
গাজী জাহিদুর রহমান, তালা : সাতক্ষীরার তালা উপজেলার নগরঘাটার বাসিন্দা হাফিজুল হোসেন ও শেফালী খাতুন দম্পতি। দুই শতক জমির ওপরে নির্মিত মাটির ঘরটাই ছিল তাদের সম্বল। সম্প্রতি টানা বৃষ্টিপাত ও বেতনা নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়াতে প্লাবিত হয় তাদের এলাকা এতে গত ২৬ সেপ্টেম্বর আশ্রয়স্থল হারাতে হয় এই দম্পতির। স্বামী-সন্তান প্রতিবন্ধী হওয়াতে ভাতার টাকায় কোনরকম সংসার চলতো শেফালীর। একই সাথে ইটভাটে কাজ করে আজীবনের শ্রমে-ঘামে মাটির ঘরে গড়ে তোলেন প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। তবে এর কোনটাই রক্ষা করতে পারেননি শেফালী। এক কাপড়ে বেড়িয়ে আসতে হয় স্বামী, সন্তানসহ তাকে। সরেজমিনে হাফিজুল-শেফালীদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাদের ঘর ভেঙে মিশে গেছে মাটির সঙ্গে। স্পষ্টভাবে ফুটে রয়েছে ধ্বংসস্তূপের চিহ্ন। মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকাতে পানি নেমে গেলেও এখনও এক প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রিত অবস্থায় দিন পার করছেন তারা। সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে মেলেনি কোন সহায়তা। টাকা না থাকায় করতে পারছেন না বাড়ি নির্মাণের কাজও। এতে ঘরবাড়ি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এই দম্পতি। শেফালী জানান, একদিকে বৃষ্টি অপরদিকে বেতনার বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় তার এলাকা। এতে প্রচন্ড পানির তোড়ে ঘটনার দিন দুপুরে বসতবাড়ি ভেঙে পড়ে। সেদিন ঘর থেকে বের হওয়ার সময় যেই কাপড় নিয়ে বের হয়েছি সেগুলোই এখন একমাত্র সম্বল। কোনরকমে স্বামী-সন্তান নিয়ে প্রাণে বাঁচলেও রক্ষা করা সম্ভব হয়নি গৃহস্থালির আসবাবপত্র। ক্ষোভ প্রকাশ করে শেফালী বলেন, এখনও পর্যন্ত কেউ সহায়তার হাত বাড়ায়নি। বাঁচলাম কী মরলাম কেউ খোঁজ রাখেনি। গত কয়েকদিন ধরে মানুষের দেওয়া খাবার খেয়ে কোনোমতে বেঁচে আছি। স্বামী-সন্তানের প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা আর নিজের পরিশ্রমের অর্থ দিয়েও যেখানে পেটের খাবার জোগানো দায়, সেখানে সহায়তা ছাড়া নতুন করে ঘর বানানো আমার পক্ষে সম্ভব না। শুধু হাফিজুল-শেফালি দম্পতির বসতবাড়ি নয়। একদিকে বৃষ্টি অপরদিকে বেতনার বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করার ফলে নগরঘাটা এলাকাসহ ৫০টি গ্রামের অধিকাংশ মাটির ঘরের একই দশা। বেতনা নদীর নিকটবর্তী হওয়াতে নগরঘাটা এলাকার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণটা বেশি। এখানকার মাটির ঘর বলতে ধ্বংসস্তূপের চিহ্ন। ঘরবাড়ি, গাছপালা, টয়লেট, হাঁস-মুরগির খোয়াড় থুবড়ে পড়ে আছে। ঘর ভেঙে মিশে গেছে মাটির সঙ্গে। এমনই একজন নগরঘাটা এলাকার ভ্যান চালক আব্দুর রহমান। গত ২৭ সেপ্টেম্বর বসতবাড়ি হারানোর পর থেকে গোয়ালঘরে বসবাস করতে হচ্ছে তাকে।
এনিয়ে আব্দুর রহমান বলেন, ঘর বাড়ি ভেঙে যাওয়ার পর অন্যের জমিতে থাকতে হয়েছে কিছুদিন। পরে প্রতিবেশীদের নানা সমস্যা হওয়াতে সেখানে থাকা হয়নি। নতুন করে ঘর নির্মাণ কিংবা সংস্কার করার অর্থ আমার ছিলনা। এজন্য, উপায়ন্তর না পেয়ে ভ্যানের ব্যাটারি বিক্রি করে গোয়ালঘরে থাকার পরিবেশ তৈরী করি। এখন স্ত্রীকে নিয়ে সেখানে থাকতে পারলেও অনাহারে দিন কাটছে। তারওপর ভ্যানের ব্যাটারি বিক্রি করাতে আয়ের উৎসও বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানান তিনি।
একই এলাকার নাসিরউদ্দিন বলেন, এলাকার সবার মতো তার মাটির ঘরটিও ভেঙে গেছে। বর্তমানে অন্যের আশ্রয়ে রয়েছেন। সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে কোন সহায়তা না পাওয়াতে মানবিক বিপর্যয়ের শঙ্কা করছেন তিনি। এব্যাপারে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোস্তাক আহমেদের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।
প্রসঙ্গত: গত ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে ভারী বর্ষণের কারনে ১৭ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বিনেরপোতা এলাকার বেতনা নদীর বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় ৪০টি গ্রাম। চারদিন পর ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধটি স্থানীয়রা স্বেচ্ছাশ্রমে মেরামত করে। তবে ২১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সংস্কারকৃত বাঁধ আবারও ভেঙে যায়। পরে ২৯ সেপ্টেম্বর বাঁধটি মেরামত করা সম্ভব হলেও ততোক্ষণে বেতনার পানিতে প্লাবিত হয় কমপক্ষে ৫০টি গ্রাম। এসময় পানির তোড়ে পড়ে অধিকাংশ মাটির ঘর ভেঙে মাটিতে মিশে যায়।

