
এনায়েত করিম রাজিব, মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) : বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি রবার্ট মোড়েলের স্থাপিত শৈল্পিক কুঠিবাড়িটি অযত্ন অবহেলা ও সংস্কারের অভাবে প্রায় বিলুপ্তির পথে এ ঐতিহাসিক বাড়িটি। কুঠিবাড়িটি স্মরণ করিয়ে দেয় অত্যাচারের নির্মম ইতিহাস।
১৮৪৯ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি মি. মোড়েলের মৃত্যু হলে স্ত্রী মিসেস মোড়েল তার দুই ছেলে রবার্ট মোড়েল ও হেনরি মোড়েলকে নিয়ে বসতি গড়েন পানগুছি নদীর পশ্চিম পাড়ে। সুন্দরবন বন্দোবস্ত নিয়ে শুরু করেন নীল চাষ। বাগেরহাট তখন মহকুমাও হয়নি। খুলনা জেলাও ছিল যশোর জেলার অন্তর্গত। আর এর বড় অংশ জুড়ে ছিল সুন্দরবন। বরিশাল থেকে শ্রমিক সংগ্রহ করে বন আবাদ করে গড়ে তোলেন বিশাল আবাসস্থল 'কুঠিবাড়ি'। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব দমন করে ইংরেজ শাসকরা এদেশে তাদের শাসন দৃঢ় করার লক্ষ্যে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করে তার মধ্যে এই কুঠিভিত্তিক শাসনব্যবস্থা অন্যতম। কুঠিবাড়ির তলদেশে নির্মিত হয় অশ্বশালা। গোপন সুড়ঙ্গসিঁড়ি দিয়ে সরাসরি নামা যেত অশ্বশালায়। এছাড়াও কুঠিবাড়ির অভ্যন্তরে আনন্দকক্ষ বা নাচঘর, গুদামঘর, নির্যাতন কক্ষ ও লাঠিয়াল বাহিনীর জন্য পৃথক কক্ষ ছিল। মূল এই ভবনটির পাশে ছিলো কাচারিঘর, অবাধ্য শ্রমিকদের বেঁধে রাখার ঘর ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত মালামাল রাখার ঘর। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বন্যপ্রাণীর হাত থেকে রক্ষা পেতে কুঠিবাড়ির চারদিকে উঁচু প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। ঐ সময় মূল শাসকের দায়িত্ব পালন করেন রবার্ট মোড়েল। তার নাম লেখা হতো 'দ্বিতীয় অ্যাডমন্টন রয়েল মিডেলসেক্স মিলিশিয়া রাইফল পল্টনের কাপ্তান রবার্ট মোড়েল'।
মোড়েল পরিবার পানগুছি নদীর পূর্বতীরে নারিকেল-সুপারির বাগান করেন এবং বাজার বসান। ক্রমে তাদের নামানুসারে এ বাজারের নাম হয়ে যায় মোড়েলগঞ্জ। পরে ইংরেজ সরকার এ বাজারকে বন্দর হিসেবে ঘোষণা করে। বন্দরটি ব্যবসা সফল হওয়ায় পরিচিতি পায় 'লিটেল কোলকাতা' নামে। পরে নদীতে চর পড়ে যাওয়ায় ধীরে ধীরে এ বন্দর বন্ধ হয়ে যায়। নীল, নীলকর নিয়ে এই মোড়েল পরিবারের সঙ্গে মিশে আছে অনেক কাহিনি। শাসক রবার্ট মোড়েলের ছোট ভাই হেনরি ও ম্যানেজার হেইলির সহযোগিতায় স্থানীয় অধিবাসী ও শ্রমিকদের ওপর অত্যাচার নিপীড়ন চালাতেন। এ অত্যাচারের খবর শুনে পার্শ্ববর্তী বারইখালী গ্রামের কৃষক নেতা জাহাঙ্গীরের ছেলে রহিমুল্লাহ্ ইংরেজি শেখার ইচ্ছা ত্যাগ করে কলকাতা থেকে গ্রামে ফিরে আসেন।
গ্রামে ফিরে তার আট ভাই ও সঙ্গীদের নিয়ে সুন্দরবন আবাদ করে ১ হাজার ৪০০ বিঘা জমি চাষের উপযোগী করে তোলেন। রবার্ট মোড়েল এই খবর জানতে পেরে রহিমুল্লাহর কাছে তার আবাদ করা ১ হাজার ৪০০ বিঘা জমির খাজনা দাবি করেন। এতে রাজি হননি রহিমুল্লাহ্। পরে আবারও খাজনা চেয়ে পেয়াদা পাঠালে রহিমুল্লাহ্ এর জবাবে একটি কাঠের বাক্সে নারীদের ছেঁড়া জুতা পাঠিয়ে কর প্রদানের দাবি পুনরায় প্রত্যাখ্যান করেন। এভাবে কাজ হবে না ভেবে কূটকৌশলের আশ্রয় নেন রবার্ট মোড়েল। রহিমুল্লাহ্ প্রতিবেশী ও সহযোগী গুণী মামুনকে রহিমুল্লাহর আবাদ করা এক খণ্ড জমি পত্তনি দিয়ে দলে ভেড়ান মোড়েল। ঐ জমি দখলের নামে ১৮৬১ সালের ২১ নভেম্বর শেষ রাতে রামধন মালোর নেতৃত্বে হেনরি মোড়েল ও তার ম্যানেজার হেইলি শতাধিক লাঠিয়াল নিয়ে রহিমুল্লাহকে আক্রমণ করেন। রহিমুল্লাহ্ও সঙ্গীদের নিয়ে পালটা আক্রমণ করেন। এতে মোড়েল বাহিনীর প্রধান রামধন মালোসহ সাত/আট জন নিহত হন। হেনরি ও হেইলি ধরা পড়েন রহিমুল্লাহ্র হাতে। জীবনে এমন কাজ আর করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিলে হেনরি ও হেইলিকে ছেড়ে দেন রহিমুল্লাহ্। এ ঘটনার তিন দিন পরে শক্তিশালী অস্ত্রধারী বাহিনী সংগ্রহ করে ২৫ নভেম্বর রাতে রহিমুল্লার বাড়িতে আক্রমণ করে মোড়েল বাহিনী। রহিমুল্লাহ্ তার দুই স্ত্রীর সহায়তায় সারা রাত ধরে দুইটি গাঁদা বন্দুকের সাহায্যে লড়াই করেন মোড়েল বাহিনীর বিরুদ্ধে। ভোররাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন রহিমুল্লাহ্। এ খবর শুনে রহিমুল্লাহর সহপাঠী তৎকালীন এ এলাকার ম্যাজিস্ট্রেট সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র সরেজমিনে এই ঘটনার তদন্তে আসেন।
হেনরি, হেইলি ও দুর্গাচরণ আত্মগোপন করেন। আসামিদের অনেককে আটক করে কলকাতায় নিয়ে যান ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিম চন্দ্র। তাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়। হেনরি বোম্বে ও দুর্গাচরণ বৃন্দাবন থেকে গ্রেফতার হন।
অসুস্থ হয়ে বরিশালে চিকিৎসাধীন থাকেন রবার্ট মোড়েল। চিকিসাধীন অবস্থায় ১৮৬৮ সালের ১৩মে বরিশালেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এর পরে আর বেশিদিন টেকেনি মোড়েল পরিবারের শাসন। কৃষক নেতা রহিমুল্লাহ হত্যার জের ধরেই মোড়েলগঞ্জ থেকে ১৮৭৮ সালে শাসন গুটাতে হয় তাদের। কিন্তু শুধু কালের সাক্ষী হয়ে এখনো রয়ে গেছে 'কুঠিবাড়ি' নামে পরিচিত মোড়েলদের নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাবিবুল্লাহ জানান, প্রাচীন ঐতিহ্য রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত রয়েছে। ইতিমধ্যে তার স্মৃতিস্তম্ভটি সংস্কার করা হয়েছে।
প্রধান সম্পাদক: লে. কমান্ডার (অব.) রাশেদ ইকবাল, প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত