সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর: সাতক্ষীরার আম বাগানে ফুটেছে আগাম মুকুল। এর মিষ্টি সৌরভে মৌ মৌ করছে চারপাশ। অনুকূল আবহাওয়া আর বাগান মালিকদের নিবিড় পরিচর্যায় এবার বাম্পার ফলনের আশা করছে কৃষি বিভাগ। জেলায় এ বছর ৪ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে আম চাষ হয়েছে। যা থেকে প্রায় ৭১ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
মুকুলেই আশার আলোসাতক্ষীরা সদর, কলারোয়া, তালা ও কালিগঞ্জ উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, ছোট-বড় সব বাগানেই এখন মুকুলের সমারোহ। কোথাও গাছে সোনালি রঙের মুকুল উঁকি দিচ্ছে, আবার কোথাও মুকুল থেকে গুটি বের হতে শুরু করেছে। চাষিরা বলছেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার মুকুলের পরিমাণ অনেক বেশি। বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা শিলাবৃষ্টি না হলে এবার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে আমের উৎপাদন।
কী বলছেন কৃষকরাসাতক্ষীরা সদরের আম চাষি শরিফুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘এ বছর মাঘের শেষ থেকেই আম গাছে মুকুল আসা শুরু হয়েছে। কুয়াশা কম থাকায় মুকুলগুলো বেশ সতেজ। আমরা নিয়মিত বাগানে বিষমুক্ত ওষুধ ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করছি। যদি শিলাবৃষ্টি না হয়, তবে এবার অনেক লাভবান হতে পারবো।’
কলারোয়া উপজেলার বাগান মালিক আব্দুর রহিম বলেন, ‘আমার ১০ বিঘা জমিতে হিমসাগর ও ল্যাংড়া জাতের আমের বাগান আছে। এবার গাছের প্রতিটি ডালে মুকুল এসেছে। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী গাছের গোড়ায় পানি ও জৈব সার দিচ্ছি। মুকুলে স্প্রে করছি। আমরা এখন রাত-দিন বাগান পাহারা দিচ্ছি যেন মুকুলের কোনো ক্ষতি না হয়।’
তালা উপজেলার ক্ষুদ্র আম চাষি মফিজুল হক বলেন, ‘গত বছর আমের বাজারদর ভালো ছিল না। কিন্তু এবার মুকুল দেখে মনে হচ্ছে ফলন অনেক বেশি হবে। মুকুলের যে ঘ্রাণ বের হচ্ছে, তাতে বুক ভরে যায়। আশা করছি এবার বিদেশের বাজারেও আমাদের আম যাবে।’
উৎপাদন ও রপ্তানি সম্ভাবনাজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে সাতক্ষীরায় মোট ৪ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছে হিমসাগর, আম্রপালি ও ল্যাংড়া। জেলায় বর্তমানে নিবন্ধিত আম বাগানের সংখ্যা ৫ হাজার ২৯৯টি এবং সরাসরি আম চাষের সঙ্গে যুক্ত আছেন ৫০ হাজারের বেশি মানুষ।
কৃষি বিভাগ আরও জানায়, সাতক্ষীরার আম স্বাদে ও গন্ধে অতুলনীয় হওয়ায় প্রতি বছর এর চাহিদা বাড়ছে ইউরোপের বাজারে। এ বছর কমপক্ষে ১০০ মেট্রিক টন আম বিদেশে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছেন সংশ্লিষ্টরা।বসন্তের শুরুতেই আমের মুকুলে ছেয়ে গেছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। গ্রামাঞ্চল থেকে শহর, পুকুরপাড় থেকে বাড়ির আঙিনা-সবখানেই আমগাছ এখন মুকুলে ভরা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে মুকুলের মিষ্টি ঘ্রাণ। অনুকূল আবহাওয়া অব্যাহত থাকায় চলতি মৌসুমে ভালো ফলনের আশা করছেন চাষিরা। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭০ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে সাতক্ষীরায় মোট ৪ হাজার ১৩৭ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হিমসাগর ১ হাজার ৫৫৫ হেক্টর, আম্রপালি ৮৯৯ হেক্টর, ল্যাংড়া ৫৬৪ হেক্টর, গোবিন্দভোগ ৩৮২ হেক্টর, গোপালভোগ ২১৯ হেক্টর, লতা ১৪৩ হেক্টর, মল্লিকা ৮০ হেক্টর, বোম্বাই ৫০ হেক্টর, হাঁড়িভাঙ্গা ২ হেক্টর ও অন্য স্থানীয় জাত ২৪৩ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে।
উপজেলা ভিত্তিক আবাদে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ১,২৫০ হেক্টর, কলারোয়ায় ৬৫৮, তালায় ৭১৫, দেবহাটায় ৩৭০, কালিগঞ্জে ৮৩৯, আশাশুনিতে ১৪৫ ও শ্যামনগরে ১৬০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ রয়েছে।
গত মৌসুমে জেলায় আম উৎপাদন হয়েছিল ৭০ হাজার ৮৮০ মেট্রিক টন। চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
বর্তমানে জেলায় আমবাগানের সংখ্যা ৫ হাজার ২৯৯টি এবং মোট আমচাষির সংখ্যা ৫০ হাজার ৭৪৫ জন। এর মধ্যে নিবন্ধিত চাষি রয়েছেন ৩৫১ জন।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার রাজার বাগান এলাকার আমচাষি শরিফুল ইসলাম বলেন, আল্লাহর রহমতে এ বছর জেলায় আমগাছে প্রচুর মুকুল এসেছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার মুকুলের পরিমাণ বেশি। বড় কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে ভালো ফলনের আশা করছেন তিনি।
তিনি জানান, মুকুল আসার পর থেকেই বাগানের পরিচর্যা বাড়ানো হয়েছে। রোগবালাই দমনে কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত স্প্রে ও পর্যবেক্ষণ চলছে। গাছে যাতে মুকুল ঝরে না পড়ে এবং সুস্থভাবে ফল ধারণ করতে পারে, সে বিষয়েও সতর্ক রয়েছেন চাষিরা।
আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ বছর ফলন যেমন ভালো হবে, তেমনি বাজারদরও সন্তোষজনক থাকবে বলে আশা করছেন জেলার আমচাষিরা।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, সাতক্ষীরার মাটি ও আবহাওয়া আম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এ বছর ৪ হাজার ১৩৭ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৭০ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষকদের নিরাপদ ও গুণগত মানসম্পন্ন আম উৎপাদনে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। পাশাপাশি বাগান ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই দমনে মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক পরামর্শ দিচ্ছেন।
তিনি জানান, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সাতক্ষীরা থেকে ১৮০ হাজার মেট্রিক টন আম বিদেশে রফতানি হয়েছিল। ২০২৩-২৪ সালে রফতানি হয় ১৬০ হাজার মেট্রিক টন ও ২০২৪-২৫ মৌসুমে ১৭২ হাজার মেট্রিক টন আম রফতানি হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ মৌসুমে কমপক্ষে ২০০ হাজার মেট্রিক টন আম রফতানির লক্ষ্যে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। যার বাজার মূল্য সর্বকালের রেকর্ড অতিক্রম করে ৮০০ কোটিতে দাঁড়াবে বলে কৃষি অফিস ও অভিজ্ঞ মহল থেকে জানা গেছে।
কৃষি বিভাগের পরামর্শসাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে আরো বলেন, ‘সাতক্ষীরার মাটি ও আবহাওয়া আম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আমরা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি। বিশেষ করে মুকুল আসার পর এই সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পোকার আক্রমণ থেকে মুকুল বাঁচাতে এবং গুটি টিকিয়ে রাখতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচর্যার কথা বলা হচ্ছে। সব ঠিক থাকলে এবার ৭০ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘নিরাপদ ও বিষমুক্ত আম উৎপাদনের লক্ষ্যে কৃষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যাতে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনে কোনো ঘাটতি না থাকে।’
সব মিলিয়ে সাতক্ষীরার কৃষকদের চোখে-মুখে এখন সোনালি স্বপ্নের ঝিলিক। আমের মুকুলের মতোই হাসি ফুটেছে সাতক্ষীরার হাজারো চাষির মুখে।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত