
সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর : পহেলা এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে সুন্দরবনে সরকারিভাবে মধু আহরণ সাতক্ষীরা রেঞ্জে এই মধু আহরণের উদ্বোধন করেন জলবায়ু ,পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মাননীয় প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম,।
উদ্বোধনের পরপরই মৌয়ালিরা,ঢুকে যান সুন্দরবনে মধুয়া আহরণের জন্য কিন্তু প্রতিদিন যারা সুন্দরবনে মধু কাটতে যায় আর আসে তাদের মুখে শোনা যাচ্ছে সুন্দরবনে মধুর চাকে কোন মধু নেই ।এক শ্রেণীর অসাধু চক্কররা বন বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে আগে থেকেই সুন্দরবনের মধু সব আহরণ করে ফেলেছে ।সে কারণে প্রকৃত মৌয়ালিরা পাস নিয়ে সুন্দরবনে মধু কাটতে প্রবেশ করে মধু না পাওয়ায় দিক-বেদিক হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত পর্যন্ত ।শ্যামনগর উপজেলা রমজাননগর ইউনিয়নের মৌয়ায়ালী আনসার আলী, শওকত হোসেন ,রজব আলী, মমতাজ মোল্লা ,শামসুর রহমান ,আনোয়ার হোসেন, বাবলুর রহমান ,রেজাউল হোসেন ও হরিনগর গ্রামের আদম আলী সহ অনেকেই পেশাদার মৌয়ালি এই প্রতিবেদককে জানান আমরা প্রতিদিন প্রতিটা নৌকায় আটজন করে সুন্দরবনে মধু আহারণ করতে যাই আবার প্রতিদিন ফিরে আসি কিন্তু দুঃখের বিষয় কোন চাকে মধু পাওয়া যাচ্ছে না।যেখানে যাচ্ছি সেখানে চাকে মধু আগেভাগে কেটে নিয়ে গেছে তারা জানান এর জন্য দায়ী এক শ্রেণীর অসাধু ব্যক্তিরা ও বনবিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা । বন বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীদের সাথে যোগাযোগ করে আগেভাগেই সুন্দরবনের প্রায় সকল স্থানের মধু আহরণ করা হয়ে গেছে এখন শুধু পড়ে আছে খালি মৌচাক। এর জন্য বেশি দায়ী কৈখালী স্টেশন কর্মকর্তা শ্যামাপ্রসাদ বলে দাবি করেন প্রকৃত মৌয়ালীরা। কারণ কৈখালী,স্টেশন কর্মকর্তা শ্যামাপ্রসাদ গত ৮ মার্চ থেকে সুন্দরবনে লোক ঢুকে মধু আহরণ করা শুরু করেছে ।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শুষ্ক মৌসুমের শুরুতে সুন্দরবনে খলিসা ও গরান ফুলের মধু সংগ্রহ করা হয়। এরপর আসে কেওড়া ফুলের মধু। এর মধ্যে সবচেয়ে দামি খলিসা ফুলের মধু। চলতি বছর সুন্দরবনের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় ১ হাজার ৮০০ কুইন্টাল (প্রতি কুইন্টালে ১০০ কেজি) মধু এবং ৯০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় বেশ কিছুটা বেশি। গত বছর বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে মৌয়ালেরা ১ হাজার ৪২৯ কুইন্টাল মধু ও ৪২৯ কুইন্টাল মোম সংগ্রহ করেছিলেন।
সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জের মধ্যে সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকেই সবচেয়ে বেশি মধু সংগ্রহ করা হয়। আবহাওয়া ও বনের পরিবেশ অনুকূলে থাকলে চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে এই রেঞ্জ থেকে ১ হাজার ১০০ কুইন্টাল মধু ও ৬০০ কুইন্টাল মোম সংগ্রহের আশা করছে বন বিভাগ। গত ২০২৪-২৫ মৌসুমে এই রেঞ্জ এলাকা থেকে বৈধ পাস নেওয়া ১ হাজার ৭০৯ জন মৌয়াল ৮৫৪ দশমিক ৫ কুইন্টাল মধু ও ২৭৫ দশমিক ৫ কুইন্টাল মোম আহরণ করেছিলেন।
তবে সুন্দরবন থেকে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মধু পাওয়া নিয়ে শঙ্কাও রয়েছে বিস্তর। কারণ, বৈধ পাসের আগেই চোরাকারবারিরা বনে ঢুকে অপরিণত চাক কেটে মধু নিয়ে যায়। এতে ক্ষতির মুখে পড়েন বৈধ পাস নিয়ে বনে যাওয়া মৌয়ালেরা। খুলনার কয়রা উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের মৌয়াল খোকন মণ্ডল বলেন, ‘একটি পরিপূর্ণ মধুর চাক থেকে কমপক্ষে পাঁচ থেকে সাত কেজি মধু পাওয়া যায়। কিন্তু চোরা মধু আহরণকারীরা আগেভাগেই চাক কেটে নেওয়ায় অনেক সময় চাক থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ গ্রাম মধু মিলছে না।’
প্রতিবছরই বিপুলসংখ্যক মৌয়াল প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে মধু আহরণ করতে বনে ঢোকেন। সুন্দরবন থেকে সংগৃহীত মধু প্রাকৃতিক ও ভেজালমুক্ত হওয়ায় সারা দেশেই এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে এই মধু সংগ্রহের পেছনে পদে পদে রয়েছে জীবনের ঝুঁকি। বাঘ, বিষধর সাপসহ নানা বন্য প্রাণীর আক্রমণের ভয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বনদস্যুদের আতঙ্ক।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের ডুমুরিয়া গ্রামের মৌয়াল দলনেতা আবদুর রাজ্জাক এবারও ১২ জনের একটি দল নিয়ে বনে গিয়েছেন মধু আহরণ করতে। সাম্প্রতিক সময়ে দস্যুদের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় তিনি যাওয়ার সময় খুবই শঙ্কিত ছিল। মৌয়ালি আমজাদ হোসেন তিনি বলেন, ‘মুক্তিপণের দাবিতে কয়েক দিন আগেও আমাদের এলাকার এক জেলেকে বনদস্যুরা অপহরণ করেছে। সুন্দরবনে প্রবেশের আগেই বনদস্যুদের চাহিদামতো টাকা দিয়ে অনেক মৌয়ালকে বনে ঢুকতে হচ্ছে। আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক মৌয়াল জানান, ডাকাত দলের অত্যাচার বেড়ে যাওয়ায় অনেক মৌয়াল এবার মধু আনতে যাবেন না তারপরেও এক শ্রেণীর অসাধু চক্করেরা সুন্দরবনের মধু সব আহরণ করে ফেলেছে বন বিভাগের সাথে যোগাযোগ করে। তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে একটি ডাকাত দল আমাদের কাছে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেছে। এভাবে তিনবার ডাকাতদের টাকা দিতে হবে। এ কারণে এবার অনেকেই সুন্দরবনে যাবেন না।’
‘মধু খোঁজা তো বাঘ খোঁজা’—কথাটি বলছিলেন ‘টারজান’ নামের এক মৌয়াল। টারজান মূলত তার ছদ্মনাম। ক্ষিপ্রগতিতে বনের মধ্যে হাঁটা এবং কুমিরের ভয় উপেক্ষা করে অনায়াসে বড় নদী-খাল সাঁতরে পার হওয়ার কারণে দলের সঙ্গীরা তাকে এই নাম দিয়েছেন।
অভিজ্ঞ এই মৌয়াল বলেন, ‘ঘন জঙ্গলে মৌচাক খুঁজে পাওয়ার জন্য অভিজ্ঞ চোখ ও কান দরকার। মৌয়ালেরা মৌমাছির শব্দ শুনেও চাক খুঁজে বের করতে পারেন। সুন্দরবনের তিন ধরনের মৌচাকের মধ্যে “শিলা মৌমাছি”র চাক থেকে সবচেয়ে বেশি মধু পাওয়া যায়।’ এই জাতের মৌমাছি গভীর বনের ভেতরে মাটির সমান্তরাল গাছে চাক তৈরি করে। ভরা জোয়ারের সময় এসব চাক পানি থেকে মাত্র কয়েক ফুট ওপরে থাকে।
একাধিক মৌয়ালের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চাক খুঁজে পাওয়ার পর মৌয়ালেরা গামছা দিয়ে মুখ পেঁচিয়ে নেন। এরপর হেঁতালের পাতা কেটে আঁটি বেঁধে তাতে আগুন দিয়ে ধোঁয়া তৈরি করা হয়। ধোঁয়ার কারণে মৌমাছি চাক ছেড়ে বেরিয়ে গেলে মধু সংগ্রহ শুরু হয়।
মৌয়ালেরা জানান, এই কাজের জন্য বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন। রানি মৌমাছি ও লার্ভার কোনো ক্ষতি না করে চাক কেটে চিপে মধু বের করা হয়। সঠিক পদ্ধতিতে সংগ্রহ করলে একটি চাক থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত মধু পাওয়া যায়। মধুর পাশাপাশি কাটা চাক থেকে মোম তৈরি হয়। এত ঝুঁকি নিয়ে মধু সংগ্রহ করলেও তা বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন মৌয়ালেরা।
বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছরে খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে ৪৩৭টি পাসের বিপরীতে মোট ২ হাজার ৮৫৮ জন মৌয়াল বৈধভাবে সুন্দরবনে গিয়েছিলেন। বিগত দশ বছরের মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে সুন্দরবন থেকে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৩১৫ কেজি মধু সংগ্রহ করা হয়।
বন বিভাগ জানিয়েছে, ১৪ দিনে একজন মৌয়াল সর্বোচ্চ ৫০ কেজি মধু ও ১৫ কেজি মোম সংগ্রহ করতে পারবেন। নির্ধারিত সময়ের বেশি বনে অবস্থান করা যাবে না।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বনজ সম্পদ রক্ষায় নির্ধারিত নিয়ম মেনেই মধু সংগ্রহ করতে হবে। এ বছর উদ্বোধনী আয়োজনকে আরও বড় পরিসরে করার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে চাক ধ্বংস বা অতিরিক্ত আহরণ করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি। সুন্দরবনে চাকে মধু নেই সব আগেভাগেই আহরণ করে নিয়েছে একশ্রেণীর অসাধু ব্যক্তিরা বন বিভাগের সহতায় এমন প্রশ্নের জবাবে মিস্টার হাসানুর রহমান বলেন বিষয়টি আমার কানেএসেছে খতিয়ে দেখছি প্রমাণ পেলে সেই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত