
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) জুমার নামাজের পরের এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার আনুলিয়া ইউনিয়ন। এতে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় স্মরণকালের অন্যতম তীব্র ঝাঁকুনি অনুভূত হয়। জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে ও মানুষ শক্ত কম্পন টের পান বলে জানা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জুমার নামাজের আগে মসজিদে অবস্থানরত অনেকে আতঙ্কিত হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী এ ভূমিকম্পে শহর ও গ্রাম, দুই এলাকাতেই মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে খোলা জায়গায় আশ্রয় নেন।
ভূমিকম্পের সময় তালা উপজেলার একটি মাটির ঘর আংশিক ধসে পড়ে কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের প্রাণহানি বা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন বা সুপ্ত হলেও পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্প-প্রবণ জোনে বাংলাদেশ ও আশপাশ অঞ্চলের অবস্থান। ভূমিকম্প কখন কাঁপাবে দিনক্ষণ জানিয়ে পূর্বাভাস দেয়া যায় না। তবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, ভূতাত্ত্বিক গঠন, ভূগর্ভে পরিবর্তনের আলামত এবং এ অঞ্চলে ভূমিকম্পের ইতিহাস বিবেচনায় বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেন, যে কোনো সময়েই শক্তিশালী ভূমিকম্প সংঘটিত হতে পারে। জাপান সরকারের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকা’র অর্থায়নে পরিচালিত সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (সিডিএমপি) জরিপ গবেষণায় জানা গেছে, বাংলাদেশ ঘেঁষে ভেতরে-বাইরে ভূগর্ভের পাঁচটি ফাটল বা ফল্ট লাইন চলে গেছে। সেখানে ক্রমেই জমা হয়েছে প্রবল শক্তি। প্রচ- ভূমিকম্পের মধ্যদিয়ে সেই শক্তি ওপরের দিকে বের হয়ে আসতে পারে যে কোনো সময়েই। সেখান থেকে উৎপত্তি হয়ে রিখটার স্কেলে ৭ থেকে ৮ দশমিক ৫ মাত্রায় পর্যন্ত ভয়াল ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১১ সালে পরিচালিত সিডিএমপি’র আন্তর্জাতিক গবেষণা টিমের অন্যতম সদস্য ছিলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী চুয়েট-রুয়েট-ইউএসটিসি’র সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম।
বাংলাদেশ সংবাদ বিশ্লেষণ
, বন্দরনগরী, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, রাজশাহীসহ বড় শহর-নগর-শিল্পাঞ্চলে অগণিত বাড়িঘর ভবন নির্মিত হয়েছে। সেসব ঝুঁকিপূর্ণ ভবন জরুরি ভিত্তিতে শনাক্ত ও কারিগরি উপায়ে শক্তি বৃদ্ধি (সিসমিক রেট্রোফিট) করার তাগিদ দেয়া হয়েছিল সিডিএমপি জরিপের সুপারিশে। গবেষণার জনগুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ও সুপারিশমালা আজো বাস্তবায়ন হয়নি, বরং বাক্সবন্দি রাখা হয়েছে। প্রকৌশলী ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ভূমিকম্প নিজেই মানুষ মারে না, দুর্বল ভবন-কাঠোমো-আসবাবপত্র ধসে পড়ে মৃত্যু ঘটে। যথেচ্ছ অপরিকল্পিত নির্মিত ভবনগুলো তীব্র ভূমিকম্পে তাসের ঘরের মতো ছারখার হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি জানান, ছোট ও মাঝারি মাত্রায় ঘন ঘন যে ভূকম্পন হচ্ছে সেগুলো যে কোনো সময়েই ভয়াবহ দুর্যোগ বা বিপর্যয়ের আগাম সংকেত দিচ্ছে।
এবং কাছাকাছি জায়গায় ৩১ ঘণ্টার মধ্যেই চার দফায় হালকা ও মাঝারি ভূমিকম্প হয়েছে।
আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, গত প্রায় ৫ বছরে দেশে ৩৯টি ভূকম্পন রেকর্ড হয়েছে। এরমধ্যে ১১টির উৎপত্তিস্থল (ইপি সেন্টার) রাজধানী ঢাকা থেকে ৮৬ কি.মি. পরিধির মধ্যে। অর্থাৎ ২৮ শতাংশই ঢাকায় অথবা সন্নিকটে। ছোট-মাঝারি ভূকম্পনগুলো বড় ধরনের বিপদ ঘনিয়ে আসার আগেই সজাগ হওয়ার জন্য ‘আই ওপেনার’, ‘ওয়েকআপ কল’ অর্থাৎ ‘ইশারা’। এর ধারাবাহিকতায় শক্তিশালী ভূমিকম্প সংঘটিত হতে পারে।
বাংলাদেশ ও সংলগ্ন আসামসহ উত্তর-পূর্ব ভারত, নেপালের ভূকম্পন বলয়ে বিগত ১৫০ বছরের মধ্যে রিখটার স্কেলে ৭ এবং ৮ মাত্রায় সাতটি ভয়াল ভূমিকম্প আঘাত হানে। যা ‘গ্রেট সেভেন আর্থকোয়েক’ নামে পরিচিত। এরমধ্যে ২টি ভূমিকম্পের উৎস বাংলাদেশ ভূখ-ের ভেতরেই। আর ৫টির উৎস ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ২৫০ কি.মি. ব্যবধানে।
কেন ভূমিকম্প কেমন ঝুঁকি
চুয়েট-এর ভূমিকম্প প্রকৌশল গবেষণা কেন্দ্রের সমন্বয়ক বিশিষ্ট ভূতাত্ত্বিক ভূমিকম্প বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মিজ এই তিনটি টেকটোনিক প্লেটের (ভূ-পাটাতন) সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান। এ অঞ্চলের বিট বা প্লেটের নিচে রয়েছে পাথরশিলা ও নরম পদার্থ। বিটগুলো যখন সরে যায় বা নড়চড় করে, একটি অন্যদিকে ধাক্কা দেয়। তখন ভূ-গর্র্ভে শক্তি জমা হতে থাকে। বার্মিজ ভূ-পাটাতন বছরে গড়ে ২ সেন্টিমিটার এবং ইন্ডিয়ান প্লেট ৬ সে.মি. করে নড়াচড়া করছে। এতে জমা হওয়া শক্তি বা এনার্জি যখন শিলার ধারণ ক্ষমতা অতিক্রম করে, তখনই সেই শক্তি কোনো ফাটল লাইন দিয়ে বেরিয়ে আসে। এর ফলেই সৃষ্টি হয় ভূমিকম্প।
ভূ-পাটাতনের সীমানায় যে পাঁচটি প্রধান ফাটল লাইন (ফল্ট) বা চ্যুতি হচ্ছে এক. প্লেট বাউন্ডারি ফল্ট লাইন-১ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে ভারতীয় ও বার্মা (মায়ানমার) প্লেটের মাঝামাঝি অবস্থিত। এখানে দুটি প্লেট পরস্পরের দিকে ঠেলছে। বাংলাদেশের জন্য এটি বিপজ্জনক ভূমিকম্পের উৎস। যেখান থেকে রিখটার স্কেলে ৮ দশমিক ৫ মাত্রায় পর্যন্ত তীব্র শক্তিশালী ভূমিকম্প সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। দুই. প্লেট বাউন্ডারি ফল্ট-২ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সক্রিয় ভূ-ফাটল লাইন। এটি ভারতীয় ও বার্মা প্লেটের মধ্যবর্তী অঞ্চলের অংশ। এখানে ফাটলে প্লেটের চাপ ও শক্তি ক্রমাগত জমা হয়েছে। রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রায় পর্যন্ত প্রচ- ভূমিকম্পের উৎস হতে পারে এটি।
তিন. প্লেট বাউন্ডারি ফল্ট-৩ দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও মায়ানমারে সক্রিয় ফল্টলাইন, যা ইন্দো-বার্মা সুইচ-জোনের একটি গভীর টেকটনিক কাঠামো। সেখানে ভারতীয় প্লেট পূর্বদিকে ঠেলছে, বার্মা প্লেট তার প্রতিক্রিয়ায় সরে যাচ্ছে। এর ফলে এটি এ অঞ্চলে ৮ দশমিক ৩ মাত্রায় ভূমিকম্পের সম্ভাব্য উৎস।
চার. মধুপুর ফল্ট হচ্ছে রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে কাছে এবং বাংলাদেশের কেন্দ্রস্থলের ভূ-ফাটল লাইন। কঠিন ভূ-তাত্ত্বিক গঠনে এটি গাজীপুর ও টাঙ্গাইল অঞ্চলের নিচ দিয়ে উত্তরে শেরপুর-জামালপুরের দিকে প্রসারিত হয়েছে।
ভূ-তত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উৎসে মাঝারি থেকে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে। এখান থেকে রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৫ মাত্রায় ভূকম্পন হতে পারে। রাজধানী ঢাকা ও আশপাশে ঘনবসতি এবং দুর্বল অবকাঠামোর কারণে মধুপুর ফল্ট থেকে ভূমিকম্প-ঝুঁকি সর্বাপেক্ষা বেশি। ঝুঁকিতে বড় ভূমিকা রাখে।
পাঁচ. ডাউকি ফল্ট বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল সিলেট হয়ে দক্ষিণে ও ভারতের আসাম-মেঘালয়ে পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত। এটি ভারতের শিলং প্লেল্ট দিয়ে নেমে এসে বাংলাদেশের সমতলে যুক্ত। অবিরাম চাপে এ অঞ্চলে প্রবল শক্তি জমা হচ্ছে। এর ফলে বৃহত্তর সিলেট, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা এবং ঢাকার বড় অংশ পর্যন্ত ভূমিকম্পের ঝুঁকি তৈরি করছে বলে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা চিহ্নিত করেছেন। অতীতে ১৮৯৭ সালে এ অঞ্চলে ভয়াল ‘গ্রেট আসাম আর্থকোয়েক’ সংঘটিত হয়। ডাউকি উৎস থেকে রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রায় পর্যন্ত ভূমিকম্প হতে পারে।
বাংলাদেশ সংবাদ বিশ্লেষণ
ও আশপাশ অঞ্চলে ৭ থেকে ৮ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হতে পারে যে কোনো সময়েই।
আছে ভয়-ভীতি, বেহাল প্রস্তুতি
ভূমিকম্প সম্পর্কে সাধারণ জনগণের মাঝে আছে অমূলক ভয়-ভীতি, আতঙ্ক। ভূকম্পন হলেই হুড়োহুড়ি করে বাঁচার চেষ্টা। সরকারি প্রশাসনের মাঝে শুরু হয় কিছুদিনের দৌঁড়-ঝাঁপ। এরপর আবারো সবাই নির্বিকার। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে শক্তিশালী মাত্রায় ভূমিকম্প হয়নি। এ কারণে এ দেশে অনেকটাই অচেনা ভয়াল দুর্যোগটি। এর মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা, সাবধানতা, সরকারের তরফ থেকে নিয়মিত সতর্কীকরণ ও আগাম প্রস্তুতি তৎপরতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পূর্ব-প্রস্তুতি ও সতর্কতার ক্ষেত্রে নেপাল, পাকিস্তানের তুলনায়ও পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। এ প্রসঙ্গে গতকাল বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মইনুল ইসলাম ইনকিলাবকে বলেন, দুর্বল ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে বড়সড় ভূমিকম্প হলে দেশের অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলো বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রাজধানী ঢাকা।
২০১০ সালে হাইতির ভয়াবহ ভূমিকম্পে উদ্ধার কাজে বাংলাদেশ মেডিক্যাল টিমের সদস্য বিশিষ্ট নিউরোসার্জন প্রফেসর ডা. এস এম নোমান খালেদ চৌধুরী জানান, বাংলাদেশের বাড়িঘর ভবন কাঠামোর বেহালদশার সঙ্গে হাইতির মিল রয়েছে। তবে সরু রাস্তাঘাট সড়কের কারণে
, চট্টগ্রাম নগরীর ঝুঁকি আরো বেশি। বড় আকারে ভূমিকম্প হলেই হাসপাতাল-ক্লিনিক, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় মারাত্মক বিপর্যয় ঘটবে। এহেন নাজুক অবস্থা উপলব্ধি করে এখনই সরকারকে জরুরি সেবা ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার উপায় বের করতে হবে। অন্যথায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে মানবিক বিপর্যয় ঘটবে।
প্রফেসর ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ভূমিকম্পের দুর্যোগ মোকাবেলায় যথাযথ প্রাক-প্রস্তুতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এখনও আমরা সঠিক অনুসরণ করছিনা। দেশের প্রকৌশলী, স্থপতি, নির্মাতা ও বাড়ির মালিকদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি হয়নি। ভূমিকম্পে সৃষ্ট দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যু এড়াতে দীর্ঘ, মধ্য ও স্বল্প মেয়াদি পরিকল্পনা থাকতে হবে। মৃত্যু এড়াতে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করা জরুরি। তিনি জানান, অতীতে এই অঞ্চলে প্রচ- মাত্রার ভূমিকম্পে দুর্যোগের রেকর্ড রয়েছে। সাধারণত একশ, ১৫০ বছর অন্তর শক্তিশালী ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি ও সচেতনতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ সংবাদ বিশ্লেষণ
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. এ এস এম মকসুদ কামালের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (সিডিএমপি) ডিজিটাল জরিপে দেশে ভূমিকম্প-দুর্যোগে ঝুঁঁকির উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে এসেছে। জরিপ মতে, বাংলাদেশের ভেতরে বা কাছাকাছি কোনো উৎস থেকে যদি রিখটার স্কেলে ৭ কিংবা এর বেশি মাত্রায় ভূমিকম্প হয়, তাহলে রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও সিলেট নগরীতে অন্তত ২ লাখ ৫০ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত ও ধসে পড়তে পারে। প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে এক লাখেরও বেশি মানুষের।
৩ লাখ ২৬ হাজার ভবনের মধ্যে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ৭৮ হাজার ভবন অপরিকল্পিত, গুরুতর ত্রুটিপূর্ণ। চট্টগ্রাম নগরীর ১ লাখ ৮০ হাজার ভবনের মধ্যে ১ লাখ ৪২ হাজার ভবনেই ছিল ত্রুটি-বিচ্যুতি। সিলেট নগরীর ৫২ হাজার ভবনের মধ্যে ২৪ হাজার ভবন ঝুঁঁকিপূর্ণ। গেল ১৫ বছরে অপরিকল্পিত নতুন ভবনরাজি বৃদ্ধির সাথে ঝুঁকির হার আরো বেড়েছে।
পূর্বাভাস কী সম্ভব?
ভূমিকম্পের সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাস প্রদান সম্ভব নয়। তবে ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ সাবেক চুয়েট-রুয়েট ভিসি প্রফেসর ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, আমেরিকা ও চীনের সফল দুটি মডেল অনুসরণ করা হলে ভূমিকম্প-পূর্ববর্তী ডিজিটাল অ্যালার্ট ব্যবস্থায় মানুষ তাৎক্ষণিক সতর্কতা ও প্রস্তুতি গ্রহণে সক্ষম হবে। এর ফলে বাঁচবে অনেক জীবন। তিনি এ প্রসঙ্গে জানান, আমেরিকার সর্বাপেক্ষা ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চল ক্যালিফোর্নিয়ায় ভূমিকম্প সতর্কতা অ্যালার্ট চালু আছে।
ভূমিকম্পের প্রাথমিক ও হালকা-মাঝারি কাঁপুনি (পি-ওয়েভ) শুরু হতেই সংবেদনশীল ডিজিটাল সেন্সরে সেটি ধরা পড়ে এবং তাৎক্ষণিক মোবাইল ফোন বা বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইসে সাধারণ নাগরিকদের কাছে দ্রুতই পৌঁছে যায়। ভূমিকম্পের সেকেন্ডারি ওয়েভে (এস-ওয়েভ) তীব্র ঝাঁকুনি শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত স্বল্প সময়ে সাধারণ মানুষ সতর্কতা ও জরুরি প্রস্তুতি গ্রহণে সক্ষম হয়। তাছাড়া চীনে অতীতকাল থেকেই প্রচলিত কিছু প্রাণীর (যেমন- কুকুর, বিড়াল, ইঁদুর, খরগোশ, মাছ) জ্যান্ত জাদুঘরের মতো পর্যবেক্ষণাগার রয়েছে। সেখানে এসব প্রাণীর অস্বাভাবিক আচরণের সঙ্গে সম্প্রতি ডিজিটাল সিস্টেমের সমন্বয় করেই নাগরিকদের ভূমিকম্প সতর্কতা ও প্রস্তুতির বার্তা পৌঁছে দেয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এই মডেলের সম্ভাব্য ব্যয় সম্পর্কে তিনি জানান, বাংলাদেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট এবং ব্যাপক মোবাইল সংযোগ ও নেটওয়ার্ক রয়েছে। এই সুবাদে কম বাজেটেই সরকার দ্রুত এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। এর ফলে ভূমিকম্পে রক্ষা পাবে অনেক অমূল্য জীবন। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রণিধানযোগ্য কারণ হিসেবে পবিত্র কুরআনে আমরা দেখি যে, মানুষের কর্মকা-ের ফল হিসেবেই দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে আসে। যেমন, আল্লাহ বলেন- ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণে জলে ও স্থলে বিপর্যয় দেখা দেয়। যার ফলে আল্লাহ তাদের কিছু কিছু কৃতকর্মের ফল প্রদান করে থাকেন, যেন তারা পাপ থেকে ফিরে আসে।’ (সুরা রুম : ৪১)। অথচ, আল্লাহ তা’আলা নিজ গুনে মানুষের নানাবিধ অপরাধ ক্ষমা করে দেন। তিনি বলেন- ‘তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে তাতো তোমাদেরই কৃতকর্মের ফল এবং তোমাদের অনেক অপরাধ তিনি ক্ষমা করে দেন’ (সুরা আশ-শুরা : ৩০)
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, দেশে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হলো জলবায়ুর অনভিপ্রেত পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিবেশের বৈরিতা। তারা পরিবেশের এই বৈরিভাবের জন্য দায়ী করে গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর প্রভাবকে। প্রশ্ন হলো, পৃথিবীর উষ্ণায়ন কেন হচ্ছে। এই উষ্ণতা বাড়ার মূল কারণ গ্রিনহাউজ গ্যাসের ইফেক্ট ও উর্ধ্বাকাশে ওজোনস্তরের ঘনত্ব কমে যাওয়া। আটারো শতকের শিল্প বিপ্লবের পর থেকে মানুষের ব্যবহার্য নানান যন্ত্রপাতি ও কলকারখানাসমূহকেই দায়ী করেন বিজ্ঞান। এক কথায়, মানুষের তৈরি করা প্রযুক্তির প্রত্যক্ষ কারণেই প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দেয়। অর্থাৎ এখানেও মানুষেরাই একমাত্র দায়ী। পবিত্র কুরআনেও একই প্রসঙ্গই উঠে এসেছে। সুতরাং আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য দায়ী করতে পারি মানুষের কর্মকা-কে আর উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে বলতে পারি :
১. বৈশ্বিক উষ্ণায়ন : শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও মিথেনসহ নানা গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হয়ে বাতাসে মিশছে, বায়ুম-লে এসব গ্যাস, কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডের বার্ষিক গড় দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৪১০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন), ১৮৬৬ পিপিবি (পার্টস পার বিলিয়ন) ও ৩৩২ পিপিবি। ফলে, বায়ুম-লের তাপমাত্রা আশংকাজনক বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর ঠিক এই কারণেই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পতিত হয় পরিবেশ, যা কুরআনের ভাষ্যমতে স্বভাবতই মানুষের হাতে কামাই করা।
২. পাপকাজ বৃদ্ধি পাওয়া : বিজ্ঞানের অবিশ্বাস্য উন্নতির ফলে বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিতে যথেষ্ট অগ্রগতি যেমন হয়েছে তেমনি এর অনিয়ন্ত্রিত ও যথেচ্ছা ব্যবহার মানুষকে নানা ধরণের নতুন নতুন অপরাধে সংযুক্ত করছে। এমনকি, নানা ধরণের পাপ-পঙ্কিলতা প্রয়োগ সহজ হওয়াই অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে, চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ, হত্যা, দুর্নীতি, জালিয়াতি, সুদ-ঘুষ ইত্যাদি ক্রমাগত বেড়েই চলছে।
দুর্যোগের রকমফের : ক. ভূমিকম্প, ভূমিধ্বস, সুনামি। ভূমিকম্প সম্পর্কে কুরআনে যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় তা হলো-‘বলে দাও, আল্লাহ তোমাদের উপর থেকে অথবা তোমাদের পায়ের নিচ থেকে আজাব পাঠাতে সক্ষম।’ (সুরা আনআম, আয়াত : ৬৫)। কুরআনে আরো রয়েছে- ‘তারপর আমার ভূমিকম্প তাদের গ্রাস করে ফেলল। ফলে তারা তাদের নিজেদের গৃহেই মৃত অবস্থায় উল্টো হয়ে পড়ে রইল।’ (সুরা আল আ’রাফ: আয়াত-৯১)। বস্তুত, ভূমিকম্প কিয়ামতের আলামতসমূহের মাঝে ছোট একটি আলামতও বটে। কেননা, কিয়ামতের ভয়াবহতার মধ্যে ভূমিকম্প অন্যতম। যেমন আল্লাহ বলেন- ‘(সেদিন) প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে পৃথিবী এবং পর্বতমালা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে তা বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পর্যবসিত হবে।’ (সুরা ওয়াকিয়া: ৪-৬)। এছাড়া অন্যত্র রয়েছে- ‘কিয়ামতের পূর্বে ভূমিধস, চেহারা পরিবর্তন এবং উপরে উঠিয়ে নিক্ষেপ করার মাধ্যমে শাস্তি দেয়া হবে’ (সহীহুল জামে আস্ সাগীর, হা. ২৮৫৩)।
খ. ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, বজ্রপাত। ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন- ‘তোমরা কি নিশ্চিত রয়েছ যে তিনি তোমাদের পৃথিবীর কোথাও ভূ-গর্ভস্থ করবেন না কিংবা তোমাদের ওপর কঙ্কর বর্ষণকারী ঝড়ো হাওয়া (ঘূর্ণিঝড়) প্রেরণ করবেন না? তখন তোমরা তোমাদের কোনো কর্মবিধায়ক পাবে না।’ (সুরা আল ইসরা, আয়াত : ৬৮)। অন্যত্র তিনি বলেন- ‘তারপর আমি এই লুত সম্প্রদায়ের ওপর প্রেরণ করেছিলাম প্রস্তর বর্ষণকারী এক প্রচ- ঘূর্ণিবায়ু।’ (সুরা আল কামার: আয়াত-৩৪)। এছাড়া বৃষ্টি মহান রবের পক্ষ থেকে রহমত। তবে অতিবৃষ্টি পাপাচারের শাস্তি হিসেবেই বর্ষিত হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি তাদের ওপর পাথরের বৃষ্টি বর্ষণ করলাম। অতএব চেয়ে দেখো, অপরাধীদের কী পরিণাম হয়ে থাকে।’ (সুরা আরাফ : ৮৪)। আল্লাহ আরো বলেন- ‘আর আমি তাদের ওপর শাস্তির বৃষ্টি বর্ষণ করলাম। আর যাদের সতর্ক করা হয় তাদের ওপর বর্ষিত বৃষ্টি অতি ক্ষতিকর হয়ে থাকে।’ (সুরা শুআরা, আয়াত: ১৭৩)।
গ. খরা/অনাবৃষ্টি। বৃষ্টিপাত মানুষের প্রতি আল্লাহর রহমত। তিনি বলেন- ‘আর তিনি আকাশ হতে বারি বর্ষণ করেন, তা দ্বারা তোমাদের জীবিকাস্বরূপ ফলমূল উৎপাদন করেন।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ২২)। সুতরাং খরা তথা অনাবৃষ্টির মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তির নমুনা। কেননা, তিনি বলেন- ‘অতঃপর বলেছি, তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয় তিনি মহাক্ষমাশীল, তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন…।’ (সুরা নুহ : ১০-১১)। ঘ. বন্যা, জলোচ্ছ্বাস। বন্যা এবং জলোচ্ছ্বাস ও আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা পাপের শাস্তি। হজরত নুহ (আ.) এর অবাধ্য সম্প্রদায়ের উপর বন্যার মত আজাবের বর্ণনা এভাবে এসেছে- ’তারপর মহাপ্লাবন ওদের গ্রাস করে। কেননা ওরা ছিল সীমা লঙ্ঘনকারী। তারপর আমি তাকে ও যারা জাহাজে উঠেছিল তাদের রক্ষা করলাম।’ (সুরা আনকাবুত: ১৪-১৫)। এছাড়া কুরআনে আরো এসেছে- ‘শেষ পর্যন্ত আমি এই জাতিকে পোকামাকড় বা পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ, রক্ত, প্লাবন ইত্যাদি দ্বারা শাস্তি দিয়ে ক্লিষ্ট করি।’ (সুরা আ’রাফ : ১৩৩)।
ঙ. মহামারি। মহামারি সম্পর্কে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হাদিসটি হলো- ‘যখন কোনো কওমের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা তা প্রকাশ্যেও করতে শুরু করে তখন তাদের মাঝে দুর্ভিক্ষ ও মহামারি ব্যাপক আকার ধারণ করে, যা তাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে ছিল না।’ (ইবনু মাজাহ, আসসুনান : ৪০১৯)। সাধারণত প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে মহামারি। এই মহামারি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন- ‘তারপর আমি তাদের ওপর রোগব্যাধি, অভাব, দারিদ্র্য, ক্ষুধা চাপিয়ে দিয়েছিলাম, যেন তারা আমার কাছে নম্রতাসহ নতি স্বীকার করে’ (সুরা আনআম : ৪২)।
চ. দুর্ভিক্ষ। মানুষ যখন অতিমাত্রায় পাপে নিমজ্জিত হবে ও আল্লাহর নাফরমানি করবে, তখন নানাবিধ আজাবের মধ্যে দুর্ভিক্ষও একটি আজাব হিসেবে আপতিত হবে। যেমন কুরআনে এসেছে- ‘ওর অধিবাসীদের আমি দুঃখ, দারিদ্র্য, রোগব্যাধি এবং অভাব-অনটন দ্বারা আক্রান্ত করে থাকি। উদ্দেশ্য হলো তারা যেন, নম্র এবং বিনয়ী হয়।’ (সুরা আ’রাফ: ৯৪)। এসব বিপর্যয় থেকে বাঁচার জন্য মহান রবের আনুগত্য, তাঁর হুকুম-আহকাম মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন- জেনে রাখো, আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। (সূরা ইউনূস : ৬২)। এছাড়া রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন কোনো ব্যক্তি মহামারিতে পতিত হয় এবং নেকির আশায় সে ধৈর্য্যসহকারে সেখানে অবস্থান করে এবং এ বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহ তাআলার হুকুম ব্যতিত কিছুই হয় না, তাহলে সে শহীদের সওয়াব পায়।’ (বুখারী: হা. ৫৪০২)।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচার উপায়: ১. তাওয়াক্কুল করা। মুসলমানদের সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) রাখা উচিত। তিনি বলেন- ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক: ৩)। ২. ধৈর্যধারণ করা। যে-কোনো বিপদে ধৈর্যধারণ করা মু’মীনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মহান রব বলেন- ‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান, মাল ও ফলফলাদির ক্ষতির মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা বাকারা: ১৫৫)। ৩. বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তিগফার করা: তাওবা ও ইস্তিগফার সম্পর্কে কুরআনে এসেছে- ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর সমীপে খাঁটি তওবা করো, এই আশায় যে তোমাদের প্রভু তোমাদের সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন আর তোমাদেরকে এমন উদ্যানসমূহে উপবিষ্ট করবেন যার নি¤œদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত থাকবে।’ (সুরা আত-তাহরিম: ০৮)। এছাড়া, মহানবি (সা.) বলেন, ‘শিগগিরই মহান আল্লাহকে স্মরণ করো, তাঁর কাছে তওবা করো।’ (বুখারি: ২/৩০; মুসলিম: ২/৬২৮)।
৪. সাদকা করা: সাদকা সম্পর্কে হাদিসে এসেছে- ‘নিশ্চয়ই সাদকা অপমৃত্যু রোধ করে।’ (তিরমিজি: ৬৬৪; ইবনে হিব্বান: ৩৩০৯)। অপমৃত্যু বলতে ওইসব মৃত্যুকে বোঝানো হয়েছে যা থেকে স্বয়ং নবীজি (সা.) পানাহ চেয়েছেন। তা হলো- ‘পানিতে পড়ে, আগুনে পুড়ে, ওপর থেকে পতিত হয়ে, যুদ্ধ থেকে পলায়নরত অবস্থায় বা এ ধরনের কোনো কারণে মৃত্যুবরণ করা। হঠাৎ মৃত্যুকেও কেউ কেউ অপমৃত্যু বলেছেন।’ (মেরকাত : ৪/১৩৪১)। ৫. সচেতনতা অবলম্বন করা:
ইসলামে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য জোর তাগিদ প্রদান করা হয়েছে। বাড়ি-ঘরের আসবাবপত্র দেওয়ালের সাথে এমনভাবে হুক/স্টিকার দিয়ে লাগিয়ে রাখতে হবে যাতে ভুমিকম্পে সেসব গড়িয়ে না পড়ে, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দুর্যোগের সময় কে কোন দায়িত্ব পালন করবে সেটা বণ্টন করে দিতে হবে, ফাস্ট এইড বক্স, ফায়ার এক্সটিংগুইশার রাখাসহ সবসময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ, সতর্কতা অবলম্বন করো।’ (সুরা নিসা: ৭১)। এছাড়া হাদিসে এসেছে- ‘ইমানদার ব্যক্তি একই গর্তে দুইবার দংশিত হয় না।’ (বুখারি: ৬১৩৩)। মহান রব আমাদেরকে সব ধরণের প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করুন, আমীন।চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে বাংলাদেশের ভূ-গর্ভস্থ প্লেটগুলোতে এক অস্বাভাবিক অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই মাসের মাত্র ২৭ দিনের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত দশবার মৃদু ও মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে।
সর্বশেষ আজ শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১টা ৫৪ মিনিটে ৫ দশমিক ৩ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলায়। জুমার নামাজের পরপরই এই কম্পন অনুভূত হওয়ায় দেশজুড়ে মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বারবার এই কম্পন কেবল সংখ্যাতত্ত্বের বিষয় নয়, বরং এটি বড় কোনো মহাবিপর্যয়ের সংকেত হতে পারে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় ভূমিকম্প কেন্দ্র (ইএমএসসি) তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৭। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের সিকিম রাজ্যে, যা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের খুব কাছেই অবস্থিত। যদিও এখন পর্যন্ত এসব ভূকম্পনে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবে বারবার এই কম্পন জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশ সংবাদ বিশ্লেষণ।
চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের ভূমিকম্পের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১ ফেব্রুয়ারি সিলেটের ৩ মাত্রার কম্পনের মাধ্যমে যে ধারার শুরু হয়েছিল, তা আজ সাতক্ষীরা পর্যন্ত পৌঁছেছে। এরপর ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে পর পর দুবার কেঁপে ওঠে দেশ, যার কেন্দ্র ছিল মিয়ানমারে। একই দিন ভোরে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলায় ৪ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এছাড়া ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি পুনরায় সিলেট অঞ্চলে ৩ দশমিক ৩ ও ৪ মাত্রার দুটি কম্পন আঘাত হানে। ১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতক থেকে ৪ দশমিক ১ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়।
এছাড়াও বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাতেও এক দফা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল। যার মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ১। এর উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারের সাংগাই অঞ্চলের মনিওয়া শহর থেকে প্রায় ১১২ কিলোমিটার উত্তর-উত্তরপশ্চিমে এবং মাওলাইক শহর থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে।
বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল বা কেন্দ্র। আগে বড় ভূমিকম্পের জন্য সাধারণত প্রতিবেশী ভারত বা মিয়ানমারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো। কিন্তু গত বছরের ২১ নভেম্বর ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর থেকে দেখা যাচ্ছে, কম্পনগুলোর কেন্দ্রবিন্দু এখন দেশের ভেতরেই অবস্থিত। নরসিংদীর মাধবদী, সাভারের বাইপাইল কিংবা রাজধানীর বাড্ডার মতো এলাকাগুলো এখন ভূমিকম্পের এপিসেন্টার বা উৎপত্তিস্থলে পরিণত হয়েছে। এটি সংকেত দেয় বাংলাদেশের ভূ-অভ্যন্তরে থাকা টেকটোনিক প্লেটগুলো অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
ভূতত্ত্ববিদ ও বিশেষজ্ঞরা এই ঘন ঘন কম্পনকে বড় ধরনের দুর্যোগের পূর্বলক্ষণ হিসেবে দেখছেন। ভূতত্ত্ববিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূত্বকের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে শক্তি জমা হতে থাকলে তা ছোট ছোট কম্পনের মাধ্যমে আংশিক মুক্ত হয়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে বড় কোনো শক্তি মুক্ত না হলে তা মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বাংলাদেশ মূলত ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এখানে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বরাবরই বেশি। ভূমিকম্পের ইঙ্গিত হতে পারে।