
মোঃ সাইফুল ইসলাম : “কি চাই কি নাই” কর্মসূচি নিয়ে আন্দোলন শুরু কওে সাবেক ছাত্রলীগ ফোরাম। খুলনার নাগরিক সুবিধা আদায়ের লক্ষে সভা সেমিনার, মানবন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সংগঠনটি ১২২ দফা দাবি তুলেছেন। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে কিছু প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও অনেক প্রকল্প মনোযোগ লাভ করেনি। বাস্তবায়িত প্রকল্পের সুফল পেতে শুরু করেছে নগরবাসি। কর্মসূচির উদ্যোক্তা ও সাবেক ছাত্রলীগ ফোরামের আহবায়ক কেষ মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমরা জনপ্রতিনিধিদের কাছে খুলনাবাসির দাবিগুলো জানিয়েছিলাম। যার ফলে জনপ্রতিনিধিরাও দাবিগুলো পূরণের চেষ্টা করেছেন। দাবি পূরণও হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে আমরা ফের কথা বলবো জনপ্রতিনিধিদের সাথে।
॥ শেখ হাসিনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ॥
দেশের পঞ্চম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ২০২১ সালে জাতীয় সংসদে শেখ হাসিনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাস হয়। এ কর্মসূচির অন্যতম দাবি ছিল এটি। বিশ্ববিদ্যালয়টি পুরোদমে চালু হলে এখানে চিকিৎসা বিষয়ে স্নাতকোত্ত পর্যায়ের শিক্ষা লাভ ও উচ্চতর গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে খুলনা অঞ্চলের প্রায় দু’কোটি মানুষের জন্যমানসম্মত চিকিৎসা সেবা সহজ হবে। জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলায় ৫০ একর জমির ওপর ৯৬০ শয্যার হাসপাতালসহ বাস্তবায়নাধীন বিশ্ববিদ্যালয়টি চালু হলে এ অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার মানে আমূল পরিবর্তন আসবে।
॥ ত্রুটিমুক্ত রেল স্টেশন ॥
খুলনা রেল স্টেশন ত্রুটিপূর্ণ থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান দুর্ঘটনার শিকার হন। শুরু থেকেই খুলনা রেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ও ট্রেনের সিঁড়ির মধ্যে অস্বাভাবিক উচ্চতার ব্যবধান রয়েছে। প্ল্যাটফর্ম অতিশয় নিচু হওয়ায় এমন পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছিলো। স্টেশনে অপেক্ষমাণ ট্রেন ও প্ল্যাটফর্মের মধ্যে ফাঁকাও বেশি ছিলো। যেটি বয়স্ক, নারী, শিশু যাত্রীদের জন্য ওঠানামায় খুবই ঝুঁকি তৈরি করে। রেল স্টেশন র্নিমােেণর এ ধরনের ত্রুটির ওপর গুরুত্বারোপ করে বিশেষ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খুলনা রেল স্টেশনকে নকশার এ ত্রুটিমুক্ত করার দাবি ওঠে এ কর্মসূচির আওতায়। দাবির প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ত্রুটি দূর করার উদ্যোগ নেয়। যা স্বল্প সময়ে বাস্তবায়নও হয়।
॥ যানজট মুক্ত নগরী ॥
যানবাহন বৃদ্ধিতে বেড়েছে নগরীতে তীব্র যানজট। যানজট নিরসনে এ কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফ্লাইওভার, ফুটওভার ব্রিজ নির্মানের দাবি জানাননো হয়। জাতীয় সংসদ সদস্য সেখ সালাউদ্দিন জুয়েল মহানগরীর যানজট নিরসনে বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কের
গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফ্লাইওভার, ফুটওভার ব্রিজ নির্মানের পদক্ষেপ হাতে নিয়েছেন। যা প্রক্রিয়াধীন। যানজট মুক্ত একটি ক্লিন সিটি নির্মাণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বদ্ধপরিকর। এছাড়া অতিরিক্ত ও কাগজবিহিন ব্যাটারি চালিত যান চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং শহরে বহিরাগত ইজি বাইক নিয়ন্ত্রণেরও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
॥ ময়লাপোতা-জিরো পয়েন্ট ফোর লেন নির্মাণ ॥
নগরীর ব্যস্ততম ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক শের-এ-বাংলা রোড। খুলনা সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, মংলা, কয়রা, পাইকগাছা, চালনা, বটিয়াঘাটা রুটের প্রায় সকল যাত্রী এ সড়ক দিয়ে শহওে প্রবেশ-বাহির হন। যার ফলে এসব যাত্রীদের যাতায়াতে প্রতিদিন অসংখ্য রিকশা, ইজিবাইক ও ভ্যান চলাচলের ভিড়ে বেহাল অবস্থার সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে গল্লামারী ও জিরো পয়েন্ট এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠায় শহর সম্প্রসারিত হচ্ছে। সম্প্রসারিত অঞ্চলে বসবাসকারীদেরও প্রতিনিয়ত এ সড়ক ব্যবহার করতে হয়। ফলে সড়কটির ব্যস্ততা বহুগুণে বেড়ে যাওয়ায় প্রায়শই ঘটছে দুর্ঘটনা। সড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণ খুলনাবাসীর প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়। সাবেক ছাত্রলীগ ফোরাম কর্মসূচিতে দাবিটি উত্থাপন করে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ ময়লাপোতা মোড় থেকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্নিকটে জিরোপয়েন্ট পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের সড়ক নির্মাণ প্রকল্প পাস হয়। খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক ও শেখ সালাউদ্দিন জুয়েল এমপি’র উদ্যোগে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে সড়ক চওড়া করণের কাজ প্রায় সম্পন্ন হতে চলেছে।
॥ ময়ূর নদে গল্লামারি সেতু ॥
ব্রিটিশ আমলে তৈরি করা গল্লামারি সেতুটি চলাচলের অনুপোযোগী হয়ে পড়লে খুলনা সওজ বিভাগ এখানে নতুন সেতু নির্মানের উদ্যোগ নেয়। ২০১৩ সালে ৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে এ সেতু নির্মান কাজ শুরু করে সরকারি এ সংস্থাটি। ২০১৫ সাল থেকে সেতুটি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করেন দেওয়া হয়। তবে সেতু নির্মানে পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ এবং সিটি কর্পোরেশন কোন দপ্তরের সাথেই সমন্বয় করেনি। সংস্থাটি নিজেদের মত করে সেতু নির্মানের ফলে নানা জটিলতা দেখা দেয়। নতুন সেতুর কারলে নদীতে নৌযান চলাচল স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে নদীর পানি থেকে মাত্র ৩ ফুট উচ্চতায় নির্মাণ করা হয়েছে সেতুর গার্ডার। বর্ষাকাল বা অন্যান্য সময়ে পানির উচ্চতা বেড়ে গেলে গার্ডারের অর্থাৎ ব্রীজের নিচের ফাঁকা অংশটুকু সম্পূর্ণ পানিতে ভরাট হয়ে ব্রীজটি একটি বাধে পরিণত হয়। এ পরিস্থিতিতে সংস্কারের দাবি তোলা হয় এ কর্মসূচিতে। ময়ূর নদে সেতু নির্মানে প্রায় সাত কোটি
টাকা লোকসান গুনে বাংলাদেশ অভ্যন্তরিন নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে এটি ভেঙে নতুন সেতু নির্মানের পরামর্শ দিয়েছে। যা হাতিরঝিলের আদলে তৈরি হচ্ছে।
॥ ওয়ার্ড ভিত্তিক খেলার মাঠ ॥
বছরজুড়ে মাঠগুলো বাণিজ্য মেলাসহ রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যাস্ত থাকে। নগরবাসির অভিযোগ, উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েরা খেলাধুলার সুযোগ না পাওয়ায় ধীরে ধীরে আসক্ত হচ্ছে মোবাইল ফোনে। তাই খুলনাবাসির দাবির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে প্রত্যেক ওয়ার্ডে খেলার মাঠের দাবি করেন সাবেক ছাত্রলীগ ফোরাম। পর্যাপ্ত জমি না থাকাসহ একাধিক কারণে এ দাবি শতভাগ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এ নিয়ে কেসিসি’র প্যানেল মেয়র-১ এস এম রফিউদ্দিন রফি বলেন, সব ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত জায়গা নেই। তবে যে সকল ওয়ার্ডে মাঠ করে দেয়া সম্ভব তা অবশ্যই উদ্যোগ নেবো।
॥ বিমানবন্দর স্থাপন ॥
অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একটি বিমানবন্দরে তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল প্রায় তিন দশক আগে। এ জন্য জমিও অধিগ্রহণ করা হয়। এরপরে নানা কারণে বিমানবন্দর স্থাপনের গতি স্থবির হয়ে পড়ে। বিমানবন্দরস্থাপনের গতি ফিরিয়ে আনার দাবি উত্থাপন করেন তারা। সম্প্রতি সম্ভাব্যতা যাচাই করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে বিমানবন্দরটি এই মুহূর্তে লাভজনক হবে না। ফলে বিমানবন্দরটি তৈরি না কওে প্রকল্পটি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তাই চাহিদা থাকার পরও আপাতত বিমানবন্দর পাচ্ছে না খুলনা অঞ্চলের মানুষ।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অল্পপরেই সাবেক ছাত্রলীগ ফোরামের ব্যানারে ১২২ দাবি তুলে ধরে এ কর্মসূচির উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রধান প্রধান দাবি পূরণ হয়। তবে অপূরণীয় রয়েছে কিছু দাবি।