
শাহরিয়ার কবির, পাইকগাছা : সরকারি নির্ধারিত ফি যেখানে কয়েকশ’ টাকার বেশি নয়, সেখানে দালালচক্রের মাধ্যমে কাজ করতে হচ্ছে। সেখানে নামজারি, জমা খারিজ, খতিয়ান সংশোধন, পর্চা উত্তোলনে গুনতে হচ্ছে ১০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। আবার জমা খারিজ কিংবা খতিয়ান সংশোধনের মতো কাজে এই অঙ্ক এক থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত দর হাকানো হয়। টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখা, কাগজে অযৌক্তিক ত্রুটি দেখানো কিংবা মাসের পর মাস ঘোরানো এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এ চিত্র পাইকগাছা উপজেলা ভূমি অফিসের। তবে এমন গুরুতর অনিয়ম-দুর্নীতি থাকা সত্ত্বেও তা বন্ধে দৃশ্যমান কোন উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্টদের।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নির্ধারিত ফি থাকলেও দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে সাধারন মানুষকে ১০ থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়। জমা , খারিজ কিংবা খতিয়ান সংশোধনের মতো কাজে ১ লাখ থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত দালালদের দিয়ে কাজ করাতে হয়। একাধিক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কার্যত কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি উপজেলা এসিল্যান্ডকে। তার অফিসের বাইরে দেদারসে চলছে ঘুস লেনদেন। হয়রানি তো রয়েছে। ঘুসের টাকা নিয়ে জানাজানি হলে তা আবার ফেরৎ দেয়াও হচ্ছে।
একাধিক সূত্র জানায়, উপজেলা ভূমি অফিসের ভিতরে কর্মরত কর্মকর্তা কর্মচারীরাই দালালদের নিয়ন্ত্রন করেন। ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার মো. শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে চলে সিন্ডিকেট। শহিদুল ইসলাম দিন শেষে কালেকশনের অর্থ ভাগ বাটোয়ারা করেন। সিন্ডিকেটের দেয়া ঈশারায় দালালরা সাধারন মানুষদের সাথে কথা বলে টাকা হাতিয়ে নেয়। এর একটা অংশ ভূমি অফিসের টপ টু বটম পায়। যে ধরনের আবেদন সহজে সমাধান হয়ে যাবে, সেসকল আবেদনের তথ্য অফিস থেকে দালালদের দিলে সেবাগ্রহীতাদের নানা অজুহাতে ভয় ভীতি দিয়ে দালালরা টাকা হাতিয়ে নেয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরাসরি ভূমি অফিসে আবেদন করলেই শুরু হয় হয়রানি। কখনো বলা হয় এসিল্যান্ড অফিসে নেই, কখনো রিপোর্ট আসেনি, আবার কখনো নতুন আপত্তি তোলা হয়। ঠিক তখনই দৃশ্যপটে ভিন্নরুপে হাজির হয় একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র—যারা ‘লাইন ঠিক আছে’ বলে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
খোজ নিয়ে জানা যায়, সৈয়দ সালাম উল্ল্যাহ নামে এক ব্যক্তি নিজেকে সাবেক বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রতিদিন অফিস চলাকালীন সময় ভূমি অফিসে অবস্থান করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। ভূমি অফিসের ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে সমন্বয় করেই এই অবৈধ বাণিজ্য করছেন তিনি। পৌর সদরের ৬ নং ওয়ার্ডের বাতিখালী গ্রামের সাবিনা বেগম এর কাজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ১০ হাজার টাকা নেন। বিষয়টি জানাজানি হলে তিনি টাকাটা ফেরত দিয়ে দেন। এ বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার শহিদুল ইসলাম মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, “এ বিষয়ে আমার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আছে। অফিসিয়াল বক্তব্য তাঁদের কাছ থেকেই জানা যাবে।”
সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফজলে রাব্বী এ বিষয়ে জানান ,“আমাদের অফিসে কোনো দালাল চক্র নেই। সার্ভেয়ারসহ সকল কর্মচারী নিয়ম মেনে দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন সময়ে কিছু অভিযোগ ওঠে, কিন্তু সেগুলো প্রায়ই ভিত্তিহীন। আমরা সচেতনতার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে জানাই যে অফিসে কোনো অনৈতিক লেনদেন হবে না।
তবে অফিসের বাইরে কেউ অননুমোদিতভাবে টাকা-পয়সা আদায় করলে তা সম্পূর্ণ বেআইনি। ভুক্তভোগীরা সরাসরি অফিসে এসে অভিযোগ করতে পারেন। অভিযোগের ভিত্তিতে প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। আমরা নিয়মিত মনিটর করি যাতে কোনো অনিয়ম বা অবৈধ লেনদেন না হয়।

