
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরা উপকূলে জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের মাঝে ভিন্ন চিন্তা। ভোটারদের একমাত্র দাবী বাঁধ নেই ,ভোট নেই ,বাধ দেন ,ভোট নেন । টেকশই মজবুত ভেড়িবাদের আশ্বাসে আর আশ্বাসে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে সাতক্ষীরা সহ উপকূলের মানুষ। তাই এখন ভোটের সময় মুখ খুলেছেন উপকূলীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করা মানুষগুলো। আগামী সংসদ নির্বাচনে যে সমস্ত প্রার্থীরা উপকূল থেকে নির্বাচন করছেন তাদের কাছে উপকূলবাসীর একমাত্র দাবী টেকসই মজবুত ভেরি বাধ। এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কয়েকজন প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে। শ্যামনগর উপজেলা বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের,রাধাকান্ত , হরিদাস মন্ডল, রতিকান্ত মন্ডল, গণেশ মণ্ডল, তারাপদ মন্ডল, আব্দুল আজিজ গাজী, আব্দুর রহমান গাজী, আমিনুর রহমান, শামসুজ্জামান, ও রেজাউল করিম তাদের একটাই কথা ভোটের সময় প্রার্থীরা নানা ছলনা দিয়ে আমাদের কাছ থেকে ভোট নিয়ে যায় পরে আর আমাদের কথা মনে থাকে না বানের জলে ভাসি আমরা সাহেবরা থাকেন ঢাকার ফ্লাটে কেউবা থাকেন সরকারি ল্যামভবনে। তাই এবার আমরা যে প্রার্থী ভোট চাইতে আসুক না কেন উপকূলে টেকশই মজবুত ভেড়িবাধের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন বলে ওয়াদা করতে হবে জন সম্মুখে ।তারপরে ভোট তা নাহলে কেন্দ্রে যাব না ভোট দিতে। তারা আরো বলেন সেই যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এলাকা ছেড়ে অন্যত্রে চলে যেতে হয় তাহলে ভোট দিয়ে লাভ কি। যে সরকার ,জেএমপি ,যে মন্ত্রী হোক না কেন সুন্দর সুন্দর কথা আর প্রতিশ্রুতি দেয় সবাই কিন্তু ভোটের পরে আর উপকূলের এই অসহায় মানুষগুলোর কথা কেউ ভাবে না ধারেপাশে গেলেও তখন আর কেউ কথা বলতেও চায় না। না চেনার ভানে চিনতেও চায় না তখন বলে তোমার বাড়িটা কোথায় যেন। তাই এবার সময় এসেছে উপকূলবাসীর দাবি আদায়ের এই দাবির গ্যারান্টি দিতে হবে তারপরে ভোট। তারা আরো বলেন জনপ্রতিনিধিরা চায় উপকূলে টেকসই মজবুত ভেড়িবাদ না হলে তাদের ভালো হয়। কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে সরকারের দেওয়া কাড়ি কাড়ি টাকা জনপ্রতিনিধিরা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পিছনে অথবা টেকসই মজবুত ভেরিবাধ না করে নিজেদের পকেটে ভরে ।তাই এবার আর অত সহজে ভোট দিব না।ঘুরেফিরে সকলের ওই একটাই কথা—নাজুক বেড়িবাঁধ সারানোর ব্যবস্থা হলে আইলার মতো আবারও ভাসতে হতো না। আইলা, ফণী, বুলবুলের পর কত আশ্বাসই না এলো; কই, কেউ তো ফিরেও তাকালো না। সবখানে শুধু জোড়াতালি। এভাবে কী বাঁধ টিকানো যায়?
আম্পানে ভেসে গেল বাড়িঘর, চিংড়ি ঘের, ফসলি জমি—সবকিছু। মানুষগুলো আবার নিঃস্ব হয়ে পড়ল। একজন বললেন, কী দরকার ছিল তেল খরচ করে আমাদের কাছে এসে আশ্বাস বাণী শোনানোর! আরেকজন বললেন, বাঁধ সারানো হলে আমরা ঠিক বেঁচে যেতাম!
পশ্চিম উপকূলে খুলনার কয়রা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনির জনপদে কান পাতলে এখন এসব কথা ভেসে আসে। মানুষজন অনেক সমস্যার কথাই বলেন; তার মাঝে ঘুরেফিরে একই কথা। অন্য যেসব সমস্যা তৈরি হয়েছে; তার নেপথ্য কারণ এই নাজুক বাঁধ। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রবল ধাক্কা থেকে বাঁধ রক্ষা করা গেলে তেমন কোন সমস্যা হতো না। বাঁধ ভেঙে গ্রামের পর গ্রাম পানি ঢুকেছে। মানুষগুলোর পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। হাজার হাজার মানুষ নেমে গেছে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ মেরামতে। আম্পানের প্রভাব শেষ হওয়ার পর গত সপ্তাহখানেক ধরে চলছে মেরামতের কাজ। খুলনার কয়রা, সাতক্ষীরার গাবুরা, বুড়িগোয়লিনী, কাশিমাড়িসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণের ছবি আসছে একের পর এক।
‘আমরা আর কতকাল আশ্বাস বাণী শুনে শুনে অপেক্ষা করবো? জীবন তো শেষ হয়ে গেল।’ -কথাগুলো বলছিলেন গাবুরার বাসিন্দা খান আবু হাসান। নিজ এলাকার বর্ণনা তুলে তিনি বলছিলেন, দেশের মানচিত্রে গাবুরা উপকূলীয় অবহেলিত অঞ্চল। চারিদিকে নদী বেষ্টিত ৩৩ বর্গ কিলোমিটারে দ্বীপ। এখানে ৪৫ হাজার মানুষ প্রতিবছর নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা, নদী ভাঙন, জলাবদ্ধতার কবলে থাকে। মানুষজন জান ও মালের অনিশ্চয়তার মাঝে বসবাস করে আসছে বছরের পর বছর। উপর মহল এটা জানেন; তবুও কোন কাজ হয় না।
খান আবু হাসানের এই ক্ষোভ ঝরানো কথাগুলো কতটা সত্যি? তার কথার সূত্র ধরে খানিক পেছনে ফিরে গেলেই এর প্রমাণ মিলে। ২০০৯ সালের ২৫ মে। দিনটি ছিল সোমবার। সেদিন প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আইলা প্রলয়ে গাবুরার ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ৯০ শতাংশ। আইলার পরে বেশ কয়েকজন মন্ত্রী এসেছিলেন। প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন- বাঁধ হবে; সাইক্লোন শেলটার হবে। কিন্তু হয়নি। গত বছর এই এলাকার ওপর দিয়ে বয়ে যায় ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রলয়। তখন বাঁধ ছিঁড়েনি বটে; কিন্তু ক্ষতির পরিমাণ একেবারে কম ছিল না। ফণী চলে গেল; এলেন মন্ত্রীদ্বয়। একইভাবে আশ্বাস দিলেন তারাও। এই আশ্বাসের ফলোআপও আছে; অক্টোবরে এলাকা ঘুরে এসেছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ অন্যান্যরা। এতকিছুর পরেও আজ পর্যন্ত সে আশ্বাস গল্পই রয়ে গেছে। আর তারই ফল আম্পানের প্রলয়। এটা আম্পানের ছোট ধাক্কাই বলা যায়; কেননা ঘূর্ণিঝড়টি শক্তি কমিয়েই পশ্চিম উপকূলে আঘাত হেনেছে।
আম্পানের আঘাতের আগে বহুবার এই দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা ঘুরে দেখেছি নাজুক পরিস্থিতি। কোথাও বাঁধ আছে অর্ধেক; কোথাও মোটরবাইক তো দূরের কথা; পায়ে হেঁটে যাওয়াও কঠিন। কোথাও আবার দেখেছি স্থানীয় জনসাধারণ নিজেদের উদ্যোগে জোড়াতালি দিয়ে বাঁধ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। এই ইউনিয়নের ধ্বসে যাওয়া যে স্থানগুলোর নাম বার বার সংবাদ মাধ্যমে উচ্চারিত হচ্ছে, সেগুলো আমার চেনা পথ। পারশেমারী, চাঁদনিমুখা, নাপিতখালী, নেবুবুনিয়াসহ আশপাশের এলাকাগুলো কতটা নাজুক অবস্থায় রয়েছে বছরের পর বছর; তার ছবি আমার ফটোফোল্ডারে ঠাসা। স্বাভাবিক জোয়ারেও এসব স্থান জোড়াতালি দিয়ে টিকিয়ে রাখতে হয়। কোথাও বাঁশের পাইলিং, তার ভেতরে আবার পুরানো টিনের টুকরো দিয়ে পানি আটকানোর চেষ্টা। দৃশ্যমান সব ছবি। বলা যায় নাজুক বাঁধগুলোও টিকে আছে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ টিকানোর উদ্যোগের মধ্যদিয়ে। এলাকার মানুষেরা বছরের পর বছর প্রকৃতির সঙ্গে অনেকটা লড়াই করেই বাঁধ টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু আম্পান তাদের সর্বনাশ করে দিয়ে গেল।
এতো গেল শুধু গাবুরার কথা। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী, পদ্মপুকুর কাশিমাড়ী, আশাশুনি উপজেলার আনুলিয়া, শ্রীউলা, প্রতাপনগর, খাজরা, খুলনার কয়রা উপজেলার কয়রা সদর, উত্তর বেদকাশী, দক্ষিণ বেদকাশী, মহারাজপুর, পাইকগাছা উপজেলার দেলুটি, সোলাদানা, লস্কর এবং বাগেরহাটের রামপাল ও শরণখোলা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাঁধ বিধ্বস্ত হওয়ায় গ্রাম, জনপদ, চিংড়ির ঘের, ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। পশ্চিম উপকূল ছাড়াও দক্ষিণের পটুয়াখালী, ভোলা জেলায়ও বাঁধ বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এরফলে এই সময়ের সকল ফসল নষ্ট হয়েছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে চিংড়ির ঘেরে।
সূত্র বলছে, ষাটের দশকে নির্মিত পশ্চিম উপকূলের বাঁধগুলো ক্রমেই ক্ষয়ে যাচ্ছিল। আশির দশকে এই এলাকায় চিংড়ি চাষের শুরুতে বাঁধ আরও নড়বড়ে হয়ে পড়ে। এরসঙ্গে লবণপানির ধাক্কা, জোয়ারের পানির প্রবল চাপ এই বাঁধকে নাজুক করে তোলে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে এইসব বাঁধ মেরামতের কাজ হলেও যথাযথভাবে কাজ না হওয়ায় বাঁধের এই বেহাল দশা।
এ প্রসঙ্গে পানি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, উপকূল অঞ্চলের বেড়িবাঁধগুলো অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় আছে। এর উচ্চতা অনেক কম। এক সময় ১৫ ফুট উচ্চতার বাঁধ করা হয়েছে। তখন ঘূর্ণিঝড়ের এই প্রভাবের চিন্তা বিবেচনায় ছিল না। আগামীতে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বাড়বে কীনা বলা মুশকিল; তবে জলোচ্ছ্বাসের পানির উচ্চতা বাড়বে; এটা বলা যায়। সে কারণে বাঁধের উচ্চতা অন্তত তিন মিটার বাড়াতে হবে। সমুদ্রের দিকে বাঁধ করতে হবে। এক সময় বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে পানি কমিটি করা হয়েছিল। এখন তা সেভাবে কার্যকর নয়। একে কার্যকর করতে হবে। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ভাগ করে দিতে হবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, উপকূলের প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কিলোমিটার বাঁধ আম্পানের মত ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলার জন্য উপযুক্ত নয়। প্রতি অর্থ বছরে বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে যে অর্থ বরাদ্দ হয়; তা পর্যাপ্ত নয়। এজন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি বিদেশি সাহায্য নিয়ে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবীর বিন আনোয়ার দাবি করেন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাজে যেসব দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ আছে; তা আগের চেয়ে অনেকটাই কমে এসেছে। দুর্নীতি রোধে নানামূখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এখন স্বচ্ছতার সঙ্গেই সকল প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
উপকূলের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলা পরবর্তী সময়ের ঝুঁকি মোকাবেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ‘কোস্টাল এমব্যাকমেন্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’ গ্রহন করে; যা সংক্ষেপে সিইআইপি নামে পরিচিত। পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের প্রথম পর্যায় ২০১৯ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু জমি না পাওয়া, নদীর ভাঙন ইত্যাদি কারণে প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে এ সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ হওয়ার কোন লক্ষণ নেই। এ প্রকল্পের আওতায় খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরগুনা, পটুয়াখালী ও পিরোজপুরে বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। ৩ হাজার ২৮০ কোটি টাকার প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ব্যয় হচ্ছে ৬৯৬ কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে কোস্টাল এমব্যাকমেন্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, সিডর ও আইলা পরবর্তী সময়ে উপকূলীয় এলাকায় যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে; তা কমিয়ে আনাই এ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। আমরা কাজ করছি। কোন স্থানের কাজ শেষ হয়েছে, কোন স্থানের কাজ কিছু বাকি রয়েছে। বাগেরহাটের শরণখোলায় প্রকল্পের আওতায় নির্মানাধীন একটি বাঁধ আম্পান আঘাতের আগেই ধ্বসে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নদীর ভাঙনের কারণে আগে থেকেই সেখানকার অবস্থা নাজুক ছিল। প্রকল্প প্রণয়নের সময়ে নদী শাসনের বিষয়টি বিবেচনায় ছিল না। সে কারণে প্রকল্পের কাজ শেষ হতে বিলম্বিত হচ্ছে। সময় এ বছরের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে; আরও এক বছর বাড়াতে হতে পারে।
সরকারের ডেল্টা পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে দেশের দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় এলাকার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কার্যক্রম। ২৭ হাজার ৭৩৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে থাকা উপকূলীয় অঞ্চল দেশের অন্যান্য বিশেষায়িত এলাকা থেকে অনেক বড়। ডেল্টা পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চলের বিদ্যমান পোল্ডারের কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ঝড়বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ও লবনাক্ততার অনুপ্রবেশ মোকাবেলা করা হবে; পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বন্যার ঝুঁকি হ্রাস করা হবে ইত্যাদি। কিন্তু এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে উপকূলীয় বাঁধ শক্ত ও উঁচু করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অথচ বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রকল্প পরিকল্পনা, আবেদন, অনুমোদন এবং বাস্তবায়নেই দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। ফলে বাঁধ সংস্কার প্রকল্পগুলো ফলপ্রসূ হচ্ছে না।
বাঁধের মালিকানা জনগণকে দেওয়ার দাবি তুলেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও দুর্যোগ ফোরামের আহবায়ক গওহার নঈম ওয়ারা। তিনি বলেন, দেশের মালিকানা জনগণকে না দিলেও মানুষের জীবন বাঁচাতে অন্তত বাঁধের মালিকানা জনগণকে দিতে হবে। বাঁধ কীভাবে সংরক্ষণ করতে হবে; সেটা জনগণই ঠিক করবে। ভোলার চরফ্যাসনে জনঅংশগ্রহণে বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণে সুফল পাওয়া গেছে। আর এখন জরুরি ভিত্তিতে বাঁধ ভেঙে যেসব স্থান দিয়ে পানি ঢুকেছে; অবিলম্বে সে পানি সরাতে হবে। তা না হলে বাঁধের ভেতরের কৃষি নষ্ট হয়ে যাবে। মানুষ চরম সংকটের মুখোমুখি হবে। কৃষিকে আমাদের মূল কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে।
উপকূল অঞ্চলে বিদ্যমান বাঁধগুলোর সংস্কার এবং নতুন বাঁধ তৈরিতে কমিউনিটির নেতৃত্বাধীন বাঁধ তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টান্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ক্লাইমেট ফিন্যান্স এনালিষ্ট এম. জাকির হোসেন খান।
তিনি বলেন, এ পদ্ধতিতে বাঁধ সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হলে একদিকে যেমন খরচ অনেক কমবে; একইসাথে মানুষের মালিকানা প্রতিষ্ঠা পাবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে তদারকির দায়িত্ব দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড শুধুমাত্র বাঁধের ডিজাইন প্রণয়ন ও স্থানীয় নাগরিকদের কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে। যেকোন দুর্যোগে স্থানীয় কমিউনিটিই পারে শত বছরের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কার্যকর প্রাণ ও প্রকৃতি বান্ধব দুর্যোগ সহিষ্ণু টেকসই উন্নয়ন তথা কার্যকর জলবায়ু অভিযোজন নিশ্চিত করতে।
বাঁধ বিপন্ন এলাকার মানুষেরা বলছেন, এ অঞ্চলের মানুষের জীবন জীবিকা নির্ভর করে বাঁধের ওপর। বাঁধের ক্ষতি হলে তাদের সব ভেসে যায়। ফসল নষ্ট হয়, বাড়িঘর নষ্ট হয়। জরুরি খাবার না দিয়ে বাঁধটা শক্ত করে বানিয়ে দেওয়ার দাবিটাই তাদের কাছে প্রধান। বাঁধের ফাঁদ জনজীবন বিপন্ন করে তুলেছে।জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে নদী ভাঙ্গনের মত নানা সমস্যায় ভুগছে উপকূলীয় জনপদ সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ। নদী বেষ্টিত এই দ্বীপ ইউনিয়নের মানুষকে পুনর্বাসন করতে সরকার হাতে নিয়েছে প্রায় ১০২০.১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বহুল প্রতীক্ষিত টেকসই বাঁধ নির্মাণ মেঘা প্রকল্প। প্রকল্পটি এই এলাকার মানুষদের জন্য এক নতুন আশার আলো হয়ে এসেছে। বাঁধ নির্মাণ শুধু দুর্যোগ প্রতিরোধই করবে না, এই প্রকল্প দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক, পর্যটন শিল্প, সামাজিক ও পরিবেশগত উন্নয়নের পথ সুগম করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মেঘা প্রকল্পের আওতায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে উপকূলীয় মানুষের যেমন বাসস্থান, মৎস্যঘের রক্ষা পাবে তেমনি পর্যটন শিল্পের দুয়ার খুলছে। বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ হলে সড়ক পথে সুন্দরবনে পর্যটক এর সংখ্যা দিনদিন বৃদ্ধি পাবে। তাছাড়া এই অঞ্চলে গড়ে উঠবে রিসোর্ট, রেস্তোরাসহ পর্যটন নির্ভর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এতে করে উপকূলের মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির হবে।
জানা যায়, ২০০৯ সালের ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের মানুষের জীবনে এক বিভীষিকাময় অধ্যায় নেমে আসে। ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে ইউনিয়নের পাউবো’র বেড়িবাঁধ সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। প্রাণ হারায় বহু মানুষ। গৃহহীন হয় পড়ে সহস্রাধিক পরিবার। গাবুরার জনপদ পরিণত হয় এক বিশাল লোনা পানির জলাভূমিতে। এরপর একে একে ঘূর্ণিঝড় মহাসেন, রোয়ানু, আম্পান, ইয়াস ও সিত্রাং প্রতিটি দুর্যোগের সময়ই বেড়িবাঁধ ভেঙে গাবুরা ইউনিয়ন বারবার প্লাবিত হয়েছে।
বছরের পর বছর দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা এই উপকূলীয় মানুষ আজ নতুন করে আশা ও নিরাপত্তার আলো দেখতে পাচ্ছেন। পাউবো কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন টেকসই বাঁধ নির্মাণের মেঘা প্রকল্প ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পেরেছে। ২০২৪ সালে ঘূর্ণিঝড় রেমাল আঘাত হানলেও গাবুরা ইউনিয়নের কোথাও বেড়িবাঁধ ভাঙেনি। এলাকার মানুষজন ছিল নিরাপদে, অক্ষত ছিল বাড়িঘর। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে প্রথমবারের মতো গাবুরার বাসিন্দারা বুঝতে পেরেছেন একটি দৃঢ় ও পরিকল্পিত বাঁধ তাদের জীবন কতটা পরিবর্তন করতে পারে।
গাবুরা ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরেই নদীভাঙন ও প্লাবনের শিকার। টেকসই বাঁধ নির্মাণের ফলে উপকূলীয় ভাঙনের ঝুঁকি কমে এসেছে এবং মানুষজন আর ঘরবাড়ি হারানোর আতঙ্কে থাকবে না। বাঁধটি মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ীভাবে নির্মিত হচ্ছে যাতে এটি আগামী কয়েক দশক ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে সক্ষম।
নদীভাঙনের ঝুঁকি কমার পাশাপাশি এলাকায় জমির চাহিদা ও মূল্য বাড়তে শুরু করেছে। টেকসই বাঁধের কারণে নিরাপদ বসবাস নিশ্চিত হলে স্থানীয় বাসিন্দারা আরও স্থায়ী ঘরবাড়ি নির্মাণে আগ্রহী হয়ে উঠবে। এতে স্থানীয় নির্মাণ খাতেও গতি আসবে এবং নতুন ব্যবসা ও পেশার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা কাদের গাজী বলেন, “আইলার সময় আমি সব হারিয়েছি। তখন মনে হতো আমরা শুধু মরার জন্য বাঁচি। কিন্তু এখন ঝড়ের সময় বাড়িতেই থাকি। কোনো ভয় লাগেনা। এখন মনে হয় সত্যিই কিছু একটা বদলেছে।”
স্থানীয় নারী প্রতিনিধি রাশিদা খাতুন বলেন, “আগে পানির জন্য ২ কিলোমিটার হাঁটতাম। এখন টেকসই বাঁধ হওয়ায় গ্রামেই সুপেয় পানি পাচ্ছি। এটি আমাদের জীবনের বড় পরিবর্তন। বাঁধের নিরাপত্তা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে গাবুরা ইউনিয়নের পাশেই থাকা সুন্দরবন হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ছে স্থানীয় হোটেল, রিসোর্ট, খাবার দোকান ও নৌবিহার কেন্দ্রিক ছোট ব্যবসার উন্মেষ ঘটছে, যা তরুণদের কর্মসংস্থানেও ভূমিকা রাখতে পারবে।
গাবুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিএম মাছুদুল আলম জানান, এই মেঘা প্রকল্পটি গাবুরার মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়ায় গাবুরাবাসীর মনে স্বস্তি ফিরেছে। এই ইউনিয়নের মানুষ এখন খুবই নিরাপদবোধ করছে। প্রল্পটি এই এলাকার মানুষদের জন্য এক নতুন আশার আলো হয়ে এসেছে
গাবুরা টেকসই বেড়িবাঁধ প্রকল্পের তত্তা¡বধানকারি সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডে বিভাগ-১এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আশরাফুল আলম জানান, এই প্রকল্পে ২৮ কিলোমিটার টেকসই বাঁধ, ৮ কিলোমিটার নদীর তীর সংরক্ষণ, ৫টি নতুন স্লুইচ গেট, ১১টি ইনলেট এবং ৮টি খাল পুনঃখননের কাজ শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে কাজের অগ্রগতি প্রায় ১০০ শতাংশ। বর্তমানে বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণের মত টুকটাক কাজ চলছে। ইতিমধ্যে এই এলাকার মানুষ এই প্রকল্পের সুফল পেতে শুরু করেছেন।সাতক্ষীরার উপকুলীয় এলাকার জনমানুষের মাঝে প্রকৃতির রুদ্ররোষ আর তান্ডবলীলা প্রতিনিয়ত জাগ্রত। অতীতের আর নিকট অতীতের হারিকেন, সিডর, আইলা, বুলবুল নামীয় জ্বলোচ্ছ¡াস এবং ঘুর্ণিঝড়ের মুহুর্ত বারবার পার করেছে। সম্পদ আর জীবন হানির বিভিষিকাময় স্মৃতি রোমানর করে চলেছে। সাতক্ষীরার উপকুলীয় এলাকার হৃদয় স্পর্শী, মর্মান্তিক ঘনঘটা যেমনটি শঙ্কিত করে চলেছে অনুরুপ ভাবে উপকুলীয় এলাকায় টেকসই ভেড়িবাঁধ নির্মান কাজ শুরু হওয়ায় আশায় বুক বাঁধতে শুরু করেছে। দেশের সর্ব দক্ষিনের উপজেলা শ্যামনগর এই উপজেলার সর্বাপেক্ষা ঝুকিপূর্ণ এবং প্রকৃতির হিংস্রতায় বারবার ক্ষত বিক্ষত ইউনিয়ন গাবুরা, সুন্দরবনের কোলঘেষে বঙ্গপোসাগরের অদুরের গাবুরাকে দ্বীপ ইউনিয়ন ও বলা হয়। ইতিহাস খ্যাত গাবুরা বহুবারই জলস্রোত এবং ঘূর্ণিঝড়ে লন্ড ভন্ড হয়েছে। এখানেই শেষ নয় চারিদিকে লবনাক্ত পানি বেষ্টিত, আর আগ্রাসী পানির রাক্ষুসে ছোবলে সারা বছরই অস্তিত্ব হুমকির মুখে দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা। গাবুরার প্রকৃতির শক্তির কাছে অসহায় জনসমষ্টির প্রত্যাশা ছিল স্থায়ী তথা টেকসই ভেঁড়িবাঁধ নির্মানের মাধ্যমে গাবুরাকে রক্ষা করা। বানের স্রোতে এই ইউনিয়নের ফসলিজমি, চিংড়ী ঘের ডুবে নদী আর সাগরের সাথে একাকার হয়েছে। গবাদিপশু ভেসে গেছে। হাজার মানব সন্তান আশ্রয়হীন হয়েছে। কঠিন, কঠোর জীবন সংগ্রামের পর মানব সন্তানরা আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু প্রতিনিয়ত, প্রতিমুহুর্তে চোখে মুখে আতঙ্ক, আমাবশ্যার কালোমেঘের ঘনঘটা কারন প্রকৃতির অসীমক্ষমতা মোকাবিলা করার সাধ্য তাদের নেই। দিনে দিনে গাবুরার মানুষ যেমন সর্বস্ব হারিয়েছে। ঘুরে দাঁড়ানোর প্রানন্তকর প্রচেষ্টা চালিয়েছে অনুরুপ ভাবে বসতবাড়ী, সর্বপরি ভূ-খন্ড বিলীন হয়েছে। আশাবাদী, খুশি, নতুন ভাবে বাঁচবার, বসবাসের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে গাবুরা বাসি ইতিমধ্যে গাবুরা রক্ষায় হাজার কোটি টাকার অধিক ব্যয়ে মেঘা প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। পঁয়তালিশ হাজার জনগোষ্ঠীর গাবুরা অপরুপ সৌন্দর্য্যরে অধিকারী কিন্তু ছিল প্রাণহীন, নানান ধরনের বিপদের আশঙ্কা কিন্তু বাস্তবতা হলো হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গাবুরা রক্ষায় মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়ায় দ্বীপ ইউনিয়নটির জন মানুষের সীমানা পেরিয়ে সর্বত্র উদ্বাস, উৎসব আর আনন্দের ছোয়া। মহাকাজ প্রত্যক্ষ করতে ইতিমধ্যে গাবুরার দুর্গম এলাকা ও নির্মানাধিক কর্মযজ্ঞ পরিদর্শন করেছেন গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব নাজমুল আহসান। গত বছরে গাবুরার জনপদ তথা গাবুরাকে রক্ষা করতে এক হাজার বিশ কোটি টকার কাজ শুরু হয়। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের গাবুরা রক্ষার টেকসই বাঁধ নির্মান পরিদর্শনের পর জন মানুষের মাঝে কাজের গুনগত মান নিয়ে ও আশার সঞ্চার হয়েছে। এলাকা বাসি জানান সচিব গাবুরার জেলেখালী ও নেবুবুনিয়া সহ অপরাপর দুর্গম এলাকায় শুরু হওয়া মেগা প্রকল্পের কাজ পরিদর্শন করতে এবং কাজের গুনগত মান সরেজমিন প্রত্যক্ষ করেন এ সময় তিনি নদীর মধ্যভাগে স্থাপনকৃত কার্গোতে অবস্থান নিয়ে বালুভর্তি জিও ব্যাগের পরিমান, গুনগতমানে যাচাই করেন। পানি সম্পদ সচিব পাঁচ নম্বর পোল্ডারের অধিকতর ঝুকিপর্ণ দুর্গাবাটিক এলাকা পরিদর্শন কারেন। প্রকাশ্যে তিনি ঘোষণা দেন কার্যদেশ অনুযায়ী সঠিকভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পন্ন হবে। গাবুরার অধিবাসিদের সুদিন আসছে, মেগা প্রকল্পটি পয়তালিশ হাজার জনসমষ্টির গাবুরার জন্য আর্শীবাদ। শ্যামনগরের গাবুরা বাসি আগামী দিনের প্রকতির রুদ্র রোষ হতে বাঁচতে চলেছে। শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী, কৈখালী পদ্মপুকুর হুমকির মুখে থেকে যাচ্ছে। বিগত দিনের প্রকৃতির হিংসাত্মক তৎপরতায় পাতাখালি, বুড়িগোয়ালীনী, কৈখালী, লন্ডভন্ড হয়েছে। খোলপেটুয়ার পানিতে ভেঙ্গেছে, ভেড়িবাঁদ একই ভাবে খোলপেটুয়ার রাক্ষুসে পানি উলেখিত জনপদগুলোকে করেছে বিবর্ণ, ভাঙ্গন অব্যাহত আছে। উপকুলীয় এলাকার জনগোষ্ঠী, সাতক্ষীরার বিশলক্ষাধীক জনমানব গাবুরার ন্যায় অন্যান্য ঝুকিপূর্ণ এলাকার টেকসই ভেড়িবাঁধ নির্মানের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে।সাতক্ষীরার শ্যামনগরে বেড়িবাঁধের দুপাশে বাস্তুচ্যুত হয়েছে হাজারো পরিবার। জানা যায়, উপজেলার দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার আইলা, সিডরসহ বেশ কিছু দুর্যোগে বিধস্ত। ইউনিয়নটিতে মেগা প্রকল্পের ৩০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারা অব্যাহত রয়েছে। স্মার্ট বাংলাদেশের মডেল ইউনিয়ন হিসেবে গাবুরা ইউনিয়নকে সরকার এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে ঠিকাদার নিয়োগ দিয়েছেন। ইতোমধ্যে বেশ কিছু ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেগা প্রকল্পের কাজও শুরু করেছেন।
সরজমিনে দেখা গেছে, গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা, চাঁদনীমুখা, হরিশখালি ডুমুরিয়াসহ বেশ কিছু এলাকার বেড়িবাঁধের ধারে বসবাসরত মানুষের ঘরবাড়ি ভেঙে অন্যথায় সরে যাওয়ার জন্য আদেশ করেছেন কর্তৃপক্ষ। এরই ধারাবাহিকতায় গত কয়েক দিন বসতি থেকে ঘর বাড়ি ভাঙার কার্যক্রম শুরু করেছে।
তবে ওই এলাকার বসতি মানুষের বাস্তভিটা থেকে চ্যুত হয়ে যাওয়ায় পরবর্তী সময়ে পরিবার পরিজন নিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই হচ্ছে না বেশ কিছু পরিবারের। অনেকে অভিযোগ করে বলেন, বেড়িবাঁধে ঘর বেঁধে সারা জীবন বসত করে আসছি। বাপ-দাদাদের পৈত্রিক সম্পত্তি না থাকায় এসব স্থানে ঘর বেঁধে বসবাস করতাম। হঠাৎ এই ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়ায় অন্যখানে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় আজ আমরা গৃহহারা।
৯ নম্বর সোরা গ্রামের ইয়াকুপ শেখ বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকে বাস করে আসছি। আজ আমাদের ঘর ভেঙে দিতে হচ্ছে। আমরা এখন কোথায় যাব। সরকার আমাদের জন্য ৯ নম্বর সোরার চরে গুচ্ছগ্রাম করে দিক।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, এই বেড়িবাঁধের কারণে আইলার মতো ক্ষতিগ্রস্ত হবে গাবুরাবাসী।
গাবুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, ৯ নম্বর সোরা নদীর চরে হাজার হাজার বিঘা জমি পড়ে আছে। সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি গাবুরায় গুচ্ছগ্রাম তৈরি করে দিত তাহলে এই মানুষগুলো ঠাঁই খুজে পেত।খুলনার দাকোপ উপজেলার বটবুনিয়া এলাকার ষাটোর্ধ্ব গৃহিণী শিখা রানি সরদার। গত পাঁচ বছরে চারবার তার বাড়ি বেড়িবাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে। তিনবার ঝড়ে আর একবার অতিরিক্ত জোয়ারের চাপে ভেঙে পড়ে বাঁধ। প্রতিবারই ঘরবাড়ির সঙ্গে সব স্বপ্নও নদীতে ভেসে গেছে। কোনো আসবাবপত্রই টিকিয়ে রাখতে পারেননি তিনি। এখন স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পে।
খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে নদী ভাঙনে তীরবর্তী অগণিত মানুষ চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন।
শিখা রানি সরদার বলেন ‘আমার বাড়ি গত পাঁচ বছরে চারবার ভেঙে গেছে। এখন আর নিজের কোনো ঘর নেই, বাধের উপরই থাকতে হয়। দুর্বল বেড়িবাঁধ পানির চাপ বাড়লেই ভেঙে যায়। আমরা চাই শক্ত ও স্থায়ী বাঁধ। না হলে বারবার আমাদের ঘরবাড়ি নদীতে ভেসে যাবে।’
শুধু শিখা রানি নন, খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের নদী তীরবর্তী অগণিত মানুষ একই দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন। খুলনার পাইকগাছার দেলুটি ইউনিয়নের কালিনগর ও হিতামপুর, দাকোপের বটবুনিয়া ও আচাবুনিয়া, সাতক্ষীরার আশাশুনির মরিচ্চাপ নদীর তীরবর্তী অংশ এবং বাগেরহাটের শরণখোলার স্মরণখোলা এলাকাসহ অন্তত ১২টি ইউনিয়নের ২০ কিলোমিটার এলাকায় নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে অর্ধশত কিলোমিটার বেড়িবাঁধ এখন ঝুঁকিপূর্ণ। যে কোনো মুহূর্তে বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হতে পারে বিস্তীর্ণ জনপদ।

