
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশের উপকূল, যা একসময় সবুজ ধানের দিগন্তজোড়া মাঠ আর স্বাদু পানির প্রাচুর্যের জন্য পরিচিত ছিল, আজ ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করা লবনাক্ততার শিকার। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে কৃষিজমি ও স্বাদু পানির উৎসে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে, যা গত প্রায় দুই দশকে এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকায় এক আমূল পরিবর্তন এনেছে। এই পরিবর্তন আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য এক অশনি সংকেত।
লবণাক্ততা উপকূলীয় কৃষিব্যবস্থার জন্য বড়ো হুমকি। এর প্রধান শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্যশস্য ধান। উচ্চ লবণাক্ততার কারণে ধানের উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয় যে, কিছু এলাকায় ৪-৫ বছর ধান চাষ করা সম্ভবই হয়নি। আবার ২০২৪ এর ঘূর্ণিঝড় রেমাল তেমনই প্রভাব রেখে গিয়েছে অনেক অঞ্চলে।
লবণাক্ততা মাটির উর্বরতাকেও নষ্ট করে দিচ্ছে। এটি মাটি থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরিয়ে ফেলে এবং উপকারী অণুজীব মেরে করে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বেশিরভাগ চাষযোগ্য জমি বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততায় আক্রান্ত। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে এখানকার মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কম এবং নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির তীব্র ঘাটতি রয়েছে।
সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে স্বাদু পানি নিয়ে। লবণাক্ত পানি ভূ-পৃষ্ঠের নদী-খাল এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে দূষিত করছে, যা সেচ ও পানীয় জলের তীব্র অভাব তৈরি করেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০৫০ সাল নাগাদ উপকূলীয় অঞ্চলে পানীয় ও সেচের পানির তীব্র সংকট দেখা দেবে। এই সম্মিলিত প্রভাব বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
দুই দশকে উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকায় একটি সুস্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ঐতিহ্যবাহী কৃষি কাজ ছেড়ে মানুষ বাধ্য হয়ে অন্য পেশা বেছে নিচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ধান চাষ ছেড়ে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষের দিকে ঝুঁকে পড়া। মাটি ও পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণেই তারা ধান চাষের বদলে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষে যেতে বাধ্য হয়েছেন। ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার কারণে উপকূলের অনেক পরিবার তাদের জীবিকার ধরণ পরিবর্তন করে নিয়েছে।
চিংড়ি চাষের পাশাপাশি অনেকে দিনমজুরি, ভ্যান চালানো, দোকানদারি এবং অন্যান্য অ-কৃষি কাজে যুক্ত হচ্ছেন। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র হলো বাধ্য হয়ে অভিবাসন। কৃষিজমি হারিয়ে, মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঘরবাড়ি হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ ঢাকা, খুলনা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছে। এই বাধ্যতামূলক অভিবাসন কেবল তাদের অর্থনৈতিক সংকট বাড়াচ্ছে না, বরং সামাজিক বন্ধনকেও নড়বড়ে করে দিচ্ছে।
পরিবেশগত কারণ: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তন লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশকে ত্বরান্বিত করছে। গত ২০ বছরে বাংলাদেশে ৮টি বড় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আঘাত হেনেছে, যা কয়েক মিলিয়ন মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং উপকূলের কৃষিজমিকে লবণাক্ত পানিতে ডুবিয়ে দিয়েছে।
মানবিক ও আর্থ-সামাজিক কারণ: ফসলের ক্ষতি হওয়ায় কৃষকদের আয় কমে যাচ্ছে এবং বেকারত্ব বাড়ছে। এর চেয়েও মারাত্মক হলো স্বাস্থ্যগত ক্ষতি। লবণাক্ত পানি পান ও ব্যবহারের ফলে মানুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভবতী নারীদের প্রি-এক্লাম্পশিয়া ও গর্ভপাত, চর্মরোগ এবং শ্বাসকষ্টের মতো ভয়াবহ রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। এই স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক চাপ মানুষকে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করছে।
চাহিদা ও বাজার: আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ির ব্যাপক চাহিদা চিংড়ি চাষকে উৎসাহিত করেছে। অন্যদিকে, নগরায়ন গ্রামীণ মানুষকে শহরে কাজের সন্ধানে আকর্ষণ করছে, যা গ্রামের কৃষিব্যবস্থাকে দিনদিন পঙ্গু করে দিচ্ছে। এছাড়া, সরকারি সহায়তা অপর্যাপ্ত হওয়ায় কৃষকরা প্রায়ই এনজিওগুলোর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও উপকূলের মানুষ টিকে থাকার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। তারা লবণ-সহনশীল ধানের জাত (যেমন, ব্রি ধান-৪৭, বিনা ধান-৮) চাষ করছে, উঁচু জমিতে বা ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি আবাদ করছে এবং বৃষ্টির পানি ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
তবে অনেক অভিযোজন কৌশলই টেকসই নয়, বরং কিছু ক্ষেত্রে তা হিতে বিপরীত হচ্ছে। যেমন, চিংড়ি চাষ বিকল্প আয়ের পথ খুলে দিলেও তা জমির লবণাক্ততা আরও বাড়িয়ে তুলছে এবং পরিবেশের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করছে। এটিকে ‘ত্রুটিপূর্ণ অভিযোজন’ বা Maladaptation বলা হয়। এছাড়া, দুর্বল অবকাঠামো (নাজুক বেড়িবাঁধ যা সামান্য দুর্যোগেই ভেঙে যায়), আর্থিক ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব এবং সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয়হীনতা অভিযোজন প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
উপকূলীয় বাংলাদেশে লবণাক্ততা এখন আর কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর মানবিক ও আর্থ-সামাজিক সংকট। এই সংকট আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলেছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিচ্ছিন্ন বা স্বল্পমেয়াদী প্রকল্প যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত, এবং দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা।
সমন্বিত উপকূলীয় অঞ্চল ব্যবস্থাপনা (ICZM): কৃষি, মৎস্য, স্বাস্থ্য এবং অবকাঠামো পরিকল্পনাকে এক ছাতার নিচে এনে লবণাক্ততা মোকাবিলার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো: দুর্বল বেড়িবাঁধের পরিবর্তে শক্তিশালী ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে।
টেকসই বিকল্প জীবিকা: চিংড়ি-কাঁকড়া চাষের মতো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর জীবিকার পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ‘নীল অর্থনীতি’ (Blue Economy) নির্ভর জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
পরিকল্পিত পুনর্বাসন: যারা অভিবাসনে বাধ্য হচ্ছেন, তাদের জন্য পরিকল্পিত পুনর্বাসনের আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। যার বিরূপ ফলাফল হিসেবে উজানের মিঠাপানির অভাবে সুন্দরবনের নদী-খাল ও জমিতে বাড়ছে লবণাক্ততা। এর ক্ষতিকর প্রভাবে ধুঁকছে বিশে^র একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন; বিশেষ করে উদ্ভিদ ও প্রাণিবৈচিত্র্যে আসছে বড়সড় পরিবর্তন। কমে যাচ্ছে সুন্দরীসহ কম লবণসহিষ্ণু গাছপালা ও প্রাণী। এতে সুন্দরবন হারাচ্ছে তার চিরচারিত বৈশিষ্ট্য।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ অংশে সুন্দরবনের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। এই অংশে বনভূমির পরিমাণ ৬৯ আর ৩১ ভাগ জলাভূমি। জীববৈচিত্র্য বিশ্বের যেকোনো ম্যানগ্রোভ বনের তুলনায় অনেক বেশি সমৃদ্ধ। সুন্দরী, পশুর, গেওয়া, গরানসহ ৩৫০ প্রজাতির গাছ রয়েছে। রয়েছে প্রায় ৩৭৫ প্রজাতির বন্য প্রাণী।
খুলনার মুজগুন্নী এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে বনের বিভিন্ন নদী ও খালের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৪৫ থেকে ১২ দশমিক ১ পিপিটি। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ থেকে ২৯ পিপিটি।
অন্যদিকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার তথ্য বলছে, ২০১২ সালে বনের বিভিন্ন নদী ও খালের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক ৩ থেকে ১৮ দশমিক ৮ পিপিটি। এক দশকের ব্যবধানে ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৮ থেকে ২৪ দশমিক ৫ পিপিটি। আর মাটিতে ৬ দশমিক ৯ থেকে বেড়ে হয়েছে ১২ পিপিটি লবণাক্ততা।
বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, লবণাক্ততায় সুন্দরবনে অঞ্চলভেদে বিভিন্ন গাছের চারা গজানোর হার কমেছে। প্রতি হেক্টরে কম লবণাক্ত এলাকায় ২২ হাজার ৫৮৫টি, মধ্যম লবণাক্ত এলাকায় ৯ হাজার ৩১৭টি ও বেশি লবণাক্ত এলাকায় ৭ হাজার ৭৪৫টি গাছ জন্ম নিচ্ছে।
বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিনিয়র রিসার্চ অফিসার (ম্যানগ্রোভ সিলভিকালচার বিভাগ) ড. মমিনুল ইসলাম নাহিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গবেষণায় দেখা গেছে, লবণাক্ততার কারণে সুন্দরবনে শিফট পরিবর্তন হচ্ছে। সাগরের লবণপানি ওপরে উঠে আসছে। ফলে কম বা মাঝারি লবণাক্ততা এলাকা বেশি লবণাক্ততায় পরিণত হচ্ছে এবং সেটি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। এ কারণে সুন্দরবনে সার্বিক পরিবর্তন আসছে; বিশেষ করে সুন্দরীসহ কম লবণসহিষ্ণু গাছপালা কমে যাচ্ছে। তবে গেওয়া ও গরানের আধিক্য বেড়ে যাচ্ছে।’
সুন্দরবনে লবণাক্ততা বৃদ্ধির প্রভাব দৃশ্যমান উল্লেখ করে খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর রহমান এই প্রতিবেদককেবলেন, ‘লবণাক্ততার কারণে সুন্দরবনে গাছের দৈর্ঘ্য ছোট হয়ে যাচ্ছে। সুন্দরীসহ বেশ কয়েকটি প্রজাতির গাছ কমে গেছে। যে মাছ মিষ্টি পানি পছন্দ করে তার সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। মাছের প্রজাতির ভিন্নতা চলে এসেছে। লবণাক্ততা কম সহিঞ্চু মাছ লবণ বেশির খাল ও নদী ছেড়ে চলে যাচ্ছে।’
লবণাক্ততা বৃদ্ধি বাঘের আবাসস্থলের ওপরও প্রভাব ফেলছে উল্লেখ করে এই বন কর্মকর্তা বলেন, ‘বাঘ গণনায় দেখা গেছে পশ্চিম দিক থেকে পূর্বদিকের কটকা, কচিখালি ও হাড়বাড়িয়ায় বাঘের ঘনত্ব বেশি। কারণ পূর্বদিকে লবণাক্তার পরিমাণ কম।’
এ প্রসঙ্গে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘লবণাক্ততা বৃদ্ধিসহ নানা কারণে সুন্দরবনের উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলে পরিবর্তন আসবে, যার মধ্য দিয়েই সৃষ্টি হবে নতুন ইকোলজি (প্রতিবেশ)। এই পরিবর্তন বুঝতে সুন্দরবনের প্রাণিকুল ও জীববৈচিত্র্যের ওপর আরও গবেষণা জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘জোয়ারের পানিতে খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে। খালের ধারণক্ষমতা না থাকায় ফের জোয়ারের পানি আসলে বনের মধ্যে লবণ পানি ঢুকে যায়। লবণাক্ততা কমানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়াতে হবে। উজানের পানি আসলেই সুন্দরবনের মধ্য ও পূর্বাংশে মাটি ধুয়ে ধুয়ে লবণের পরিমাণ কমবে। এ ছাড়া সমুদ্রের জোয়ারের লবণপানিও আসবে না। এটিই একমাত্র প্রাকৃতিক উপায়।’

