
সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর: বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। এই অসংখ্য উৎসবের ভিড়ে যে উৎসবটি কোনো ধর্মীয় আবরণে আবদ্ধ নয় বরং যার শেকড় মিশে আছে বাংলার পলিমাটিতে সেটি হলো পহেলা বৈশাখ। আবহমান বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ধারক এই দিনটি সময়ের আবর্তে তার বাহ্যিক রূপ পরিবর্তন করলেও এর অন্তর্নিহিত আবেদন চিরন্তন। সেকালের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ভিত্তি আর একালের আধুনিক সুযোগ-সুবিধার মেলবন্ধনে নববর্ষ এখন এক নতুন উচ্চতায় আসীন। এটি যেমন আমাদের জাতিগত অগ্রগতির প্রমাণ দেয় তেমনি আমাদের বিশ্বদরবারে এক অনন্য স্বকীয়তায় পরিচিত করে তোলে।
সাতক্ষীরার প্রেক্ষাপটে বৈশাখ মানেই এক অন্যরকম শুভসূচনা। উপকূলবর্তী এই জনপদে বৈশাখ আসত সুন্দরবনের দুয়ার খোলার নতুন বার্তা নিয়ে। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় মুঘল সম্্রাট আকবরের আমলে কর আদায়ের সুবিধার্থে যে ফসলি সন প্রবর্তিত হয়েছিল তা সাতক্ষীরার কৃষিপ্রধান জনপদে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল। সেকালে সাতক্ষীরার গ্রামগঞ্জে পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল অকৃত্রিম হালখাতা আর সৌহার্দ্যের উৎসব। ব্যবসায়ীরা লাল মলাটের নতুন খাতায় বছরের প্রথম হিসাব শুরু করতেন আর আপামর জনসাধারণ মেতে উঠত প্রাণের স্পন্দনে। সাতক্ষীরার প্রাণসায়র খালের স্মৃতিবিজড়িত পাড় কিংবা ইছামতীর তীরবর্তী মেলাগুলোতে মাটির তৈরি শিল্পকর্ম, কাষ্ঠশিল্প এবং লোকজ বাদ্যযন্ত্রের যে সমারোহ বসত তা আমাদের কারুশিল্পের সমৃদ্ধিকেই তুলে ধরত। তখন ঘরে ঘরে তৈরি হতো আমানি আর বিন্নি চালের খই যা ছিল আমাদের পুষ্টি ও ঐতিহ্যের এক চমৎকার মিশেল।
কালের বিবর্তনে পহেলা বৈশাখ এখন বিশ্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে ইউনেস্কো কর্তৃক মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর এই উৎসবের গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এটি কেবল নতুন বছর নয় বরং প্রযুক্তির সাথে ঐতিহ্যের এক অপূর্ব সেতুবন্ধন। ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে সাতক্ষীরার নিজস্ব পণ্য যেমন- সুন্দরবনের মধু কিংবা সাতক্ষীরার সুমিষ্ট আম বৈশাখী আয়োজনে এক নতুন মাত্রা যোগ করছে। সরকারিভাবে বৈশাখী ভাতার প্রচলন এই উৎসবকে যেমন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিয়েছে তেমনি এটি আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সাতক্ষীরার পর্যটন ও হসপিটালিটি সেক্টরে নববর্ষের এই সময়টা এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয় যা আমাদের স্থানীয় কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি।
একালের বৈশাখ অনেক বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক। আজ আমরা যখন কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন জাতি গঠনের কথা বলি তখন বৈশাখের এই অসাম্প্রদায়িক চেতনা আমাদের উদ্ভাবনী চিন্তাকে আরও শাণিত করে। সাতক্ষীরার শ্রমজীবী ও মেধাবী মানুষ আজ বৈশাখের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের মাঝে এই উৎসব দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধের যে বীজ বপন করে দিচ্ছে তা আগামীর উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করবে। আমাদের লোকজ বাদ্যযন্ত্র আর আধুনিক প্রযুক্তির সুর যখন এক হয়ে বাজে তখন সাতক্ষীরার আকাশ-বাতাস এক নতুন সম্ভাবনার কথা বলে।
পহেলা বৈশাখ কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা পরিবর্তনের দিন নয় এটি বাঙালির আত্মপরিচয় ও সাহসের নাম। আধুনিকতার আশীর্বাদে আমরা আজ বিশ্ব নাগরিক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছি ঠিকই কিন্তু আমাদের হৃদস্পন্দনে আজও মিশে আছে সেই মাটির গন্ধ। একালের জৌলুসের সাথে সেকালের সেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সরলতার সমন্বয় আমাদের এই উৎসবকে চিরস্থায়ী মর্যাদা দান করেছে। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির এই ত্রিমাত্রিক মেলবন্ধনেই বৈশাখ হয়ে উঠুক আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।
পরিশেষে, সাতক্ষীরার মাটি ও মানুষের সাহসী মুখপত্র দৈনিক পত্রদূত-এর অগণিত পাঠক, শুভানুধ্যায়ী এবং আমার প্রিয় সাতক্ষীবাসীকে জানাই বাংলা নববর্ষের অন্তহীন শুভেচ্ছা। নতুন বছর সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল শান্তি, সৃজনশীলতা ও সমৃদ্ধি। বাঙালির এই জয়যাত্রা অব্যাহত থাকুক যুগ থেকে যুগান্তরে।
সাতক্ষীরায় উৎসবমুখর পরিবেশ ও বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়েছে বাংলা নববর্ষ-১৪৩৩। বৈশাখী শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ঐতিহ্যবাহী মেলার মধ্য দিয়ে জেলাজুড়ে বইছে পহেলা বৈশাখের আনন্দধারা।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকাল ৮টায় কালেক্টরেট পার্কে জাতীয় সঙ্গীত ও বর্ষবরণের চিরচেনা গান ‘এসো হে বৈশাখ’ গাওয়ার মাধ্যমে দিনব্যাপী কর্মসূচির শুভ সূচনা করা হয়। এরপর সেখান থেকে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে গিয়ে শেষ হয়। বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ শোভাযাত্রায় ফুটে ওঠে
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক আফরোজা আখতার, পুলিশ সুপার আরেফিন জুয়েল, সিভিল সার্জন আব্দুস সালাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বিষ্ণুপদ পাল এবং অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রিপন বিশ্বাস। এছাড়াও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রহমতুল্লাহ পলাশ, সদস্য সচিব আবু জাহিদ ডাবলুসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উৎসবে শামিল হন।
শোভাযাত্রা শেষে শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। পরে সকাল ৯টায় একই স্থানে ফিতা কেটে সাত দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী `বৈশাখী মেলা`র উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক আফরোজা আখতার। মেলায় স্থানীয় কুটির শিল্প ও কারু পণ্যের স্টলগুলো দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখরিত হয়ে ওঠে।
উৎসবের দ্বিতীয় পর্বে বিকেলে শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা ও ঘুড়ি ওড়ানো প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। দিনটি উদযাপনে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সাতক্ষীরায় এক সম্প্রীতির মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।