
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরার উপকূলে শ্যামনগর উপজেলার অধিকাংশ মানুষের জীবন চলে যুদ্ধ করে বন আর নদীর সাথে। বাঘের আক্রমণ তো আছেই তাছাড়া রয়েছে ভয়ংকার বনদস্যু বাহিনী। এদের মুখ থেকে আড়াল করে আয় করে নিয়ে এসে জীবন জীবিকা নির্বাহ করছে শ্যামনগর উপজেলার মানুষ।জলবায়ু পরিবর্তনের কষাঘাত সুন্দরবন উপকূলে। ৩০ বছরে কমেছে ২২ শতাংশ ফসলি জমি। লবণাক্ততা বাড়ায় অনাবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে ৭ শতাংশ। নেই বিকল্প কর্মসংস্থানের বড় কোনো উদ্যোগও। এ অবস্থায় জীবিকার খোঁজে অন্যত্র পাড়ি জমালেও প্রতারিত হয়ে ফিরেছেন অনেকে।
শ্যামনগর, সাতক্ষীরা জেলার একটা উপজেলা। মুন্সিগঞ্জ, শ্যামনগর উপজেলার একটি ইউনিয়ন। বিভিন্ন কারণে ইউনিয়নটির নাম বারবার আলোচনায় আসলেও সবচেয়ে বড় পরিচয় বিশ্বের একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে এর অবস্থান। এখানে বসবাস করা লোকদের আবাসন নিয়ে আমরা চিন্তিত, ভাবছি তাদের সুরক্ষা নিয়ে। বনের ওপর নির্ভর করা এই মানুষগুলো ছয় থেকে সাত মাস বন সংশ্লিষ্ট কোনো কাজ করতে পারে না। আমরা তাদের আশি থেকে নব্বই কেজি চাল দিয়ে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতার গল্প শুনিয়ে দিচ্ছি। রাতে কোনো মা ও শিশু অসুস্থ হয়ে পড়লে জরুরি কোনো যানবাহন যেখানে পৌঁছায় না, সেখানে আমরা তাদের স্বাস্থ্য সচেতনতার বার্তা দিচ্ছি।
সুন্দরবনের মোট আয়তন দুই হাজার দুইশত আঠাশ বর্গমাইল বা তিন হাজার পাঁচশত পঁয়ষট্টি বর্গ কিলোমিটার বা চৌদ্দ লক্ষ পঁচিশ হাজার আটশত পঁচানব্বই একর। যার মধ্যে সাতক্ষীরা তথা শ্যামনগর অংশে বনভূমির পরিমাণ চার লাখ একান্ন হাজার একশত আশি একর। শ্যামনগর ইউনিয়ন প্রায় পঁয়ত্রিশ বর্গ কিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট। যার মূল ভূখণ্ড চারশত পঞ্চান্ন বর্গ কিলোমিটার এবং সুন্দরবন এক হাজার চারশত আটচল্লিশ বর্গ কিলোমিটার।
জলবায়ু পরিবর্তনের কষাঘাত সুন্দরবন উপকূলে। ৩০ বছরে কমেছে ২২ শতাংশ ফসলি জমি। লবণাক্ততা বাড়ায় অনাবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে ৭ শতাংশ। নেই বিকল্প কর্মসংস্থানের বড় কোনো উদ্যোগও। এ অবস্থায় জীবিকার খোঁজে অন্যত্র পাড়ি জমালেও প্রতারিত হয়ে ফিরেছেন অনেকে।
প্রকৃতির কোলে জীবনের গল্প। যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকির সাথে নিত্য বসবাস। প্রতি বছর বাড়তে থাকা ঘূর্ণিঝড়, বন্যা আর নদী ভাঙনে জর্জরিত এক জনপদ আজ নিজেদের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যত প্রজম্মকে একটি সুস্থ ও টেকসই জীবন কামনা করছে। কিন্তু সত্যি কি তারা পারবে তা করতে!
একথা আজ আমাদের কাছে নতুন কোনো বিষয় নয় যে, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ জলবায়ুর প্রতিনিয়ত পরিবর্তন। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর বারংবার চরম আঘাত হানছে যা ইতোমধ্যে আমরা উপলব্ধি করেছি। জলবায়ু পরিবর্তন শুধুমাত্র পরিবেশে পরিবর্তন আনছে না, মানবজীবন, খাদ্য উৎপাদন, পানীয় জল সরবরাহ, স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে।
জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি প্যানেলের ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২১ শতকের শেষ নাগাদ বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা গড়ে ১ মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ২ থেকে ৩ মিলিমিটার হারে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। উপকূলীয় ১৯ জেলার মধ্যে প্রায় ১০ জেলা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা। বিশ্বব্যাংক, ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের প্রতিবেদন বলছে, খুলনা, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা তারমধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। সমুদ্রপৃষ্ঠ ১ মিটার বাড়লে প্রায় ১৭ শতাংশ জমি ও ৩০ মিলিয়ন মানুষ ঝুঁকিতে পড়বে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট অনুসারে, গত ৩৫ বছরে আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত জমির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য মতে ২০৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ১ দশমিক ৫–২ কোটিরও বেশি মানুষ তাদের বসতি হারাতে পারে উপকূলীয় অঞ্চলে। এদেরকে বলা হচ্ছে ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’, যাদের অনেকেই শহরমুখী হয়ে চরম দারিদ্র্য ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
ম্যানগ্রোভ বন জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাবের শিকার। উপকূলীয় জেলেরা জীবিকা হারাচ্ছেন। সুন্দরবনের ক্ষয়ে ঘূর্ণিঝড় থেকে রক্ষার প্রাকৃতিক ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল যা জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বিপন্ন হতে পারে। বন বিভাগের তথ্য মতে, সুন্দরবনের ৪০ শতাংশ অঞ্চল আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বিলীন হতে পারে, যা বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশ্ব প্রকৃতি তহবিলের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, সুন্দরবন যেমন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল, তেমনি এটি উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ, যা ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানবিক ও পরিবেশগত সংকট সৃষ্টি করবে। পানিবাহিত রোগ (ডায়রিয়া, টাইফয়েড, চর্মরোগ) বাড়ছে। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের পরে বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি দেখা দেয়। অভ্যন্তরীণ স্থানচ্যুতি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র অনুযায়ী, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ জলবায়ুজনিত কারণে শুধুমাত্র বাংলাদেশে ৭ লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। শহরমুখী অভিবাসন বৃদ্ধি পাবে, ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো বিভাগীয় শহরে জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি।
বস্তি ও সামাজিক অস্থিরতা তথা অপরাধ, দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়েই যাবে, মানসিক স্বাস্থ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষ করে যারা বাস্তুচ্যুত হবে। ডাবলিন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাতের প্রবণতা পরিবর্তন হলে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া এবং কলেরা রোগের বিস্তার বাড়বে। স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে, ২০৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্য সমস্যা আরও প্রকট হয়ে উঠবে ও দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুসহ অন্যান্য রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাবে। জলে লবণাক্ততা বেড়ে গিয়ে কৃষিকাজে ব্যবহৃত জমি অনাবাদি হয়ে পড়বে। ধান, গম, সবজি, পাটসহ বহু খাদ্যশস্যের উৎপাদন ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। গবাদি পশু ও খামারব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পানির সংকট তীব্র হবে, লবণাক্ততা ভূগর্ভস্থ ও পৃষ্ঠজল উভয়েই আক্রান্ত করবে, বিশুদ্ধ পানির অভাবে জলবাহিত রোগ ও অপুষ্টি ব্যাপকভাবে ছড়াতে পারে। মৎস্য ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হবে সুন্দরবনসহ উপকূলীয় নদী ও মোহনার জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। চিংড়ি, ইলিশ ও অন্যান্য মাছের প্রজনন হ্রাস পেতে পারে, যার ফলে জীবিকা হারাবে লাখো মানুষ।
যতীন্দ্রনগর জেলে পাড়ার সুরমা (ছদ্মনাম) আজ কাঁদছে। স্বামী স্ত্রী দুজনে বনে মাছ, কাঁকড়া ধরে জীবনচালায়। সুন্দরবনের কোলে তাদের বসবাস। একদিকে বন অন্যদিকে জীবন। জানুয়ারি থেকে মার্চ ইলিশের প্রজনন মৌসুম। জুন থেকে আগস্ট কাঁকড়া ও চিংড়ির প্রজনন মৌসুম। এ সময়ে বনে যাওয়া ও নদীতে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষেধ। নিষেধাজ্ঞাকালীন সরকারিভাবে পরিবার প্রতি চাল দেয়া হয়। কিন্তু আর জীবন চলবে কিভাবে! খুব অল্প বয়সে বাবার হাত ধরে বনে যাওয়া শুরু, এখন যাচ্ছে স্বামীর হাত ধরে। এই পথ চলা তার শেষ হয়নি! নিজের সঞ্চয় বলে কিছু নেই। তাই আজ সে খুঁজছে বিকল্প জীবনের পথ। ভরা জোয়ারে, ঢেউয়ের তালে যাদের জীবন দোলে, প্রতিনিয়ত নদী, বন, প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করে, আজ সে ক্লান্ত। সবাই আসে যায় কিন্তু সুরমাদের ভাগ্যের কোন দিশা এখনো হয়নি! অজানা ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে তাদের চোখে অশ্রু ছাড়া আর কিছু নেই!
তাই আজ আমাদের সবার জন্য, দেশ প্রকৃতি জীব ও বৈচিত্র্য রক্ষায় কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। উপকূলীয় এলাকায় সবুজ বেষ্টনী তৈরি, বিশেষ করে সুন্দরবনের মত ম্যানগ্রোভ বন সম্প্রসারণ, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে। নদী ভাঙনরোধে কার্যকর ভেড়িবাঁধ নির্মাণ করা। বাড়ির চারপাশে লবণাক্ত সহিষ্ণু গাছ রোপণ করা। চাষাবাদের জন্য লবণাক্ততা অভিযোজক ধান, গম বা সবজির জাত নির্বাচন করা। লবণ সহনশীল কৃষি গবেষণা ও বীজ সরবরাহে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহার দক্ষ করার জন্য বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ পদ্ধতি গ্রহণ। শুধুমাত্র কৃষির ওপর নির্ভর না করে হাঁস-মুরগি পালন, মৎস্য চাষ, হস্তশিল্প বা ক্ষুদ্র ব্যবসায় উৎসাহ দেওয়া। নারীদের স্বনির্ভরতা বাড়াতে সেলাই, কুটির শিল্প ও ছোট উদ্যোক্তার প্রশিক্ষণ দেওয়া। উঁচু মাচা বা প্ল্যাটফর্মের ওপর ঘর নির্মাণ। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধে উপযোগী আবাস গঠন করা। স্থানীয় সাইক্লোন শেল্টারগুলোতে সঠিকভাবে যাতায়াত নিশ্চিত করা।
পরিবারভিত্তিক জরুরি পরিকল্পনা তৈরি (প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ওষুধ, শুকনো খাবার সংরক্ষণ)। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে স্থানীয় জনগণকে সচেতন করা। স্কুল ও কমিউনিটিতে সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা আয়োজন করা। শিশু ও যুবকদের জলবায়ুর নেতা হিসেবে তৈরি করা। উপকূলীয় জেলায় মিষ্টি পানির রিজার্ভার নির্মাণ। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ঘরে ঘরে হারভেস্টিং সিস্টেম চালু করা। জলাধার পুনঃখনন করে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানো। আগাম ঘূর্ণিঝড় সতর্কতা ও এসএমএস সতর্কবার্তা প্রযুক্তি আরও উন্নত ও সম্প্রসারিত করা। জলবায়ুর কারণে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর জন্য গৃহনির্মাণ ও পুনর্বাসন প্রকল্প (যেমন আশ্রয়ন প্রকল্প) আরও সম্প্রসারণ। উন্নত দেশগুলো থেকে জলবায়ু ক্ষতিপূরণ সংগ্রহে সক্রিয় কূটনৈতিক সক্ষমতা তৈরি করা। ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য ‘ক্ষতি এবং ক্ষতি’ অর্থায়ন নিশ্চিত করা। জাতীয় জলবায়ু ফান্ড গঠন করে উপকূলীয় উন্নয়নে ব্যবহার। জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ও জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বহু-খাতভিত্তিক সমন্বিত নীতি গ্রহণ। আগামী প্রজন্মের জন্য আজ থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। শুধু প্রকৃতি নয়, মানুষের মানসিকতা, অভ্যাস ও নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে না হলে ২০৫০ খ্রিষ্টাব্দ উপকূল নয়, পুরো দেশই বিপদের মুখে পড়তে পারে। আসুন আমরা সকলে মিলে আমাদের গর্বের সুন্দর বনকে ও তাকে নির্ভর করে যাদের জীবন চলে তাদের জন্য কিছু করি। আগামী প্রজন্মকে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ উপহার দেই।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত