
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : ধাক্কাগুলো ক্রমশ বড় হচ্ছে। ক্ষয়ে যাচ্ছে তীরের মাটি, ডুবছে বাড়িঘর, মানুষ ছুটছে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। সদ্য ফেলে আসা বছরে ঘূর্ণিঝড় আঘাত না হানলেও বেশ কয়েকটি নিম্নচাপ এবং গভীর নিম্নচাপের প্রভাব উপকূলে ঘূর্ণিঝড়ের চেয়েও বড় ধাক্কা দিয়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক। ২০২৪ সালের মতো, উপকূলে বন্যার প্রভাব এই বছরেও অব্যাহত ছিল। উপকূলের জন্য চিরচেনা বিপদ জলোচ্ছ্বাস, নদী ভাঙন, লবণাক্ততা কিংবা উচ্চ জোয়ারের প্রভাব সদ্য বিদায়ী বছরেও অব্যাহত ছিল। এই বিপদগুলো ক্রমশ সহনশীল মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মানুষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। সদ্য ফেলে আসা বছরে যোগ হয়েছে বিপদের নতুন কিছু প্রবণতা, যেমন ডেঙ্গু। তীব্র তাপপ্রবাহ এবং শীতের প্রকোপ উপকূলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে কাবু করেছিল এ বছর।
বছরজুড়ে চরম সংকটের মুখোমুখি থাকা এক জনপদের নাম উপকূল। ৭১০ কিলোমিটার তটরেখার এ জনপদে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর বিপদের শেষ নেই। তারা নানামুখি প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তাদের জীবন জীবিকার লড়াই আরো কঠিন করে তোলে। তাদের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ে, বাড়ে সংকটাপন্ন মানুষেরা সংখ্যা। বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। প্রতিবছর বাস্তুচ্যুত মানুষদের একটি বড় অংশ রাজধানী ঢাকা কিংবা দেশের অন্য বড় শহরে যেতে বাধ্য হয়। জার্মানওয়াচ প্রকাশিত 'গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২৫'-এ বাংলাদেশের সামগ্রিক জলবায়ু ঝুঁকি এবং বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। উপকূল থেকে পাওয়া থেকে প্রতিবছরই ঝুঁকির তথ্য পাওয়া যায়। যেমনটা অন্যান্য বছরের মত ২০২৫ সালেও তা পাওয়া গেছে।
সদ্য ফেলে আসা বছরে উপকূলে ঘূর্ণিঝড় আঘাত না হানলেও বেশ কয়েকটি নিম্নচাপ এবং গভীর নিম্নচাপ আঘাত করেছে। এর প্রভাব উপকূলে ঘূর্ণিঝড়ের চেয়েও বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষয়ক্ষতি হলে ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় আঘাত না করলে সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। এ বছর একাধিক ঘূর্ণিঝড়ের ঝাপটা বাংলাদেশের উপকূল তছনছ করেছে। আঘাত করেছে পার্শ্ববর্তী দেশের উপকূলে। মে মাসের শেষের দিকে গভীর নিম্নচাপ বাংলাদেশের উপকূলের মানুষদের ব্যাপক ক্ষতি করে। এটি পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করেছিল। এর প্রভাবে উপকূলীয় জেলাগুলোতে জলোচ্ছ্বাস এবং সারাদেশে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছিল। উপকূলের অনেক স্থাপনার ক্ষতি হয়েছিল এই নিম্নচাপের প্রভাবে।
মে মাসের গভীর নিম্নচাপের কারণে উপকূলের বহু জনপদ পানিতে ডুবে গিয়েছিল, অনেক স্থানে নদী ভাঙন বেড়ে গিয়েছিল। অনেকে বাড়িঘর স্থানান্তর করতে বাধ্য হয়েছেন। ভোলার দ্বীপ ঢালচরের বাসিন্দা শরীফ সওদাগর বলেন, ‘‘গত বছরের জলোচ্ছ্বাস ও ভাঙনে ঢালচর থেকে শতাধিক বাড়ি স্থানান্তর করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে মানুষের জীবন-জীবিকায় নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। ক্রমাগত জলোচ্ছ্বাস, ভাঙন, ঘূর্ণিঝড়ে ঢালচরের মানুষ জীবিকা হারাচ্ছে।’
গত বছর ঢালচর থেকে বাড়ি স্থানান্তর করেছেন নুরুদ্দিন মাঝি। তিনি বলেন, ‘‘মাত্র ৭ দিন বয়সে নদী ভাঙনের কারণে ভোলার লালমোহনের হাকিমুদ্দিন থেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে ঢালচরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। বড় হয়ে জীবিকার অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায় নদী ও সমুদ্রে মাছ ধরা। ৪৮ বছর বয়স অবধি এই পেশায় ঢালচরে জীবিকা নির্বাহের পর আমি গত বছর ভাঙনের কারণে বাড়ি স্থানান্তর করতে বাধ্য হয়েছি।’’
ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কা না এলেও উপকূলজুড়ে এখন ঘন ঘন নিম্নচাপ হচ্ছে, কোন কোন নিম্নচাপ গভীর নিম্নচাপে পরিণত হচ্ছে। গত বছর জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে উত্তর বঙ্গোপসাগরে আরেকটি গভীর নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছিল। এর প্রভাবে ভোলা, পটুয়াখালী, সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় ১৪টি জেলায় স্বাভাবিকের চেয়ে ৩-৪ ফুট বেশি উচ্চতার জোয়ার বা জলোচ্ছ্বাস দেখা দেয়।
অক্টোবর মাসের শুরুতে একটি নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে এটি গভীর নিম্নচাপ আকারে ওড়িশা উপকূলের দিকে অগ্রসর হয়। বাংলাদেশের উপকূলেও এর ঝাপটা লেগেছিল। অক্টোবরের শেষে বঙ্গোপসাগরে তৈরি হয়েছিল ’মনথা’ নামের শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। এটি উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বসতঘর, কৃষি জমি, মাছের ঘের, গাছপালার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। নভেম্বরের শেষ দিকে বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ ও নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছিল। এ সময়ে ঘূর্ণিঝড় 'সেনিয়ার' ও 'দিতওয়াহ' ভারত মহাসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সক্রিয় ছিল। এর প্রভাব পড়েছিল বাংলাদেশের উপকূলে। তবে তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালের মতো ২০২৫ সালেও উপকূলের দিকে ধাবিত হয়েছিল বন্যা। নোয়াখালী, ফেনি, লক্ষ্মীপুর এবং চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি অঞ্চল অবধি আকস্মিক বন্যা আঘাত করেছিল। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ছোটবড় অনেকগুলো ভূমিধসের ঘটনা ঘটে গতবছর। এসব ভূমিধ্বসে প্রায় ১৪শ’ ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার মানুষ। আগের বছর যখন ফেনী-নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুরে বন্যা হয়েছিল, তার অনেক আগে ২০২৫-এ জুলাইয়ের প্রথম দিকে বন্যা আঘাত করেছিল। বন্যায় ফেনীর পাঁচটি উপজেলা ও দুটি পৌরসভার বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হয়ে পড়েছিল। দুর্যোগ-পরবর্তী সরকারি তথ্যমতে, এ বছর জেলায় ১০৬ দশমিক ১৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৮,১৪৩টি পরিবার এবং দুর্যোগে আক্রান্ত হন ৭৭,৭০২ জন মানুষ।
বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছিল নোয়াখালী এবং লক্ষ্মীপুর জেলাও। মানুষের দুর্ভোগ ছিল চরমে। আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়া নারী ও শিশুরা সীমাহীন কষ্ট ভোগ করেছেন। এই ধরনের সংকটে সাধারণত নারী ও শিশুরাই বেশি সংকটের মুখোমুখি হন। স্যানিটেশন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতির কারণে নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। বন্যার ফলে পানিবাহিত রোগ যেমন ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও চর্মরোগ বেড়ে গিয়েছিল। বাড়ি হারানোর কষ্ট, পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং আশ্রয়কেন্দ্রে অনিরাপত্তা নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। বন্যাকালীন আশ্রয়কেন্দ্রে নারীরা যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের ঝুঁকিতেও থাকেন। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর নতুন করে বসবাস শুরু করতে বহুমূখী সংকটে পড়তে হয়েছিল ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের।
সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার আনুলিয়া ইউনিয়নের খোলপেটুয়া নদীর তীরে গত বছরের ঈদের দিনের সেই গল্পটা এই মানুষদের কাছে এখনো তাজা। একমাস পবিত্র মাহে রমজানের সিয়াম সাধনার পর এসেছিল ঈদুল ফিতর। গতবছর রমজান শেষে রাত পোহানোর আগেই সব বাড়িতে ছিল ঈদের প্রস্তুতি। সেই প্রস্তুতির ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল সকালেও। আনুলিয়া ইউনিয়নের নয়াখালী গ্রামের রমেছা বেগমের মতো কেউ পায়েস রান্না করছিলেন, আনুলিয়া গ্রামের আসাদুজ্জামান, আবদুস সাত্তার গাজী, সফিকুল ইসলামের মতো আরো অনেক মানুষ নতুন জামা পরে গিয়েছিলেন ঈদের জামাতে। কিন্তু এরই মধ্যে হঠাৎ পানির স্রোত সর্বনাশ ডেকে আনলো। গোটা এলাকায় ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে গেলো। শুধু ঈদের আনন্দ নয়, এই বিপর্যয় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জীবনে নতুন সংকট নিয়ে এলো। আকস্মিক বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় আনুলিয়া ইউনিয়নের দশটি গ্রামের অন্তত দশ হাজার মানুষ চরম সংকটের মুখে পড়েছে।
অতি কষ্টে চলা রমেছা বেগমের সব কিছু এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। খোলপেটুয়া নদীর পাড়ে নয়াখালী গ্রামে কঠোর পরিশ্রমে দিনমজুরি করে জীবন কাটাচ্ছিলেন রমেছা। দুই সন্তান ফেলে স্বামী চলে যাওয়ায় রমেছার ঠাঁই হয় নয়াখালী বাবার ভিটেয়। পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন রমেছা নিজেই নিজের রোজগারের পথ বের করেছিলেন। রাস্তার কাজ, মাটির কাজ, চিংড়ি ঘেরের কাজে দিনমজুরি করছিলেন তিনি। কাজ না থাকলে নদীতে চিংড়ির পোনা ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। দরিদ্র বাবার ভিটেয় বসবাসের জন্য করেছিলেন মাটির দেওয়ালে তৈরি একটি ঘর। রমেছা বলেন, ‘‘নানান সংকটের মধ্য দিয়ে জীবন এগিয়ে নিচ্ছিলাম। জোয়ারের পানির তোড়ে বসবাসের ঘর হারিয়ে এখন নতুন সংকটে পড়লাম। এখন মাথাগোঁজার ঠাঁইও নাই। বেড়িবাঁধের উপরে বসবাস করছি। কবে ঘরে ফিরতে পারবো জানি না। ঘরে ফিরতে হলে ঘর তৈরি করতে হবে। ঘর তৈরি করতে লাগবে অনেক টাকা। কোথায় পাবো সে টাকা!’’
আনুলিয়া গ্রামের আসাদুজ্জামানসহ আরো অনেকের চিংড়ির খামার লবণ পানির নিচে ডুবে গিয়েছিল। আসাদুজ্জামানের চারটি চিংড়ির খামার লবণ পানির তলায় চলে যায়। বাড়িতে তার তিনটি ঘর ধ্বসে গিয়েছিল। সব নিয়ে তার ক্ষতির পরিমাণ ৫ লক্ষাধিক টাকা। সফিকুল ইসলামের ১১ বিঘা জমিতে চিংড়ির ঘের ছিল। সব মাছ ভেসে যায়। ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ছয় লাখ টাকা। এভাবে আরো অনেক চিংড়ি চাষি তাদের সর্বস্ব হারিয়েছিলেন। এ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ চিংড়ি চাষের উপর নির্ভরশীল। গত বছর চিংড়ি চাষের মৌসুম কেবল শুরু হয়েছিল।
আসাদুজ্জামান বলেন, ‘‘ধারদেনা করে কিংবা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে চিংড়ি চাষ করেছিলাম। ব্যাংক এবং সমিতিতে ঋণ রয়েছে। চিংড়ি চাষে বিপর্যয় হলেও ঋণ আমাদের শোধ করতেই হবে। মৌসুমের শুরুতে ঘের থেকে কেবল চিংড়ি আহরণ শুরু হয়েছিল। পুরো মৌসুম পেলে দেনা শোধ করে লাভবান হতে পারতাম। কিন্তু এখন আমরা ব্যাপক লোকসানে আছি। চিংড়ি আমাদের উপার্জনের প্রধান অবলম্বন। চিংড়িতে ধ্বস নামলে আমাদের বিকল্প কিছু নাই।’’
এটা প্রতি বছরের ঘটনা। বিপদের মুখে পড়ে উপকূলের মৎস্যজীবীরা নিখোঁজ হয়। কেউ ফিরে আসে, কেউ ফিরে আসতে পারে না। জীবিকার প্রয়োজনে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও মৎস্যজীবীরা সমুদ্রে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যজীবী বা তাদের পরিবারের লোকজনের সহায়তা পাওয়ার খবর পাওয়া যায় খুব কম। ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর ভোলা জেলার লালমোহন উপজেলা থেকে 'মা বাবার দোয়া' নামে একটি মাছধরার ট্রলার সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হয়। ওই ট্রলারে ১৩জন মৎস্যজীবী ছিলেন। ১৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের ফিশারি ঘাট থেকে 'এফভি খাজা আজমির' নামক ট্রলারে আরো ১৮ জন মৎস্যজীবী সমুদ্রে গিয়েছিলেন। এরপর থেকে তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
৭ আগস্ট চট্টগ্রাম উপকূলে মাছ ধরার ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটে। ওই ট্রলারে থাকা ১৯ জনের মধ্যে ১১ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বাকিদের সন্ধান মেলেনি। জুলাই মাসের শুরুতে ভোলার চরফ্যাশন এলাকা থেকে মাছ ধরতে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে ৩টি ট্রলার ডুবির ঘটনায় প্রায় ৩০ জন মৎস্যজীবী নিখোঁজ হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
সদ্য বিদায়ী বছরে উপকূলীয় জেলাগুলোতে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর বিস্তার ছিল ব্যাপক। উপকূলীয় জেলা বরগুনা জেলা সারাদেশে পরিচিত হয়ে উঠেছিল ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে। গত বছর অক্টোবর অবধি ওই জেলায় ডেঙ্গুতে অন্তত ৫৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে বেসরকারি হিসাবে। উপকূলীয় অঞ্চলের নোনা পানিতে আয়রন বেশি। এ জন্য স্থানীয় মানুষ বৃষ্টির পানিসহ অন্যান্য পানি দীর্ঘদিন ধরে জমিয়ে রাখে। যে কারণে সহজেই এডিস মশা বংশবিস্তার করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলের অন্যান্য এলাকায়ও ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছে বলে অনেকের ধারণা।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের গবেষণাতেও। ‘রিভার স্যালাইনিটি অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ : এভিডেন্স ফ্রম কোস্টাল বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই গবেষণা বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে উপকূলীয় ১৯ জেলার ১৪৮টি উপজেলায় মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততায় আক্রান্ত হবে ১০টি নতুন এলাকা। উপজেলাগুলো হলো সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালীগঞ্জ; খুলনার বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ডুমুরিয়া, কয়রা, পাইকগাছা; বাগেরহাটের মোংলা এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা। লবণাক্ততার কারণে সুপেয় পানির জন্য উপকূলের অনেক মানুষের ভরসার স্থল বৃষ্টির পানি। এ পানি মটকা বা প্লাস্টিকের বড়ড্রামে করে ভরে রাখা হয় শুকনো মৌসুমে ব্যবহারের জন্য। আর এ পানিতে ডেঙ্গু ছড়ানো এডিসের বিস্তার ঘটছে।
অন্যদিকে ভারতের ‘ন্যাচার ইন্ডিয়া’ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নোনাপানির মশা মিঠাপানির মশার চেয়েও ভয়ংকর ভূমিকা রাখতে পারে। সমুদ্রের নোনাপানি ও নদীর মোহনায় জন্ম নেওয়া এসব মশা ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা, পীতজ্বর ও ম্যালেরিয়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। নদীর নোনাপানি এখন লোকালয়ের গভীরে পৌঁছে গেছে।’ তবে এখনো অবধি নোনাপানিতে এডিসের বংশবিস্তার হচ্ছে এমন তথ্য দেননি দেশের বিশেষজ্ঞরা।
২০২৫ সালের মার্চ-এপ্রিলে উপকূলীয় জেলাগুলোতে তাপমাত্রা গত দুই দশকের রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। অনেক জায়গায় পারদ ৪৩° সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছিল। তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে উপকূলীয় মানুষের মধ্যে হিটস্ট্রোক এবং ডিহাইড্রেশনের সমস্যা ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে। উপকূলীয় জেলাগুলোর মধ্যে সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলে গরমের তীব্রতা ছিল সবচেয়ে বেশি। এসময় নদী-ডোবা-নালা পানিশূন্য হয়ে পড়ায় মানুষের সংকট কয়েকগুন বেড়ে যায়। পানি সংগ্রহ করতে হয় দূরদূরান্ত থেকে। কৃষি ক্ষেত্রেও চরম সংকট দেখা দেয়। একইভাবে গতবছরের জানুয়ারি এবং ডিসেম্বরের শেষে শীত কাবু করেছিল উপকূলবাসীকে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার ইতিহাস সবসময়ই নদীর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে। কিন্তু গত দুই দশক এ জনপদের জন্য এক আমূল পরিবর্তনের অধ্যায়। এক সময় যে মানুষগুলোর পরিচয় ছিল গর্বিত কৃষক হিসেবে, যাদের গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ ছিল, আজ তারা অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে নিজেদের আদি পেশা ভুলতে বসেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে উপকূলের মাটি ও পানিতে যে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়েছে, তা কেবল পরিবেশকেই বিপন্ন করেনি; বরং উপকূলীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকার মানচিত্রে এক স্থায়ী ও বেদনাদায়ক পরিবর্তন এনেছে।
বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্তও খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও পটুয়াখালীর মতো জেলাগুলোর অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল কৃষি। দিগন্তজোড়া আমন ধানের খেত ছিল এখানকার সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু গত ২৫ বছরে এই চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত জমির পরিমাণ জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে এই পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ঘূর্ণিঝড় রেমাল সেই কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে।
লবণাক্ত পানি কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ার ফলে ধানের উৎপাদন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। যে জমিতে আগে বছরে দু-তিনবার ফসল ফলত, সেখানে এখন বছরের অধিকাংশ সময় লোনা পানি থৈ থৈ করে। ফলে হাজার হাজার কৃষক তাদের বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা কৃষি পেশা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। এটি কোনো শৌখিন পেশা বদল নয়, বরং এটি হলো সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি বা টিকে থাকার কৌশল। একজন কৃষক যখন দেখেন তার চোখের সামনে সোনার ফসল নোনা পানিতে জ্বলে যাচ্ছে, তখন পেশা পরিবর্তন ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকে না।
উপকূলীয় জীবিকা পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান উদাহরণ হলো ধান চাষ ছেড়ে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষে ঝুঁকে পড়া। গত দুই দশকে এই অঞ্চলটি কার্যত চিংড়ি মহলে পরিণত হয়েছে। একে বলা হচ্ছে সাদা স্বর্ণ বা হোয়াইট গোল্ড, কিন্তু এই স্বর্ণের পেছনের গল্পটি বেশ করুণ।
কৃষি জমিতে লোনা পানি আটকে চিংড়ি চাষ করা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মনে হলেও এটি কর্মসংস্থানের ব্যাপক সংকোচন ঘটিয়েছে। কারণ, এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে যে পরিমাণ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, চিংড়ি ঘেরে তার চেয়ে অনেক কম শ্রমিকের দরকার পড়ে। ফলে কৃষিজমি যখন ঘেরে রূপান্তরিত হয়, তখন বিপুলসংখ্যক কৃষি শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন।
তা ছাড়া, এই পেশাগত পরিবর্তনে এক ধরনের শ্রেণি বৈষম্য তৈরি হয়েছে। যারা ধনী ও বড় জমির মালিক, তারা চিংড়ি চাষ করে আরও ধনী হয়েছেন। অন্যদিকে প্রান্তিক কৃষক, যার অল্প জমি ছিল, তিনি লোনা পানির কারণে চাষাবাদ করতে না পেরে নামমাত্র মূল্যে জমি ইজারা দিতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে একসময়ের স্বাধীন কৃষক আজ নিজের জমিতেই অন্যের ঘেরের পাহারাদার বা দিনমজুরে পরিণত হয়েছেন। এই পেশাগত অবনমন বা ‘ডি-ক্লাসিফিকেশন’ উপকূলীয় সমাজকাঠামোকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে।
কৃষি ও মৎস্য খাতের এই পালাবদলে যারা কাজ হারিয়েছেন, তারা কী করছেন? গত দুই দশকে উপকূলে অপ্রাতিষ্ঠানিক পেশার এক বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে, যা মূলত হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া। কৃষিকাজ হারানো মানুষেরা এখন ভ্যান-রিকশা চালানো, ইজিবাইক চালনো, চায়ের দোকানদারি কিংবা ইটভাটায় শ্রম বিক্রির মতো পেশা বেছে নিচ্ছেন।
বিশেষ করে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বনজীবী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ মধু সংগ্রহ, গোলপাতা আহরণ কিংবা নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরার কাজ করছেন। কিন্তু সেখানেও লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের থাবা। লোনা পানির কারণে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র বদলাচ্ছে, মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে যারা নদী বা বনের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতে চেয়েছিলেন, তারাও এখন অনিশ্চয়তার মুখে। ২০২৪-এর রেমাল পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, বহু মানুষ ত্রাণ নির্ভর হয়ে পড়েছেন, কারণ তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের আর কোনো সুযোগ অবশিষ্ট নেই।
লবণাক্ততা উপকূলীয় নারীদের কর্মজীবনেও বড় প্রভাব ফেলেছে। পরিবারের পুরুষ সদস্য যখন কর্মহীন হয়ে পড়েন, তখন সংসারের হাল ধরতে নারীরাও ঘরের বাইরে আসতে বাধ্য হন। গত দুই দশকে চিংড়ির পোনা ধরা বা রেণু সংগ্রহ উপকূলীয় নারীদের অন্যতম প্রধান পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোমর সমান লোনা পানিতে দাঁড়িয়ে দিনের পরদিন চিংড়ির পোনা সংগ্রহ করতে গিয়ে এই নারীরা ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন। লোনা পানির সংস্পর্শে তাদের চর্মরোগ, জরায়ু সংক্রমণ এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হচ্ছে। তবুও, অভাবের তাড়নায় তারা এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশা ছাড়তে পারছেন না। কৃষিভিত্তিক সমাজে নারীরা যেখানে বাড়ির আঙিনায় বা কৃষি কাজে সহায়তা করতেন, এখন তারা লোনা পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
যখন স্থানীয়ভাবে আর কোনো কাজের সুযোগ থাকে না, তখন মানুষ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নিতে বাধ্য হনÑ এলাকা ত্যাগ করা। গত দুই দশকে উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে ঢাকামুখী মানুষের স্রোত অভাবনীয় হারে বেড়েছে। এদের বড় একটি অংশ জলবায়ু উদ্বাস্তু।
গ্রামের একজন দক্ষ কৃষক যখন ঢাকায় আসেন, তখন তার কৃষিজ্ঞান কোনো কাজে আসে না। তিনি বাধ্য হয়ে রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক বা কারখানার নি¤œবেতনের শ্রমিকে পরিণত হন। খুলনা বা চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোর বস্তিতে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, সেখানকার বাসিন্দাদের একটা বিশাল অংশ সাতক্ষীরা, দাকোপ বা কয়রা অঞ্চল থেকে আসা। লবণাক্ততা তাদের কেবল ভিটেমাটি থেকেই উচ্ছেদ করেনি, তাদের পেশাগত পরিচয় ও সামাজিক মর্যাদাটুকুও কেড়ে নিয়েছে। এই বাধ্যতামূলক অভিবাসন উপকূলের জনমিতিকেই বদলে দিচ্ছে। গ্রামে এখন কর্মক্ষম তরুণের সংখ্যা কমছে, পড়ে থাকছে কেবল বৃদ্ধ ও শিশুরা।
২০০০-২০২৫ এই পঁচিশ বছরে উপকূলের মানুষের জীবিকার ধরন যেভাবে বদলেছে, তা আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করা উচিত। অপরিকল্পিতভাবে লোনা পানি তুলে চিংড়ি চাষ এবং তার ফলে সৃষ্ট কর্মসংস্থান সংকট যদি এখনই মোকাবিলা করা না যায়, তবে এই অঞ্চলটি ভবিষ্যতে জনশূন্য লোনা মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত ও টেকসই পরিকল্পনা। প্রথমত, কৃষি গবেষণার মাধ্যমে এমন শস্য ও ফসলের জাত উদ্ভাবন করতে হবে যা উচ্চ লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে, যাতে কৃষকরা আবার তাদের মূল পেশায় ফিরতে পারেন। দ্বিতীয়ত, চিংড়ি চাষের জন্য নির্দিষ্ট জোন বা এলাকা নির্ধারণ করে দিতে হবে, যাতে ফসলি জমিতে লোনা পানি প্রবেশ না করে। তৃতীয়ত, উপকূলীয় যুবকদের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা কৃষি বা চিংড়ির বাইরেও সম্মানজনক পেশা গড়তে পারে। সর্বোপরি, সরকারের ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর আওতায় উপকূলীয় অঞ্চলে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ও পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটাতে হবে, যা লবণাক্ততার সঙ্গে খাপ খাইয়ে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে।
লবণাক্ততা আজ উপকূলের মানুষের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু এই নিয়তির কাছে হার মানলে চলবে না। কৃষকের লাঙল হয়তো আর আগের মতো চলবে না, কিন্তু তাদের কর্মঠ হাতগুলোকে কর্মহীন রাখা যাবে না। উপকূলের মানুষের জীবিকা রক্ষা মানেই বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা।
সাতক্ষীরা উপকূলের বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধের পাশে ঝুপড়ি ঘরে থাকেন সখিনা খাতুন। ১৬ বছর আগে স্বামী ছেড়ে চলে গেছেন। এখন স্থানীয় কাঁকড়া খামারে তিন হাজার টাকা বেতনে কাজ করে সংসার চালান ৪৬ বছরের এই নারী। ঘূর্ণিঝড় আম্পানে বিধ্বস্ত হয়েছিল তার ঘর। স্থানীয় এনজিও থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ঘরটি পুনরায় নির্মাণ করেন। ঋণ শোধ হওয়ার আগেই পরের বছর ঘূর্ণিঝড় ইয়াসে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘর। আবারও ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ঘর করেন। গত জুলাই মাসে খোলপেটুয়া নদীর পানিতে প্লাবিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘর। ভাঙা-গড়ার মধ্যে টিকে থাকার সংগ্রাম যেন তার নিত্যসঙ্গী। জীবনের গ্লানি টানতে টানতে এখন ক্লান্ত তিনি। অনেকটা উদ্বাস্তুর মতো জীবনযাপন করছেন।
ভাঙা-গড়ার নিয়তিতে পড়েছেন সখিনার মা আলেয়া বেগমও। তার ঘরটি ভেঙেছে পাঁচবার। প্রতিবারই ঋণ নিয়ে ঘর করেছেন। এভাবে ঘর নির্মাণ করতে করতে তারা এখন নিঃস্ব, সর্বস্বান্ত।
শুধু সখিনা কিংবা তার মা আলেয়া বেগম নন; প্রতি বছর নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছেন শ্যামনগর ও আশাশুনি উপকূলের বাসিন্দারা। দিনদিন বাড়ছে উদ্বাস্তুর সংখ্যা। সহায়-সম্পদ হারিয়ে তারা এখন দিশেহারা। নেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। বাধ্য হয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। এভাবে ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে সাতক্ষীরা উপকূলীয় এলাকা।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানছে উপকূলে। এতে সহায়-সম্পদ হারানোর পাশাপাশি সুপেয় পানির সংকট, চিকিৎসার অভাব, নারী-শিশুদের নিরাপত্তাহীনতা জীবনযাত্রা ও পরিবেশকে বিষিয়ে তুলেছে। উপকূলের এমন অবস্থার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
উপকূলের বাসিন্দারা বলছেন, উপকূলের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার উন্নয়নে কার্যকর কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এলাকায় কাজ না থাকায় বাড়িতে নারীদের রেখে কাজের সন্ধানে যাচ্ছেন পুরুষরা। তখন পরিবারের নারী-শিশুরা নানা নির্যাতন ও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
জীবনের গ্লানি টানতে টানতে এখন ক্লান্ত সখিনা। অনেকটা উদ্বাস্তুর মতো জীবনযাপন করছেন
সখিনা খাতুন বলেন, ‘এ বছর বড় ধরনের ঝড় আসেনি। সেজন্য ঘরটি টিকে আছে। কিন্তু ঘরের কিছু অংশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গায় পড়ায় সরিয়ে নিতে বলেছেন সংশ্লিষ্টরা। না হলে ভেঙে দেবে বলে নোটিশ দিয়েছে। ঘর সরাতে অনেক টাকা খরচ হবে। কিন্তু টাকা পাবো কোথায়?’
বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দুর্গবাঢী এলাকার সদানন্দ মন্ডল বলেন, ‘আমাদের কষ্টের শেষ নেই। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আমার ঘর অনেকবার ভেঙেছে। ২০১৯ সালে ফণীতে বাড়ি বিধ্বস্ত হয়। স্থানীয় সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে আবারও ঘর তুলি। বছর না ঘুরতেই আম্পানের আঘাতে ভেঙে যায়। আবার ঋণ নিয়ে ঘর করলে পরের বছর ইয়াসে লন্ডভন্ড হয়ে যায়। এরপর আমার মামা এলাকা ছেড়ে চলে যান। তার ঘরটি আমাকে দিয়ে যান। গত জুলাই মাসে বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘরটি। দুর্যোগে বারবার ঘর ভাঙে, বারবার ঋণ নিয়ে ঘর করি। ভ্যান চালিয়ে ঋণ শোধ করি। এভাবে জীবন চলে না। মন চায় অন্য জায়গায় চলে যাই। কিন্তু যাওয়ার জায়গা নেই।’
প্রতাপনগরের হাওলদারবাড়ি এলাকার সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘আম্পানে আমাদের ঘরবাড়ি চলে গেছে নদীতে। শুধু আমার নয়, এলাকার অনেকের ঘরবাড়ি নদীতে চলে গেছে। আত্মীয়-স্বজন কারও ঘর নেই। আমার বড়ভাই খুলনায় চলে গেছেন। আমি এখন শ্বশুরবাড়িতে থাকি। কখন এই ঘর ভেঙে যায় সে আতঙ্কে আছি।’
দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার মিজানুর রহমান বলেন, ‘খরা, ঝড়, বৃষ্টি ও নদীভাঙন আমাদের নিত্যসঙ্গী। আইলার পর থেকে গোটা এলাকা উদ্ভিদশূন্য। লবণাক্ততার কারণে সব গাছ মারা গেছে। এলাকায় বসবাস করা খুবই কষ্টের। বাঁধের অবস্থা নাজুক। বেড়িবাঁধ হলে পানি প্রবেশ করতো না। বাঁধ না থাকায় প্রতিবছর আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। পুরো বছর সুপেয় পানির অভাবে থাকতে হয়। খুব খারাপ অবস্থায় আছি আমরা।’
প্রতাপনগরের স্বেচ্ছাসেবক মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতি বছর দুর্যোগে এলাকার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। অনেকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। কোথায় গেছেন জানি না। এলাকায় কাজ নেই। সুপেয় পানির সংকট। ফলে মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। স্থানীয়দের কাছে শুনেছি, এলাকার অনেকে খুলনা, নড়াইল ও বাগেরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় চলে গেছেন। যারা আছেন তারা খুব কষ্টের মধ্যে দিন পার করছেন।’
প্রধান সম্পাদক: লে. কমান্ডার (অব.) রাশেদ ইকবাল, প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত