
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : মাহে রমজান এবার আমাদের দ্বারপ্রান্তে সমাগত। আত্মশুদ্ধি, সাম্য, সহমর্মিতা ও মানবীয় গুণাবলী সৃষ্টির উদাত্ত আহ্বান নিয়ে এলো পবিত্র রমজান। মুসলিম জাতীয় ঐতিহ্য চেতনায় এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে রমজান অতি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা রমজান মাস পবিত্র কুরআন নাজিলের মাস, ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও বিজয়ের মাস। মুসলমানদের দ্বীন ও দুনিয়ার সমৃদ্ধি, পার্থিব ও আধ্যাত্মিক উন্নতি, দৈহিক ও মানবিক শ্রেষ্ঠত্ব আর গৌরব ও মর্যাদার অবিস্মরণীয় স্মৃতি বয়ে নিয়ে আসে মাহে রমজান। উন্নত চরিত্র অর্জনের পক্ষে অন্তরায় পাশবিক বাসনার প্রাবল্যকে পরাভ’ত করত: পাশবিক শক্তিকে আয়ত্বাধীন করা হচ্ছে সিয়ামের তাৎপর্য। ব্যক্তিগত এবং সামাজিকভাবে সর্বত্র আল্লাহর দ্বীনের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় যাবতীয় প্রতিকূলতার মূখে টিকে থাকার জন্যে যে মনমানসিকতার প্রয়োজন সিয়াম সাধনার দ্বারাই তা অর্জিত হয়। মানবতার মহান নেতা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর বিপ্লবী সাহাবারা এ মহান মাসে বদর যুদ্ধসহ লড়াই করেছিলেন বাতিলের বিরুদ্ধে, অন্যায়-অবিচার, জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে এবং মানুষের ওপর মানুষের প্রভ’ত্ব খতম করার লক্ষ্যে। তাই আজ শুধু রমজানের মাহাত্ম আউড়িয়ে আত্মতৃপ্তি পাবার সুযোগ নেই। বরং মানবতা রক্ষার জন্যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নেতৃত্বে সাহাবায়ে কেরাম আত্মত্যাগের যে নজির স্থাপন করে গেছেন, সেই ত্যাগের আদর্শ গ্রহণের মধ্যেই পবিত্র রমজানের চেতনা নিহিত। আজ প্রয়োজন রমজানের ত্যাগ-তিতিক্ষার সেই চেতনায় উজ্জীবিত হওয়া। ইসলামের বিজয় পতাকাকে সমুন্নত রাখার জন্যে পবিত্র রমজান মাসে সেই আত্মত্যাগের ইতিহাস আমাদের কাছে এক শিক্ষার বাণী বহন করে ফেরে। রমজানে সংযম ও আত্মত্যাগের অনুশীলন এবং সেই সাথে ইসলাম ভিত্তিক ন্যায়, সত্য ও সততা প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ প্রয়োজন। এসব ত্যাগ-তিতিক্ষা ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় প্রমাণিত, শাশ্বত ও জীবন্ত। তাই মহান আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস রেখে অসত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার অনুশীলন করার সুযোগ আসে রমজান মাসে। নৈতিকতা, শালীনতা ও ইফতার গ্রহণের মাধ্যমে সহমর্মিতার সদভ্যাস গড়ে তুলে ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক কল্যাণ সাধনের পথ প্রশস্ত করার অনুশীলন করার মাস হচ্ছে রমজান। চিরায়ত ইসলামী মূল্যবোধ, ধ্যান-ধারণা, চরিত্র, ধর্ম ও আদর্শ রক্ষায় ইসলামী নিয়ম-কানুন অনুশীলনের চেতনা জোরদার করতে হবে । তাছাড়া সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে মাফফিরাতের কামনা করতে হবে।
মুসলমানদের জন্য আল্লাহ তাআলার এক বিশাল নেয়ামত হচ্ছে রমযান মাস। আমরা কি রমযানের হাকীকত এবং এর মর্তবা মর্যাদা সম্পর্কে অবগত হওয়ার সামান্যতম কোনো গরযবোধ করছি? আমরা তো দিবানিশি দুনিয়ার ঝামেলার মধ্যে ডুবে রয়েছি। সকাল সন্ধ্যা নিজের ধান্ধা ফিকিরের চক্করেই সময় বিনষ্ট করছি। পার্থিব স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া আমাদের অস্থিমজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রমযান কি জিনিস তা নিয়ে চিন্তা ভাবনার সময় আমাদের কোথায়? রমযানের মাহাত্ম্য, এর গুরুত্ব, ফযীলত ও মর্তবা একমাত্র তাদের কাছেই রয়েছে, যারা এ মাসের বরকত সম্পর্কে অবগত। যারা জানে এ মাসটি খোদায়ী নূরে পরিপূর্ণ। এ মাসে আল্লাহর রহমতের প্লাবন বয়ে যায়, এ ধারণা যাদের আছে তারাই এ মাসের সম্মান করে থাকে। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীসে ইরশাদ করেন, ‘হে আল্লাহ! রজব এবং শাবান মাসে আমাদের উপর বরকত অবতীর্ণ কর। আর আমাদেরকে রমযানে পৌঁছিয়ে দাও।’ ( মাজমাউয যাওয়ায়িদ: খন্ড-২, পৃষ্ঠা-১৬৫)। এই হাদীসের মর্ম হল, আমাদের বয়স এতটুকু দীর্ঘ করে দাও, যেন রমযান মাসের সৌভাগ্য আমাদের অর্জিত হয়। এ থেকেই অনুমান করা যায় যে, দু’মাস পূর্ব থেকেই রমযানের জন্য অধীর অপেক্ষার পর্বটি শুরু হয়ে যায়। আর এই অপেক্ষার পর্বটি একমাত্র তাদের দ্বারাই হতে পারে, যারা এ মাসের মর্যাদা, এ মাসের গুরুত্ব ও ফযীলত উপলব্ধি করতে সক্ষম।
আল্লাহ তাআলা মানবজাতির সৃষ্টিকর্তা। তাই তিনি জ্ঞাত ছিলেন মানুষ দুনিয়ার ধান্ধায় জড়িয়ে তাঁকে ভুলে যাবে। দুনিয়ার কর্মকান্ডে সে যত নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়বে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার একাগ্রতায় ততই দুর্বলতা আসবে। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে একটি সূবর্ণ সুযোগ করে দিলেন। তিনি তাদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিলেন: প্রতি বছর আমি তোমাদেরকে একটি মাস প্রদান করছি। এগার মাস দুনিয়াদারী এবং অর্থকড়ির ধান্ধার পেছনে ছুটাছুটি করার কারণে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে। আন্তরিকতার সঙ্গে এই একটি মাস যদি তোমরা আমার কাছে প্রত্যাবর্তন কর, তাহলে এগার মাসে যে আধ্যাত্মিক ঘাটতি তোমাদের হয়েছে, আমার নৈকট্য অর্জনের ক্ষেত্রে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, এই মহান ও পবিত্র মাসে তোমরা তা পূরণ করে নাও। নিজের অন্তরের জং পাকসাফ করে পূত: পবিত্র হয়ে যাও। আমার সঙ্গে দূরত্ব হ্রাস করে নৈকট্য অর্জন করে নাও। অন্তরে আমার স্মরণ ও যিকির বাড়িয়ে দাও। মহান রাব্বুল আলামীন এই উদ্দেশ্যের নিরিখেই মুসলিম উম্মাহর জন্য রমযানের বরকতময় মাস দান করেছেন। এই উদ্দেশ্যাবলী অর্জনে,আল্লাহর নৈকট্য হাসিল ও সান্নিধ্য অর্জনে রোযার প্রথম ও প্রধান ভূমিকা রয়েছে। রোযা ছাড়া আর যেসব ইবাদত এই পবিত্র মাসে মুসলমানদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে সেগুলোও আল্লাহ তাআলার নৈকট্য ও সান্নিধ্য অর্জনে বিরাট ভূমিকা রয়েছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্য একটিই, আর তা হল, এই পুণ্যময় মাসের মাধ্যমে মানবজাতিকে নিজের কাছে টেনে নেয়া। শুধু উপবাস থাকাই রমজানের সাফল্যের শর্ত নয়, বরং উপবাসের সাথে যাবতীয় পাপ কাজ যেমন মিথ্যা কথা বলা, গীবত করা, চোগলখোরী, মুনাফাখোরী, কালোবাজারী, প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার মতো ইসলাম বিরোধী কাজ থেকে বিরত থাকার কঠোর অনুশীলন না করলে রমজানের সুফল পাওয়া যাবেনা। পবিত্র রমজানের পবিত্রতা বজায় রেখে রমজানের মাহাত্ব ও গুরুত্ব উপলব্ধি করার জন্যে বিশ্ব মুসলিমকে আল্লাহ পাক তাওফিক দান করুন, আমীন।বাংলা সংস্কার শব্দটির ইসলামী প্রতিশবদ্ধ ইছলাহ বা তাজকিয়া। অর্থাৎ বিশুদ্ধ হওয়া। পরিশুদ্ধ করা, আত্মার বিশুদ্ধি বা দিল ও দেমাগকে সকল ধরনের পাপাচার, অনাচার হতে মুক্ত রাখা ও মুক্ত করা। আত্মাত্বিক পরিভাষায় ইহাকে তাজকিয়াযে কলবও বলা হয়। মনের কলবের আত্মর বিশুদ্ধি ও সংস্কার ছাড়া কোন সংস্কার সফল হবে না। আল্লাহ বলেন যে পরিশুদ্ধ হয়েছে সেই সফল হয়েছে। যে ব্যক্তি, যে সমাজ ও রাষ্ট, তাজকিয়া, বিশুদ্ধি ও ইহলাহ অর্জন করতে পারবে, সেই সফলতা ও কল্যান লাভ করতে পারবে। ইসলামী পরিভাষায় ইহাকে তাকওয়াও বলা হয়। যে, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র তাকওয়ার ভিত্তিতে পরিচালিত হবে তার ব্যপারে আল্লাহর কোরানিক ঘোষনা হল, আল্লাহ তাদেরকে সত্য, মিথ্যা, কল্যাণ, অকল্যাণ, ভালো মন্দ নির্ধারণ করার, সমস্যা কাঠিয়ে উঠার এবং সহজে কর্মসম্পাদনের যোগ্যতা দান করবেন। আল্লাহ বলেন, “তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং নিজেদের বিষয় গুলোকে পরিশুদ্ধ করে নাও”। তিনি আর বলেন, “যারা ইমান এনে নিজেদের বিষয় গুলোকে পরিশুদ্ধ ও সংস্কার করে নেয় এবং সত্য ও ধর্য্যরে উপদেশ দেয়, তারা ছাড়া অন্য সবাই ক্ষতির মাঝে আছে”। এতে বুঝা যায় সংস্কার শুধু উপকার ও কল্যাণ বয়ে আনে না। সংস্কার না করলে ক্ষতিও হয়। এ কারণেই ইসলামে সংস্কার, ইহলাহ, তাজকিয়া বা তাকওয়ার এত গুরুত্ব। তাই আল্লাহ এক মাস সেয়াম সাধনার মাস রমজান দিয়ে মানুষের কুপ্রবৃত্তিকে জ্বালিয়ে ছাই করে দিয়ে বান্দাকে তাকওয়াবান করতে ছেয়েছেন। রমজান শব্দের অর্থ জ্বালিয়ে দেয়া পুড়িয়ে দেয়া।
কার সংস্কার কে করেঃ
বাংলাদেশের প্রায় মানুষের চরিত্র লোভ, মোহ, ভোগ বিলাসিতায় ভরপুর। দূর্নীতি ও স্বার্থ পরতা চারিত্রিক বৈশিষ্টে পরিনত। হালাল-হারাম, ন্যায়-অন্যায় জ্ঞান প্রায় বিলুপ্ত। নিস্বার্থ, ন্যায় পরায়ন, পরপোকারী, নৈতিকগুণ সম্পন্ন মানবতবাদী নেতা ও কর্মকর্তা খুঁজে পাওয়া দুশকর। কিশোর, তরুন পর্যন্ত আজ বখাটে ও চরিত্র হীনতা। ধর্ম নেতারা কোন্দল আর গ্রুপিং এ লিপ্ত। হাছিনার অত্যাচার ও ইসলাম বিরোধী কাজের ঐক্যবদ্ধ মোকাবেলায়ও তারা ব্যর্থ। রাজনৈতিক নেতা ও কর্মকর্তারা দূর্নীতি ও লুটপাটে ব্যস্ত। খুন, গুম, নারী নির্যাতন, অবৈধ প্রেমের সর্ম্পক, হিজড়াদের উৎপাত, কিশোর গ্যাং এর অপতৎপরতা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। আজ থেকে ৩৫ বছর আগে আওয়ামীলীগের জেলা সভাপতির উপস্থিতিতে জেলা প্রশাসক নাজমুল আলম সিদ্দিকীকে বলে ছিলাম, স্যার “আমাদের মওলবীদের কারণে দ্বীন বরবাদ, নেতাদের কারনে দেশ বরবাদ”, তাহা যেন আজ বাস্তব। কর্মকর্তারাও পাল্লা দিয়ে দূর্নীতি করছে। আধুনিক বর্বরতার এই যুগে ইসলামের পথে আসা ছাড়া বাঁচার উপায় কি?। আল্লাহ বলেন, “যারা ইসলাম বাদ দিয়ে অন্য বিধানে মুক্তি চাইবে অনুমোদন মুক্তি পাবে না”।
সংস্কারে নামাজ ও রোজা রমজানের ভূমিকা:-
মুসলমান জাতিগোষ্টির জন্য দিনে ৫ বার নামাজ পড়া এবং বছরে ১ বার মাস ব্যাপী রোজা রাখা আল্লাহ ফরজ করেছেন। যেন তাঁরা সংস্কার, তাজকিয়া, তাকওয়া ও পরিশুদ্ধি অর্জন করে সৎ, চরিত্রবান ও দূর্নীতি মুক্ত হতে পারেন। সমাজ, রাষ্ট্র, প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ব্যক্তিই মূল কারিগর। ব্যক্তির আত্মার সংস্কার বা পরিশুদ্ধির উপরই নির্ভর করে প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রের সংস্কার ও পরিশুদ্ধি। তাই ইসলাম ব্যক্তির পরিশুদ্ধির জন্য আনুষ্ঠানিক ভাবে নামাজ ও রোজার কর্মসূচী দিয়ে ব্যক্তির মনে তাকওয়া তথা খোদা ভীতি সৃষ্টি ও আত্মর পরিশুদ্ধির ব্যবস্থা করেছে। কারণ সংস্কার বিষয়টির সাথে মনের সর্ম্পকই বেশি। আল্লাহর নবী বলেন, “জেনে রাখ তোমার শরীরে একটি মাংস পিন্ড আছে, ঐ মাংস পিন্ড ভাল থাকলে তুুমি পুরাটাই ভাল, ঐ মাংস পিন্ড নষ্ট হলে তুুমি পুরাটাই নষ্ট, জেন রাখ ঐ মাংস পিন্ড হল তোমার মন”। নামাজ পড়ার জন্য মানুষ পাক পবিত্রতা অর্জর করে। পোষাক পবিত্র করে। ওজু করে পবিত্র হয়। সময়ের খেয়াল রাখে। নামাজে দোয়া ও সূরা কেরাত্ব পড়ে। সবই করে নিজের মন থেকে। রোজা রেখে সারা দিন ক্ষুদা, তৃঞ্চনার কষ্ট সহ্য করে। কিছু খেয়ে নিলে গোপনে কেউ দেখবে না। জানবে না। তবু খায়না। এসবই মনের ব্যপার। এ ভাবে নামাজ রোজার মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের মনকে বিশুদ্ধ ও সংস্কার করেন। যাদের মনে আল্লাহর ভয় আছে এ রকম বিশুদ্ধ মনের মানুষেরা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্ণধার হলে তারা সফল সংস্কারে ভূমিকা রাখতে পারবে। এই জন্য আল্লাহ বলেন, “নামাজ অন্যায়, অশ্লিল কাজ থেকে বিরত রাখে”। আল্লাহর নবী (সঃ) বলেন, “নামাজ যাকে অন্যায় থেকে বিরত রাখে না, সে যেন নামাজই পড়েনি”। আল্লাহ রোজা দিয়েছেন খোদা ভীতি অর্জন করে মনের সংস্কার ও আত্মশুদ্ধির জন্য। ঈমান, আমলে ছালেহ এবং নামাজ রোজার মাধ্যমে সংস্কারের যে ব্যবস্থা পত্র আল্লাহ দিয়েছেন, সমাজ ও রাষ্ট্রের সংস্কারের জন্য ইহাকেই মূল কর্মসূচী হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এছাড়াও ইসলাম যাকাত ভিত্তিক, সুদমুক্ত অর্থনীতি, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা, অন্যায়ের প্রতিরোধকে সুনাগরিক এবং উন্নত রাষ্ট্র গঠনের মূখ্য কর্মসূচী ঘোষনা করেছেন। প্রিয় রাসূল (সাঃ) এবং খোলাফায়ে রাশেদীন রাশদীন এই সব কর্মসূচীর সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমেই র্ববর আরব জাতীকে সফল ও সমৃদ্ধ জাতিতে পরিনত করেছিলেন। তাই প্রিয় নবী (সাঃ) বলেছেন, “আমার ছুন্নাত এবং আমার চার খলিফার (রাষ্ট্র পচিালনার) সুন্নাতকে মাড়ির দাঁত দিয়ে শক্ত করে কামড়িয়ে ধরা তোমাদের দায়িত্ব। তোমরা তোমাদের নবীর সুন্নত বাদ দিলে পথহারা হবে”। সফল হবে না। ব্যর্থ হবে। সমাজ ও রাষ্ট প্রিয় রাসূলের বিধান মত না চলানোর কারণেই আজ দেশের এই অবস্থা। আসল ব্যাপ হল যারা রাষ্ট্র ও প্রশাসন চালায় তারা নিজেরাই আল্লাহর দেয়া নীতি অমান্য করে যারা আল্লাহর দেয়া নীতি ভঙ্গ করে, তারা কি ভাবে দূর্নীতিমুক্ত করবে রাষ্ট্রকে?। তারা মুসলমান ও ইমান্দার হয়ে থাকলে এ ব্যাপারে তাদের চিন্তা করা উচিত।
সংস্কারের মৌলিক দিকঃ
নীতি ও নেতার সংস্কারই সকল সংস্কারের মৌলিক বিষয়। নেতা ভাল হলেও ভাল ফল আসবে না নীতি ভাল না হলে। নীতি ও নেতার সংস্কার ছাড়া কোন দেশ ও জাতি শান্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি লাভ করতে পারে না। তাই আল্লাহ বর্বর জাতিকে হেদায়েত দিয়ে সুখ সমৃদ্ধির পথে আনার জন্য যুগে যুগে, দেশে দেশে নেতা ও নবী প্রেরণের সাথে সাথে নীতি ও কিতাব প্রেরণ করেছেন। ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্র সংস্কারের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব হচ্ছেন বিশ্ব মানবতার মুক্তিদুত হযরত মুহাম্মদ (সঃ)। সর্বাধুনিক নীতি ও সংবিধান হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত কিতাব, কোরআনুল করিম। তাই আল্লাহ কোরআর শরীফকে সকল বিষয়ের বিষদ বর্ণনার কিতাব ঘোষনা করে বলেছেন, “তোমাদের দ্বীন ও বিধানকে আজ তোমাদের জন্য পরিপূর্ণ করে দিলাম”।
আল্লাহ প্রদত্ত প্রিয় রাসুল প্রদর্শিত সংস্কারের পথে আসা এবং তাদের দেয়া সংস্কার কর্মসূচী গ্রহণ ও বাস্তবায়ন ছাড়া পশ্চিমা হারাম রাজনীতি, ইহুদিতে সুদ ভিত্তিক অর্থনীতি, মুশরেকদের অশ্লিল নাচ গান মার্কা সংস্কৃতি, কোরআনের নৈতিক শিক্ষা বর্জিত শিক্ষা এবং আল্লাহর দেয়া সংবিধান বাদ দিয়ে মানুষের তৈরী সংবিধান দিয়ে প্রকৃত সংস্কার সাধন এবং তার সুফল লাভ অসম্ভব। ১৫ বছর আগে আওয়ামীলীগের নির্বাচনি সভায় বান্দরবানের গন্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে মন্ত্রীকে সামনে রেখে বলেছিলাম মন্ত্রি সাহেব বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি, আমি মদীনার সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে বলছি। আপনারা যে রাজনীতি করছেন, রাসূলের রাজনীতি ছাড়া তাতে শান্তি হবে না” শান্তিতো হয় নাই বরং অশান্তি আরো বেড়েছে। ইহা হারাম রাজনীতিরই কুফল। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সমাজের প্রভাবশালী ও ধনী ব্যক্তিবর্গ সর্বোপরি দেশের সকল জনগণকে আবারো বলছি (যদি তারা মুসলমান হয়ে থাকে) পবিত্র এই রমজান মাসে তওবা করে ঐ সব হারাম পথ ছেড়ে দিয়ে ইসলামের পথে আসতে হবে। ইহাই শান্তি ও মুক্তির পথ। আল্লাহ বলেন, “যে বা যারা আমার হেদায়াত মত চলবে তাদের কোন ভয় নেই, কোন চিন্তাও নেই”। এই জন্য বলা হয় ইসলাম শান্তির ধর্ম। যদিও মুসলমান নেতা, কর্মকর্তা এবং আলেম ওলামা ও পীর মাশায়েখদের কারণে মানুষ ইসলামের পথে আসতে পারছে না। রমজান মাস সমাগত যা ইবাদতের সুবর্ণ সুযোগ। এ মাসে আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদের নেক আমলের সওয়াব সীমাহীন ভাবে বৃদ্ধি করে থাকেন এবং প্রদান করেন অফুরন্ত কল্যাণ ও বরকত। এ মাস কোরআন নাজিলের মাস। রাত্রি জেগে ইবাদত ও বন্দেগী করার মাস। তারাবির নামাজে কোরআনুল কারীম তেলাওয়াতের মাস। দিনের বেলায় সিয়াম পালনের মাস। ধৈর্য, সহনশীলতা ও আত্মশুদ্ধির মাস।দান ও সদকার মাস। মানুষের প্রতি দয়া করার মাস। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে পুরস্কার প্রাপ্তি ও প্রতিদানের মাস। জান্নাত প্রাপ্তি ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাস।
আল্লাহ তাআলা বলেন, রমজান সেই মাস যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা বিশ্ব মানবের জন্য হেদায়াত এবং সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ আর হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী। (সূরা বাকারা-১৮৫ নং আয়াত )। এ মহিমান্বিত মাস রহমত, বরকত এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির। প্রথম দশদিন রহমতের, দ্বিতীয় দশদিন মাগফিরাতের এবং শেষ দশ দিন জাহান্নাম থেকে মুক্তির।
সহি বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যখন রমজান মাস আগমন করে, তখন জান্নাতের দরজা সমূহ খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজার সমূহ বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখা হয়। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহি হযরত আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার উম্মতকে মাহে রমাদানে পাঁচটি বৈশিষ্ট্য দেয়া হয়েছে, যা পূর্ববর্তী কোন উম্মতকে দেয়া হয়নি।
এক, রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহ তায়ালার কাছে মেশকের সুঘ্রাণ থেকেও অতি উত্তম। দুই, রোজাদারের জন্য ফেরেশতারা ইফতারের পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার কাছে মাগফিরাতের দোয়া করতে থাকেন। তিন, রোজাদারের জন্য আল্লাহ তায়ালা প্রতিদিন জান্নাতকে সুসজ্জিত করে বলেন, আমার নেককার বান্দাগণ অনেক কষ্ট স্বীকার করে খুব তাড়াতাড়ি তোমাদের সান্নিধ্যে আসছে। চার, এ মহিমান্বিত মাসে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন শয়তানদেরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করেন, ফলে তারা অন্য মাসের ন্যায় এ মাসে বান্দাকে গোমরাহীর পথে নিতে পারে না। পাঁচ, রমজানের শেষ রজনীতে রোজাদারকে মাফ করে দেয়া হয়, আরজ করা হয়, হে রাসুল, এ ক্ষমা কি কদরের রাতে করা হয়? উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, না বরং কোন শ্রমিককে তার প্রতিদান তখনই দেয়া হয়, যখন শ্রমিক তার কাজ সমাপ্ত করে।
সিয়াম পালনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তাকওয়া অর্জন করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে ঈমানদারগণ, তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল,যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো। (সূরা বাকারা-১৮৩)। সিয়াম সাধনায় পাপ মোচন হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি বিশ্বাসের সাথে এবং সওয়াবের নিয়তে রামাদানের সিয়াম পালন করবে ,তার অতীতের গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (বুখারী ও মুসলিম)।
সিয়াম পালনকারী কে সীমাহীন প্রতিদান প্রদান করা হবে। হাদিস শরীফে এসেছে, হযরত আবু হোরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, সিয়াম ছাড়া আদম সন্তানের সব আমল তার নিজের জন্য, আর সিয়াম তা একমাত্র আমার জন্য, আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব। আর সিয়াম ঢাল স্বরূপ অতঃপর যদি তোমাদের কেউ সিয়াম পালন করে, তাহলে সে যেন অশ্লীল কথা না বলে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়, তবে সে যেন বলে আমি রোজাদার। (বুখারী ও মুসলিম)।
সিয়াম পালনকারীর জন্য দুটি খুশি রয়েছে। প্রথমটি ইফতারের সময় আর দ্বিতীয়টি মহান রবের সাথে দীদারের সময়। ইফতারের সময় খুশি হচ্ছে, মহান রব তাকে সিয়ামের মত একটি উত্তম এবাদত করার সুযোগ দিয়েছেন এবং তার জন্য পানাহার ও স্ত্রী মিলন হালাল করেছেন, যা সিয়াম অবস্থায় নিষিদ্ধ ছিল। আর মহান রবের সাথে সাক্ষাতের খুশি হচ্ছে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে যেদিন পরিপূর্ণ প্রতিদান দিবেন, এবং আল্লাহ বলবেন, সিয়াম পালনকারীরা কোথায়? তোমরা রাইয়ান নামক দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করো, যে দরজা দিয়ে সিয়াম পালনকারী ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না।
সিয়ামের আরেকটি অন্যতম ফজিলত হল, সিয়াম পালনকারীর জন্য সিয়াম নিজেই আল্লাহর দরবারে সুপারিশ পেশ করবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সিয়াম ও কোরআন বান্দার জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ পেশ করবে, সিয়াম বলবে, হে আল্লাহ! আমি তাকে পানাহার ও যৌনাচার হতে বিরত রেখেছি। সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। কোরআন বলবে, হে আল্লাহ! আমি রাতের ঘুম থেকে তাকে বিরত রেখেছি, সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, উভয়ের সুপারিশ কবুল করা হবে। (আহমদ)।
মাহে রমজান বান্দাদের জন্য মহান রবের পক্ষ থেকেএকটি বিশেষ নেয়ামত। এ মাসে প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব নিয়াত ও নিষ্ঠা ভেদে দশ থেকে সাতশত গুণ বা তার চেয়েও অধিক গুনে বর্ধিত করে দেন। এ নেয়ামত ওই ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য যিনি এ মাসে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের হক ও বান্দার হক যথাযথভাবে আদায় করল এবং গুনাহ পরিত্যাগ করে তার আনুগত্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করলো।
পরিশেষে আল্লাহর কাছে মোনাজাত করছি, হে রব আপনি আমাদের সিয়াম সাধনা কবুল করুন এবং সিয়ামকে সুপারিশকারী হিসেবে গ্রহণ করুন আর হিসাব নিকাশের দিন রাইয়ান নামক দরজা দিয়ে বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করার সুযোগ দিন।
আমিন ইয়া রব্বাল আলামিন।ইসলামে অনুমোদিত কারণ ছাড়া রোজা ত্যাগ করা কবিরা গুনাহ। কেননা পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘রমজান মাস হলো সেই মাস, যে মাসে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে মানুষের পথপ্রদর্শক, সত্য পথের উজ্জ্বল নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এই মাস পাবে, তারা যেন রোজা রাখে। কেউ অসুস্থ হলে অথবা সফরে থাকলে সে যেন অন্য সময়ে সেই (রোজার) সংখ্যাগুলো পূরণ করে।’ (সুরা বাকারা ১৮৫) সুতরাং যে ব্যক্তি শরিয়ত অনুমোদিত কারণ ছাড়া রোজা ত্যাগ করল সে ইসলামের রোকন ও ফরজ বিধান ত্যাগ করল, সে কবিরা গুনাহ করল। একটি কবিরা গুনাহই মানুষের জাহান্নামে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। রমজানের রোজা না রাখার বিষয়ে যেসব শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্য থেকে তিনটি ভয়াবহ দিক উল্লেখ করা হলো।
কুফরিসদৃশ কাজ : ইসলামে অনুমোদিত কারণ ছাড়াই যারা রমজানের রোজা ত্যাগ করে তারা কুফরিসদৃশ কাজ করে। কেননা এমতাবস্থায় তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ইসলামের ফরজ বিধান ছেড়ে দেয়, যা ওই বিধানটি অস্বীকার করার সমতুল্য।
মুসলিম হওয়ার ব্যাপারে সংশয় : ইমাম জাহাবি (রহ.) বলেছেন, মুমিনদের কাছে এ কথা প্রমাণিত, যে ব্যক্তি কোনো অসুস্থতা ও ইসলামে অনুমোদিত কোনো কারণ ছাড়াই রমজানের রোজা ছেড়ে দেয়, সে একজন নিকৃষ্ট ব্যক্তি হিসেবে সাব্যস্ত হয়। তার ইমান আছে কি না, সেই ব্যাপারেও সন্দেহ হয়। (আল-কাবায়ির ৬৪)
জাহান্নামে ভয়াবহ শাস্তি : যারা ইসলামে অনুমোদিত কারণ ছাড়া রোজা রাখবে না বা রোজা রেখে ভেঙে ফেলবে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। তাদের স্থান হবে জাহান্নাম। আবু উমামা বাহিলি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘একদা আমি ঘুমিয়ে ছিলাম, এ সময় স্বপ্নে দুজন মানুষ এসে আমার দুবাহু ধরে আমাকে এক দুর্গম পাহাড়ে নিয়ে গেল। সেখানে নিয়ে তারা আমাকে বলল, আপনি এই পাহাড়ে উঠুন। আমি বললাম, আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তারা বলল, আমরা আপনার জন্য সহজ করে দিচ্ছি। তাদের আশ্বাস পেয়ে আমি উঠতে লাগলাম এবং পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে পৌঁছলাম। সেখানে প্রচণ্ড চিৎকারের শব্দ শুনতে পেলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কীসের শব্দ? তারা বলল, এটা জাহান্নামিদের চিৎকার। এরপর তারা আমাকে এমন কিছু লোকের কাছে নিয়ে গেল যাদের পায়ের টাখনুতে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের গাল ছিন্নভিন্ন এবং তা থেকে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? তারা বলল, এরা হলো এমন রোজাদার, যারা রোজা পূর্ণ না করে ইফতার করত।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান)
রোজা ভাঙার প্রতিবিধান : প্রকৃতপক্ষে ফরজ আমল সময়মতো পালন না করার কোনো পরিপূর্ণ প্রতিবিধান নেই। কেননা ব্যক্তি সময়মতো ইবাদত না করলে যে ফজিলত ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হতে হয় তা কখনো ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। তবে আলেমরা বলেন, ব্যক্তি যদি রোজা ত্যাগ করে তবু তার প্রতিবিধান আছে। এই প্রতিবিধান তার পাপমুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। তারা বলেন, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি রমজানের যত রোজা ছুটে গেছে সেটার জন্য তওবা করবে এবং হিসাব করে সেগুলোর কাজা আদায় করতে হবে। বার্ধক্য বা কোনো কারণে কাজা না করতে পারলে ফিদিয়া দেবে। একটি রোজার পরিবর্তে একটি ফিদিয়া ফরজ হয়। এক ফিদিয়ার পরিমাণ হলো, একজন মিসকিনকে পেট ভরে দুই বেলা খাবার খাওয়ানো অথবা এর মূল্য প্রদান করা।
স্বাভাবিক অবস্থায় ইচ্ছাকৃত যত রোজা রেখে নষ্ট করা হয়েছে প্রত্যেক রোজার জন্য ভিন্ন ভিন্ন ৬০টি করে রোজা কাফফারা হিসেবে রাখতে হবে। রোজা রাখার সামর্থ্য না থাকলে, যেমন বৃদ্ধ হয়ে গেলে প্রত্যেক রোজার জন্য এক ফিতরা পরিমাণ কাফফারা দেবে। রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস রমজানুল মোবারক ফিরে এসেছে। এ মাস সিয়াম সাধনার। আত্মসংযমের। ধৈর্য, ত্যাগ, সহানুভূতি, সহমর্মিতা অর্জনের। মানবিক গুণাবলী অনুশীলনের। এ জন্য এ মাস অতি পবিত্র। মুসলিম জাতির জন্য তো বটেই অন্যান্য জাতির নিকটও এ মাসটি অতি পবিত্র, বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ মাসে মানব জাতিকে সঠিক পথপ্রদর্শনের জন্য যেমন মহাগ্রন্থ আল-কুরআন নাজিল হয়েছে, তেমনি অন্যান্য আসমানী কিতাবও নাজিল হয়েছে এ পবিত্র মাসেই। এ মাসের মধ্যে অবস্থিত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম কুরআনের নুজুল, তেমনি হযরত ইব্রাহীমের ছহিফা এ মাসের প্রথম কিংবা তৃতীয় তারিখে অবতীর্ণ হয়। অষ্টাদশ কিংবা দ্বাদশ তারিখে জবুর প্রাপ্ত হন হযরত দাউদ (আ.) ৬ষ্ঠ দিবসে তৌরাত পান হযরত মুসা (আ.)। দ্বাদশ কিংবা ত্রয়োদশ তারিখে ইঞ্জিল প্রাপ্ত হন হযরত ঈসা (আ.)। এরূপ সব আসমানী কিতাব এ মাসে নাজিল হওয়ায় সব জাতির নিকট এ মাস যেমন পবিত্র, তেমনি এর পবিত্রতা রক্ষার জন্য যতœবান হওয়া উচিত প্রত্যেককেই। পবিত্রতা বা সম্মান রক্ষার অর্থ যার ওপর রোজা রাখা ফরজ তার রোজা রাখা, অধীনস্ত অন্যান্যের রোজা রাখানো। সব রকমের অন্যায়, অশ্লীলতা, বেলেল্লাপনা, নোংরামী, চরিত্রবিধ্বংসী ও নৈতিকতাবিরোধী কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকা ও অন্যান্যেরও বিরত রাখার চেষ্টা করা, রাস্তা-ঘাটে প্রকাশ্য দিবালোকে ধূমপানসহ সর্বপ্রকার পানাহার বন্ধ রাখা।