
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : জোটবদ্ধভাবে অংশ নেওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোতে সাতক্ষীরা জেলার চারটি আসনের তিনটিতেই জামায়াতে ইসলামীকে ছাড় দিয়ে আসছিল বিএনপি। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আলাদাভাবে অংশ নেওয়া এই দুই দলের মধ্যেই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন ভোটাররা।
জেলার চারটি আসনে প্রার্থী হতে মোট ২৯ জন মনোনয়নপত্র জমা দেন। যাচাই–বাছাই ও আপিল শেষে বর্তমানে বৈধ প্রার্থী ২০ জন। এর মধ্যে সাতক্ষীরা-১ আসনে পাঁচজন, সাতক্ষীরা-২ আসনে সাতজন, সাতক্ষীরা-৩ আসনে পাঁচজন ও সাতক্ষীরা-৪ আসনে তিনজন। সব আসনেই বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী রয়েছে। আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু না হওয়ায় এখন প্রার্থীরা মূলত নানা সামাজিক কর্মসূচির আড়ালে ভোটের প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন।
সীমান্তঘেঁষা জেলা সাতক্ষীরায় জামায়াতে ইসলামীর শক্ত সাংগঠনিক অবস্থান রয়েছে। অভ্যন্তরীণ বিরোধ না থাকায় দলটি অনেক আগেই চারটি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠে নামে। একই সময়ে বিএনপির মনোযোগ ছিল ইউনিয়ন কমিটি গঠনের পাশাপাশি দলীয় কোন্দল নিরসনে। বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার পর একাধিক আসনে মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে নানা কর্মসূচিও হয়। কোথাও কোথাও সেই বিভেদ মিটলেও একটি আসনে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির এক নেতা।
বিজ্ঞাপন
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিতে জামায়াত ও একটিতে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) জয়ী হয়। ১৯৯৬ সালে জামায়াত সদর আসনে জয় পায়। বাকি চারটি যায় আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির দখলে। ২০০১ সালে জামায়াত তিনটি আসনে জয়লাভ করে। ওই নির্বাচনেই প্রথম সাতক্ষীরা-১ আসনে জয় পায় বিএনপি। ২০০৮ সালে আসনসংখ্যা কমে চারটি হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত একটি আসনও পায়নি।
এবার জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবদুল আজিজ বলেন, ‘কঠিন দিনগুলোতেও সাধারণ মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি আমরা। এবারও চারটি আসনেই বিজয়ী হব।’
অবশ্য জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবু জাহিদের মতে, ‘দীর্ঘ নির্যাতনের পরও আমাদের নেতা-কর্মীরা মানুষের পাশে ছিলেন। সব স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ভোট দিয়ে বিএনপিকে জয়ী করবে বলে আমার বিশ্বাস।’
এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম (হাবিব)। তিনি দলের কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক। সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে এলাকায় তাঁর একটি আলাদা ভোটব্যাংক রয়েছে বলে মনে করছেন অনেক ভোটার। জামায়াতের প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মো. ইজ্জত উল্লাহ। ‘ব্যক্তি ইমেজের’ পাশাপাশি সাংগঠনিক অবস্থানের কারণে ইজ্জত উল্লাহর আলাদা ভোটব্যাংক রয়েছে বলে ধারণা অনেকের।
বিএনপির প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম বলেন, নির্বাচিত হলে ভবিষ্যতেও সাধারণ মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়নের পরিকল্পনা করবেন।
জামায়াতের প্রার্থী মো. ইজ্জত উল্লাহ বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি ও তাঁর দল সাধারণ মানুষের পাশে ছিল। নির্বাচিত হলে স্থানীয় মানুষের মতামতের ভিত্তিতে এলাকার উন্নয়নে উদ্যোগ নেবেন।
আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মোট সাতজন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। যাচাই-বাছাইয়ে দুজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের পাশাপাশি বাকি তিন প্রার্থী হলেন বাংলাদেশ কংগ্রেসের মহাসচিব মো. ইয়ারুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় এনজিও বিষয়ক সম্পাদক জিয়াউর রহমান ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পাটকেলঘাটা থানা শাখার সভাপতি শেখ মো. রেজাউল করিম।
জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মো. আবদুর রউফকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণার পর আসনটিতে বিরোধ দেখা দেয়। মনোনয়ন না পেয়ে জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল আলিম ও জেলা কমিটির বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক তাসকিন আহমেদের সমর্থকেরা আন্দোলনে নামেন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত কেউই প্রার্থী হননি।
আবদুর রউফ বলেন, সাধারণ ভোটাররা তাঁকে পছন্দ করেন, ভালোবাসেন। সাতক্ষীরা-২ আসনের প্রশ্নে বিএনপির সবাই এখন এক। স্বাধীনতার পক্ষের মানুষও এক হয়েছেন।
এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী দলের খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের তাঁর ও তাঁর দলের ওপর আস্থা রয়েছে। বিগত নিরপেক্ষ নির্বাচনগুলোতে মানুষের আস্থার প্রতিফলন ঘটেছে।
এ আসনে আরও প্রার্থী হয়েছেন জাতীয় পার্টির জেলার সাধারণ সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির জেলার সাধারণ সম্পাদক জি এম সালাউদ্দীন, বাংলাদেশ জাসদের জেলা সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস আলী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জেলা শাখার উপদেষ্টা রবিউল ইসলাম ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) জেলা শাখার সদস্য শফিকুল ইসলাম (সাহেদ)।
জেলার এই একটি আসনে বিএনপির প্রার্থীর পাশাপাশি দলের এক নেতাও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য কাজী আলাউদ্দীন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির আরেক সদস্য শহিদুল আলম।
বিএনপির তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা বলছেন, শহিদুল আলম ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হওয়ায় বিএনপির ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে; যা জামায়াতের অবস্থানকে সুদৃঢ় করবে।
যাচাই-বাছাইয়ে শহিদুল আলমের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল। পরে নির্বাচন কমিশনে আপিল করে তিনি প্রার্থিতা ফিরে পান। এ বিষয়ে শহিদুল আলম বলেন, ২-১৮ নভেম্বর পর্যন্ত তাঁর দলীয় মনোনয়নের জন্য এ আসনের দল-মত–ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাই মাঠে নেমেছিলেন। বিএনপি থেকে তাঁকে মনোনয়ন না দেওয়ায় স্থানীয় নেতা-কর্মীদের দাবির মুখে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিএনপির প্রার্থী কাজী আলাউদ্দীন বলেন, দল তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছে। অন্য কেউ প্রার্থী হতে চাইলে দল থেকে তাঁর প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বিশ্বাস করেন, দুঃসময়ে তিনি ও দল সাধারণ ভোটারদের পাশে ছিল। তাঁরা তাঁকে ও দলকে মূল্যায়ন করবেন।
এখানে জামায়াতের প্রার্থী দলের জেলা শাখার সাবেক আমির মুহা. রবিউল বাসার। জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ভোটাররা সৎ মানুষকে পছন্দ করেন ও আস্থা রাখেন।
এই আসনের অন্য প্রার্থীরা হলেন জাতীয় পার্টির জেলা কমিটির সহসভাপতি মো. আলিফ হোসেন ও বাংলাদেশ মাইনরটি জনতা পার্টির (বিএমজেপি) সদস্য রুবেল হোসেন।
যাচাই-বাছাই শেষে আসনটিতে তিনজন বৈধ প্রার্থী আছেন। তাঁরা হলেন জামায়াতের প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা কর্মপরিষদ সদস্য জি এম নজরুল ইসলাম, বিএনপির প্রার্থী জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মনিরুজ্জামান এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী এস এম মোস্তফা আল মামুন।
ভোটাররা বলছেন, বিগত গ্রহণযোগ্য নির্বাচনগুলোতে সাতক্ষীরা-৪ আসনে বিএনপি তাদের শক্তিমত্তা দেখাতে পারেনি। নতুন মুখ হলেও প্রবাসী মনিরুজ্জামান প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে তরুণ ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। অপর দিকে জামায়াতের জি এম নজরুল ইসলাম দুবারের সংসদ সদস্য হওয়ায় তাঁর নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে।
এ বিষয়ে বিএনপির প্রার্থী মো. মনিরুজ্জামান বলেন, তিনি পাঁচ বছর ধরে জনসাধারণের ভালো–মন্দে পাশে থাকার পাশাপাশি শ্যামনগর উন্নয়নে, বিশেষ করে তরুণসমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছেন।
জামায়াতের প্রার্থী জি এম নজরুল ইসলাম বলেন, ১৭ বছর ধরে নানা সমস্যার মধ্যে তাঁরা সাধারণ মানুষের পাশে ছিলেন। ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের পাশে থেকে কাজ করবেন। ভোটারদের তাঁর প্রতি আস্থা রয়েছে।আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরার ৪টি সংসদীয় আসনের রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় মূল লড়াই বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হওয়ার কথা। কৌশলী প্রচারণা এবং প্রার্থী ইমেজে বর্তমানে অনেকটা এগিয়ে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। অন্যদিকে, প্রার্থী চূড়ান্তে বিলম্ব এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলে কিছটা ব্যাকফুটে রয়েছে বিএনপি। প্রার্থী তৎপরতা, স্থানীয় জোটের সমীকরণ, জামায়াতের নিজস্ব ভোট ব্যাংক এবং ভোটারদের মানসিকতায় বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরা-১, ২, ৩ ও ৪ আসনে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এই চারটি আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা তাদের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির কারণে ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছেন। বিশেষ করে সাতক্ষীরা সদর আসনে জামায়াতের বিশাল ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক ও জনপ্রিয়তা রয়েছে। সাতক্ষীরায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে ও ইসলামী আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে টার্গেট করা হয়েছিল জামায়াত-শিবিরকে। এ জেলায় তারা যাতে কখনো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে সেজন্য ২০০৯ সালের শুরু থেকেই আওয়ামী লীগ তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে জামায়াত-শিবিরের ওপর দমন পীড়ন শুরু করে। যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার দিন। এ দিন বিকেলে শহরের অদূরে সার্কিট হাউজ মোড়ে জামায়াতের শান্তিপূর্ণ মিছিলে যৌথবাহিনী নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করে সাত জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীকে বলে জানিয়েছেন সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ আব্দুল খালেকে।সেই থেকে সরকারদলীয় লোকজন পুলিশকে ব্যবহার করে জামায়াত-শিবির দমনে মেতে ওঠে বলে জানান জেলা আমির। একইসাথে চলে গ্রেফতারের নামে অর্থ বাণিজ্য। টাকা নেয়ার পরও আটক জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের কারো পায়ে গুলি করে পঙ্গু করে দেয়া হতো। আবার অনেককে শারীরিকভাবে নির্যাতন চালিয়ে গুরুতর আহত করা হতো। এ সময় ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হওয়ার পাশাপাশি পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন অনেকে। পায়ে গুলিবিদ্ধ অনেকের পা কেটে ফেলতে হয়েছে। পায়ে গুলিবিদ্ধ বাকিদের পক্ষে এখনো স্বাভাবিক চলাচল সম্ভব হচ্ছে না। এভাবে বিগত সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের নামে নির্যাতনের শিকার হয়ে ৪৭ জন নিহত ও ৩৪ জন জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী গুরুতর আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করে এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছে জানান অধ্যক্ষ আব্দুল খালেক। এসব কারণে সাধারণ মানুষেন সহানুর্ভতি জামায়াত শিবিরের প্রতি। আ’লীগ সরকারের আমলে যেখানে জামায়াত শিবির পরিচয় দেয়া কোন নেতা কর্মী নিজ বাড়িতে ঘুমাতে পারতো না তখন বিএনপি ও তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা কর্মীরা অভ্যন্তরীন কোন্দলে প্রকাশ্যে নিজ দলের নেতা আমান হত্যার শিকার হয়। এঘটনায় আমানের মা বাদী হয়ে বিএনপির একটি অংশের অসংখ্য নেতাকমীদের জেলে ঘানি টানিয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের সহানুভ’তি অর্জনে ব্যর্থ হয় দলটি। ভোটারদের মতে, জামায়াতের প্রার্থীরা ক্লিন ইমেজের প্রার্থী হওয়ায় তারা অন্যান্যদের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। অন্যদিকে, নির্বাচনে প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচিত হলেও বিএনপি বেশ কিছু কৌশলগত ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। প্রার্থী চূড়ান্ত করতে দেরি হওয়ায় নির্বাচনী প্রচারণায় পিছিয়ে পড়েছে দলটি। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় বিএনপি অনেকটা ‘ফাঁকা মাঠে গোল’ দেওয়ার মতো অতি-আত্মবিশ্বাসী মনোভাব দেখাচ্ছে বলে স্থানীয়দের ধারণা। সাধারণ ভোটারদের কাছে যাওয়ার চেয়ে দলীয় কোন্দল মেটাতেই বেশি সময় ব্যয় করছেন দলটির অনেক নেতা।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভোটারদের চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। সাধারণ মানুষ এখন আর প্রতীক বা দলের অন্ধ অনুসারী নয়। গত কয়েক মাসে কিছু এলাকায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং জমি ও স্ট্যান্ড দখলের মতো অপকর্মে বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি সাধারণ ভোটাররা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবার ভোটে একটি ‘নীরব বিপ্লব’ ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। ভোটারদের স্পষ্ট বার্তা এবার ভোট হবে দল বা মার্কার বদলে প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও ইমেজের ভিত্তিতে। মাঠপর্যায়ের এই পরিস্থিতি বজায় থাকলে আসন্ন নির্বাচনে সাতক্ষীরায় একটি ‘নীরব বিপ্লব’ ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। ভোটাররা শেষ পর্যন্ত দলীয় ব্রান্ডের চেয়ে ব্যক্তি প্রার্থীর স্বচ্ছতা এবং মাঠের সক্রিয়তাকেই অগ্রাধিকার দেবেন।
সাতক্ষীরা-১ আসন (তালা-কলারোয়া) আসনের নির্বাচনী সমীকরণ দ্রুত পাল্টাচ্ছে। মাঠপর্যায়ের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আগাম প্রস্তুতি ও কৌশলী প্রচারণায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যক্ষ মুহাঃ ইজ্জত উল্লাহ অনেকটা এগিয়ে থাকলেও নানা অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সংকটে ধুঁকছে বিএনপি। জামায়াত এই আসনে অধ্যক্ষ মুহাঃ ইজ্জত উল্লাহকে অনেক আগেই প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করে। ফলে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতির সুযোগ পেয়েছেন। কলারোয়া, পাটকেলঘাটা থেকে শুরু করে তালার প্রতিটি ওয়ার্ড ও হাটে-বাজারে নিয়মিত জনসংযোগ করছেন তিনি। স্থানীয় মসজিদ, মাদ্রাসা এবং পাড়া-মহল্লাভিত্তিক শক্তিশালী নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি ভোটারদের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছেন। ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও ক্লিন ইমেজের কারণে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও তাকে নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিএনপির প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব বর্তমানে বেশ কঠিন সময় পার করছেন। এর পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করছে ; কেন্দ্র থেকে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার কারণে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা শুরু থেকেই দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। স্থানীয় পর্যায়ে দলের মধ্যকার অনৈক্য নির্বাচনী প্রচারণায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ ভোটারদের মতে, এবারের নির্বাচনে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ ও মাঠে উপস্থিত থাকাটা বড় ফ্যাক্টর। তালা এলাকার ভোটারদের ভাষ্যÑ “ইজ্জত উল্লাহ সাহেবকে গত কয়েক মাস ধরে নিয়মিত কাছে পাচ্ছি। তিনি মানুষের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন, সমস্যার কথা শুনছেন। ভোটাররা এমন প্রার্থীকেই চায় যারা সুখে-দুখে পাশে থাকে।” বিপরীতে, বিএনপির দেরিতে মাঠে নামা এবং অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা তাদের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। স্বাধীনতার পর থেকে ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব দলের পৃথক অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য ১২ জুন ১৯৯৬ এর নির্বাচন ও ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ সাতক্ষীরা-১ আসনের ফলাফল বিশ্লেষনে সাতক্ষীরা ১ তালা কলারোয়া আসনে দেখা যায় আওয়ামী লীগের সৈয়দ কামাল বখত পান ৩৫.৬% ভোট। জামায়াতের শেখ আনসার আলী পান ৩১.৩৫% ভোট। বিএনপির হাবিবুল ইসলাম হাবিব ও এবিএম আলতাফ হোসেন পান ১৮.৬%। জাতীয় পাটির সৈয়েদ দিদার কখত পান ১২.৯% ভোট।
সাতক্ষীরা-২ আসন (সাতক্ষীরা সদর ও দেবহাটা) জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সাতক্ষীরা-২ আসনে নির্বাচনী হাওয়া জমে উঠেছে। তবে এই আসনে বড় দুই শক্তির লড়াইয়ে বর্তমানে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাদ্দিস আব্দুল খালেকের। অন্যদিকে, আসন পরিবর্তন, দলীয় কোন্দল ও ইসলামী মাহফিলে বক্তাকে মারতে যাওয়া ঘটনায় এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন বিএনপির আব্দুর রউফ। স্বাধীনতার পর থেকে ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব দলের পৃথক অংশ গ্রহণে গ্রহণযোগ্য ১২ জুন ১৯৯৬ এর নির্বাচন ও ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-২ আসনের ফলাফল বিশ্লেষনে দেখা যায় জামায়াতের প্রার্থী শেখ কাজী শামসুর রহমান পান ৩৫.২৫% ভোট। সেই দুটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ও এ.এফ.এম. ইন্তাজ আলিপান ২৬.৪৫% ভোট। জাতীয় পাটির সৈয়দা রাজিয়া ফায়েজ ও মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান পান ২৫.৬৫% ভোট এবং বিএনপির এম. মনসুর আলি ও ফরিদা রহমান পান ১১.৯৫%। অর্থাৎ সাতক্ষীরা ২ আনসে জামায়াত প্রথম, আ’লীগ দ্বিতীয়, জাতীয় পাটি তৃতীয় ও বিএনপির অবস্থান চতৃর্থ। স্থানীয় ভোটার ও রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিরপেক্ষ নির্বাচনে বরাবরই এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী বিজয়ী হওয়ায় এবারও তাদের অবস্থান অনেক মজবুত।
বিগত ১০ বছর ধরে মুহাদ্দিস আব্দুল খালেককে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে জামায়াত। ফলে তিনি এলাকায় নিয়মিত গণসংযোগ ও বড় বড় শোডাউন করে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। একজন বিজ্ঞ আলেম ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তার একটি বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। পাড়া-মহল্লায় তার শক্তিশালী পারিবারিক ও সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যা তাকে নির্বাচনী দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে রাখছে। সাধারণ ভোটারদের মতে, চট্টগ্রাম-৯ আসনে বিএনপির ডা. শাহাদাতের যে একক প্রভাব ছিল, আবু সুফিয়ান সেই প্রভাব কতটুকু ধরে রাখতে পারবেন তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিপরীতে, জামায়াতের সুশৃঙ্খল প্রচারণা এবং ডা. ফজলুল হকের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি সাধারণ মানুষের আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে।
সাতক্ষীরা ৩ আসন (আশাশুনি-কালিগঞ্জ): জেলার গুরুত্বপূর্ণ আসন সাতক্ষীরা-৩ এখন নির্বাচনী উত্তাপে টালমাটাল। এই আসনে মাঠের লড়াইয়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাদ্দিস রবিউল বাশার দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির কারণে সুবিধাজনক অবস্থানে। অন্যদিকে দলীয় কোন্দলে কারনে বিএনপি আসনটিতে গরিবের ডাক্তার নামে খ্যাত ডা. শহিদুল আলমকে প্রার্থী না করে কাজী আলাউদ্ধনিকে প্রার্থী করায় সাধারণ ভোটার এবং তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাদ্দিস রবিউল বাশার দীর্ঘ সময় ধরে সাধারণ মানুষের পাশে থেকে নিজের অবস্থান সুসংহত করেছেন। জামায়াতের সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক কাঠামোর কারণে এই আসনের প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় তার প্রচারণা এখন তুঙ্গে। কাজী আলাউদ্দীন সাবেক এমপি হলেও স্থানীয় সাধারণ ভোটারদের কাছে তিনি তুলনা মূলক ভাবে নতুন মুখ। তবে তার দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে কাজে লাগিয়ে তিনি ভোটারদের সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
সবদলের অংশগ্রহণে ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই সাতক্ষীরা-৩ আসনের সীমানা ছিল শুধুমাত্র আশাশুনি উপজেলা। এই আসনে জামায়াতের রিয়াছাত আলী বিশ্বাস ৭৩ হাজার ৫৭৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের এসএম মোখলেছুর রহমান পেয়েছিলেন ৫৬ হাজার ৯৮২ ভোট। সব দলের অংশগ্রহণে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৩ আসনে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ডা. আ. ফ. ম রুহুল হক। তিনি পেয়েছিলেন ১ লাখ ৪২ হাজার ৭০৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের রিয়াছাত আলী বিশ্বাস পেয়েছিলেন ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮০২ ভোট। সব দলের অংশগ্রহণে ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ অনুষ্ঠিত ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে জামায়াতের রিয়াছাত আলী বিশ্বাস ৩১ হাজার ৬৩১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের মো. হাফিজুর রহমান। তিনি পেয়েছিলেন ২৯ হাজার ৬৮০ ভোট। ৩মার্চ ১৯৮৮ তারিখে অনুষ্ঠিত ৪র্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৩ আসনে নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির সালাউদ্দিন আহমেদ। ৭ মে ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত ৩য় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আশাশুনি সংসদীয় এলাকা থেকে নির্বাচিত হন স্বতন্ত্র সালাউদ্দিন আহমেদ। সেই সালাউদ্দিন আহমেদ এবার জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেছেন। ফলে ভোটের সমীকরণ পরিবর্তন হয়ে বিপুল ভোটে জামায়াতের প্রার্থী মুহাদ্দিস রবিউল বাশার জয়ী হবে বলে আশাবাদী স্থানীয় ভোটাররা।
সাতক্ষীরা-৪ আসন (শ্যামনগর): সুন্দরবন ঘেষা সাতক্ষীরা-৪ আসনে নির্বাচনী সমীকরণ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। রাজপথের আন্দোলন আর জাতীয় নির্বাচনের ভোটের রাজনীতির সমীকরণ ভিন্ন। এই আসনের ভোটাররা বলছেন, জামায়াতের গাজী নজরুল ইসলামকে তারা দীর্ঘদিন ধরে মাঠে দেখছেন এবং তিনি এলাকার পরিচিত মুখ। অন্যদিকে বিএনপির মনিরুজ্জামানকে এলাকায় খুব একটা পাওয়া যেত না। এই ‘জনবিচ্ছিন্নতা’ বর্তমানে তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি যখন প্রার্থী নিয়ে দোলাচলে, জামায়াতে ইসলামী তখন এই আসনে তাদের অবস্থান সুসংহত করে ফেলেছে। জামায়াতের একক প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম নিরবচ্ছিন্নভাবে জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। মসজিদ, মাদ্রাসা এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে তার সমর্থকদের শক্তিশালী সমন্বয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিগত সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলা এবং কয়েকবার জেল খাটার ঘটনা তাকে ভোটারদের কাছে একজন ‘মজলুম জননেতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এমনকি ক্রসফায়ারের হুমকির মুখেও মাঠ না ছাড়ার বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যে তার প্রতি এক ধরনের সহানুভূতি তৈরি করেছে। এখানকার ভোট মূলত তিনটি বড় ব্লকে বিভক্ত; শ্রমিক ইউনিয়ন ভিত্তিক ভোটার। মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক ভোটার। পারিবারিক জামায়াত-শিবির সমর্থক। স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম দীর্ঘ সময় ধরে এই তিনটি ব্লকের সঙ্গেই নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখছেন।
এলাকার সাধারণ ভোটারদের মতে, গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়মিত এলাকায় দেখা যাচ্ছে। তিনি মানুষের দুয়ারে দুয়ারে যাচ্ছেন। অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী এখনো ঠিকমতো ফাংশান করতে পারছে না।” ভোটারদের এই পর্যবেক্ষণ আসন্ন নির্বাচনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সব মিলে বিএনপি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়ায় এগিয়ে গেছে জামায়াত এমনটাই বলছেন ভোটাররা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, ১৯৮৪ সালে সাতক্ষীরা জেলা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সাতক্ষীরা জেলায় পাঁচটি সংসদীয় আসন ছিল। এক্ষেত্রে জেলার শ্যামনগর উপজেলা নিয়ে ছিল সাতক্ষীরা-৫ আসন। ২০০৮ সালে সাতক্ষীরা জেলা থেকে একটি আসন কমিয়ে চারটি আসন করা হয়। যেখানে শ্যামনগরের সঙ্গে কালিগঞ্জের আটটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠন করা হয় সাতক্ষীরা-৪ আসন। এভাবেই চলেছে ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত। সম্প্রতি আবার সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। যেখানে শুধুমাত্র শ্যামনগর উপজেলা নিয়ে গঠন করা হয়েছে সাতক্ষীরা-৪ আসন।
সূত্রমতে সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালিগঞ্জ আংশিক) নির্বাচনী এলাকায় স্বাধীনতা পরবর্তী ১৩টি নির্বাচনের, আমি, ডামি, নৈশ্য ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৭টিতেই আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থীরা জয়লাভ করে। এছাড়া অধিকাংশ দলের বর্জনের মুখে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ তারিখে অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি একবার ও স্বাধীনতা পরবর্তি শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ তারিখে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে আসনটিতে। সব দলের অংশগ্রহণে ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ অনুষ্ঠিত ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে জামায়াতের গাজী নজরুল ইসলাম, এছাড়া ২০০৮, সালের নির্বাচনে অল্প ভোটের ব্যবধানে হেরে জান জামায়াতের প্রাথী। জাতীয় পার্টি একবার এবং মুসলিম লীগ প্রার্থী একটি নির্বাচনে বিজয়ী হয়। ফলে একক ভাবে নির্বাচন করে আসনটিতে বিএনপির জয়ের কোন রের্কড নেই। জামায়াতের প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম ব্যাপক গণসংযোগ ও প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে জামায়াতের পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন তৈরি হয়েছে, তিনি বলেন, আমি যদি জনগণের ভোটে এমপি হতে পারি, তাহলে এই অবহেলিত সাতক্ষীরা-৪ আসনকে ঢেলে সাজানোর জন্য চেষ্টা করব, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ভূমিকা রাখব। তরুণ ভোটারা বলেন, এখন ভ্যান চালকও অনেক সচেতন। তারা নিজের ভালো-মন্দ জানে এবং বুঝে। খিচুড়ি খাওয়ার জন্য অনেকেই নেতাদের সভায় যায়। প্রকৃতপক্ষে জীবন বাঁচানোর তাগিদে তারা তাল মিলিয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে বৃহৎ দল বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা অন্তকোন্দল ও প্রার্থী জটিলতার কারণে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া কষ্টসাধ্য হবে। সেই ক্ষেত্রে ভোটাররা দেশ নিয়ে এখন জামায়াতে ইসলামীর প্রতি আস্থা রাখছেন। আলোচনা, পর্যালোচনা শেষে এটায় প্রতিয়মান হয় যে স্বাভাবিক ভাবে ভোট হলে জেলার ৪ টি আসনেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে হলে ও দিন শেষে সবকটি আসনে জামায়াতের প্রার্থী জয়লাভ করবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।আগামী ১২ ই ফেব্রুয়ারি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সাতক্ষীরাজুড়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও নীরব উত্তেজনা। সারা বছর পত্র-পত্রিকায় টেলিভিশনের টকশই বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়েছে সাতক্ষীরা জামাতের দুর্গ। আর এই জামাতের দুর্গে আঘাত আনতে চাই বিএনপি। তবে বিএনপি’র একথা আমলে নেয়নি জায়ামাতে ইসলামের নেতাকর্মী সমর্থকরা। তাদের দাবি ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে সাতক্ষীরায় চারটি আসন জামায়াতের অনুকূলে থাকবে। কিন্তু গত কয়েকদিন দেখা যাচ্ছে সাতক্ষীরায় কিছু কিছু সাধারণ ভোটারদের মাঝে গুজন তৈরি হয়েছে। তার মধ্য একদিকে তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং তার গঠনমূলক বক্তব্য আস্থা আনতে পারে অনেকের মনে। দ্বিতীয়তঃ বিএনপির চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সারা দেশের মানুষ দল-মত ভুলে গিয়ে তার জন্য দোয়া করেছেন এবং তার মৃত্যুতে শোক পালন করেছেন। অনেকের ধারণা সে কারণেও সাতক্ষীরা বিএনপির চারটি আসনে প্রার্থীরা ভোটের রেজাল্ট ভালো করতে পারে। তবে এ কথা মানতে নারাজ জামায়াত তাদের নেতাকর্মীদের একটাই কথা আওয়ামী লীগ যদি নির্বাচনে না আসে সেই ক্ষেত্রে সাতক্ষীরা ৪ টি আসন বিপুল ভোটার ব্যবধানে জামায়াতের দখলে থাকবে।

