
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : জেলায় লবণাক্ত জমিতে এখন দেখা দিয়েছে অভাবনীয় কৃষি সাফল্য। দিগন্তজুগড় শস্যের ক্ষেতগুলোতে ভূট্টা ও সবজির আবাদে সবুজ হয়ে গেছে। এক ফসলী জমিগুলো এখন তিন ফসলে রূপান্তর হচ্ছে। সেই লবণাক্ত জমিতে লাউ, কুমড়া, পেঁপে, ঢেড়শ, পুঁইশাক, উচ্ছে, শসা ও লালশাক এবং উচ্ছেসহ বিভিন্ন প্রকার সবজি উৎপাদন করে সফল হয়েছে।
গত কয়েক দশক ধরেই লবণাক্ততার কারনে জমিতে ফলে না ফসল। মিঠাপানির আধারগুলো গেছে শুকিয়ে। গ্রামের পাশ দিয়ে খাল প্রবহমান থাকলেও পানির অভাবে শস্য আবাদ করতে পারেন না উপকূলের কৃষকরা। শুষ্ক মৌসুমে দিগন্তজুড়ে দেখা দেয় খরা। এরই মধ্যে সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছে এই এলাকার কৃষকরা। পতিত থাকা ফসলী জমির কোনায় পুকুর করে মিঠা পানির সংস্থান করছেন তারা। সেই পানি দিয়ে এখন ফলানো হচ্ছে শস্য। দিগন্তজুগড় শস্যের ক্ষেতগুলোতে ভূট্টা ও সবজির আবাদে সবুজ হয়ে গেছে। এক ফসলী জমিগুলো এখন তিন ফসলে রূপান্তর হচ্ছে।
গল্পের এই পরিবর্তনের নাম সাতক্ষীরার উপকুলীয় শ্যামনগর উপজেলার কাশিমারি ইউনিয়নের খুটিকাটা গ্রামের কৃষকদের। আগে এখানকার কৃষকদের শুধুমাত্র আমন ধান আবাদ করতে পারতো। এখন সেই লবণাক্ত জমিতে লাউ, কুমড়া, পেঁপে, ঢেড়শ, পুঁইশাক, উচ্ছে, শষা ও লাল শাক এবং উচ্ছেসহ বিভিন্ন প্রকার সবজি উৎপাদন করে সফল হয়েছে। তারা সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখাচ্ছে আশপাশের কৃষকদের। পতিত জমি এখন আশা দেখাচ্ছে। স্বপ্ন বুনছেন আগামীর জন্য।
খুটিকাটা গ্রামের প্রান্তিক কৃষক নির্মল সরকার, রবিন্দ্র নাথ সরকার ও নিহার সরকার জানান, লবণাক্ততার কারনে তাদের গ্রামের শত শত হেক্টর কৃষি জমি পতিত থাকে। ফসল ফলে না ঠিকমত। তাছাড়া মিঠাপানির আধারগুলো শুকিয়ে গেছে। গতবছর সিনজেনটার সহযোগিতায় লবণাক্ত জমিতে ফসল উৎপাদন করে এলাকায় রীতিমত সাড়া ফেলে দিয়েছে তারা। গ্রামের অধিকাংশ কৃষককে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে পুকুর খনন করে দিয়েছে সিনজেন্টা। এছাড়া আবাদের জন্য ভার্মিং কম্পোজ সার প্লান্ট, শস্য বীজ এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করেছে। কৃষকরা লবণাক্ত জমিতে বৃষ্টির পানি ব্যবহার করে নানা প্রকার ফসল উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছেন। চলতি মৌসুমে প্রতি বিঘা জমিতে একেক জন কৃষক ৩০-৫০ হাজার টাকা লাভ করেছেন। আরো অধিকসংখ্যক পুকুর খনন এবং গ্রামের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া খালগুলো পুর্নখনন করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করলে বারো মাসই সবজিসহ বিভিন্ন প্রকার ফসল উৎপাদন করা সম্ভব।
এ বিষয়ে সিনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেদায়েত উল্লাহ বলেন, সাতক্ষীরার যে অঞ্চলে লবনাক্ততার কারনে সারাবছর ফসল ফলাতে পারতো না। সেখানে সিনজেনটার প্রযুক্তিগত ও উপকরণ সহায়তার মাধ্যমে এক ফসলী জমিকে তিন ফসলী জমিতে রূপান্তর করা সম্ভব হয়েছে। এতে কৃষকের সক্ষমতা এবং জীবন জীবিকার মানউন্নয়ন হয়েছে। কৃষিতে একটা অমুল পরিবর্তন আনা গেছে। এ অঞ্চলে টেকসই কৃষি ব্যবস্থার পাশাপাশি রিজেনারেটিভ এগ্রিকালচার পদ্ধতিগুলো বাস্তবায়ন করছে সিনজেনটা। গো গ্রো প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসডিজির অনেকগুলো লক্ষ্য পূরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি জলবায়ুর পরিবর্তনের ঝুকি মোকাবেলা করে সক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রে একটি মডেল হিসেবে কাজ করছে প্রকল্পটি।
এই কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত সিনজেন্টা বাংলাদেশ লিমিটেডের পরিচালক (বিজনেস সাসটেইন এবিলিটি ও এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স) মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, উপকূলের পরিস্থিতি বিবেচনা করে কৃষকদের শস্য আবাদে পুকুর খনন কার্যক্রম পরিচালনা করছে সিনজেনটা। এতে করে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে লবনাক্ত জমিতে ফসল ফলাতে পারছেন কৃষকরা। উপকুলীয় এলাকায় অধিকসংখ্যক পুকুর খননের পাশাপাশি উন্মুক্ত জলাশয় সংরক্ষণ করতে হবে। যাতে করে কৃষকরা বৃষ্টির পানি ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন করতে পারেন। সিনজেনটা কৃষকদের পুকুর খননের পাশাপাশি বীজ, ভারমিকম্পোস্ট , সোলার ইরিগেশন ও কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। বীজ ও কীটনাশকের পরিমিত ব্যবহারের মাধ্যমে ফসলের সর্বোচ্চ উৎপাদনের বিষয়ে কার্যকর পরামর্শ দিচ্ছে সিনজেনটা। সব মিলিয়ে এ অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে টেকসই কৃষি ব্যবস্থার পাশাপাশি রিজেনারেটিভ এগ্রিকালচার পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করা হচ্ছে। সফলভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসডিজির অনেকগুলো লক্ষ্য পূরণ করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জানা গেছে, খুটিকাটা গ্রামে শস্য আবাদের মাধ্যমে কৃষিকে টেকসই রূপান্তর করতে গো গ্রো প্রকল্প গ্রহণ করেছে সিনজেন্টা বাংলাদেশ লিমিটেড। গতবছরে শুরু হওয়া এ প্রকল্পে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান জড়িত রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), বিনা, ডিএইর এসএসি প্রকল্প এবং এসআরডিআই। শুরুতে পুকুর খননের মাধ্যমে মিঠা পানির সংস্থান করা হয়েছে। খুটিকাটা গ্রামের ৪০ জন কৃষক দিয়ে এই কার্যক্রম শুরু হয়। সেসব কৃষক জমির কোনায় কয়েকটি পুকুর খনন করেন। এক একটি পুকুর খনন করতে ১০-১৫ ফুট গভীর করা লাগে। খননে প্রায় ১ লাখ টাকা খরচ হয়। আর সেই পুকুর মিঠা পানির আধার হিসেবে কাজ করে। সবজি ও শস্য আবাদের সময় পুকুরের পানি দিয়ে সেচ দেওয়া হয়। তবে মিঠা পানির সরবরাহ বাড়াতে এই ধরনের পুকুর খননেন পাশাপাশি বিদ্যমান খালের পানি সরবরাহের উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে এ অঞ্চলে আরো বেশি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিসেস আফরোজা আক্তার এই প্রতিবেদককে জানান, উপকুলে বসবাসরত মানুষদের বারোমাসই নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেল করতে হয়। ঝড়, জলচ্ছ্বাস ও খরার কারনে এসব উপকুলবাসীদের টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়েছে। সেখানে জমি পতিত থাকলে অর্থনৈতিকভাবে তারা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েন। তাদের টিকে থাকার পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার উপায় বের করতে হবে আমাদের। কারণ ঝড়, জলচ্ছ্বাস ও বন্যা বন্ধ করা তো কারো পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে এমন পরিবেশে টিকে ফসল উৎপাদন বাড়াতে হবে। সিনজেনটার এ প্রযুক্তি এই জেলার অনান্য গ্রামে সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারিখাতকে এগিয়ে আসার প্রয়োজন। লবণ সহিঞ্চু বিভিন্ন প্রকার ধান, সবজি, ফল এবং অন্যান্য গাছ রোপণ করতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। মিঠা পানির সরবরাহের লক্ষ্যে খালে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানান।উপকূলীয় খুলনা অঞ্চলের কৃষকদের জন্য অভিশাপ ছিল মাটির অতিরিক্ত লবণাক্ততা। মিঠাপানির অভাবে বছরের অধিকাংশ সময় পতিত থাকত ফসলি জমি। লোনাপানি আটকে চিংড়ি চাষের কারণে একসময় শুধু বর্ষা মৌসুমেই আমন ধান উৎপাদন হতো। সেই লবণাক্ত মাটি থেকে এখন বছরজুড়ে ফসল ঘরে তুলছেন উপকূলীয় এ অঞ্চলের কৃষক।
কৃষক বলছেন, পরপর কয়েকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর শুধু ধান চাষ করে তেমন লাভবান হতো না। লবণসহিষ্ণু ফসল আবাদের পদ্ধতি শিখে নিয়েছেন তারা। মৌসুমভেদে তরমুজ, শিম, কিনোয়া, সূর্যমুখী, সরিষা, বেগুন, করলা, মিষ্টি কুমড়া, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, গোল আলু, মিষ্টি আলুসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করছেন তারা। পাশাপাশি বিনাচাষে রসুন ও ভুট্টাও উৎপাদন করছেন।
খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় চার উপজেলা দাকোপ, বটিয়াঘাটা, কয়রা ও পাইকগাছায় লবণাক্ততা বেড়েছে। বছরের পর বছর কৃষি জমিতে লোনাপানি আটকে চিংড়ি চাষ করতেন এখানকার কৃষক। শুধু বর্ষা মৌসুমে আমন ধান উৎপাদন হতো। বাকি সময় এসব জমি পতিত থাকত। শুষ্ক মৌসুমে উপকূলের মাটিতে লবণাক্ততা বেড়ে যায়। চার বছর আগেও জমিগুলো আমন ধান চাষের পর অনাবাদি পড়ে থাকত। এখন সেই জমিগুলোই স্বপ্ন দেখাচ্ছে উপকূলের কয়েক উপজেলার চাষীদের। অল্প সময়ে বিনিয়োগে দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ লাভ হওয়ায় কৃষক ঝুঁকছেন তরমুজ চাষে। উপকূলীয় এলাকার তরমুজ মিষ্টি ও সুস্বাদু হওয়ায় চাহিদা বাড়ছে সারা দেশে। লাভ বেশি হওয়ায় চাষও বাড়ছে। গত কয়েক বছর এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির সমৃদ্ধিতে নতুনমাত্রা যোগ করেছে তরমুজ।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে দাকোপ, বটিয়াঘাটা, কয়রা ও পাইকগাছায় এবার ১২ হাজার ১৭৫ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ টন। যার বাজার মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।
খুলনার দক্ষিণে সুন্দরবনঘেরা উপজেলা কয়রা। এ জনপদের চারদিকে পানি থাকলেও তা লবণাক্ত। পুকুর, খাল, নদ-নদীতেও লবণ পানি। গভীর বা অগভীর নলকূপ এখানে অকার্যকর। সেচ সংকটে কৃষক ফসল আবাদ করতে পারতেন না।
কয়রার নাকশা গ্রামের কৃষক আবদুল কাদের, হারুন গাজী, আবদুল আজিজ, যোগেশ মণ্ডলসহ বেশ কয়েকজন জানান, উপকূলীয় কৃষকের জন্য মাটির অতিরিক্ত লবণাক্ততা ছিল অভিশাপ। চোখের সামনে বিস্তীর্ণ জমি থাকলেও চাষের জমির জন্য ছিল হাহাকার। লবণাক্ত মাটি থেকেই এখন ফসল ঘরে তুলছেন তারা। কৃষিকাজ করে তারা এখন স্বাবলম্বী। এসব ফসল বিক্রি করে তাদের আয়ও বেড়েছে কয়েক গুণ।
কয়রা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘এ উপজেলায় বিগত দিনের তুলনায় ফসল ও সবজি চাষ বেড়েছে। কৃষকদের ফসল ও সবজি চাষে প্রদর্শনী এবং প্রণোদনার মাধ্যমে সহযোগিতা করা হচ্ছে। তবে ধানের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হচ্ছে তরমুজ। ২০২০ সালে এ উপজেলায় মাত্র ৬৫ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছিল। চাষীরা লাভবান হওয়ায় চার বছরের ব্যবধানে আবাদ বেড়েছে। চলতি মৌসুমে ২ হাজার ৯৩০ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৯৬০ টন।’
তরমুজ চাষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন পুরোদমে তরমুজ তোলা ও বিক্রির কাজ চলছে। পাকিজা, সুইট ড্রাগন, মারভেলাস, আনারকলিসহ কয়েকটি জাতের তরমুজ চাষ করেছেন তারা। ফলনও ভালো হয়েছে, দামও পাচ্ছেন ভালো। বিঘাপ্রতি (৩৩ শতাংশ) তাদের খরচ হয়েছে ১৮-২২ হাজার টাকা। আর আয় হচ্ছে ৬০-৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে তরমুজের বীজ, কীটনাশক, সার ও ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে লাভ কিছুটা কমেছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট খুলনা কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হারুনর রশীদ বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমরা ধান, ডাল, তরমুজ, আলু, ভুট্টা, বার্লি, সূর্যমুখী ও সবজিসহ কয়েকটি ফসলের লবণসহিষ্ণু উন্নত জাত উদ্ভাবন করতে পেরেছি। উপকূলীয় জমিতে এসব ফসল উৎপাদন বেড়েছে। তবে ধানের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হচ্ছে তরমুজ।’
দাকোপ উপজেলায় এ বছর ৭ হাজার ৬০৫ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছে। হেক্টরপ্রতি তরমুজের গড় উৎপাদন হয়েছে ৪২ টন। ১ হেক্টর জমিতে উৎপাদিত তরমুজ ৫ থেকে সাড়ে ৫ লাখ টাকা বিক্রি হচ্ছে।বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল খুলনার পতিত জমিতে গম ও সূর্যমুখী চাষ করে কৃষকরা বিঘাপ্রতি ছয় থেকে আট হাজার টাকা লাভ করতে পারবেন বলে গবেষকরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। এ অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে লবণাক্ত জমিকে চাষাবাদের আওতায় আনতে গবেষণা করে চলেছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিন। এরই ধারাবাহিকতায় দাকোপের পানখালিতে রোপা আমন ধান কাটার পর রবি মৌসুমে সূর্যমুখী ও গম চাষে সফল হয়েছেন এই ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. এনামুল কবীর এবং উপ-গবেষক সহকারী অধ্যাপক বিধান চন্দ্র সরকার। দাকোপের পানখালিতে ১০ বিঘা (প্রায় ১.৫ হেক্টর) জমিতে দুটি গবেষণা প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তীব্র লবণাক্ততার কারণে রোপা আমন ধান দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের একমাত্র ফসল। এ এলাকার কৃষকরা সাধারণত দেরিতে পাকে এমন স্থানীয় জাতের ধান আবাদ করে থাকেন। এসব জাতের ফলন অন্যান্য উচ্চ ফলনশীল জাতের তুলনায় অনেক কম। আমন ধান কাটার পর এ এলাকার অধিকাংশ জমি পতিত থাকে। কারণ দেরিতে আমন ধান কাটার ফলে কৃষক উপযুক্ত সময়ে রবি ফসলের বীজ বপন করতে পারেন না। এছাড়া ধান কাটার পর জমিতে অতিরিক্ত রস থাকায় সঠিক সময়ের মধ্যে বীজ বপন করতে না পারা অরেকটি প্রধান কারণ।
এ সমস্যা থেকে উত্তরণে খুবিসহ বাংলাদেশ, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান দুটি সমন্বিত গবেষণা প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অস্ট্রেলিয়ার একটি সংস্থা অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ এবং বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন কেজিএফের যৌথ অর্থায়নে এই প্রকল্পের কাজ চলছে।
প্রকল্পের উপ-গবেষক সহকারী অধ্যাপক বিধান চন্দ্র সরকার বলেন, ‘প্রথম প্রকল্পে আমরা নির্বাচন করার চেষ্টা করেছি– এখানে রবি মৌসুমের কোন কোন ফসল চাষাবাদের জন্য উপযুক্ত এবং এ পরিবেশে সেগুলো টিকে থাকবে কি না। আমরা অনেক ফসল নিয়ে কাজ করেছি– গম, সরিষা, সূর্যমুখী, ভুট্টা, মটর ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে সূর্যমুখী ও গম (তিন বছর) সফলভাবে চাষ করা সম্ভব হয়েছে। এরপর সূর্যমুখী ও গমের সার ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য চাষাবাদ কৌশল নিয়ে আমরা দ্বিতীয় প্রকল্পের কাজ শুরু করেছি।’
খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক বলেন, ‘এই লবণাক্ত অঞ্চলে চাষ করা সম্ভব এমন একটি ফসল হচ্ছে সূর্যমুখী। এর ফুল ধারণের ওপর দিনের দৈর্ঘ্য ও মৌসুমের কোনও প্রভাব নেই, দেরিতে লাগালেও হচ্ছে। এর মূল মাটির গভীর থেকে খাদ্য গ্রহণ করে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে না লাগালে ফুল ফুটবে না এমন কোনও বিষয় নেই। এজন্য এটি রবি, খরিফ-১ ও খরিফ-২ এই তিন মৌসুমেই করা যাবে। তবে রবি মৌসুমে এর ফলন বেশি। এতে করে কৃষক এবং সর্বোপরি সরকার লাভবান হবে। কাজেই সূর্যমুখী এ অঞ্চলের জন্য একটি কার্যকরী ফসল বলে আমি মনে করি।’
মুখ্য গবেষক অ্যধাপক ড. মো. এনামুল কবীর বলেন, ‘সূর্যমুখী ও গম এখানে হবে তা বিগত কয়েক বছরের গবেষণায় আমরা নিশ্চিত। রোপা আমন কাটার পর মাটিতে যে অতিরিক্ত আর্দ্রতা থাকে এমন অবস্থায় মাটিতে বিনাচাষে সূর্যমুখী ও গম দিলে সেটা গজাচ্ছে। কিন্তু অন্য ফসল সেটা সহ্য করতে পারে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা মারা যায়। রবি মৌসুমে সূর্যমুখী ও গম চাষের নতুন প্রযুক্তি (সার, পানি, লবণাক্ততা ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনা) কৃষকদের দিতে পারলে এই এলাকায় রোপা আমনের সঙ্গে তারা অতিরিক্ত একটি ফসল পাবে এবং আর্থিকভাবে লাভবান হবে। সূর্যমুখী চাষ ভোজ্য তেলের ঘাটতি পূরণেও ভূমিকা পালন করবে এবং কৃষকরাও সূর্যমুখীর তেল ব্যবহার করতে পারবেন।’
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘এ অঞ্চলে সূর্যমুখী ও গমের ভালো ফলন পেতে উচ্চ ফলনশীল এবং স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন আমন ধান একটু আগে লাগাতে ও কাটতে হবে। এরপর মাটিতে অতিরিক্ত আর্দ্রতা থাকা অবস্থায় বিনা চাষে সূর্যমুখী ও গমের বীজ বপন করে, এমনকি সূর্যমুখীর চারা রোপণ করেও চাষ করা যায়। এতে লবণাক্ততা তীব্র হওয়ার আগেই ফসল কাটার উপযোগী হয়।’
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল প্রকাশিত ফার্টিলাইজার রিকমেন্ডেশন গাইডে সূর্যমুখীর কোনও ফার্টিলাইজার রিকমেন্ডেশন এ অঞ্চলের জন্য নেই। এই প্রকল্প দুটির সফল সমাপ্তির পর এই অঞ্চলের জন্য সূর্যমুখী ও গমের একটি সুনির্দিষ্ট সার ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য চাষাবাদ কৌশল প্রতিষ্ঠা করা যাবে এবং কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া যাবে।
পানখালির কৃষক শংকর প্রসাদ বলেন, ‘সূর্যমুখী ও গম চাষের ফলে আমরা রোপা ধানের সঙ্গে অতিরিক্ত একটি ফসল পাচ্ছি এবং ভবিষ্যতেও পাব। এই সূর্যমুখী ও গম চাষের ফলে আমরা লাভবান হব এবং তাতে আমরা অনেক খুশি।খুলনার উপকূল অঞ্চলে লবণাক্ততার মধ্যেও সূর্যমুখী ফুলের চাষ ভালো হয়েছে। অধিকাংশ বাড়ির আঙিনায় শোভা পাচ্ছে হলুদ সূর্যমুখী ফুল। একদিকে, সয়াবিন ও সরিষা ভোজ্যতেলের ঘাটতি পূরণ করবে সূর্যমুখী তেল; অন্যদিকে, সাধারণ মানুষ ও প্রকৃতিপ্রেমী দর্শনার্থীদের মন আকৃষ্ট করছে।
বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা যায়, ফুটে থাকা হলুদ সূর্যমুখী ফুলের সমাহারে নয়নাভিরাম দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। চারদিকে হলুদ রঙের ফুলের মনমাতানো ঘ্রাণ আর মৌমাছিরা ছুটছে এক ফুল থেকে অন্য ফুলে। এটি যেন ফসলি জমি নয়, এ এক দৃষ্টিনন্দন বাগান। এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য অবলোকনে শুধু প্রকৃতিপ্রেমি নয় বরং যে কারো হৃদয় কাড়বে। তবে সূর্যমুখী ফুল চাষের লক্ষ্য নিছক বিনোদন নয়। মূলত ভোজ্যতেল উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্য চাহিদা মেটাতে এ চাষ করা হচ্ছে। আবহাওয়া এখন পর্যন্ত অনুকূলে থাকায় কৃষকরা সূর্যমুখী ফুলের বাম্পার ফলনের আশা করছেন। তেল জাতীয় অন্য ফসলের চেয়ে সূর্যমুখীর চাষ অনেক সহজলভ্য ও উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় কৃষকেরা এতে উৎসাহিত হয়ে উঠছে।
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কৃষক শিবপদ মন্ডল বলেন, ‘উপজেলা কৃষি অফিসের সহযোগিতায় আমি এ প্রথম দুই বিঘা জমিতে সূর্যমুখী ফুলের চাষ করেছি। আমার সূর্যমুখী ফুল ভালো হয়েছে। প্রায় প্রতিটি গাছে বড় ফুল ধরেছে।’
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় একাডেমিক ভবনের সামনের পুকুরের চারপাশ, চারুকলা কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে ও পেছনে, ভিসি বাসভবনের সামনে সূর্যমুখী ফুলের হয়েছে আবাদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের মালি মো. বাবুল শেখ বলেন, ‘ক্যাম্পাসে ব্যাপকভাবে সূর্যমুখী চাষ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি স্যার সূর্যমুখী ফুলের বীজ এনে দিয়েছিলেন।’
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার নলকুড়া গ্রামের কৃষক ওলিউর রহমান জানান, চলতি রবি মৌসুমে তিনি এক বিঘা জমিতে হাইসান জাতের সূর্যমুখী চাষ করেছেন। খেতের অধিকাংশ গাছে ফুল বড় হয়েছে। গত মৌসুমে একই পরিমাণ জমিতে সূর্যমুখী চাষ করে ১৮ হাজার টাকা লাভ হয় তার।
সাতক্ষীরার তালা উপজেলার কৃষক নূরুজ্জামান বলেন, কৃষি অফিস থেকে বীজ পেয়ে সূর্যমুখীর চাষ করেন। অনেক বড় ফুল ধরেছে। প্রতিনিয়ত লোকজন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সূর্যমুখী ফুল দেখতে আসেন। ছবি তোলেন।
বিভিন্ন উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, সয়াবিন ও সরিষা ভোজ্যতেলের ঘাটতি পূরণ করবে সূর্যমুখী তেল। হাইসান, এফ-১ জাতের সূর্যমুখী ফুলের চাষ হয়েছে। সূর্যমুখী ফুলের চাষ করলে ফুল থেকে তেল, খৈল ও জ্বালানি পাওয়া যায়। প্রতি কেজি বীজ থেকে প্রায় আধা লিটার তৈল উৎপাদন সম্ভব। প্রতি বিঘা জমিতে ৭ মণ থেকে ১০ মণ বীজ উৎপাদন হয়। তেল উৎপাদন হবে প্রতি বিঘায় ১৪০ লিটার থেকে ২০০ লিটার পর্যন্ত। প্রতি লিটার তেলের সর্বনিম্ন বাজার মূল্য ২৫০ টাকা। প্রতি বিঘা জমিতে খরচ হয় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা।
কয়রা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, সূর্যমুখী লবণ সহিঞ্চু। উপকূলে লবণাক্ততার মধ্যে সূর্যমুখী চাষ করে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সূর্যমুখী চাষে উদ্বুদ্ধ করতে ১ হাজার ৭০০ জন কৃষককে ১ কেজি করে বীজ ও সার দেয়া হয়েছে। কয়রা উপজেলায় এ বছর ২২০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে।
পাইকগাছা উপজেলা কৃষি অফিসার বলেন, উপকূলের লবণাক্ত এ উপজেলায় সূর্যমুখী ফুলের চাষ ভালো হয়েছে। সূর্যমুখী ফুলের তেল অধিক পুষ্টিগুণ সম্পন্ন। অলিভ ওয়েলের পরেই সূর্যমুখী তেলের অবস্থান। ডায়াবেটিস ও হৃদরোগীদের জন্য এ তেল অন্যান্য তেলের চেয়ে অনেক উপকারী ও স্বাস্থ্যসম্মত।
কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর, খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহন কুমার ঘোষ বলেন, গত মৌসুমে খুলনা অঞ্চলে ২ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমিতে চাষ হয়। এ মৌসুমে ৩ হাজার ১৪৬ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। এরমধ্যে খুলনা জেলায় ১ হাজার ৮৫৫ হেক্টর, বাগেরহাটে ১ হাজার ৪৮ হেক্টর, সাতক্ষীরায় ১৩৮ হেক্টর ও নড়াইলে ১০৫ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টিপাত না হলে আরও বেশি জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ সম্ভব হতো। সাধারণ কৃষকদের সূর্যমুখী চাষে উদ্বুদ্ধ করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে সার ও বীজ প্রণোদনা দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। খুলনার উপকূলীয় বটিয়াঘাটা উপজেলার লবণাক্ত পতিত জমিতে সূর্যমুখী ফুলের চাষে সফলতা এসেছে। ফলে উৎকৃষ্টমানের তেলের চাহিদা পূরণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এছাড়াও স্বল্প খরচে অধিক ফলনে লাভবান হওয়ার আশা করছেন কৃষকরা।
গোপালগঞ্জ-খুলনা-বাগেরহাট-সাতক্ষীরা-পিরোজপুর কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প (এসআরডিআই) এর আওতায় খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার লবণাক্ততা ব্যবস্থাপনা ও গবেষণা কেন্দ্রে রবি মৌসুমে ডিবলিং পদ্ধতিতে সূর্যমুখী চাষের গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। এখানে নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে আমন ধান কর্তনের পর ভিজা মাটিতে সূর্যমুখীর বীজ ডিবলিং পদ্ধতিতে বপণ করা হয়েছে। এরপর চারা গাছের গোড়া বেঁধে সার প্রয়োগ করা হয়েছে। গবেষণায় তিনটি জাত ব্যবহার করা হয়েছে। স্থানীয়, বারি সূর্যমুখী-২ এবং হাইসান-৩৩ এই তিনটি জাতের সবকটিতেই ফলি এসেছে। এগুলোর মধ্যে হাইসান-৩৩ জাতের ফলন ভালো হয়েছে। মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে এ জাতের সূর্যমুখী বীজ কাটা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন গবেষণা কতৃপক্ষ।
লবণাক্ততা ব্যবস্থাপনা ও গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অমরেন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন, সূর্যমুখী একটি লবণ সহিষ্ণু ফসল। ফলে লবণাক্ত এলাকায় সূর্যমুখী চাষের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে আমন ধান কাটার পর বিস্তীর্ণ জমি পড়ে থাকে। মাটি ও পানিতে লবণ থাকায় সহজে অন্য কোনো ফসল ফলানো কঠিন। সেখানে বিনা চাষে ডিব্লিং পদ্ধতিতে দুটি সেচ দিয়ে সূর্যমুখী ফুল চাষ করলে পতিত জমি চাষের আওতায় আসবে। এটি একটি উৎকৃষ্ট তেল ফসল হওয়ায় মানব শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী সূর্যমুখী তেলের চাহিদা পূরণ হবে। এই প্রযুক্তি সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়ে কৃষকদের সূর্যমুখী চাষে উৎসাহী করা প্রয়োজন।
খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানা গেছে, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে জেলায় ১ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী করে ২ মেট্রিকটন উৎপাদন হয়। এরপর ২০১৯-২০২০ (রবি) অর্থবছরে জেলায় মোট ১৪ হেক্টর জমিতে খরিপ-১ জাতের সূর্যমুখী চাষ করে ৩২ মেট্রিকটন উৎপাদন হয়। এ বছর ১৪ হেক্টরের বেশি জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়েছে বলে তারা জানান।
বটিয়াঘাটা উপজেলার কৃষক অরবিন্দ জানান, এ বছর ৩৩ শতক পতিত জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে। আগামিতেও সূর্যমুখী চাষ করবো।
বটিয়াঘাটা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জনান, সূর্যমুখী লবণ সহিষ্ণু ফসল। এর বীজে ৪০-৪৫ শতাংশ লিনোলিক এসিড রয়েছে। এছাড়া এই তেলে ক্ষতিকারক ইরোসিক এসিড না থাকায় তা হার্টের রোগীদের জন্য উপকারী। আমন মৌওসুমে ধান লাগানোর পর উপকূলীয় এলাকার অধিকাংশ জমি পতিত থাকে। এ ফসল চাষে অনাবাদী জমির পরিমাণ কমার পাশাপাশি স্থানীয় সূর্যমুখী তেলের চাহিদাও পূরণ করবে। স্বল্প খরচে এ ফসল চাষে কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে। এবছর যেসব জমিতে সূর্যমুখী ফুলের চাষ করা হয়েছে সেখানে ফসলও ভালো হয়েছে। ভালো ফলন দেখে এলাকার অন্য কৃষকদের মাঝেও সূর্যমুখী চাষে আগ্রহ দেখা দিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ইতোমধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জোয়ারের নোনা পানি ঢুকে পড়ার ফলে এই অঞ্চলের মাটি ক্রমশ লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। ফলে হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি অনুর্বর হয়ে পড়েছে, যা কৃষকদের জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। তবে কৃষির আধুনিক অভিযোজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। লবণসহিষ্ণু সূর্যমুখী চাষের সফলতার মাধ্যমে উপকূলীয় কৃষকরা এখন তাদের পতিত জমিকে নতুন করে চাষযোগ্য করে তুলছেন।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় এমনই এক ইতিবাচক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। ব্র্যাক জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচির উদ্যোগে ও সহায়তায় লবণসহিষ্ণু সূর্যমুখী চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে হাইসান-৩৩ জাতের সূর্যমুখী বীজ এই অঞ্চলের কৃষকদের জন্য আশাতীত ফলন দিচ্ছে। এই উচ্চফলনশীল জাতের সূর্যমুখী চাষ করে কৃষকরা একদিকে যেমন অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পথও তৈরি হচ্ছে।
এক সময় এই অঞ্চলে আমন ধান কাটার পর অধিকাংশ জমি পতিত পড়ে থাকতো, কারণ লবণাক্ততার কারণে অন্যান্য শস্য চাষ করা সম্ভব হতো না। কিন্তু ব্র্যাকের এডাপটেশন ক্লিনিকের সহায়তায় কৃষকদের বীজ, সার, বালাই ব্যবস্থাপনা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়, যার ফলে তারা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সূর্যমুখী চাষে আগ্রহী হন। এর ফলস্বরূপ, এই বছর কলাপাড়ার প্রায় ৫,০০০ বিঘা পতিত জমিতে সূর্যমুখী চাষ করা হয়েছে, যা থেকে ১,৮০০ টন সূর্যমুখী উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এই উৎপাদিত সূর্যমুখী থেকে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার লিটার তেল পাওয়া যাবে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
সূর্যমুখী বীজের তেল পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ এবং এতে কোলেস্টেরলের মাত্রা কম থাকে, ফলে এই তেলের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে কৃষকদের যাতে তেল উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ করতে সুবিধা হয়, সেজন্য তাদের মধ্যে সূর্যমুখীর খোসা ছাড়ানোর মেশিন এবং তেল ভাঙানোর মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। কৃষকরা এখন শুধু সূর্যমুখী বীজ বিক্রিই করছে।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত