
শাহরিয়ার কবির, পাইকগাছা : নেই ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। আগুন লাগলে পাশের উপজেলার ফায়ার স্টেশনে খবর দিতে হয়, ৩০ মিনিটের পথ অতিক্রম করে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের আসতে হয়। এ চিত্র খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার। অবহেলিত এ উপজেলাটির ফায়ার স্টেশন এখন সময়ের দাবী।বিশেষ করে, অগ্নিকাণ্ড, দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের প্রয়োজন।
পাইকগাছা উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা খালিদ হাসান ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাবনা পাঠিয়েছিলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর প্রস্তাবটি আজও পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।
সুন্দরবনের সন্নিকটে পাইকগাছা উপজেলা অবস্থিত। খুলনা জেলা শহর থেকে প্রায় ৬৬ কিলোমিটার দূরে ১০ টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে এ উপজেলা।
খোজ নিয়ে জানা যায়, পাইকগাছা উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা খালিদ হাসান ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের জন্য পৌর সদরের শিববাটী মৌজায় টেকনিক্যাল স্কুল ও নতুন পৌরসভা ভবনের মাঝে পাইকগাছা-কয়রা’র প্রধান সড়কের পাশে ১ বিঘা জমি ফায়ার স্টেশনের জন্য নির্ধারণ করে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য প্রস্তাবনা পাঠিয়েছিলেন। এমনকি নির্ধারিত স্থানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের আওতাধীন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সাইন বোর্ডও লাগানো হয়। সেখানে জমির অধিগ্রহণের জটিলতা দেখা দিলে পরবর্তীতে পাইকগাছা কৃষি কলেজর অপর পাশে সরণ খালি মৌজায় জমি অধিগ্রহণের জন্য আবারো ডিসি অফিসসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়।
আরো জানা যায়, ২০১৯ সালে ফায়ার স্টেশন স্থাপন প্রকল্পের ফায়ার স্টেশন স্থাপনের জন্য অধিগ্রহণকৃত জমি ফায়ার স্টেশন স্থাপনের উপযোগী কিনা এবং মামলা মোকদ্দমা সংক্রান্ত জটিলতা আছে কিনা তা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও প্রশিক্ষন) লেঃ কর্ণেল সিদ্দিক মোহাম্মদ জুলফিকার রহমান।
বিগত দিনের দূর্ঘটনা বরাতে জানা যায়,২০২৩ সালের ১৭ জানুয়ারি পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাত দশটার দিকে অপারেশন থিয়েটার রুমে এসির সার্কিট ব্রেকারে শর্ট সার্কিট হয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। একই বছরের ১৩ ডিসেম্বর ২০২৩ ভোর রাতে পাইকগাছা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, ২০২৪ সালের ১৮ জানুয়ারি দুপুর তিন টার দিকে পৌরসদরের ৯ নং ওয়ার্ড শিববাটী গ্রামের ভ্যান চালক আকবর গাজীসহ তার পরিবারের পাঁচটি বসতঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়, সেখান থেকে মাত্র সাতাশ দিনের মাথায় অর্থাৎ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পৌর সদরের হক মার্কেটর পিছনে একটি গোয়াল ঘর ও জয়মা ফার্নিচার এবং মিজান ফার্নিচারের দোকান আগুনে পুড়ে প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ২০২৫ সালের ১১ মার্চ পৌরসদরে বাতিখালী বাড়ির ৮ টি ঘর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত হয়ে যায়।সবশেষ, চলতি বছরের ১৬ জুন উপজেলার গজালিয়া গ্রামে হতদরিদ্র কিনা গাজীর গোয়াল ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে পরবর্তীতে বসতঘরে ছড়িয়ে পড়লে বসতঘর পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা কামরুল ইসলাম বলেন, পাইকগাছা উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন না থাকায় পাশ্ববর্তী সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি ফায়ার স্টেশন ও তালা ফায়ার স্টেশন এবং পাইকগাছার পাশ্ববর্তী উপজেলা কয়রা’র ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মীরা এ উপজেলায় এসে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ করে। কিন্তু এই তিন উপজেলা থেকে আগুন লাগার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই সব পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে যায়। ঘরবাড়ি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন লেগে লক্ষ লক্ষ টাকার মালামাল পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে গেছে। একেরপর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সর্বস্ব হারাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো। এধরণের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব যদি পাইকগাছায় একটা ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থাকতো। দুঃখের বিষয় পার্শ্ববর্তী সকল উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থাকলেও এ উপজেলায় স্টেশন নেই।
অ্যাডভোকেট ও মানবাধিকার কর্মী এফএমএ রাজ্জাক বলেন, এ উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন না থাকায় মানুষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি।এ উপজেলায় একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থাকলে ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো বা কমানো যেত। ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থাকলে আগুন লাগা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো ঘটনা ঘটলে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হতো, ফলে ক্ষয়ক্ষতি পরিমাণটাও অনেক কম হতো। বিশেষ করে, পাইকগাছা পৌরসভায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন না থাকার কারণে আগুন লাগলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হচ্ছে।
পাইকগাছা উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সভাপতি ও সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহবায়ক ডা. মো. আব্দুল মজিদ জানান, পাইকগাছার মতো এতো বড় একটা উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নেই এটা আমাদের জন্য দুঃখ জনক। খুলনা জেলার সবথেকে বড় উপজেলা পাইকগাছা। উপজেলায় একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের প্রয়োজন।এই উপজেলায় অগ্নি সংযোগের মতো বড় কোন দূর্ঘটনা ঘটলে অন্যান্য উপজেলা থেকে এ উপজেলায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আসতে দীর্ঘ একটি সময় লাগে। তারা ঘটনা স্থলে পৌঁছাতে পুড়ে সব ভস্মীভূত হয়ে যায়।
পাইকগাছা উপজেলায় ফায়ার স্টেশন স্থাপনের দাবিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই জেলা প্রশাসক (ডিসি) মহোদয়ের কাছে পুনরায় লিখিত আবেদন পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী।