
সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর: ভোটের মাঠে সাতক্ষীরা জেলায় আওয়ামী লীগ অবস্থান বরাবরই ভালো ছিল। দেশে বিগত দিনে অনুষ্ঠিত মোটামুটি স্বচ্ছ (বিগত তিনটি নির্বাচন ছাড়া) নির্বাচনগুলোর ফলাফলে তেমনটিই দেখা গেছে। তবে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় পাল্টে গেছে জেলার ভোটের চিত্রও। এই জেলায় এবার লড়াই হবে মূলত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে জেলার চারটি আসনে ২০ জন প্রার্থী ভোটারদের সমর্থন আদায়ে জোরেসোরে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে, দলীয় মনোনয়ন ঘোষণায় দেরি হওয়া, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাশায় আলাদা আলাদা কর্মসূচি পালন করায় বিএনপি একক প্রচারণায় জামায়াতের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়ে। যদিও ক্রমান্বয়ে জামায়াতকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার তীব্র লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। অন্যদিকে, সাতক্ষীরার-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত (বিদ্রোহী) প্রার্থী থাকায় ধানের শীষের প্রার্থীর প্রচার-প্রচারণায় কিছুটা ঘাটতি চলছে বলে জানা গেছে।
সাতক্ষীরা-১ : জেলার কলারোয়া উপজেলা আর তালা উপজেলা নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা-১ আসনটি। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা চার লাখ ৯৬ হাজার ৮৪৮ জন। এর মধ্যে দুই লাখ ৪৭ হাজার ৮৭৩ জন পুরুষ, দুই লাখ ৪৮ হাজার ৯৭৩ জন নারী ও দুজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।
পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোতে এই আসনে ১৯৯১ সালের জামায়াতের শেখ আনসার আলী, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে হাবিবুল ইসলাম হাবিব, একই বছরের জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সৈয়দ কামাল বখত, ১৯৯৯-এর উপ-নির্বাচনে একই দলের বি এম নজরুল ইসলাম, ২০০১ সালে বিএনপির হাবিবুল ইসলাম হাবিব, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের প্রকৌশলী শেখ মুজিবুর রহমান, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে ওয়ার্কার্স পার্টির মুস্তফা লুৎফুল্লাহ ও সর্বশেষ ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের ফিরোজ আহমেদ স্বপন নির্বাচিত হন।
এবারের নির্বাচনে আসনটিতে মোট প্রার্থী পাঁচজন। এদের মধ্যে বিএনপি থেকে দলের কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক ও সাবেক এমপি হাবিবুল ইসলাম হাবিব, জামায়াত ইসলামী থেকে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মো. ইজ্জত উল্লাহ, জাতীয় পার্টির জিয়াউর রহমান, বাংলাদেশ কংগ্রেস থেকে দলের মহাসচিব মো. ইয়ারুল ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন থেকে পাটকেলঘাটা থানা শাখার সভাপতি শেখ মো. রেজাউল করিম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
৫ আগস্টের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটের আগে থেকেই জামায়াতের পূর্ব ঘোষিত প্রার্থী মো. ইজ্জত উল্লাহ এলাকার সবখানে প্রচার প্রচারণার সুযোগ পেয়েছেন। অপরদিকে, এই আসনের বিএনপির প্রভাবশালী প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব ছিলেন কারাঅন্তরীণ। ৫ আগস্টের পর জেল থেকে বের হলেও নিজ দলের নেতা কলারোয়ার সাবেক মেয়র জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আক্তারুল ইসলাম নির্বাচনের মাঠে তার প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনিও মনোনয়ন চাওয়ায় কিছুটা চাপে পড়তে হয় হাবিবুল ইসলাম হাবিবকে। যদিও হাবিবুল ইসলাম বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেয়ে বর্তমানে প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। এবারের নির্বাচনে এই আসনে জামায়াতের সাথে বিএনপির হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বেশ কিছু জরিপে ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছে জামায়াতের প্রার্থী এই আসনে এগিয়ে রয়েছে।
সাতক্ষীরা-২ : ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাতক্ষীরা-২ আসনটি সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত ছিল। ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সীমানা পরিবর্তন করে, সাতক্ষীরা সদর উপজেলা ও দেবহাটা উপজেলা করা হয়েছে। এই আসনের মোট ভোটার সংখ্যা পাঁচ লাখ ৩৫ হাজার ৬৫৪ জন। এর মধ্যে দুই লাখ ৬৫ হাজার ৯৬৫ জন পুরুষ, দুই লাখ ৬৯ হাজার ৬৮৫ জন নারী ও চারজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।
আসনটিতে ১৯৯১ সালে জামায়াতের কাজী শামসুর রহমান, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি থেকে শামছুল হক, একই বছরের জুনের নির্বাচনে ফের জামায়াতের কাজী শামসুর রহমান, ২০০১ সালে একই দলের আব্দুল খালেক ম-ল, ২০০৮ সালে জাতীয় পর্টির আব্দুল জব্বার, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের মীর মোস্তাক আহমেদ ও ২০২৪ সালে মহাজোটের জাতীয় পার্টির আশরাফুজ্জামান আশু নির্বাচিত হন।
এবারের নির্বাচনে আসনটি থেকে মোট পাঁচজন প্রার্থী ভোটযুদ্ধে নেমেছেন। এখানে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন কেন্দ্রীয় জামায়াতের সাংগঠনিক সেক্রেটারি মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক এবং বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আলিপুর ইউনিয়নের দীর্ঘ সময়ের জনপ্রিয় চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রউফ। মূলত এই দুই প্রার্থীর মধ্যেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে অনেক ভোটারের অভিমত। তবে, এবার দেবহাটা উপজেলাকে সদরের সাথে যুক্ত করায় সদর আসনের হিসাব-নিকাশ কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে বলে করেছেন অনেকেই।
এছাড়া আসনটিতে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাতক্ষীরা জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি আশরাফুজ্জামান আশু, ইসলামী আন্দোলনের সাতক্ষীরা জেলা শাখার উপদেষ্টা মুফতি রবীউল ইসলাম ও বাংলাদেশ জাসদের সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ইদ্রিস আলী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
সাতক্ষীরা-৩ : ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাতক্ষীরা-৩ আসনটি জেলার আশাশুনি উপজেলা, কালীগঞ্জ উপজেলা, দেবহাটা উপজেলা, চাম্পাফুল ইউনিয়ন, ভাড়াশিমলা ইউনিয়ন, তারালী ইউনিয়ন, নলতা ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ছিল। তবে ২০২৫ সালে সীমানা পরিবর্তন করে আশাশুনি উপজেলা, কালীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে আসনটি গঠিত করা হয়েছে। এই আসনের মোট ভোটার সংখ্যা পাঁচ লাখ দুই হাজার ২২২ জন। এর মধ্যে দুই লাখ ৫৩ হাজার ৯৮৪ জন পুরুষ, দুই লাখ ৪৮ হাজার ২৩৫ জন নারী ও তিনজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।
সীমানা পুনর্বিন্যাসের আগে এই আসনে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী রিয়াছাত আলী বিশ্বাস নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির আলী আহমদ, একই বছরের জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ডা. মোখলেসুর রহমান, ২০০১ সালে জামায়াতের রিয়াছাত আলী বিশ্বাস পুনরায় নির্বাচিত হন।
আসন পুনর্বিন্যাস হয়ে দেবহাটা ও কালিগঞ্জের আংশিক যুক্ত করলে ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ডা. আ ফ ম রুহুল হক নির্বাচিত হন।
এবারের নির্বাচনে আসনটিতে ছয়জন প্রার্থী থাকলেও লড়াই হবে দুজনের মধ্যে। বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী ‘গরিবের ডাক্তার’ খ্যাত ডা. শহিদুল আলম মনোনয়ন না পাওয়ায় ফুটবল প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। ফলে এখানে জামায়াত ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী হাফেজ রবিউল বাশারের সাথে স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. শহিদুল আলমের ভোটের লড়াই হবে।
এছাড়া এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সাবেক এমপি কাজী আলাউদ্দিন, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আলিপ হোসেন, ইসলামী আন্দোলনের সাতক্ষীরা জেলা শাখার সহ-সভাপতি মো. ওয়েজ কুরুনী, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রুবেল হোসেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে আসনটি তিনবার পুনর্বিন্যাস হওয়ায় এবার ভোটের হিসেব কিছুটা ওলট-পালট হতে পারে।
সাতক্ষীরা-৪ : ১৯৮৪ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সাতক্ষীরা জেলায় পাঁচটি সংসদীয় আসন ছিল। এই আসনে বিএনপি স্বতন্ত্র প্রার্থী ডাক্তার শহিদুল আলম এগিয়ে রয়েছে এবং চমক দেখাতে পারে বলে বিভিন্ন জরিপ ও প্রত্যক্ষদর্শিতা জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে জেলার শ্যামনগর উপজেলা নিয়ে ছিল। সাতক্ষীরা-৫ আসন। ২০০৮ সালে সাতক্ষীরা জেলা থেকে একটি আসন কমিয়ে চারটি আসন করা হয়। যেখানে শ্যামনগরের সঙ্গে কালিগঞ্জের আটটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠন করা হয় সাতক্ষীরা-৪ আসন। ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত এভাবেই চলে। তবে, এবারো সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। যেখানে শুধু শ্যামনগর উপজেলা নিয়ে গঠন করা হয়েছে সাতক্ষীরা-৪ আসন। এই আসনের মোট ভোটার সংখ্যা দুই লাখ ৯৮ হাজার ৫০ জন। এর মধ্যে এক লাখ ৫০ হাজার ২৬ জন পুরুষ, এক লাখ ৪৮ হাজার ২০ জন নারী ও চারজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।
পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর মধ্যে ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগ থেকে মনসুর আহমেদ গাজী, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির ওয়াজেদ আলী বিশ্বাস, একই বছরের জুনের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির শাহাদত হোসেন, ২০০১ সালে একই দলের কাজী আলাউদ্দিন, ২০০৮ সালে জাতীয় পার্টির এইচএম গোলাম রেজা, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের জগলুল হায়দার এবং সবশেষ ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের আতাউল হক দোলন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
সুন্দরবন ঘেষা এই আসনটিতে এবারের নির্বাচনে চারজন প্রার্থী লড়াই করছেন। এর মধ্যে জামায়াত ইসলামী থেকে জেলা জামায়াতের শূূরা সদস্য ও সাবেক এমপি জি এম নজরুল ইসলাম, বিএনপি থেকে মো. মনিরুজ্জামান, জাতীয় পার্টি থেকে শ্যামনগর উপজেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আব্দুর রশীদ ও ইসলামী আন্দোলন থেকে ঢাকা মহানগর উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি এস এম মোস্তফা আল মামুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই আসনে জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী জি এম নজরুল ইসলামের জয়লাভের সম্ভাবনা অনেক বেশি বলেই জানা গেছে।
সব মিলিয়ে সাতক্ষীরা জেলার দুটি আসনে জামায়াতের কিছুটা আধিক্য থাকলেও এবার চারটিতেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। এর মধ্যে তিনটিতে বিএনপির সাথে আর একটিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর (স্বতন্ত্র) সাথে।
এখন অপেক্ষা, ভোটের দিন পর্যন্ত। ভোটাররা কোন প্রার্থীকে জয়ের মালা পরাবেন তা দেখার জন্য। ভোটারদের জন্য ৬০৯টি ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে নির্বাচন কমিশন।

