ফাওজিয়া ফারিয়া জেবা, খুবি : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাসের সেই আদিম ও অকৃত্রিম প্রকৃতির ঘ্রাণ কি ইট-পাথরের শহরে পাওয়া সম্ভব? উত্তরটি পেতে হলে আপনাকে পা রাখতে হবে ১০৬ একরের এক মায়াবী ভূখণ্ডে, যার নাম খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি)। সময়ের আবর্তে ক্যাম্পাসটি এখন কেবল দেশ সেরা একটি উচ্চশিক্ষার বিদ্যাপীঠ নয়, বরং প্রকৃতি আর তপ্ত তারুণ্যের এক নিবিড় উপাখ্যান—যেখানে বইয়ের পাতার অক্ষরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কথা বলে জারুল, পলাশ আর নাম না জানা হাজারো বনকুসুম। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য মিলে শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশের তীর্থস্থানে রুপ নিয়েছে।
জল ও স্থলের স্নিগ্ধ অভ্যর্থনা:
বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই যেন অভ্যর্থনা জানায় এক চিলতে প্রশান্তি। পুকুরের টলমলে লোনা-মিষ্টি জলে লাল শাপলার যে সতেজ হাসি, তা নিমিষেই ভুলিয়ে দেয় একাডেমিক জীবনের যান্ত্রিকতা। প্রবেশপথের চারপাশ ঘিরে হরেক রঙের ফুল গাছগুলো যেন এক একটি জীবন্ত কবিতা। একটু এগোলেই চোখে পড়বে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মুকুট রত্ন’ খ্যাত লালন লেক। জীবনানন্দের কবিতার মতো সেই শান্ত জলের শরীর জুড়ে খেলা করে রোদের ঝিলিক। গত দুই বছরে লেক সংলগ্ন ওয়াকওয়ে ও ছায়াঘেরা পরিবেশ আরও পরিপক্ব হয়েছে, যেখানে শিউলি ফুলের সুবাসে ক্যাম্পাসের প্রতিটি রাত এক অন্য ভুবনে নিয়ে যায় শিক্ষার্থীদের। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের অদ্ভুত এক মায়ায় আপন করে বুকে জড়িয়ে রাখে এই প্রাকৃতিক স্নিগ্ধতা।
গোলপাতার নস্টালজিয়া ও আধুনিকতার ছোঁয়া:
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়াটি এখন ক্যাম্পাসের প্রাণের কেন্দ্র। বাঁশঝাড়, পদ্ম-শাপলার পুকুর আর পেছনে হোগলার বন-সব মিলিয়ে এক গ্রামীণ দৃশ্যপট। সুন্দরবনের ঐতিহ্যবাহী গোলপাতায় মোড়া এই ছাউনির নিচে যখন ক্লাসের ফাকে অথবা বিকেলের আড্ডা জমে, তখন মনে পড়ে যায় হারানো কোনো দুরন্ত শৈশব। পাশের কচুরিপানার ফাঁকে উঁকি দেওয়া পদ্মফুলের দল এখানে ক্লান্ত শিক্ষার্থীদের মনে এনে দেয় একপশলা নির্মল শান্তি। এটি কেবল খাওয়ার জায়গা নয়, বরং শিল্প-সাহিত্য আর মুক্তচিন্তার এক উর্বর চত্বর।
অদম্য বাংলার পথে পাখির কলতান:
বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অদম্য বাংলা’ ভাস্কর্যটি সাহসের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সবুজের মাঝে। সড়কের দুপাশে বকুল আর শিউলির মাদকতা মৌমাছিদের যেমন টানে, তেমনি টানে বইপ্রেমী শিক্ষার্থীদেরও। ক্যাম্পাস জুড়ে গাছে গাছে ঝোলানো মাটির হাঁড়িগুলো জানান দেয়-এখানে পাখিরাও নিরাপদ নাগরিক। ডানা মেলা পাখিদের কিচিরমিচিলে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের সেই ‘খোলা হাওয়া’র গানটি বুঝি ক্যাম্পাস জুড়েই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সর্বত্র।
ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ ২৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী ইব্রাহিম সিরাজ বলেন, আমার পরিবার ঢাকায় থাকে, খুলনায় কখনই আসা হয়নি, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পর একাধিকবার ভেবেছি যে কিভাবে পরিবার ছেড়ে একা থাকবো। কিন্তু আমার সকল দুশ্চিন্তা কেটে গিয়েছে ক্যাম্পাসে। শিক্ষার্থী বান্ধব একাডেমিক পরিবেশের পাশাপাশি এই সবুজ ক্যাম্পাসের প্রকৃতির এক অদ্ভুদ মাদকতা আমাকে পরিবার ছেড়ে একা থাকতে অনুপ্রেরণা দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।
ঋতুচক্রে রঙের মহোৎসব:
শীত আসতেই খুবির ক্যানভাসে রাজত্ব শুরু করে ‘সূর্যের হাসি’। কাজী নজরুল ইসলাম কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের কোল ঘেঁষে ফুটে থাকা শত শত সূর্যমুখী যেন হাজারো জীবন্ত সূর্য। সেই হলুদ আভার মাঝে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের ছবি তোলার হিড়িক যেন এক উৎসবে পরিণত হয়। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয় এই ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য্য পুরো খুলনার মানুষকেই আকৃষ্ট করে। অন্যদিকে মুক্তমঞ্চের সামনের শ্বেতকাঞ্চন আর কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম আভা বসন্তের আগমনী বার্তা দেয় আগাম। আম, জাম, কাঁঠাল আর কামরাঙার সমারোহে গ্রীষ্মকালে এখানে পাখিদের যে ভোজ বসে, তা বিরল কোনো অরণ্য দৃশ্য ছাড়া আর কোথাও কল্পনা করা কঠিন।
পরিবেশ ভাবনা ও মননশীল বিকাশ:
বিগত বছরগুলোতে নতুন করে কয়েক হাজার গাছ রোপণের ফলে ক্যাম্পাসটি এখন আরও সজীব। চারুকলার শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা আর প্রশাসনের পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ-সব মিলে এক সুষম ভারসাম্য। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার প্রফেসর ড: এসএম মাহবুবুর গোলাম রহমান এর মতে, "পরিবেশ রক্ষা করেই এখানকার সব উন্নয়ন পরিকল্পনা করা হয়। শাপলা রক্ষা থেকে শুরু করে পাখিদের নিরাপদ আবাসন-সবই আমাদের অগ্রাধিকার।"
উপচার্য অধ্যাপক ড, মোঃ রেজাউল করীম যথার্থই বলেছেন, "এই ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের কেবল ডিগ্রি দেয় না, দেয় এক মানবিক ও মননশীল বিকাশের অবারিত সুযোগ।" পরিবার ছেড়ে আসা শিক্ষার্থীরা এই সবুজ অরণ্যের মাঝেই খুঁজে পায় এক পরম আশ্রয়, যা তাদের সংগ্রামের দিনগুলোকে করে তোলে সহনীয় ও সুন্দর। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সবুজ অরণ্যে পড়াশোনা আর প্রকৃতি এক সমান্তরাল রেখায় চলে। যেখানে প্রতিটি জারুল তলা আর বকুল বীথি সাক্ষী হয়ে থাকে হাজারো শিক্ষার্থীর সোনালী দিনলিপির। এখানে প্রকৃতি কেবল পটভূমি নয়, প্রকৃতি এখানে জীবন গড়ার নিঃশব্দ কারিগর।