
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরা সহ উপকূলের ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাস প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষরা নির্বাচনের সময় উল্টে যাচ্ছে প্রার্থীদের বাড়ি বাড়ি। উপকূলবাসীর একটাই দাবি তারা ভাত ,কাপড় ও ত্রাণ চায়না চায় টেকসই মজবুত ভেড়ি বাধ। নির্বাচন ঘিরে যেমন সব রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতৃবৃন্দের মধ্যে যেমন দৌড়ঝাঁপ তথা প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। তেমনি এবার উপকূলের ভুক্তভোগী ভোটাররা প্রস্তুত শুরু করেছে। তারা প্রার্থীদের কাছ থেকে কিছু নিতে চায়। এমন নিতে চাওয়ার উদাহরণ নতুন নয়। তবে সাধারণত প্রার্থীদের কাছ থেকে নিজেদের নগদ নগদ সুযোগ সুবিধা নেয়ার উদাহরণই সবথেকে বেশি। আর উপকূলে সম্পদ হারা, ফসল হারা মানুষ সব রাজনৈতিক দলের কাছেই ছুটছে। তাদের চাওয়া খুব পরিষ্কার তারা চায় সব রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে তুলে আনুক উপকূলের মানুষের জীবনমানের নিরাপত্তায় টেকসই বেড়িবাঁধ।
সাতক্ষীরার উপকূল ঘুরে দেখা গেছে ত্রিশ কিলোমিটারের বেশি ষাটের দশকের বেড়ীবাঁধ রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। একই অবস্থা বিরাজমান খুলনা ও বাগেরহাট উপকূলে। শ্যামনগর উপজেলার দূর্গাবাটি গ্রামের ধীরেন্দ্রনাথ রপ্তান বলেন, দেশের দক্ষিণ উপকূলের কোটি মানুষের আর্তনাদ আজ রাজনীতিবিদদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না অথবা তারা তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার আগে বা পরে উপকূলবাসীর কথা মনে থাকছে না। আশি বছর বয়সী ধীরেন বলেন, বেড়িবাঁধ ভেঙে তিনি ও তার পরিবার অন্তত সাতবার গৃহহারা হয়েছেন। এখন তিনি মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এরকম খারাপ অবস্থায় এলাকা ছাড়ার সংখ্যা দিনে দিনে বড় হচ্ছে। তাই এলাকার মানুষ এখন প্রার্থীদের কাছে সরাসরি দাবি তুলছে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডাতে উপকূলবাসীর জন্য কী করবে তা স্পষ্ট করুক।
সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট বারবার দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারণে দিনের পর দিন জলবন্দি দিনযাপন আর ঘরবাড়ি ভেঙে বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়া শ্যামনগরের গাবুরা, পদ্মপুকুর, রমজাননগর, মুন্সিগঞ্জ, কৈখালী, আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর, শ্রীউলা, আশাশুনি, আনুলিয়া, খাজরাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ দরিদ্র থেকে হতদরিদ্র হয়েছে। এরকম পরিস্থিতিতে উপকূলবাসীর কথা রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে তুলে ধরার জন্য আহ্বান জানান শ্যামনগর উপজেলার জেলেখালী গ্রামের রঞ্জন কুমার রপ্তান।
রাজনীতিবিদরাই দেশের নীতি নির্ধারণ করে থাকেন আর নির্বাচিত রাজনৈতিকদলগুলোই নির্ধারণ করেন দেশের মানুষের সংকট সমাধানে কী করতে হবে। আসছে নির্বাচন তৎপর হয়ে পড়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃনন্দের এই নির্বাচনী প্রস্তুতির সাথে দেশের সব থেকে দুর্যোগকবলিত মানুষের কথা যথাযথ ভাবে উঠে আসছে না এমনই কষ্টের অভিব্যক্তি জানালেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলের শ্রীফলকাটি গ্রামের নারী রেকসানা বেগম। জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও শ্যামনগর মহিলা কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ আশেক ই এলাহী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন আজ মানবতার জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও বৈশ্বিক উষ্ণতায় বাংলাদেশের অবদান মাত্র ০.৪%, বলে ক্লাইমেট ভালনাবেলিটি ইনডেক্স ২০২০ অনুসারে দুর্যোগে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলির মধ্যে আমাদের দেশের অবস্থা তৃতীয়। এবং ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুসারে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে সপ্তম। ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ১৯৭টি বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে যা এদেশের মানুষের জীবন-জীবিকা, সম্পদ, খাদ্য, পানি, বাসস্থানসহ অন্যান্য সংকট সৃষ্টি করেছে। এ সংকট দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে আরো প্রকট।
জলবায়ু বিষয়ক উন্নয়ন সংগঠক মোহন কুমার মণ্ডল বলেন, লন্ডন ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ম্যাপল ক্রফট বিশ্বের ১৭০টি দেশের উপর জরিপ চালিয়ে যে ১৬টি দেশকে সর্বাপেক্ষা ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৩০ থেকে ১০০ সেন্টিমিটারে উপনিত হবে। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ইউনাইটেড নেশনস ইন্টার-গভর্মেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেইঞ্জ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট ভূমির শতকরা ১৭ভাগ সমুদ্রের গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। এর ফলে অন্তত দুই কোটি মানুষ হয়ে পড়বে গৃহহীন। ভৌগলিক অবস্থান, ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভঙ্গুর অবকাঠামো, দারিদ্র্য, দীর্ঘমেয়াদী লবণাক্ততা, সংকটাপন্ন কৃষি প্রভৃতির কারণে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট উপকূলীয় এলাকার মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকার মানুষ, প্রকৃতি, ও জীবন জীবিকার সুরক্ষার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার উদ্যোগ নেওয়া দরকার বলে জানান সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ।
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে উপকূলীয় মানুষের উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার সংযুক্ত করার দাবিতে উপকূলের মানুষের ইশতেহার শীর্ষক উপকূল সংলাপে উপকূলে বারবার দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত নারীপুরুষদের দাবির পরিবর্তে আকুতি প্রকাশ করতে দেখা যায়।
আইলার পর বিশেষ করে ২০০৯ সাল থেকে উপকূলের সকল বেড়িবাঁধ ভাঙা সব গ্রাম থেকে দীর্ঘদিন ধরে একটাই দাবি জোরে উঠছে উপকূলীয় বোর্ড গঠন। বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের মৎস্যচাষী শওকত হোসেন বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে অবকাঠামোগত, শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনৈতিক, সামাজিক, কৃষি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় সামগ্রিক ও টেকসই উন্নয়ন, এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সংযোগ স্থাপন ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য উপকূলীয় উন্নয়ন বোর্ড গঠন করতে হবে।
বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের প্রাক্তন নারী সদস্য মলিনা রাণী রপ্তান আসছে নির্বাচনে সকল দলের ইশতেহারে উপকূলের মানুষের সুপেয় পানির দাবি লিপিবদ্ধ করার জন্য অনুরোধ করেন। এ প্রতিবেদন করার সময় তিনি ঘরের নাস্তা প্রতিবেদক দিতে দিতে বলেন, আমরা একজন অতিথিকে নাস্তা দিতে পারি কিন্তু নাস্তা দিতে গেলে হিমসিম খাই। আমাদের চারপাশে কোথাও একফোটা সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। আমাদের মহিলাদের আধা ঘণ্টা এক ঘণ্টা নৌকা চালিয়ে কলসে করে পানি আনতে হয়। তবে সে পানিও যে নিরাপদ তা বলার উপায় নেই। কারণ পুকুরের পানি ফিল্টার করে তারপর খেতে হয় এসব পানি। মলিনা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। গত ৩৫ বছরে লবণাক্ততা পূর্বের তুলনায় বেড়ে ২ পিপিটি থেকে ৭ পিপিটি হয়ে গেছে।
বিগত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন দলের ইশতেহারে জলবায়ু প্রতিজ্ঞার দিকে চোখ ফেরালে অতীতের যেকোনো সময়ের থেকে উপকূলকে বেশি গুরুত্ব দিতে দেখা গেছে। আওয়ামী লীগের সাতক্ষীরা জেলা কমিটির সহ-সভাপতি ও সাতক্ষীরা সিটি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ বিগত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কর্তৃক ঘোষিত ‘নির্বাচনী ইশতেহার ২০১৮ সম্মৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ এর ৩.২৩ অনুচ্ছেদে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার ওপর গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সংযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঝুঁকিগ্রস্ত এলাকা থেকে ভুক্তভোগীদের নতুন জায়গায় স্থানান্তর, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড-এর কার্যক্রম বাড়ানো, নগরকেন্দ্রিক জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলার রূপরেখা, পানি সমস্যার সমাধানের বিষয়কে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিএনপি সাতক্ষীরা জেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক বলেন, উপকূলবাসী ও জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুকে তার দল বারবার সামনে এনেছে। বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ২০১৮-এ জলাবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় টেকসই কৌশল গ্রহণের আওতায় উপকূলসহ সারাদেশে নিবিড় বনায়ন ও সুন্দরবনসহ অন্যান্য বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র রক্ষায় যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সাতক্ষীরা জেলা কমিটির সভাপতি ওবায়েদুস সুলতান বাবলু জানান, জাসদ এ ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়েছে সে কারণে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় জাতীয় নীতি প্রণয়ন, লোকজ জ্ঞানের ব্যবহার, স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ানো সহ বিভিন্ন অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
আর জাতীয় পার্টি এ বিষয়কে দেয়ার জন্যই দিতে হয়েছে বলে দিয়েছে। এদলের সাতক্ষীরা জেলার সাধারণ সম্পাদক আশরাফুজ্জামান আশু জানান, জাতীয় পার্টির ১৮ দফা সম্বলিত নির্বাচনী ইশতেহারে শুধুমাত্র নদী ভাঙনে গৃহহীনদের জন্য পুনর্বাসনের কথা বলা হয়েছে।
দেশের বড় দলগুলির এ সকল নির্বাচনী ইশতেহার ও পরবর্তীতে অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকার সামগ্রিক উন্নয়ন জাতীয় বাজেটে তেমন গুরুত্ব পায়নি। ইতোমধ্যে সরকার ৩টি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে কিন্তু এর বাইরেও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা রয়েছে অরক্ষিত। সামগ্রিকভাবে দেশের অবকাঠামোগত ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটলেও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকার বড় অংশের মানুষ যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ঘন ঘন দুর্যোগ, সুপেয় পানির তীব্র সংকট, জীবন-জীবিকার সংকট, দুর্বল অবকাঠামো, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, প্রভৃতি মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। ফলশ্রুতিতে মানুষ জীবন-জীবিকার তাগিদে উপকূল ত্যাগ করছে।
অন্যদিকে উপকূলের এই দীর্ঘমেয়াদী সংকট নিরসনে সরকারের পাশাপাশি এনজিওরা দীর্ঘদিন কাজ করছে। কিন্তু এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। এজন্য আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি উপকূলীয় মানুষের উন্নয়নে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি সংযুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে উপকূলের সাধারণ মানুষ। ভুক্তভোগী উপকূলের বাসিন্দা নিরঞ্জন মন্ডল বলেন, তার গ্রাম পাখিমারার সাত এর এক পোল্ডারের যে অবস্থা তাতে মনে হয় কখন যায় যায়। এসব কারণে তার চেনা জানা বহু লোক দেশ ছেড়ে চলে গেছে। উপকূল এলাকায় জীবন জীবিকার নিরাপত্তা থাকলে কেউ জন্মভিটে ছাড়তো বলে তিনি মনে করেন না। আইলা থেকে মখা সব দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত গাবুরার শরবানু বেগম বলেন, আগে আমাদের উপকূলবাসীকে বোঝানোর জন্য হলেও প্রার্থীরা উপকূলে টেকসই বাঁধ, সুপেয় পানিসহ নানা বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিতে আসতো। ইদানিং তাও আসে না। কিন্তু এবার সুন্দরবন উপকূলের মানুষ স্কুলের মাস্টারদের কাছ থেকে পড়ে নিলেও পড়ে নেবে ক্ষমতায় গেলে উপকূলবাসীর জন্য কী করবে তা ঠিকঠাক লিখেছে কি না। আর যদি তা মনোপুত না হয় তাহলে অবশ্যই সে অনুযায়ী দুরে থাকবে। শরবানুর সোজা কথা নির্বাচনী ইশতেহারে উপকূলে অসহায় মানুষদের দূরে রাখবে যে দল। সে দলকেও দূরে রাখবে উপকূলের সাধারণ মানুষ।
জলবায়ু পরিবর্তন ও উপকূল সংকট নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন লিডার্সের সদস্য অসিত মন্ডল বলেন, নির্বাচন আসন্ন আওয়ামী লীগ ইতিমধ্যে নির্বাচনী ইশতেহার প্রস্তুত করতে দেশের সব মানুষের মতামত চেয়েছেন। নিশ্চয় অন্যদলগুলোও সেই কাজের দিকে হাঁটছে। সব দলের মধ্যে নির্বাচনী ইশতেহারে উপকূলের কথা থাকা খুব জরুরি। সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলাকে জলবায়ু দুর্যোগ ঝুঁকিপ্রবণ এলাকা ঘোষণা করতে হবে। অসিত জানান, বাংলাদেশের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সামুদ্রিক দুর্যোগসমূহের ৭০% বয়ে যায় সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলার উপর দিয়ে। এছাড়া ইউএনডিপি ও স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত ক্লাইমেট ভালনেরেবিলিটি ইনডেক্স অনুসারে, সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা জেলাগুলোর মধ্যে খুলনা ও বাগেরহাট ৪র্থ (স্কোর ০.৫২) এবং সাতক্ষীরা ৫ম (স্কোর ০.৫১) অবস্থানে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনকে মাথায় রেখে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকুলকে দুর্যোগপ্রবন এলাকা ঘোষণা করতঃ দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকার ও মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। এ প্রসঙ্গে উন্নয়নকর্মী তমালিকা মল্লিক জানান, উপকুলের ৭৩% মানুষ সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত। দেশের এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য ইকোসিস্টেম ভিত্তিক বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জন্য নিরাপদ খাবার পানির স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। শুধুমাত্র সাতক্ষীরা অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন প্রতি বছর গড়ে ৩.৪৫% হারে কমে যাচ্ছে যা এ এলাকায় খাদ্য সংকট বাড়িয়ে তুলছে। এছাড়া লবাণাক্ততা বৃদ্ধি এ অঞ্চলের মানুষকে স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও ফেলেছে। চিকিৎসাবিদদের মতে এ এলাকার বসবাসকারীদের উচ্চ রক্তচাপ রোগে ভোগার সম্ভাবনা বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে লবণাক্ততায় আক্রান্ত এলাকায় গর্ভবতী মায়েদের প্রি-একলেম্পশিয়া ও উচ্চরক্তচাপের হার ৬.৮%-৩৯.৫% বেড়েছে।
বারবার ভেঙে যাওয়া ঘরবাড়ির বাসিন্দারা নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিটি ঘরকে যেন শেল্টার হোম করা হয় সে কথাও বলেছেন অনেক উপকূলবাসী। ষাটের দশকের ভঙ্গুর স্লুইস গেটগুলো মেরামতের কথাও বলছেন। নীলডুমুর গ্রামের দেবব্রত সরকার বলেন, আমাদের দেশে প্রায় সতের হাজার কিলোমিটার ওয়াপদা বেড়িবাঁধের ৫৭০০ কিলোমিটার বাঁধ দুর্বল থাকায় সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস এলাকায় লবণ পানির অনুপ্রবেশ ঘটায়। জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগকে মাথায় রেখে উপকুলের মানুষের জীবন, জীবিকা ও সম্পদ রক্ষার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ মেরামত, ভঙ্গুর স্লুইসগেট মেরামত ও স্লুইসগেটগুলোর কার্যকরী ব্যবস্থাপনায় আনতে হবে।
উপকূলবাসী প্রাণ থেকে সব থেকে জোরেসোরে প্রধানতম যেসব দাবি তুলছেন তারমধ্যে সর্বাপেক্ষা অগ্রজ হলো; উপকূল টেকানোর প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ সুন্দরবনকে সুরক্ষার দাবি। সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। সুন্দরবনের সম্পদ মানুষের জীবন জীবিকার অন্যতম উৎস এবং এর রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক ধারা। সুন্দরবন দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের রক্ষা কবচ। বিভিন্ন কারণে সুন্দরবন হুমকির সম্মুখীন। উপকূলীয় অঞ্চলকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করার জন্য ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ, সবুজ বেষ্টনী তৈরি, নদীর চর বনায়ন সহ সুন্দরবন সুরক্ষায় স্থায়ী ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলছেন সুন্দরবন গ্রামের রহমত সরদার। হরিনগর গ্রামের অসিত মল্লিক বলেন, সুন্দরবন সুরক্ষার দাবি নিয়ে বিতর্ক থাকার কোন সুযোগ নেই সুন্দরবন না থাকলে শুধু উপকূল অরক্ষিত হবে তা না। অরক্ষিত হবে গোটা বাংলাদেশ।
উপকূল বাসির প্রাণের দাবি-নিরাপদ বেড়িবাঁধ চাই।’ ‘জোড়াতালির বাঁধ নয়-নিরাপদ বেড়িবাঁধ চাই।’ ‘ত্রাণ নয়, টেকসই বেড়িবাঁধ চাই’—এমন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। কেউ কেউ আবার বুকে-পিঠে এসব স্লোগান লিখে সেই ছুবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে ন্যায্য দাবির কথা জানাচ্ছেন রাষ্ট্র ও সরকারকে। যদি সরকার বাহাদুরের হৃদয়ে একটু হলেও নাড়া দেওয়া যায়।
এগুলো নিছক স্লোগান বা অন্য দশটা দাবির মতো সাধারণ কোনো দাবি নয়। এটি হচ্ছে মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষার দাবি, নূন্যতম সুযোগ সুবিধা নিয়ে বেঁচে থাকার দাবি। উপকূল আর উপকূলে বসবাসকারী মানবসন্তান, জীব-বৈচিত্র্য এবং সম্পদ রক্ষার দাবি। এসব দাবি পূরণ হতে পারে শুধুমাত্র একটি টেকসই বাঁধ নির্মাণ করার মধ্য দিয়ে।
গত ২০ মে উপকূলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সুপার সাইক্লোন আম্পানের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে সুন্দরবন, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটের বিস্তৃীর্ণ এলাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। ঝড়ের সঙ্গে জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গেছে উপকূলের মাইলের পর মাইল বেড়িবাঁধ। বাঁধ ভেসে যাওয়ার পর প্রায় দেড়মাস গত হলেও অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত জনপদের। প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ যুদ্ধ করছেন প্রতিদিন। এই দেড়মাস সময়েও আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়তে পারেননি বহু এলাকার মানুষ। নিজেদের বাড়িঘর থাকলেও সেখানে রাত কাটাতে সাহস পাননা তারা। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে তাদের জীবনযাত্রা। তাদের স্বপ্নগুলো ভেসে যাচ্ছে জোয়ারের পানিতে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা খুলনা বাগেরহাট উপকূলের ৪১টি নদ-নদীর প্রায় পাঁচ হাজার কিলমিটার বেড়িবাঁধের প্রায় ১৫০ কিলমিটার ভেঙে গেছে আম্পানের আঘাতে। ফলে পানিতে ভাসছে উপকূলের মানুষ ও মানুষের সুখ দুঃখ। শুধু যে বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে তা নয়। সরকারের প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী আম্পানের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপকূলের অবকাঠামো। প্রায় আড়াই লাখ বাড়িঘর, পৌনে দুই লাখ হেক্টর ফসলি জমি, চিংড়ি ও অন্য মাছের খামার, সড়ক, দুই শতাধিক ব্রিজ ও কালর্ভাট, প্রায় ৫০০ কিলোমিটার বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন, ৫০ হাজারেরও বেশি গবাদিপশু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বারবার সাইক্লোনের হাত থেকে উপকূলকে রক্ষাকারী বিশ্বের একমাত্র ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন। বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী সুন্দরবনের ১২ হাজার ৩৩২টি গাছ ভেঙে পড়েছে। এর বাইরে সুপেয় পানির সংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরো অনেক কিছু আছে এই ক্ষতির তালিকায়।
ক্ষতির এমন পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যাচ্ছে উপকূলের মানুষ তাদের টুকরো টুকরো স্বপ্নগুলোকে তিল তিল করে একত্রিত করেছিলেন, গড়ে তুলেছিলেন সুখের সংসার, সেই স্বপ্ন তাদের চোখের সামনে মুহূর্তেই ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সুপার সাইক্লোন আম্পান এবং তার কারণে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস।
আমরা একটা বিষয় দেখি, যখনই কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয় তখনই উপকূলের মানুষের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় সরকার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। সেই সাহায্য হচ্ছে সাময়িক প্রতিষেধক। অর্থাৎ ত্রাণ সামগ্রী, নগদ অর্থ, ঘর মেরামতের জন্য নূন্যতম সংখ্যক ঢেউটিন—এরকম আরো অনেক সাহায্য। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলের যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, বিশেষ করে বেড়িবাঁধ ভেঙে জনপদের পর জনপদকে মাসের পর মাস সমুদ্রের নোনা পানি ভাসিয়ে রাখে, উপকূলের মানুষের জীবনকে অনিয়শ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়, সেই অনিয়শ্চয়তা থেকে বেরিয়ে আসতে, ঘুরে দাঁড়াতে, নতুন করে জীবনকে সাজাতে মানুষ কি সাময়িক ত্রাণ চায়? নাকি স্থায়ী প্রতিষেধক চায়? আমার মনে হয়, মানুষ স্থায়ী সমাধানই চায়। আর এই স্থায়ী সমাধান হচ্ছে একটি শক্তিশালী, টেকসই ও জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধে সক্ষম উঁচু ও মজবুত বেড়িবাঁধ। কিন্তু বারবার তাদের এই দাবিটিই উপেক্ষিত হয়ে আসছে। যার ফলে তাদেরকে প্রতিবারই ঘুর্ণিঝড়ের সময় চরম মূল্য দিতে হয় নিঃস্ব হয়ে।
সিডর এবং আইলার আঘাতের পর থেকে উপকূলের মানুষের যে দুর্দশা-দুর্গতি শুরু হয়েছিল, গত ১২-১৩ বছরেও সেটি কাটিয়ে উঠতে পারেননি তারা। এর কারণ একটাই ‘টেকসই বাঁধ’ নির্মাণ না হওয়া। আর এই সময়ের মধ্যেই ফণী, বুলবুল, মহাসেন-এর মতো বেশ কয়েকটি সাইক্লোন আঘাত হেনেছে উপকূলে। মানুষও নিঃস্ব হয়েছেন প্রতিটি আঘাতে। কেউ কেউ ভিটেমাটি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়েছেন। প্রিয় জন্ম মাটি ছেড়েছেন অনেকে।
অথচ দীর্ঘস্থায়ী, টেকসই, মজবুত বাঁধ নির্মাণের জন্য কত শত, হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে, পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, নকশা হয়েছে, কত কত প্রতিশ্রুতি, আশ্বাস পেয়েছেন উপকূলের মানুষ। আর প্রতিবার ঘুর্ণিঝড়ের পর বাঁধ মেরামত ও সংস্কারের নামে দুর্নীতি-অনিয়মের মাধ্যমে কত অর্থের অপচয় হয়েছে তার কোনো শেষ নেই। তবে ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলা পরবর্তী সময়ে ভবিষ্যত ঝুঁকি মোকাবেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ‘কোস্টাল এমব্যাকমেন্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’ (সিইআইপি) গ্রহণ করে। ৩ হাজার ২৮০ কোটি টাকার পাঁচ বছর মেয়াদী এ প্রকল্পে ৬৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রথম পর্যায়ের কাজ ২০১৯ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জমি না পাওয়া, নদী ভাঙনসহ নানা জটিলতার কারণে প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বৃদ্দি করলেও কাজ আর শেষ হয়নি। যদিও এ প্রকল্পের আওতায় খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরগুনা, পটুয়াখালী ও পিরোজপুরে বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে।
আবার ২০১২ সালে বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় উপকূলীয় বাঁধ পুনঃনির্মানের জন্য ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। সে প্রকল্পের আওতায় সাতক্ষীরা থেকে ভোলা পর্যন্ত ১-৫৪ নম্বর পোল্ডারে কাজ হওয়ার কথা ছিল। সেটিও আর হয়নি। কিন্তু কেন হয়নি সেটা আজও অজানা।
বিভিন্ন সময়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাঁধ নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হতো তাহলে হয়তো উপকূলের মানুষকে এভাবে জোয়ারের পানিতে ভাসতে হতো না বারবার। তাদের স্বপ্নগুলোও ভেসে যেত না এক একটি ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে।
সরকারের ডেল্টা পরিকল্পনায় উপকূলীয় এলাকার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চলের বিদ্যমান পোল্ডারের কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ঝড়বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ মোকাবেলা করা হবে; পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বন্যার ঝুঁকি হ্রাস করা হবে। খুবই আশার কথা।
প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা উপকূলের মানুষও চায় জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগকে মাথায় রেখে স্থায়ী ও মজবুত বেড়িবাঁধ পুনঃনির্মাণ করা হোক। যে বাঁধ হবে নিচে ১০০ ফুট ও উপরে ৩০ ফুট প্রশস্ত এবং উচ্চতা হবে ৩০ ফুট। বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জরুরি তহবিল গঠন ও বাঁধ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকারকে সম্পৃক্ত করারও দাবি স্থানীয়দের। একই সঙ্গে উপকূলীয় সকল মানুষের খাবার পানির টেকসই ও স্থায়ী সমাধান করার দাবি তাদের। উপকূলের মানুষগুলোর বেঁচে থাকার জন্য এসব দাবির প্রতিটিই যৌক্তিক। তাদের এসব দাবি পূরণ হলে বছর বছর ঘূর্ণিঝড়ের সময় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে ত্রাণ সাহায্য নিয়ে ছুটে যেতে হবে না উপকূলের পথে-প্রান্তরে। বরং টেকসই বাঁধই হবে তাদের রক্ষা কবচ। তাই সরকারের উচিত উপকূলের মানুষের আর্তনাদ আমলে নিয়ে বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রকল্প পরিকল্পনা, আবেদন, অনুমোদন এবং বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় নষ্ট না করে দ্রুত বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে উপকূলীয় নাগরকিদের বেঁচে থাকার অধিকার সুনিশ্চিত করা। তাদের জীবন-জীবিকাকে বাঁচিয়ে রাখা। তাহলেই হয়তো উপকূলবাসীর কাছ থেকে দায়মুক্ত হবে রাষ্ট্র।সাতক্ষীরা শহরের মুনজিৎপুর এলাকার রথখোলা বিলের মধ্যে ছোট্ট একটি খুপরিতে তিন সন্তান নিয়ে বসবাস করেন মাজেদুল ও মাসুরা দম্পতি। মাজেদুল সাতক্ষীরা শহরে ভ্যান চালান। তার স্ত্রী শহরের কয়েকটি বাসাবাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। দুই ছেলের মধ্যে বড়টা কাজ করেন একটি মোটর গ্যারেজে। ছোট ছেলে ও মেয়ে শহরের একটি স্কুলে পড়ালেখা করছে। এটি এ পরিবারের বর্তমান চিত্র।
অথচ কয়েক বছর আগেও মাজেদুল বসবাস করতেন তার পৈতৃক ভিটা সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর গ্রামের কপোতাক্ষ নদীর পাড়ে। সেখানে নিজস্ব ঘরবাড়িসহ কয়েক বিঘা চাষের জমিও ছিল। সেই জমিতে ফসল ফলাতেন কৃষক মাজেদুল। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় আম্পানের পর নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে তাদের সেই জমিতে লোনা পানি প্রবেশ করে। দীর্ঘদিন ওই জমিতে পানি জমে থাকায় ফসল চাষের অনুপযোগী হয়ে যায়। ফলে বেকার হয়ে পড়েন তিনি।
এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় অল্প দামে চাষের সব জমি বিক্রি করে পাড়ি জমান শহরে। মূল শহরে জমি কিনতে না পারলেও শহর লাগোয়া বিলের মধ্যে দুই কাঠা জমি কেনেন। ছোট্ট একটি ঘর করে সেখানেই বসবাস করছেন।
জানা গেছে, এ শহরে তাদের মতো আরও অনেক পরিবার রয়েছে যারা কয়েক বছর আগেও সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকার বিভিন্ন গ্রামে বসবাস করতেন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষিকাজ বা বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র বসতি গড়তে বাধ্য হন।
যারা এলাকা ছাড়তে পারছেন না তাদের বড় একটি অংশ কাজের সন্ধানে বছরের প্রায় সাত মাস দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বল্প মজুরিতে ইটভাটা ও কৃষিজমিতে শ্রমিকের কাজ করেন। এজন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি কৃষিজমিতে লোনাপানি তুলে অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষকেও দায়ী করছেন অনেকে।
২০১৯ সালে এ-সংক্রান্ত জরিপ পরিচালনা করে শ্যামনগরের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লিডার্স।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, শুধু জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ঘূর্ণিঝড় ও জোয়ারের পানিতে বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে লোনাপানি প্রবেশের ফলে গত এক দশকে সাতক্ষীরার দুই উপজেলার আটটি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের কয়েক হাজার বিঘা ফসলি জমি ফসল উৎপাদনে অনুপযোগী এবং সুপেয় পানির উৎস স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব অঞ্চল থেকে কয়েক হাজার পরিবার স্থায়ীভাবে অন্যত্র বসতি গড়েছে।
শুধু তাই নয়, অস্থায়ী কাজের জন্য তিন লক্ষাধিক মানুষ বছরের প্রায় সাত মাস দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ইটভাটায় অবস্থান করেন। খুলনা, ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন বস্তিতে বসবাস করছেন অনেকে। কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজের জন্য অনেকে উত্তরাঞ্চলে যান।
অন্য একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় পার্শ্ববর্তী দেশেও অনেক বাংলাদেশি অবস্থান করছেন।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত