
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : আগামী ১২ ফেব্র“য়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতার লক্ষে সাতক্ষীরাা-৪ (কালিগঞ্জ) আসনে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে নির্বাচনী লড়াইয়ে টিকে আছে ৩ প্রার্থী। প্রার্থীরা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় সঙ্গে জমা দিয়েছেন তাদের হলফনামা।
সাতক্ষীরা-৪ আসনের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্ব›িদ্বতায় থাকা দুই প্রার্থীদের হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতিপক্ষ জামায়াত দলীয় প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম এর চেয়ে নগদ অর্থ ও সম্পদে অনেক এগিয়ে বিএনপি প্রার্থী ড. মোঃ মনিরুজ্জমান। তবে জামায়াত দলীয় প্রার্থীও নামে ৪৯টি মামলা ছিল।
বিএনপি প্রার্থী ড. মোঃ মনিরুজ্জামান এর অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদ রয়েছে ১ কোটি ৩১ লাখ ৭৮ হাজার ২৮৩ টাকার। যার মধ্যে নগদ অর্থ ২৯ লাখ ৯০ হাজার ২৮৩ টাকা হলফনামায় উল্লেখ করেছেন তিনি। তার বার্ষিক আয় ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর মধ্যে কৃষিখাত থেকেত ৫ লাখ ৬০ হাজার এবং ব্যবসা থেকে আয় ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এছাড়া ৬১ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের গাড়ি, ২ লাখ টাকার ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও ২ লাখা টাকা মূল্যের আসবাবপত্র রয়েছে। ২.৯৯ একর কৃষি জমি যার অর্জনকালীন মূল্য ধরা হয়েছে ৩৬ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। রয়েছে পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত একটি তিন তলা বাড়ি। সর্বশেষ দাখিল করা আয়কর রিটার্নে তিনি ১কোটি ৩১ লাখ ৭৮ হাজার ২৮৩ টাকা সম্পদের উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম এর স্থাবর ও স্থাবর সম্পদ রয়েছে ৬৮ লাখ ৭৭ হাজার ৩১৬ টাকার। হলফনামায় তিনি বার্ষিক আয় ৫ লাখ ৪ হাজার ৬৫ টাকা বলে উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে কৃষিখাত থেকে ৪ লাখ টাকা, সম্পত্তি ভাড়া থেকে ১ লাখ ও ব্যাংক আমানত থেকে তার আয় ৪ হাজার ৬৫ টাকা। তার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ৪ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ টাকার। এর মধ্যে নগদ অর্থ আছে ৬ হাজার ৫৬৯ টাকা। স্থাবর সম্পদের মধ্যে ০.১০ একর কৃষি জমি ও বিলান ২২.০০ শতক ভিটা এবং ২.২৫ শতক অকৃষি জমির মালিক তিনি। দুইতলা পাকা একটি বসতবাড়ি রয়েছে যার নির্মাণকালীন ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ টাকা। এছাড়া টিন সেডের তিনটি ঘর ও টিন সেডের তিনটি দোকান ঘর রয়েছে তার। সর্বশেষ দাখিল করা আয়কর রিটার্নে তিনি ৬৮ লাখ ৭৭ হাজার ৩১৬ টাকা সম্পদের উল্লেখ করেছেন।
প্রার্থীদের হলফনামা পর্যালোচনা করে আরও দেখা যায়, বিএনপি প্রার্থী ড, মোঃ মনিরুজ্জামান এমবিএ পাস। তার নামে ২টি মামলা ছিল। যার প্রত্যেকটি নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। তার পেশা ব্যবসা।
এদিকে জামায়াতের প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম বিএ পাশ। তিনি একজন অবসরপ্যাপ্ত শিক্ষক। তবে তার বর্তমান পেশা কৃষি। তার বিরুদ্ধে ৪৯টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ৬টি মামলায় চার্জগঠন হয়েছে। একটি মামলা স্থগিদ এবং বাকি সব মামলা প্রত্যাহার ও নিস্পত্তি হয়ে গেছে। তবে তিনি কোন ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হননি।
প্রসঙ্গত, সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনে ৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ৪ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল এবং ৩ জনকে বৈধ্য ঘোষণা করেছেন জেলা রিটানিং কর্মকর্তা। ১% ভোটার তথ্য সঠিক নয়, দলীয় মনোনয়ন সঠিক না থাকা এবং ঋণ খেলাপির কারনে বাকি ৪ জনকে বাতিল করা হয়েছে।
এই আসনে মনোনয়নপত্র দখিল করেছিলেন জিএম নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, মোঃ আব্দুর রশিদ জাতীয় পাটি, মোঃ মনিরুজ্জামান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, হুসেইন মুহাম্মদ মায়াজ জাতীয় পাটি, এইচএম গোলাম রেজা গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি), এসএম মোস্তফা আল মামুন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং মোঃ আব্দুল ওয়াহেদ স্বতন্ত্র।সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরার রাজনৈতিক সমীকরণ এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন। অতীতে জোটবদ্ধ নির্বাচনের সময় এই জেলার চারটি সংসদীয় আসনের তিনটিতেই শরিক দল জামায়াতে ইসলামীকে ছাড় দিয়ে আসছিল বিএনপি। কিন্তু আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই পুরনো মিত্ররাই এখন একে অপরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। জেলার চারটি আসনেই এবার বিএনপি ও জামায়াত আলাদাভাবে প্রার্থী দেওয়ায় ভোটের মাঠে তৈরি হয়েছে নতুন মেরুকরণ। ভোটাররা মনে করছেন, মূল লড়াইটা এবার এই দুই দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চারটি আসনে নির্বাচনের জন্য মোট ২৯ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। যাচাই-বাছাই ও আপিল প্রক্রিয়া শেষে বর্তমানে মাঠে টিকে রয়েছেন ২০ জন বৈধ প্রার্থী। এর মধ্যে সাতক্ষীরা-১ ও ৩ আসনে পাঁচজন করে, সাতক্ষীরা-২ আসনে সাতজন এবং সাতক্ষীরা-৪ আসনে তিনজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু না হলেও প্রার্থীরা বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কৌশলী প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।
সাতক্ষীরায় জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে। দলের অভ্যন্তরীণ কোনো বিরোধ না থাকায় তারা অনেক আগেই চার আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করে মাঠে নেমেছে। জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবদুল আজিজ আত্মবিশ্বাসের সুরে বলেন, ‘কঠিন সময়েও আমরা মানুষের পাশে ছিলাম। এবার চারটি আসনেই আমাদের প্রার্থীরা বিজয়ী হবেন।’
অন্যদিকে, বিএনপি এবার প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে কিছুটা অভ্যন্তরীণ সংকটে পড়েছিল। দলটির মনোযোগ ছিল ইউনিয়ন কমিটি গঠন ও কোন্দল নিরসনে। প্রার্থী ঘোষণার পর একাধিক আসনে বিক্ষোভ হলেও বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক। তবে একটি আসনে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী থাকায় অস্বস্তিতে রয়েছে দলটি। জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবু জাহিদের মতে, দীর্ঘ নির্যাতনের পরও কর্মীরা মাঠ ছাড়েননি এবং স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি এবার বিএনপিকেই বেছে নেবে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ১৯৯১ সালে জেলার পাঁচটি আসনের (তৎকালীন) চারটিতে জামায়াত এবং একটিতে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে জামায়াত একটি আসন ধরে রাখতে পারে। ২০০১ সালের নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে জামায়াত তিনটি এবং বিএনপি একটিতে জয়লাভ করে। তবে ২০০৮ সালে আসন বিন্যাস পরিবর্তনের পর এই জেলায় বিএনপি-জামায়াত জোট কোনো আসনই পায়নি।
এই আসনে বিএনপির হয়ে লড়ছেন দলের কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাবিবুল ইসলাম (হাবিব)। সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতের বাজি দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মো. ইজ্জত উল্লাহ। সাংগঠনিক শক্তির পাশাপাশি তাঁর স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ভোটারদের টানবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই আসনে অন্যান্য প্রার্থীরা হলেন বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. ইয়ারুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির জিয়াউর রহমান এবং ইসলামী আন্দোলনের শেখ মো. রেজাউল করিম।
সদর আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক সহসভাপতি মো. আবদুর রউফ। শুরুতে মনোনয়ন নিয়ে দলের অপর অংশের ক্ষোভ থাকলেও আবদুর রউফ দাবি করেছেন, দলের সবাই এখন ঐক্যবদ্ধ। এই আসনে জামায়াতের শক্তিশালী প্রার্থী দলের খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক। তিনি মনে করেন, বিগত দিনের নিরপেক্ষ নির্বাচনে মানুষ তাঁর দলের ওপর আস্থা রেখেছে। এখানে জাতীয় পার্টি, এবি পার্টি, জাসদ, এলডিপি ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরাও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এই আসনটিতে বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি। বিএনপির দলীয় প্রার্থী সাবেক এমপি কাজী আলাউদ্দীনের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শহিদুল আলম। আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়া শহিদুল আলম জানান, স্থানীয় নেতাকর্মীদের চাপেই তিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। তৃণমূলের কর্মীদের আশঙ্কা, বিএনপির ভোট ভাগ হলে সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যাবে জামায়াত। এখানে জামায়াতের প্রার্থী মুহা. রবিউল বাসার জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।
সুন্দরবন সংলগ্ন এই আসনে মূল লড়াই হবে অভিজ্ঞতার সঙ্গে তারুণ্যের। জামায়াতের প্রার্থী দুবারের সাবেক সংসদ সদস্য জি এম নজরুল ইসলামের রয়েছে নিজস্ব বিশাল ভোটব্যাংক। অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী মো. মনিরুজ্জামান রাজনীতিতে অপেক্ষাকৃত নতুন মুখ। তিনি তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে জোর প্রচার চালাচ্ছেন। মনিরুজ্জামান বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে তিনি এলাকার উন্নয়নে কাজ করছেন। তবে জামায়াত প্রার্থীর দাবি, ১৭ বছরের কঠিন সময়েও তাঁরা জনবিচ্ছিন্ন হননি।
সব মিলিয়ে সাতক্ষীরার ভোটের মাঠে এবার জোটের রাজনীতি নেই। দীর্ঘদিনের মিত্ররা এখন মুখোমুখি অবস্থানে। বিএনপি ও জামায়াতের এই সরাসরি লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসবে, তা দেখার অপেক্ষায় জেলাবাসী।

