
গাজী জাহিদুর রহমান, তালা : আগামী ১২ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থীর পাশাপশি এবং প্রশাসনের প্রস্তুতি চলছে বেশ জোরেসোরে। ইতিমধ্যে ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। যতই দিন ঘনিয়ে আসছে ততই প্রার্থীরা সাধারণ মানুষের মন জয় করতে দৌঁড়ঝাপ শুরু করেছে। তালা ও কলারোয়া উপজেলা নিয়ে সাতক্ষীরা-১ আসন গঠিত। যার সংসদীয় আসন নং-১০৫। প্রচার-প্রচারণায় সাতক্ষীরা-১ আসনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাটবাজার ও গুরুত্বপূর্ণ জনবহুল এলাকা মুখর হয়ে উঠেছে। এখনো বিএনপির প্রচার প্রচারণা লিফলেট বিতরণ ও সমাবেশের মাধ্যেই অনেকটা সীমাবদ্ধ। জামায়াত বহু আগেই তাদের দলীয় সাংগঠনিক কাজ গোছানোর কাজ শেষ করে বর্তমানে নির্বাচনের মাঠে সভা সমাবেশ অব্যাহত রেখেছেন। বিএনপি, জামায়াত,ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন,জাতীয় পার্টি এবং বাংলাদেশ কংগ্রেেেসর প্রত্যেক দল তাদের একক প্রার্থী ঘোষণা করেন। প্রার্থীরাও কোমরবেধে নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। এবার মুক্তভাবে ভোট দিতে পারবে এমন আশায় উৎসবমুখর পরিবেশে স্ব স্ব দলের পক্ষে নেতাকর্মীরা কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে। নির্বাচন অফিস সুত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৯১২ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৯০জন এবং মহিলা ভোটার ২লাখ ৪৮হাজার ৯২০জন এবং হিজড়া ভোটার ২জন। এরমধ্যে তালা উপজেলার মোট ভোটার ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৫৫ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ১লাখ ৩৮ হাজার ৫১৭ জন এবং মহিলা ভোটার ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৭ জন এবং হিজড়া ভোটার ১জন। এছাড়া কলারোয়া উপজেলার মোট ভোটার ২লাখ ২০হাজার ৫৭জন। এদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ১লাখ ৯হাজার ৪৭৩জন এবং মহিলা ভোটার ১লাখ ১০হাজার ৫৮৩ জন এবং হিজড়া ভোটার ১জন।
সাতক্ষীরা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান জানান, সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের অন্তর্ভুক্ত দু’টি উপজেলায় মোট ১৬৮টি কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে তালা উপজেলায় ৯৩ এবং কলারোয়াতে রয়েছে ৭৫টি কেন্দ্র। উক্ত কেন্দ্রের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ (ঝুঁকিপূর্ণ) ৫০টি ও সাধারণ কেন্দ্র ১১৮টি। সবগুলো কেন্দ্রই থাকবে সিসি ক্যামেরার আওতাভুক্ত। নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের তত্ত্বাবধায়নে কেন্দ্রগুলোতে সিসি ক্যামেরা বসানো হবে। ভোট কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানোর কাজ ইতোমধ্যে ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে সব কয়টি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানোর কাজ শেষ হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে বিগত ১৬ বছর যাবৎ রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়ে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা জেল-জুলুম অত্যাচার সহ্য করার পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির পরেও এখনো রাজনীতির মাঠে আছেন। কয়েকটি ইউপি, উপজেলা এবং সংসদ নির্বাচনে জনগণ তাদের ইচ্ছানুযায়ী ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। যার কারণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার সাথে সাথে ভোটারদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনী আমেজ শুরু হয়। তাই প্রার্থীদের সাথে প্রত্যন্ত এলাকার জনগণও নির্বাচনকে উৎসবমুখর করতে মুখিয়ে আছে। ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর মূলতঃ এ আসনে জামায়াত বিএনপি জোরেসোওে এবং ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন অনেকটা ধীর গতিতে তাদের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে। সর্বশেষ জাতীয় পার্টি এবং বাংলাদেশ কংগ্রেস নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে এই ৫ দল ছাড়া কোন রাজনৈতিক দলের তেমন প্রচার দেখা যাচ্ছে না। এদের মধ্যে জামায়াত এবং বিএনপি বর্তমানে নির্বাচনী মাঠ সরগরম করে রেখেছেন।
সাতক্ষীরা-১ আসন থেকে নির্বাচনের মাঠে নেমেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুল ইসলাম হাবিব, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহ, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের পাটকেলঘাটা থানা শাখার আমীর মাওঃ শেখ রেজাউল করিম,জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির এনজিও বিষয়ক সম্পাদক এড. জিয়াউর রহমান, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মহাসচিব এড.ইয়ারুল ইসলাম ।
সময়ের ব্যবধানের নির্বাচনী প্রচারণার ধরণ পরিবর্তন হয়েছে। মানুষের হাতে হাতে থাকা মোবাইল ফোনে প্রতিনিয়ত কর্মী সমর্থকরা খবর সংগ্রহ করছেন। সাথে সাথে গ্রামগঞ্জের হাটবাজার এবং অলিগলিতে প্রতিটি চায়ের দোকানে চলছে নির্বাচনী প্রচারণা সাথে সাথে আলোচনা সমালোচনা। কোন প্রার্থী নির্বাচিত হলে এলাকার কতটুকু উন্নয়নের কাজ হবে, কে জনগণের আশা আকাংখার মূল্যায়ন এবং বাস্তবায়ন করতে পারবে? কোন প্রার্থী সাধারণ জনগনের সাথে মিলে মিশে কাজ করতে পারবে এমন শত শত প্রশ্নের মধ্যে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে বিএনপি বা জামায়াত দু’দলই তাদের ভোট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে শতভাগ আশাবাদী। তবে প্রচারণায় এখনো পর্যন্ত এগিয়ে রয়েছে জামায়াত ও বিএনপিসহ অঙ্গ সংগঠন। ইতিমধ্যে ভোটের জন্য পুরুষের পাশাপাশি মহিলা জামায়াতের কর্মী সদস্যরাও বাড়িতে বাড়িতে এবং প্রতিটি মহল্লায় প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে বিএনপির প্রচারণা এখনো সভা সমাবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানের দলের প্রার্থীসহ নেতাকর্মীদের সাথে সাথে মহিলা দলের নেতাকর্মীরাও জোরেসোরে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে দলীয় প্রার্থী ছাড়া দলগতভাবে পাড়া মহল্লায় তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। প্রার্থী নিজেই সভা সমাবেশের মাধ্যমে কর্মী সমর্থকদের কাছে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি জনগনের দোরগোড়ায় গিয়ে ভোটের জন্য কাজ করছেন এবং এখনো অব্যাহত আছে।
তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে,বিএনপি সমর্থিত নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা দলীয় কার্যক্রমে অংশ নিলেও প্রচারণা থেকে পিছিয়ে আছে। বিভিন্ন সমাবেশে উপস্থিতির হার দেখেই তারা নির্বাচনে শতভাগ পাশের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ের ভোট পেতে প্রার্থীর মত কর্মী এবং সমর্থকদের প্রচারণা তুঙ্গে থাকা দরকার। কিন্তু সেটা পরিলক্ষিত হচ্ছেনা বলে জানিয়েছেন অনেক প্রবীন নেতাকর্মীরা। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি এলাকায় বিএনপির পক্ষ হতে লিফলেট বিতরণ করতে দেখা গেছে। তবে জামায়াত এবং বিএনপির ভোটের হিসাব নিকাশ শুরু হয়েছে বেশ সুচারুভাবে। অনেকটা তাত্ত্বিক নেতাদের মত বিএনপির কিছু কর্মী-সমর্থকরা বাজার এবং পাড়া মহল্লার দোকানে বসে সমাবেশে উপস্থিতির হার দেখেই আবেগে বিজয়ের হিসাব নিকাশ করেই সময় পার করছেন। তবে জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে তাদের পুরুষ এবং মহিলা নেতাকর্মীরা বিজয়ের তাগিদেই প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের প্রার্থী বা কর্মী সমর্থকরা প্রচার প্রচারনায় তেমন সাড়া পাওয়া না গেলেও বেশ কিছু এলাকায় প্রার্থী পরিচিতির জন্য গাছে এবং বিদ্যুতের খুটিতে ফেস্টুন দেখা গেছে। নির্বাচনী প্রচারের দু/একটি সভা সমাবেশ ছাড়া নেতা-কর্মীদের অনেকটা নিশ্চুপ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
মুলতঃ এ আসনে জামায়াত এবং বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে চলছে ভোটের জোর প্রচারণা। জামায়াত এবং বিএনরপি প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা বিরাজমান। নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে শীত এবং ঘন কুয়াশা ভেদ করে প্রার্থীরা প্রচারণার অংশ হিসেবে কবর জিয়ারত,ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মরা বাড়ী থেকে শুরু করে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে দোয়া ও আশীর্বাদ কামনা করছেন। এছাড়া উভয় দলের নেতাকর্মীরা ওয়াজ মাহফিল, নামযজ্ঞ,যাত্রাপালাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় এবং সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে উপস্থিত হয়ে স্ব স্ব দলের প্রার্থীদের পক্ষে ভোট ও দোয়া কামনা করছেন। সর্বোপরি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক জিয়ার আগমনে লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতি এবং জনপ্রিয়তার পাশাপাশি বিভিন্ন সমাবেশে উপস্থিতির দিকে নজর রেখে বিএনপির প্রচারণা চলছে অনেকটা ঢিমেতালে। জামায়াত তাদের আসন ভাগাভাগির ব্যাপারে কিছুদিন ঢিমেতালে চললেও বর্তমানে তাদের দলীয় সমাবেশ বাস্তবায়নের পাশাপাশি পাড়ামহল্লায় নিয়মিত রুটিন হিসেবে প্রচারণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। একাধিক ভোটার জানান বিএনপির চেয়ে জামায়াত এ আসনে প্রচার প্রচারণায় এগিয়ে আছে। বিশেষ করে পতিত আওয়ামীলীগ সমর্থিত নেতাকর্মী এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট পেতে জামায়াত এবং বিএনপি ভিন্ন ভিন্ন ভাবে তাদের নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে অনেক ভোটার জানান, ইতিপূর্বে এ আসনে জাতীয় পার্টি, জামায়াত,বিএনপি ও আওয়ামীগের এমপি ছিলেন। কিন্তু এর মধ্যে বিএনপির হাবিবুল ইসলাম হাবিব ২টি কলেজসহ এলাকার রাস্তাঘাট নির্মাণে যে কাজ করেছেন তেমন কাজ অন্য কোন দলের এমপি করতে পারেনি। এমনকি দৃশ্যমান উন্নয়নের কাজ করেনি। যতই দিন যাচ্ছে ততই নির্বাচনী প্রচারণা জমে উঠছে এবং পাড়া মহল্লার অলিতে গলিতে কর্মী সমর্থকদের মধ্যে চলছে নির্বাচনী হিসাব নিকাশ ও চুলচেরা বিশ্লেষণ। নির্বাচন নিয়ে বিএনপি এবং জামায়াতের প্রার্থীর কাছে জানতে চাইলে তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিজয়ী হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সর্বোপরি সাধারণ ভোটারদের প্রত্যাশা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিগত নির্বাচনগুলোর চেয়ে অনেকটা নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে এ আসন থেকে ৫টি দল অংশগ্রহণ করলেও মুলতঃ এ আসনে জামায়াত এবং বিএনপির প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা বিরাজ করছে।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত