
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : নতুন সরকারের কাছে বাংলাদেশের উপকূলীয় ১৪জেলার ৪ কোটি মানুষের প্রাণের দাবি উপকূল রক্ষা টেকসই মজবুত ভেরি বাধ নির্মাণ। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে এই ১৪ টি জেলায় বড় সমস্যা উপকূল রক্ষা ভেড়ি বাঁধ। উপকূল রক্ষা বেরিবাধ নাজুক অবস্থায় থাকায় চিন্তিত ৪ কোটি মানুষ। সে কারণে বিষয়টি নিয়ে সরকারকে গুরুত্ব সহকারে দেখার দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ মহল।বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলের দৈর্ঘ্য ৭১০ কিলোমিটার, এর মধ্যে সুন্দরবন ১২৫ কিলোমিটার, নদীর মোহনা ও ছোট-বড় দ্বীপমালা ২৭৫ কিলোমিটার, সমতল ও সমুদ্রসৈকত ৩১০ কিলোমিটার। টেকনাফের নাফ নদীর মোহনা থেকে সাতক্ষীরা জেলার সীমান্ত নদী রায়মঙ্গল-কালিন্দী পর্যন্ত খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের মোট ১৪টি উপকূলীয় জেলায় বিস্তৃত বাংলাদেশের উপকূলেই দেশের প্রধান দুটি সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম ও মোংলা, বিশ্বের সেরা গহীন গরান বন সুন্দরবন এবং বিশ্বের অন্যতম অখণ্ডিত (আনব্রোকেন) সমুদ্রসৈকত বা বেলাভূমি কক্সবাজার অবস্থিত। দেশের শতকরা ২৫ ভাগ মানুষ যেমন এ উপকূল অঞ্চলে বসবাস করে, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতে জিডিপির কমবেশি প্রায় শতকরা ২৫ ভাগ অবদানও এ অঞ্চলেরই। অথচ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এ অঞ্চল, এর অবকাঠামো এবং বসবাসকারী জনগণের অর্থনৈতিক জীবন নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাক, বৈষম্য, অবহেলা আর অমনোযোগিতার শিকার। অথচ এটা ঠিক বঙ্গোপসাগরের তীরে ও বিশ্বের সেরা গহিন গরান বনের নীড়ে গড়ে ওঠা গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ বাংলাদেশ যেন প্রকৃতির এক বিচিত্র বিলাস। তার মাথার ওপর হিমালয় পর্বত, সাইবেরিয়ার হিমবাহ ঠেকিয়ে চলে অবিরত, পায়ের নিচে বঙ্গোপসাগর তার ধোয়ায় পা প্রতিনিয়ত। সে কারণেই কর্কটক্রান্তি রেখার ওপর দাঁড়িয়েও চরম নয় তার আবহাওয়া, নাতিশীতোষ্ণ তার মৌসুমি বায়ুর বরমাল্য বরিষণে বাংলা সতত সবুজ শস্য শ্যামল।
প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চল প্রকৃতির বিরূপ আচরণের প্রথম ও প্রত্যক্ষ শিকার সবসময়ই। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতির সুরতহাল রিপোর্ট পর্যালোচনা করলে এটা প্রতিভাত হয়ে ওঠে যে জাতীয় অর্থনীতির আন্তঃসলিলা শক্তির (রেজিলিয়েন্ট পাওয়ার) উদ্বোধন যার হাতে, সেই সবচেয়ে বেদনায় বিবর্ণ। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরো অর্থনীতির অনেক প্রবণতার সূচক সন্ধানে কালাতিপাত
প্রাকৃতক সম্পদে পরিপূর্ণ বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চল প্রকৃতির বিরূপ আচরণের প্রথম ও প্রত্যক্ষ শিকার সবসময়ই। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতির সুরতহাল রিপোর্ট পর্যালোচনা করলে এটা প্রতিভাত হয়ে ওঠে যে জাতীয় অর্থনীতির আন্তঃসলিলা শক্তির (রেজিলিয়েন্ট পাওয়ার) উদ্বোধন যার হাতে, সেই সবচেয়ে বেদনায় বিবর্ণ। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরো অর্থনীতির অনেক প্রবণতার সূচক সন্ধানে কালাতিপাত করে, কিন্তু উপকূলীয় জেলানিচয়ের আর্থসামাজিক চালচিত্রের খানা-পুরী থেকে শুরু করে ভূমি বণ্টন ব্যবস্থা, চাষাবাদের হালহকিকত, প্রাণিসম্পদের সালতামামি অনেক কিছুরই বাস্তবতার ব্যাখ্যা তাদের কাছে দুঃখজনকভাবে নেই। উপকূলীয় অঞ্চল যেন শুধু দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের মাথাব্যথা সূত্রে সমুপস্থিত, আকালের দিনে নাকালের মোহনায় এবং একমাত্র মিডিয়ায়।
পাঁজি-পুঁথি ও সরকারি পরিসংখ্যান ঘেঁটে জানা যায়, ১৭৯৭ থেকে শুরু করে এই সেদিন গত মে মাসে সর্বশেষ ইয়াস পর্যন্ত মোট ৪৯৪ বার মাঝারি ও মোটাদাগের জলোচ্ছ্বাস, গোর্কি, হারিকেন, সিডর, আইলা, নার্গিস, মহাসেন, ফণী, বুলবুল, আম্পান বাংলাদেশের উপকূলকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ১৭৩ বছরে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে ৩২৯টি, এসেছে গড়ে ৫-১০ বছর পরপর, কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে গত ৫০ বছরে ১৭৪টি ঝড় বা জলোচ্ছ্বাস ঘটেছে ঘন ঘন। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ ও মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
নদীর অববাহিকাই মানবসভ্যতার সূতিকাগার, কৃষিই প্রাচীনতম জীবিকা আর শ্যামল সবুজ প্রান্তরে প্রাণিসম্পদের সমারোহই জীবনায়নের স্পন্দন। বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চল যে এসব সত্য ও সম্ভারে সমৃদ্ধ, তা তো চর্যাপদের পাতা থেকেও জানা যায়। সমুদ্র, নদীমেখলা প্রকৃতি আর শ্যামল সবুজ পরিবেশের সংমিশ্রণে উপকূল অঞ্চল গোটা দেশের, সমাজের, অর্থনীতির জন্য অনিবার্য অবকাঠামো শুধু নয়, উন্নয়ন প্রয়াস-প্রচেষ্টায় সার্বিক ভারসাম্য রক্ষার জন্যও জরুরি। সুপ্রাচীনকাল থেকে ইতিহাসের পথ ধরে এ সত্য সতত সব ভূগোলে স্বীকৃত থাকলেও প্রাচীন এ জনপদে তা যেন সবসময় নতুন করে মনে করিয়ে দিতে হয় যখন পালা করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে সবাই। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে পড়ে, তাপমাত্রার পরিবর্তনপ্রসূত তারতম্য সূত্রে সমুদ্রের তলদেশ স্ফীত হয়ে ওঠার ফলে পরিবেশ ভারসাম্যহীনতার যে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে চলেছে বিশ্বের প্রায় সব সমুদ্র উপকূলবেষ্টনীতে, বঙ্গোপসাগর-তীরবর্তী বাংলাদেশের জন্য তা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের অশনিসংকেত দিয়ে চলেছে। বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চল, বিশেষ করে অদূরবর্তী দ্বীপাঞ্চল সামান্য জলোচ্ছ্বাসেই তলিয়ে যাচ্ছে, তা উদ্ধারে বশংবদ কোনো কার্যক্রম সফল হচ্ছে না। সুন্দরবনের প্রাণবৈচিত্র্য বিপন্ন হতে চলেছে এর প্রভাবে। এবার ইয়াসের অকস্মাৎ জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের মৃত হরিণ ভেসে এসেছে লোকালয়ের নদীতে, সুন্দরবন অভ্যন্তরে তিন শতাধিক সুপেয় পানির জলাধার (যা বন্যপ্রাণীদের একমাত্র পানীয় অবলম্বন) লোনা পানিতে একাকার হয়ে যাওয়ায় সেখানকার প্রাণিসম্পদ আজ নিদারুণ সংকটে।ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে খাদ্য ও অর্থকরী ফসল উৎপাদন, মত্স্য চাষ ও উৎপাদন বারবার ব্যাহত হচ্ছে। কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদনসংক্রান্ত পরিসংখ্যান বলছে, উপকূলীয় অঞ্চলে শস্য উৎপাদন দেশের অন্যান্য অংশের তুলনায় বাড়েনি, বরং কমছে। উজান থেকে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখানে চাষাবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেলেও চাষাবাদ পদ্ধতি প্রক্রিয়ায় নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল ততটা আসেনি যতটা শস্য-বর্হিভূত অর্থকরী খাতে অর্থাৎ মত্স্য চাষসহ প্রাণিসম্পদ চাষ ও বিকল্প পণ্য উৎপাদন ক্ষেত্রে এসেছে। এ খাতে আপাত ব্যাপক সাফল্যের ফলে কৃষি থেকে গড়পড়তায় জিডিপিতে এখনো সমানুপাতিক হারে অবদান (২৫%-২৩%) রেখে চলেছে এ অঞ্চল। আলোচ্য খাতের এ সাফল্যকে টেকসই করা যেমন প্রয়োজন, একই সঙ্গে শস্য উৎপাদনে, জমির সঠিক ব্যবহারে, উপায় উপাদান সরবরাহে, চাষ পদ্ধতিতে আধুনিক প্রযুক্তির সমাবেশ ঘটানোয় এবং এমনকি ভূমি প্রশাসনেও সংস্কার আবশ্যক। মোদ্দাকথা, সময়ের প্রেক্ষাপটে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে যে পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে, তার গতি-প্রকৃতি বিচার-বিশ্লেষণ জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে এ জন্য যে একে যথাসময়ে যথাপ্রযত্ন প্রদান করা সম্ভব না হলে, উষ্ণায়নের প্রভাবক ক্ষয়ক্ষতি যথানিয়ন্ত্রণ ও মোকাবেলা করা সম্ভব না হলে সমূহ সম্ভাবনাময় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের আবদান থেকে অদূরভবিষ্যতে জাতীয় অর্থনীতি শুধু বঞ্চিতই হবে না, সময়ের অবসরে জলবায়ুর পরিবর্তন প্রভাবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এটি গোটা দেশ ও অর্থনীতির জন্য দুর্ভাবনা-দুর্গতির কারণও হয়ে দাঁড়াতে পারে। দেশের অন্যতম দুটি সামুদ্রিক বন্দর, প্রাকৃতিক সম্পদের স্বর্গ সুন্দরবন ও পর্যটন সম্ভাবনা সমৃদ্ধ কক্সবাজারকে কার্যকর অবস্থায় পাওয়া জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন অভিযাত্রার জন্য যে কত জরুরি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাম্প্রতিককালে সিডর, আইলা, আম্পান, ইয়াসে সুন্দরবন, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার মানুষ ও অন্যান্য প্রাণিসম্পদের ওপর যে দুর্বিষহ ও নেতিবাচক প্রভাব প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়, তাতে উপকূলীয় কৃষি অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ দেখা দিয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান মতে, গত ২৬ মে প্রবাহিত ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন জেলার ১৫ লাখ মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ঝড়ের প্রভাবে এসব জেলার ২৬ হাজার বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। দেশের ১৬ জেলার ৮২ উপজেলা এবং ১৩ পৌরসভায় ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাব পড়ে। আর ঝড়ে মারা গেছে নয়জন। প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইয়াসের প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাস, ভারি বৃষ্টির সঙ্গে বয়ে যাওয়া ঝড়ো হাওয়ায় বাঁধ, ঘরবাড়ি ভেঙে যায়। ক্ষতির মুখে পড়ে উপকূলের হাজার হাজার মানুষ। ইয়াসে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সাতক্ষীরা জেলায়। এ জেলায় ৯৪ হাজার ৮৫০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাতক্ষীরার আশাশুনি, দেবহাটা, কালীগঞ্জ, শ্যামনগর উপজেলার পৌনে ছয় কিলোমিটার বেড়িবাঁধ জলোচ্ছ্বাসে ভেঙে গেছে। এছাড়া ৬ হাজার ৭৩৮ হেক্টর মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খুলনার কয়রা ও পাইকগাছায় এবং বাগেরহাট জেলার শরণখোলা ও মোড়েলগঞ্জ উপজেলায় ৪৮ হাজার ৯১৬ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ৫৪৫ হেক্টর মাছের ঘের এবং আট কিলোমিটারের বেশি বেড়িবাঁধ ভেঙে ফসলের জমি লোনা পানিতে তলিয়ে গেছে।
উপকূলীয় অঞ্চলে বাঁধ ভেঙে লোনা পানি ঢুকছে ফসলের ক্ষেতে। জমির ফসল নষ্টই শুধু নয়, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা হাজার হাজার মানুষকে নিঃস্ব করছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মৌসুমি বন্যার পর রিং বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় প্রায়ই বন্যা আঘাত হানে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলোয়। নদ-নদীর অস্বাভাবিক জোয়ারের চাপে একের পর এক বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় খুলনা ও সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ এলাকা। হু-হু করে লোকালয়ে ঢুকছে পানি। ডুবছে মাছের ঘের, আবাদি জমি ও নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়ি। প্রবল বর্ষা ও অস্বাভাবিক জোয়ারের কারণে পানি বাড়ছে দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের নদ-নদী, খাল-ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে খাদ্য ও অর্থকরী ফসল উৎপাদন, মত্স্য চাষ ও উৎপাদন বারবার ব্যাহত হচ্ছে। কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদনসংক্রান্ত পরিসংখ্যান বলছে, উপকূলীয় অঞ্চলে শস্য উৎপাদন দেশের অন্যান্য অংশের তুলনায় বাড়েনি, বরং কমছে। উজান থেকে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখানে চাষাবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেলেও চাষাবাদ পদ্ধতি প্রক্রিয়ায় নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল ততটা আসেনি যতটা শস্য-বর্হিভূত অর্থকরী খাতে অর্থাৎ মত্স্য চাষসহ প্রাণিসম্পদ চাষ ও বিকল্প পণ্য উৎপাদন ক্ষেত্রে এসেছে। এ খাতে আপাত ব্যাপক সাফল্যের ফলে কৃষি থেকে গড়পড়তায় জিডিপিতে এখনো সমানুপাতিক হারে অবদান (২৫%-২৩%) রেখে চলেছে এ অঞ্চল। আলোচ্য খাতের এ সাফল্যকে টেকসই করা যেমন প্রয়োজন, একই সঙ্গে শস্য উৎপাদনে, জমির সঠিক ব্যবহারে, উপায় উপাদান সরবরাহে, চাষ পদ্ধতিতে আধুনিক প্রযুক্তির সমাবেশ ঘটানোয় এবং এমনকি ভূমি প্রশাসনেও সংস্কার আবশ্যক। মোদ্দাকথা, সময়ের প্রেক্ষাপটে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে যে পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে, তার গতি-প্রকৃতি বিচার-বিশ্লেষণ জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে এ জন্য যে একে যথাসময়ে যথাপ্রযত্ন প্রদান করা সম্ভব না হলে, উষ্ণায়নের প্রভাবক ক্ষয়ক্ষতি যথানিয়ন্ত্রণ ও মোকাবেলা করা সম্ভব না হলে সমূহ সম্ভাবনাময় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের আবদান থেকে অদূরভবিষ্যতে জাতীয় অর্থনীতি শুধু বঞ্চিতই হবে না, সময়ের অবসরে জলবায়ুর পরিবর্তন প্রভাবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এটি গোটা দেশ ও অর্থনীতির জন্য দুর্ভাবনা-দুর্গতির কারণও হয়ে দাঁড়াতে পারে। দেশের অন্যতম দুটি সামুদ্রিক বন্দর, প্রাকৃতিক সম্পদের স্বর্গ সুন্দরবন ও পর্যটন সম্ভাবনা সমৃদ্ধ কক্সবাজারকে কার্যকর অবস্থায় পাওয়া জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন অভিযাত্রার জন্য যে কত জরুরি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাম্প্রতিককালে সিডর, আইলা, আম্পান, ইয়াসে সুন্দরবন, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার মানুষ ও অন্যান্য প্রাণিসম্পদের ওপর যে দুর্বিষহ ও নেতিবাচক প্রভাব প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়, তাতে উপকূলীয় কৃষি অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ দেখা দিয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান মতে, গত ২৬ মে প্রবাহিত ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন জেলার ১৫ লাখ মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ঝড়ের প্রভাবে এসব জেলার ২৬ হাজার বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। দেশের ১৬ জেলার ৮২ উপজেলা এবং ১৩ পৌরসভায় ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাব পড়ে। আর ঝড়ে মারা গেছে নয়জন। প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইয়াসের প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাস, ভারি বৃষ্টির সঙ্গে বয়ে যাওয়া ঝড়ো হাওয়ায় বাঁধ, ঘরবাড়ি ভেঙে যায়। ক্ষতির মুখে পড়ে উপকূলের হাজার হাজার মানুষ। ইয়াসে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সাতক্ষীরা জেলায়। এ জেলায় ৯৪ হাজার ৮৫০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাতক্ষীরার আশাশুনি, দেবহাটা, কালীগঞ্জ, শ্যামনগর উপজেলার পৌনে ছয় কিলোমিটার বেড়িবাঁধ জলোচ্ছ্বাসে ভেঙে গেছে। এছাড়া ৬ হাজার ৭৩৮ হেক্টর মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খুলনার কয়রা ও পাইকগাছায় এবং বাগেরহাট জেলার শরণখোলা ও মোড়েলগঞ্জ উপজেলায় ৪৮ হাজার ৯১৬ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ৫৪৫ হেক্টর মাছের ঘের এবং আট কিলোমিটারের বেশি বেড়িবাঁধ ভেঙে ফসলের জমি লোনা পানিতে তলিয়ে গেছে।
উপকূলীয় অঞ্চলে বাঁধ ভেঙে লোনা পানি ঢুকছে ফসলের ক্ষেতে। জমির ফসল নষ্টই শুধু নয়, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা হাজার হাজার মানুষকে নিঃস্ব করছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মৌসুমি বন্যার পর রিং বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় প্রায়ই বন্যা আঘাত হানে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলোয়। নদ-নদীর অস্বাভাবিক জোয়ারের চাপে একের পর এক বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় খুলনা ও সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ এলাকা। হু-হু করে লোকালয়ে ঢুকছে পানি। ডুবছে মাছের ঘের, আবাদি জমি ও নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়ি। প্রবল বর্ষা ও অস্বাভাবিক জোয়ারের কারণে পানি বাড়ছে দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের নদ-নদী, খাল-বিলেও। নদ-নদীর অস্বাভাবিক জোয়ারের পানির চাপে খুলনার পাইকগাছা ও কয়রা, বাগেরহাটের শরণখোলা ও মোড়েলগঞ্জ এবং সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলায় বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বাঁধে নতুন করে ধস নামায় পাইকগাছার সোলাদানা, বেতবুনিয়া, গড়ুইখালী, কয়রার হরিণখোলা, গোবরা, ঘাটাখালীতে ভাঙন আতঙ্ক দেখা দেয়। কপোতাক্ষ নদের জোয়ারের চাপে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, পদ্মপুকুর ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ ভেঙে দুটি দ্বীপ ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। ভেসে গেছে অসংখ্য চিংড়িঘের ও ছোট-বড় পুকুর, গৃহহারা হয়েছে অসংখ্য পরিবার। ভেঙে পড়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যরক্ষা ব্যবস্থা। উপকূল রক্ষা বাঁধ তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে নানা পক্ষের দায়িত্বহীনতায় প্রতি বছরই বাঁধে ফাটল ধরে। ভুক্তভোগীদের রক্ষা ও সরকারি অর্থের অপচয় রোধ এবং বছর বছর এলাকাবাসীকে ভোগান্তি থেকে রক্ষার্থে স্থায়ী, টেকসই ও কার্যকর বাঁধ নির্মাণে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে।উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণ সম্পর্কে ২০১৬ সালে সমকাল পত্রিকায় ১৫ জানুয়ারি প্রকাশিত ‘বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে মার্চে’ শীর্ষক সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, “ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যা থেকে উপকূলীয় এলাকার জমি ও ঘরবাড়ি রক্ষায় ছয় জেলায় নির্মাণ করা হচ্ছে প্রায় ৬২৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। এ কাজে ব্যয় হবে ৩ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। এ প্রকল্পের তিনটি প্যাকেজের মধ্যে একটির টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষে চীনা একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। আগামী মার্চ থেকে বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের নাম দেয়া হয়েছে ‘উপকূলীয় বেড়িবাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প, ফেজ-১’। প্রকল্পের আওতায় খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলার ১৭টি পোল্ডারে বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের পরামর্শক নিযুক্ত করা হয়েছে নেদারল্যান্ডসের দুটি প্রতিষ্ঠানকে। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ২০১৩ সালের জুন থেকে এতদিন খাতা-কলমের কাজ চললেও মাঠ পর্যায়ের মূল কাজ শুরু হচ্ছে আগামী মার্চে।”
২০২০ সালের ১৪ জুলাই সংবাদমাধ্যম ‘টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে ৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে সরকার ৮ হাজার কোটি টাকার চারটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীম। চলতি অর্থবছর এসব প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। এছাড়া উপকূল উন্নয়ন বোর্ড গঠনের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) উপকূলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে জরুরি করণীয় শীর্ষক জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। পানিসম্পদ উপমন্ত্রী বলেন, ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে ৮ হাজার কোটি টাকার চারটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছর এসব প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।’
এ বিষয়ে ২০১৯ সালের ১২ মে দৈনিক প্রথম আলোয় ‘মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে নজর দিন, ঝুঁকিতে উপকূলের বেড়িবাঁধ’ শীর্ষক সম্পাদকীয় স্তম্ভে বলা হয়,
‘ভয়ানক আতঙ্কের কথা হলো, দেশের উপকূলীয় এলাকার ৮ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালে আইলার পর উপকূল এলাকার এসব বাঁধের অনেক জায়গা ভেঙে গিয়েছিল, অনেক জায়গা বানের তোড়ে ভেসে গিয়েছিল; কিন্তু তার বড় অংশ এখনো যথাযথভাবে মেরামত হয়নি। সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০১৭ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় মোরায় প্রায় ২২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর বাইরে ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, কোমেনের আঘাতে ১৯ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেগুলোর মেরামত এখনো শেষ হয়নি। সরকারের হিসাবে দেশে ১৯ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর প্রায় অর্ধেকই উপকূলীয় এলাকায়। উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত হলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়। লবণাক্ত পানি ফসলি জমিতে চলে আসার পর টানা কয়েক বছর ফসল হয় না। মিঠাপানির মাছ ও অন্যান্য প্রকৃতিবান্ধব কীটপতঙ্গের বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হয়। এ কারণে উপকূলের বেড়িবাঁধ সুরক্ষিত রাখায় অগ্রাধিকার দেয়া দরকার। উদ্বেগের বিষয় বেড়িবাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ বরাদ্দ সবসময়ই অপ্রতুল। পানি উন্নয়ন বোর্ড তাদের অধীনে থাকা বেড়িবাঁধের ওপর স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘেঁষতে দেয় না। এমনকি অনেক জায়গাতেই দেখা গেছে, বাঁধে সামাজিক বনায়ন করা হলে কিংবা এলাকাবাসী ঘরবাড়ি তুললে বাঁধ অনেক বেশি সুরক্ষিত থাকে। নিজেদের স্বার্থেই এলাকাবাসী বেড়িবাঁধকে সুরক্ষিত রাখতে উদ্যোগী হয়। এ কারণে বাঁধগুলো সুরক্ষার সঙ্গে স্থানীয় মানুষের ব্যক্তিস্বার্থের মধ্যে সম্পর্ক বাড়ানো যেতে পারে। আমাদের দেশে দুর্যোগের আগে নানা রকমের প্রস্তুতি নেয়া এবং দুর্যোগের পরপর সব ভুলে যাওয়ার সংস্কৃতি চালু আছে। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। এছাড়া সরকারি বরাদ্দের অর্থ নয়ছয়ের প্রচেষ্টাও দেখা যায়। জোয়ারের পানি ঠেকানোর রিং বাঁধ নির্মাণ, বাঁধ মেরামত, সংস্কার প্রভৃতির নামে প্রতি বছর নেয়া হয় বিভিন্ন প্রকল্প। এসব প্রকল্পের অর্থ নয়ছয়ের ঘটনাও ঘটে। বর্ষা এলে বাঁধ ভেঙে যায়। নতুন প্রকল্পের নামে শুরু হয় নতুন বরাদ্দ। এভাবে বছরের পর বছর উপকূলীয় বাঁধের সংস্কারের নামে চলে অর্থের অপচয়। এই মনোভঙ্গিরও অবসান জরুরি।’
বেড়িবাঁধ নির্মাণ সম্পর্কে প্রকৃত অবস্থার চিত্র উঠে আসে বিবিসির ১৫ জুলাই ২০২০ প্রতিবেদনে, “ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলাসহ নয়টি জেলার কয়েকশ গ্রাম প্লাবিত হয়ে গেছে। এসব জেলার পাশ দিয়ে যে নদীগুলো বয়ে গেছে সেগুলোর বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় মুহূর্তেই তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকা। অথচ প্রতি বছর বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং সংস্কার বাবদ বাজেটে মোটা অংকের বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু স্থানীয় এলাকাবাসী এবং মাঠ পর্যায়ে যে কর্মীরা কাজ করেন তারা জানিয়েছেন, সেই বরাদ্দের কোনো বাস্তবায়ন তারা দেখেননি। যখন সরকারি কোনো চুক্তি হয় তখন তার বরাদ্দকৃত অর্থ অনেকভাবেই ভাগাভাগি হয়ে যায় বলে তারা অভিযোগ করেছেন। বিদেশী দাতব্য সংস্থার কর্মকর্তা নাজমুন নাহার বলেন, ‘বরাদ্দ অর্থের পুরোটা বাঁধ সংস্কার বাস্তবায়নে কাজে লাগে কিনা আমার সন্দেহ আছে। এমনও হয়েছে যে কাগজে-কলমে দেখা গেছে যে কাজ হয়ে গেছে। আসলে কাজই হয়নি।’ প্রকৌশলীরা কাজ হয়ে গেছে বলে রিপোর্ট জমা দিয়ে দিলেও সরেজমিনে দেখা গেছে সেই কাজের কোনো অস্তিত্বই নেই, এমন অভিযোগ করেন নাহার। অথচ ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার পর এবারই সবচেয়ে প্রবল শক্তিতে উপকূলে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় আম্পান।’
এসব প্রতিবেদনে লক্ষ করার বিষয় যে বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে যথাযথ তদারকি, গুণগত মান পরীক্ষা ও একে টেকসইকরণে দায়িত্বশীল বিভাগ ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভার এবং কারিগরি নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা রয়েছে, রয়েছে সমন্বিত উদ্যোগের অভাব।
উপকূলীয় অর্থনীতির সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে বেড়িবাঁধ টেকসই আকারে নির্মাণসহ সুন্দরবন সুরক্ষা এবং উপকূলীয় জনপদ, জীবন ও জীবিকা ও কৃষি অর্থনীতির দুর্দশা লাঘব-উত্তর বিকাশকে গুরুত্ব দিতে স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে ২০২১-২২ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রদত্ত বরাদ্দ এবং এরই মধ্যে ঘোষিত উদ্যোগ ও নির্দেশনা যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর কড়া নজরদারি, আগামী অর্থবছরে বিশেষ বরাদ্দ দান ও তা বাস্তবায়নে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে ‘উপকূলীয় উন্নয়ন বোর্ড’ গঠন করা। উপকূলীয় উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হলে অর্থনীতির এক-চতুর্থাংশ জিডিপি সরবরাহকারী উপকূলীয় অঞ্চলের যাবতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি থেকে উপকূল, সুন্দরবন ও লোকালয় রক্ষার সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়াস প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পরিগ্রহ করবে। কৃষকের প্রাণের দাবি-নিরাপদ বেড়িবাঁধ চাই।’ ‘জোড়াতালির বাঁধ নয়-নিরাপদ বেড়িবাঁধ চাই।’ ‘ত্রাণ নয়, টেকসই বেড়িবাঁধ চাই’—এমন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। কেউ কেউ আবার বুকে-পিঠে এসব স্লোগান লিখে সেই ছুবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে ন্যায্য দাবির কথা জানাচ্ছেন রাষ্ট্র ও সরকারকে। যদি সরকার বাহাদুরের হৃদয়ে একটু হলেও নাড়া দেওয়া যায়।
এগুলো নিছক স্লোগান বা অন্য দশটা দাবির মতো সাধারণ কোনো দাবি নয়। এটি হচ্ছে মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষার দাবি, নূন্যতম সুযোগ সুবিধা নিয়ে বেঁচে থাকার দাবি। উপকূল আর উপকূলে বসবাসকারী মানবসন্তান, জীব-বৈচিত্র্য এবং সম্পদ রক্ষার দাবি। এসব দাবি পূরণ হতে পারে শুধুমাত্র একটি টেকসই বাঁধ নির্মাণ করার মধ্য দিয়ে।
গত ২০ মে উপকূলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সুপার সাইক্লোন আম্পানের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে সুন্দরবন, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটের বিস্তৃীর্ণ এলাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। ঝড়ের সঙ্গে জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গেছে উপকূলের মাইলের পর মাইল বেড়িবাঁধ। বাঁধ ভেসে যাওয়ার পর প্রায় দেড়মাস গত হলেও অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত জনপদের। প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ যুদ্ধ করছেন প্রতিদিন। এই দেড়মাস সময়েও আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়তে পারেননি বহু এলাকার মানুষ। নিজেদের বাড়িঘর থাকলেও সেখানে রাত কাটাতে সাহস পাননা তারা। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে তাদের জীবনযাত্রা। তাদের স্বপ্নগুলো ভেসে যাচ্ছে জোয়ারের পানিতে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা খুলনা বাগেরহাট উপকূলের ৪১টি নদ-নদীর প্রায় পাঁচ হাজার কিলমিটার বেড়িবাঁধের প্রায় ১৫০ কিলমিটার ভেঙে গেছে আম্পানের আঘাতে। ফলে পানিতে ভাসছে উপকূলের মানুষ ও মানুষের সুখ দুঃখ। শুধু যে বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে তা নয়। সরকারের প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী আম্পানের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপকূলের অবকাঠামো। প্রায় আড়াই লাখ বাড়িঘর, পৌনে দুই লাখ হেক্টর ফসলি জমি, চিংড়ি ও অন্য মাছের খামার, সড়ক, দুই শতাধিক ব্রিজ ও কালর্ভাট, প্রায় ৫০০ কিলোমিটার বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন, ৫০ হাজারেরও বেশি গবাদিপশু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বারবার সাইক্লোনের হাত থেকে উপকূলকে রক্ষাকারী বিশ্বের একমাত্র ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন। বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী সুন্দরবনের ১২ হাজার ৩৩২টি গাছ ভেঙে পড়েছে। এর বাইরে সুপেয় পানির সংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরো অনেক কিছু আছে এই ক্ষতির তালিকায়।
ক্ষতির এমন পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যাচ্ছে উপকূলের মানুষ তাদের টুকরো টুকরো স্বপ্নগুলোকে তিল তিল করে একত্রিত করেছিলেন, গড়ে তুলেছিলেন সুখের সংসার, সেই স্বপ্ন তাদের চোখের সামনে মুহূর্তেই ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সুপার সাইক্লোন আম্পান এবং তার কারণে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস।
আমরা একটা বিষয় দেখি, যখনই কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয় তখনই উপকূলের মানুষের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় সরকার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। সেই সাহায্য হচ্ছে সাময়িক প্রতিষেধক। অর্থাৎ ত্রাণ সামগ্রী, নগদ অর্থ, ।