভাবে বিতরণ করা হয় না। অধিকাংশ ভূমি অঞ্চল মহাসাগরীয় অঞ্চলের তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে, উত্তর মেরুর অঞ্চল (সুমেরু অঞ্চল) বাকি অঞ্চলগুলোর তুলনায় দ্রুতহারে উষ্ণ হচ্ছে। এছাড়াও রাতের তাপমাত্রা দিনের তাপমাত্রার তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভবিষ্যতে পৃথিবীর তাপমাত্রা কতটা বৃদ্ধি পাবে তা নির্ভর করবে আমরা গ্রহকে রক্ষা করার জন্য কতটা পদক্ষেপ গ্রহণ করি তার উপর। এই উষ্ণায়নের প্রভাব প্রকৃতি এবং মানুষের উপর ব্যাপক আকারে পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অনুমান করার জন্য বিজ্ঞানীরা নানা পদ্ধতি ব্যবহার করেন। একটি উপায় হচ্ছে অতীতের প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিবর্তন সন্ধান করা, অতীতে পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন উৎসের সাহায্য নেন যেমন- গাছের বর্ষ বলয় বরফের স্তর প্রবাল এবং সমুদ্র ও হৃদয়ের পলি। এই সমস্ত অধ্যয়ন থেকে বোঝা যায় যে সাম্প্রতিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি গত ২০০০ বছরের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। এই ২১তম শতাব্দীর শেষের দিকে তাপমাত্রা এমন একটি পর্যায় বৃদ্ধি পেতে পারে, যা সর্বশেষ ৩০ লক্ষ বছর আগে প্লাইওসিন যুগে দেখা গিয়েছিল।পৃথিবী জুড়ে শুরু হয়েছে আবহাওয়া এবং পরিবেশগত ব্যাপক পরিবর্তন। এসব পরিবর্তন আমাদের জন্য কোন শুভ বার্তা বয়ে আনছে না। এসব হচ্ছে, নেতিবাচক পরিবর্তন। বিশ্ব আবহাওয়ার ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ৮টি দেশের উপকূলীয় এলাকায় বিরুপ পরিবেশগত প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী ইতিমধ্যেই করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের আবহাওয়া ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞরা সম্প্রতি এক গবেষণার পর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, বিশ্ব্যব্যাপী বায়ুমন্ডলে উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে। উষ্ণতা বৃদ্ধি প্রাপ্ত অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেবে। দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার লাখ লাখ লোক ‘পরিবেশগত উদ্বাস্তুতে’ পরিণত হবে। তারা বলেছন, উন্নত পরিবেশ, দূষণরোধ প্রযুক্তির দ্রুত ব্যবহারের মাধ্যমে সম্ভাব্য দূর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি লাঘব হতে পারে। ওয়াশিংটনস্থ আবহাওয়া ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় ২৭ মাস ব্যাপী ৬০ জন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ এবং ৮টি এশীয় দেশের সরকার এ জরিপ কাজে অংশগ্রহণ করেন। ওয়াশিংটন আবহাওয়া ইনস্টিটিউটের জরিপে বলা হয়েছে, উপকূলের ব্যাপক এলাকা সাগরের স্ফীত পানিতে নিমজ্জিত হবে এবং ভূমিধ্বসের সৃষ্টি হবে। মিষ্টি পানির প্রবাহে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করবে। উপকূলীয় ব্যাপক এলাকায় মৎস্য উৎপাদন হ্রাস পাবে এবং ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির প্রকোপও বৃদ্ধি পাবে। দক্ষিণাঞ্চলীয় ৮টি দেশ বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম এবং ফিলিপাইনে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ বসবাস করে। বিশ্বব্যাপী বায়ুমন্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট গ্রীন হাউস প্রতিক্রিয়ায় মারাত্মক ক্ষতির শিকার হবে পূর্ব এশিয়ার এই দেশগুলো।
‘গ্রীন হাউস এফেক্ট’ এর জন্য বন উজাড়কেই প্রধান কারণ বলে গণ্য করা হয়। একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও পরিবেশকে সুন্দর-সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে দেশের মোট আয়তনের শতকরা ২৫/৩০ ভাগ বনভূমি থাকা অত্যাবশ্যক। আমাদের দেশে বনভূমির পরিমাণ সরকারী হিসাব মতে, শতকরা ১৬ ভাগ। প্রকৃতপক্ষে বনভূমির পরিমাণ আরও অনেক কম হবে। দেশে বনভূমির এই অস্বাভাবিক হ্রাসের কারণে বাংলাদেশের জলবায়ু ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন পরিষদ কর্তৃক পরিচালিত ‘বাংলাদেশে গ্রীণ হাউসের প্রভাব এবং আবহাওয়ার পরিবর্তন’ শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জলবায়ু ক্রমশ উত্তপ্ত হচ্ছে। গত শতাব্দীর শেষ দিকের তুলনায় গড় তাপমাত্রা বর্তমানে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এখন জলবায়ু ঠান্ডা হবার কোন প্রবণতা নেই বলে গবেষণা গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকলে ২০৩১ সাল নাগাদ দেশে বর্তমানের তুলনায় তাপমাত্রা ১ থেকে ১.৫ জিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২০৫০ সার নাগাদ ১.৫ থেকে ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে বলে ধারণা কর হচ্ছে। উচ্চ তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতার সঙ্গে সঙ্গে বর্ষা ঋতুও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
গবেষণা থেকে জানা যায়, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার পানি বিভাজন এলাকাতে ভবিষ্যতে বৃষ্টিপাতের বৃদ্ধি দেশে বন্যার ভয়াবহতা বাড়বে। বেশি বৃষ্টিপাত নদীর প্রবাহ বাড়িয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির জন্যে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশকে প্রশমিত করতে সাহায্য করতে পারে। তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধি পেলে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
দেশের অন্যতম প্রধান এই বনভূমি এখন ধ্বংস এবং বিপর্যয়ের মুখে। সুন্দরবন বাংলাদেশের সমগ্র বনভূমির প্রায় ১৭.৭৩ শতাংশ। মানুষের লোভ আর বিভিন্ন অপকর্মের কারণে সুন্দরবন তার সৌন্দর্য হারাচ্ছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধ দেশকে শুধু পানি শূন্যই করেনি, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে প্রায় মরুভূমিতে পরিণত করেছে। সামগ্রিক প্রাকৃতিক পরিবেশকে বিনষ্ট করছে। ফারাক্কার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বনভূমি সুন্দরবন অঞ্চলে। এ বাঁধের কারণে পদ্মা নদীর পানির সরবরাহ ও নাব্য কমে যায়। ফলে সুন্দরবনে প্রবাহিত শাখা নদীগুলোর মধ্য দিয়ে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি অভ্যন্তরভাগে বহুদূর পর্যন্ত প্রবেশ করে। এর ফলে সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান বৃক্ষ কম লবণাক্ততায় টিকে থাকার উপযোগী উদ্ভিদ সুন্দরী গাছ মরে যাচ্ছে। এছাড়া, মানুষের সচেতনতার অভাবে সুন্দরবনসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের বনভূমি মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। আমরা দিন দিন গ্রীন হাউস এফেক্টের নির্মম শিকারে পরিণত হতে চলেছি। দেশের বনাঞ্চলগুলোর সম্পদের অধিক ও অনিয়ন্ত্রিত আহরণ পরিবেশ ও প্রতিরোধের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফারাক্কা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নদীর নাব্য সংকটের কারণে দেশের পরিবেশ ভারসাম্যহীনতার শিকার হচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে নির্বিচারে গাছ কাটার কারণে সুন্দরবনসহ দেশের অন্যান্য বনাঞ্চল হুমকির সম্মুখীন। শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বনভূমির অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে। দিনে দিনে যে পরিমাণ গাছ কাটা হচ্ছে, তার এক-চতুর্থাংশও রোপন করা হচ্ছে না। গাছ লাগানো হলেও প্রাথমিক পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অসংখ্য চারাগাছ মারা যাচ্ছে। বিশ্ব পরিবেশ বিজ্ঞানীদের অভিমত অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা সমুদ্র গর্ভে তলিয়ে যেতে পারে। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, সিলেটসহ দেশের অন্যান্য শহরও অব্যাহত পাহাড় কাটার কারণে বৃষ্টির সঙ্গে বালি পড়ছে আবাদযোগ্য জমিতে। পানি নিষ্কাশনের খালগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এতে বন্যা সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করছে। লাখ লাখ মানুষ জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছে। এছাড়া, নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে ভূমিধসে প্রাণ হারাচ্ছে অনেক ছিন্নমূল মানুষ। নিজেদের প্রয়োজনেই এখন পাহাড় অক্ষত রাখা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
সবুজ বুক্ষরাজি এবং শ্যামল প্রকৃতি প্রাণীদের বাঁচিয়ে রাখছে অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং আমাদের নিঃশ্বাসের সাথে বের হওয়া বিষাক্ত কার্বন-ডাই-অক্সইড গ্যাস গ্রহণ করে। অথচ আমরা অবিবেচকের মতো পরিবেশ রক্ষাকারী বৃক্ষরাজি, বনভূমি ও পাহাড় উজাড় করে চলেছি। পরিবেশবিদদের মতে, এক হেক্টর সবুজ বনভূমি ৩.৭ টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং ২ টন অক্সিজেন ত্যাগ করে। অনিয়ন্ত্রিত বৃক্ষ নিধনের ফলে এই পরিমান কার্বন-ডাই-অক্সইডের বাতাসে মিশে প্রকৃতিকে করছে শুষ্ক ও গরম। যেসব স্থানে কাঠের বিকল্প হিাসবে অন্যকিছু ব্যবহার করা যায়, সেখানেও কাঠের ব্যবহার হচ্ছে। যেমন দেশের প্রায় ৪ হাজার ইট ভাটাতে প্রায় ৩ লাখ মেট্রিক টন কয়লা ব্যবহৃত হতে পারে। তা না করে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে কাঠ। চলছে বৃক্ষ নিধন। পরিবশ বিজ্ঞানীদের মতে, দেশের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য জরুরিভিত্তিতে সব রকমের পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মধ্য দিয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং প্রয়োজনে কঠোর আইন প্রণয়ন করে তা প্রয়োগ করতে হবে। ইট তৈরির জন্য কাঠের ব্যবহার রোধ করতে হবে। এসব করা না হলে, ভয়াবহ দুর্যোগ সৃষ্টি হবে। পরিবেশ ও প্রতিবেশ সমস্যা যেহেতু বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষপটে একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়, তাই আমাদের পরিবেশ ভারসাম্যহীনতা এবং বনভূমি উজাড়ের অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসাবে ফারাক্কাসহ বিভিন্ন নদীর পানির হিস্যা আদায়ে তৎপর হতে হবে। প্রয়োজনে সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া, দেশী-বিদেশী গবেষক দ্বারা পরিচালিত নিরবচ্ছিন্ন ও গঠনমূলক গবেষণা সেল থাকা জরুরি। বনসম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে আরও নিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পিত ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে। পরিবেশকে রক্ষা করার কাজে সাফল্য অর্জন করতে হলে সময় থাকতে সতর্ক হতে হবে। শুধু সেমিনার বা সমাবেশই যথেষ্ট নয়, জনগণকে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করে তোলার পাশাপাশি যুগোপযোগি কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। ওয়াশিংটনের আবহাওয়া ইনস্টিটিউশনের বিশেষজ্ঞরা এশিয়ার দক্ষিলাঞ্চলীয় ৮টি দেশের প্রতি সতর্কবাণী উচ্ছারণ করার পাশাপাশি এটাও বলেছেন, উন্নত পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ প্রযুক্তির দ্রুত ব্যবহারের মাধ্যমে সম্ভাব্য দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করা সম্ভব।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত