
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত
জন্মভূমি রিপোর্ট : দৈনিক জন্মভূমি’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, খুলনা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক হুমায়ূন কবীর বালু হত্যাকাণ্ডের পর বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দায়ের হওয়া মামলার রায়ের পর্যবেক্ষনে আদালত উল্লেখ করেছেন, তখনকার সময়ে খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চল সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল। তিনি নির্ভিক সাংবাদিকতা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থানের কারণে নির্মমভাবে খুন হন। নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী সংগঠন পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি এমএল জনযুদ্ধের সন্ত্রাসীদের বোমা হামলায় তিনি প্রাণ হারান। এজাহারকারী, তদন্ত কর্মকর্তাসহ কয়েকজন সাক্ষীর জবানবন্দিতে উঠে এসেছে-দণ্ডিতরা তখন ওই সন্ত্রাসী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ছিল। অকুতোভয় কলম সৈনিক বালু হত্যাকাণ্ড- তৎকালে ঘটে যাওয়া কয়েকজন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতা খুনের ধারাবাহিকতা।
জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল-এর বিচারক মোঃ সাইফুজ্জামান হিরো রায়ের পর্যবেক্ষনে উল্লেখ করেছিলেন, এজাহারে বর্ণিত ঘটনার সময় অর্থাৎ ২০০৪ সালে নিহত হুমায়ূন কবীর বালু জনপ্রিয় দৈনিক জন্মভূমি পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন এবং অত্যন্ত নির্ভিক সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ওই সময় খুলনাসহ সমগ্র দক্ষিণ অঞ্চল সম্পূর্ণ সন্ত্রাস কবলিত জনপদ ছিল। তিনি জন্মভূমি ও সান্ধ্য দৈনিক রাজপথের দাবী পত্রিকাসহ বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও সেমিনারে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিবাদী হিসেবে সোচ্চার ছিলেন। সে কারণে তিনি তখনকার বিভিন্ন সন্ত্রাসী দল ও সংগঠনের টার্গেটে পরিণত হন।
পর্যবেক্ষন থেকে জানা গেছে, ঘটনাকালীন পরিস্থিতি বিবেচনা করলে সহজেই অনুমান করা যাবে- তখনকার সময়ে অত্র মামলার ঘটনাসহ কোনো চাঞ্চল্যকর হত্যা বা বিস্ফোরনের মামলায় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী থাকবে না, থাকলেও সাক্ষ্য দিবে না, এটাই স্বাভাবিক। বিস্ফোরনের ঘটনার বিষয়ে চাক্ষুস সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন নাই। কিন্তু, ঘটনার অব্যবহিত পরেই দু’জন স্থানীয় মানুষের সাক্ষ্য মামলাটির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের একজন রংমিস্ত্রি মিন্টু হাওলাদার, আরেকজন চা বিক্রেতা হাফিজুর রহমান। তারা হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন পর ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট স্বেচ্ছায় জবানবন্দি প্রদাণ করেন। তারা অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে আসামিদের নাম উল্লেখ করেন, কিভাবে তাদের চেনেন-নাম জানেন এবং ঘটনার সময় সনাক্ত করেন, সে বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন। তারা হত্যাকাণ্ডের পর আসামিদের সম্পৃক্ত করে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন, ১৪-১৫ বছর পর আদালতে একই রূপ বক্তব্য প্রদাণ করেন। সাক্ষী মিন্টুকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জেরা না করায় এবং হাফিজুর রহমানকে জেরার মাধ্যমে কোনো স্ববিরোধীতা প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের সাক্ষ্য সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য।
মামলার এজাহারকারী ও তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য, অন্যান্য মৌখিক সাক্ষ্য ও পারিপার্শিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আদালত মনে করেন-আসামিদের বিরুদ্ধে ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক দ্রব্যাদি আইনের ৩ ধারার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তারা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে দৈনিক জন্মভূমি পত্রিকা অফিসের সামনে শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সাংবাদিক হুমায়ূন কবীর বালুকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ট্রাইব্যুনাল-এর উচ্চমান বেঞ্চ সহকারী মোঃ ছায়েদুল হক শাহিন দৈনিক জন্মভূমিকে এ তথ্য জানান।
আদালতের পর্যবেক্ষণ সূত্রে জানা যায়, নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের কালে খুলনার মহানগর আওয়ামীলীগ এর সাবেক সভাপতি এডভোকেট মঞ্জুরুল ইমাম, সাংবাদিক মানিক চন্দ্র সাহা, জনকন্ঠ পত্রিকার যশোরের সাংবাদিক শামসুর রহমান ক্যবল, সাতক্ষীরার পত্রদূত সম্পাদক আলাউদ্দিন, দৈনিক রানার পত্রিকার সম্পাদক মুকুল এবং খুলনার বামপন্থী রাজনৈতিক নেতা কমরেড রতন সেন সন্ত্রাসীদের দ্বারা নির্মমভাবে নিহত হন। এরই ধারাবাহিকতায় নির্ভিক সাংবাদিক হুমায়ূন কবীর বালু পূর্ব পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাসীদের বোমা হামলায় প্রাণ হারান।
তদন্তকালে গ্রহণ করা সাক্ষীদের জবানবন্দির উদ্ধৃতি দিয়ে লেখা অভিযোগপত্র সূত্রে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের কিছু দিন আগে থেকেই হুমায়ূন কবীর বালুকে টেলিফোনে হুমকি দেয়া হচ্ছিল। বিষয়টি তিনি এবং তার ভাই এসএম জাহিদ হোসেন তৎকালীন পুলিশ কমিশনারকে জানিয়েছিলেন। আততায়ীদের বোমা হামলায় নিহত আরেক প্রথিতযশা সাংবাদিক মানিক সাহার সাথে কলম সৈনিক বালুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। মানিক সাহা হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের দাবিতে তিনি সোচ্চার ছিলেন। ওই কেস নিয়ে বালু যেন বাড়াবাড়ি না করেন-সে ব্যাপারে অজ্ঞাত পরিচয়ের ব্যক্তি টেলিফোনে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সাংবাদিক আইয়ুব হোসেনকে হুঁশিয়ারি বার্তা শুনিয়েছিলেন। চরমপন্থী সংগঠন পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি এমএল জনযুদ্ধের সন্ত্রাসীরা তার উপর ক্ষিপ্ত ছিল। ওই দলের আঞ্চলিক নেতা বিডিআর আলতাফ ঘাতক দলের নেতৃত্ব দেয় বলে গোপন সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছিল।