সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সুন্দরবনের বুকে বয়ে চলা নদী, খাল ও খাঁড়িতে মাছের খরা। জাল ফেলেও কাঙ্ক্ষিত মাছ পাচ্ছেন না মৎস্যজীবীরা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলেরা মাত্র চার হাজার ৭৪৪ কুইন্টাল সাদা মাছ পেয়েছেন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এটি ছিল ছয় হাজার ৪০৫ কুইন্টাল। এক বছরে সাদা মাছ কমেছে প্রায় এক হাজার ৬৬১ কুইন্টাল। সরকারও রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
রুই, কাতলা, ভেটকি, পারশে, টেংরা ইত্যাদি সাদা মাছ হিসেবে পরিচিত। মৎস্যজীবীদের দাবি, প্রতিবছর জেলে ও নৌকা বাড়লেও অভয়ারণ্য ঘোষণার কারণে কর্মক্ষেত্রের পরিধি কমে গেছে। কতিপয় অসাধু জেলে অবাধে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করছে। এক দিন কোনো খাল বা খাঁড়িতে বিষ দিলে টানা কয়েক দিন সেখানে মাছ ও কাঁকড়ার অস্তিত্ব মেলে না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সুন্দরবনের প্রায় ৩১ শতাংশ জলাভূমি। বনের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের বৃহৎ অংশ মৎস্য সম্পদ। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদী ও খালে ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৬ প্রজাতির চিংড়ি, ১৩ প্রজাতির কাঁকড়াসহ অসংখ্য জলজ প্রাণী রয়েছে।
বন বিভাগের তথ্যে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে চার হাজার ৭৪৪ কুইন্টাল সাদা মাছ আহরণ করা হয়। এ থেকে রাজস্ব আসে প্রায় ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। একই সময়ে এক হাজার ১৭২ কুইন্টাল চিংড়ি ধরা পড়েছে, যা থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। কাঁকড়া আহরণ করা হয় সাত হাজার ৮৩০ কুইন্টাল, যা থেকে রাজস্ব মেলে প্রায় ৫৮ লাখ ৭২ হাজার টাকা।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে সাদা মাছ ছয় হাজার ৪০৫ ও ৭৪৭ কুইন্টাল চিংড়ি পাওয়া যায়। রাজস্ব ছিল যথাক্রমে প্রায় ৪০ লাখ ৯৯ হাজার ৩৯৩ ও তিন লাখ ৭৩ হাজার টাকা। এ সময় ছয় হাজার ৮৫৬ কুইন্টাল কাঁকড়া শিকার থেকে রাজস্ব মেলে ৫১ লাখ ৪২ হাজার টাকার বেশি।
এ ছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরে সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে পাঁচ হাজার ৮৯১ কুইন্টাল সাদা মাছ আহরণ করা হয়, যা থেকে রাজস্ব আসে ৪৫ লাখ ৭৮ হাজার টাকার বেশি। এ সময়ে চিংড়ি ৮৮২ ও কাঁকড়া সংগ্রহ করা হয় সাত হাজার ১১ কুইন্টাল। রাজস্ব আদায় হয় যথাক্রমে প্রায় চার লাখ ৪১ হাজার ও ৫২ লাখ ৫৮ হাজার টাকা।
দুই দশক ধরে মাছ ও কাঁকড়া শিকার করছেন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জ জেলেপাড়ার ৩৫ বছর বয়সী স্বপন বাড়ই। মাছ কমে যাওয়া প্রসঙ্গে বলছিলেন, ‘পানি থেকে শুরু করে সবকিছু আমাগো কিনে খাতি হয়। এক ছটাক জায়গা-জমি নি; ডানে-বাঁয়ে কোনো আয়ের উৎস নি। আমাগো যা করতি হয় সব বনের ওপর। মেয়েডা ফাইভে পড়ে, বাচ্চাডা ক্লাস ওয়ানে। অথচ বনে নামলি চালান উঠতেছে না। দিন দিন ঋণের বোঝা বড় হচ্চে।’
আঁটিরউপর গ্রামের আরেক মৎস্যজীবী মহব্বত হোসেন বলেন, ‘আমাগো দিন কাটতেছে খুব কষ্টে। গত গোণে চালান গায়ে (লোকসান) গেছে। সর্বশেষ গোণের সাত দিন বনে থেকে কোনো রকমে দিনে মাথাপিছু ৩০০ টাকা উঠেছে। এভাবে ছেলেপিলে মানুষ করতি খুব কষ্ট হচ্ছে। তাগো লেখাপড়া শিখাতি পারতিছি নে; নিজেরা খাতি-পরতি পারতিছি নে। বনে এখন মাছ-কাঁকড়া কম। তারপরও পেটের জ্বালায় আমাগো নদীতে যাতি হচ্চে।’
শ্যামনগরের হরিনগর, মরাগাং, চুনকুড়ি, মথুরাপুর, কালিঞ্চি, টেংরাখালী, দাতিনাখালী, বুড়িগোয়ালিনীসহ বিভিন্ন গ্রামের অসংখ্য মৎস্যজীবী বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে নানা কারণে সুন্দরবনের নদী-খালে মাছ ও কাঁকড়ার আকাল চলছে। অথচ দু-তিন বছর আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না। তাদের দাবি, বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার, অভয়ারণ্যের আয়তন বৃদ্ধিসহ নানা কারণে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তারপরও বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় বাধ্য হয়ে অনেকে বনে যাচ্ছেন।
স্থানীয়রা জানান, সুন্দরবনে যাতায়াতকারী অসাধু কিছু জেলে অবাধে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করছে। নদীতে ভাটা শুরু হলে খালের এক প্রান্তে পাঁচ-ছয় বোতল বিষ ঢেলে অপর প্রান্তে জাল পাতেন তারা। বিষের প্রভাবে মাছ মরে ভেসে ওঠে। সেই সঙ্গে মারা যায় কাঁকড়াসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী। দেখা গেছে, এক দিন যদি কোনো খাল বা খাঁড়িতে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করা হয়, টানা কয়েক দিন সেখানে মাছ, কাঁকড়ার অস্তিত্ব থাকে না। মূলত চিংড়ি শিকারে জড়িত জেলেরা এমন অপকর্ম করছে।
বন বিভাগের তথ্য, গত এক বছরে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে বিষসহ ১৭ জেলেকে আটক করা হয়েছে। তারপরও কিছু জেলে প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।
৪২ বছর ধরে মাছ ও কাঁকড়া শিকারে জড়িত মুন্সীগঞ্জের হরিনগর গ্রামের পরিমল মণ্ডল বলেন, আগে গোটা সুন্দরবন জেলেদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু দিন দিন বনের বিভিন্ন এলাকা সরকার অভয়ারণ্য ঘোষণা করায় তাদের কর্মক্ষেত্রের পরিধি কমেছে। বিপরীতে প্রতিবছর সুন্দরবনে যাওয়া জেলে ও নৌকার সংখ্যা বাড়ছে। অল্প জায়গায় বেশি নৌকা অবস্থানের কারণে জেলেদের চালানের টাকা পর্যন্ত উঠছে না।
বন বিভাগের তথ্য, এখন সুন্দরবনের ৫২ শতাংশ জায়গা অভয়ারণ্য। বনের জীব ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় বিশেষজ্ঞ এবং সরকারের পরামর্শে ২০১০ সাল থেকে অভয়ারণ্যের আয়তন বৃদ্ধির কাজ শুরু হয়। ভবিষ্যতে এ আয়তন আরও বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
মৎস্যজীবীরা জানান, তারা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সুন্দরবনে গিয়ে পছন্দমতো জায়গায় জাল ফেলতে পারেন না। কারণ বন বিভাগের সঙ্গে যোগসাজশ করে কিছু বড় ব্যবসায়ীর নৌকা তুলনামূলক ভালো জায়গা বেছে নিয়ে মাছ শিকার করে। এসব ব্যবসায়ী স্থানীয়ভাবে ‘কোম্পানি’ নামে পরিচিত। সাতক্ষীরা রেঞ্জে তৎপর অয়ন কোম্পানি, বিপুল কোম্পানি, শরীফ কোম্পানি, কামরুল কোম্পানি ও হোসেন কোম্পানি।
এ ছাড়া বনের নদী-খাল-খাঁড়িতে মাছ ও কাঁকড়া কমে যাওয়ার জন্য মৎস্যজীবীরা নিষিদ্ধ জালের যথেচ্ছ ব্যবহার, দূষণ ও প্রশাসনের নজরদারির অভাবকে দায়ী করেন।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী রেঞ্জ কর্মকর্তা হাবিবুল ইসলাম বলেন, বড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বন বিভাগের যোগসাজশ– জেলেদের এ দাবি সঠিক না। তবে মাছ-কাঁকড়া পর্যাপ্ত থাকলেও বিষ প্রয়োগসহ অভয়ারণ্যের আয়তন বৃদ্ধি জেলেদের জন্য পরিস্থিতি কিছুটা কঠিন করে তুলেছে। স্বল্প জায়গায় অনেক জেলের উপস্থিতির কারণে অনেকে খরচ ওঠাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। বিষ প্রয়োগসহ নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে বন বিভাগের টহল দলসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা করছে।
এ ব্যাপারে কথা হয় পশ্চিম সুন্দরবনের বিভাগীয় বনকর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর রহমানের সাথে তিনি এই প্রতিবাদেরকে বলেন সুন্দরবনে মাছ কাঁকড়া জীববৈচিত্র গাছ গাছালি রক্ষার জন্য নতুন বনয় আইন জারি হবার পথে এই নতুন কোন আইন জারি হলে অপরাধ কমিয়ে আসবে কারণ এই নতুন আইনে জামিনের কোন বিধান থাকছে না কোন অপরাধী সুন্দরবনে অপরাধ করে ধরা পড়লে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত জেলা যত থাকতে হবে তারপরে অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি ভোগ করতে হবে নিরপরাধ হলে বেকা সুর খালাস পাবে এমনভাবে আইন তৈরি করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন এর পরেও বন বিভাগ জনবল বাড়ানোর জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে সরকার এই প্রস্তাবে একমত হয়েছেন এর পরেও বনবিভাগের টহল জোরদার করা হয়েছে এর সাথে সহযোগিতা করছেন কোস্টগার্ড ,নৌবাহিনী , নৌপুলিশ সহ আরো আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত