
সিরাজুল ইসলাম, ( ইসলামী চিন্তাবিধ ও গবেষক) : মানুষের মধ্যে বিদ্যমান পশুশক্তিকে দমন করে আত্মিক ও নৈতিক পরিশুদ্ধতা অর্জন করা রমজান মাসের রোজা পালন করার অন্যতম উদ্দেশ্য। উপবাস অনুশীলনের মাধ্যমে অপরের অনাহার-ক্লিষ্টতা, অভাব-অনটনের দুঃখ-কষ্ট ও মানবিকতার যথার্থ অনুভূতি অর্জন করতে রোজা পালনের বিকল্প নেই। দুঃখিত, বিপদগ্রস্ত ও অসহায় মানবতার প্রতি সহানুভূতি সহমর্মিতা প্রদর্শন মানুষের নৈতিক দায়িত্বও বটে। এরূপ গুণাবলীর অধিকারী হতে হলে রোজা পালন অপরিহার্য। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) রমজান মাসের রোজার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও তাৎপর্যের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে এই পবিত্র মাসকে ‘শাহরুল মোওয়াসাত’ বা মানুষের প্রতি ‘সহানুভূতি প্রদর্শনের মাস’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই সহানুভূতি প্রদর্শনের বহু দিক রয়েছে।
‘মোওয়াসাত’ বা সহানুভূতি প্রদর্শনের অনুশীলন করার উত্তম ব্যবস্থা হিসেবে এই মাসের বৈশিষ্ট্য স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বর্ণনা করেছেন। তিনি ধনী-গণীদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের কথা বলেননি। দরিদ্র-অভাবী, ফকির-মিসকিন, অসহায়দের প্রতি ধনীদের সহানুভূতি প্রদর্শনের কথাই বলেছেন। আর্থিকভাবে সক্ষম-সচ্ছল লোকরাই দরিদ্র-অভাবী-অসহায়দের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করবে, তাদের প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করবেÑ সহানুভূতির মাস বলতে এটাকেই বুঝানো হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একজন অর্থশালী রোজাদার ইফতারের জন্য রুচিসম্মত বহু প্রকারের জিনিসের ব্যবস্থা করে তৃপ্তি সহকারে ইফতার করে অথবা ইফতারের জন্য বিপুল আয়োজন করে বড় বড় লোকদের দাওয়াত করে, অথচ তার আশেপাশে এমন রোজাদারও রয়েছে, যাদের ইফতার করার সম্বল পানি ছাড়া আর কিছুই নেই। বিত্তশালী লোকদের ইফতার করানোর সময় এই গরীব-মিসকিন রোজাদারদের কথা স্মরণ করে তাদেরকেও যদি অংশীদার করা হয়, তা হবে সহানুভূতি প্রদর্শনের অন্তর্ভুক্ত। তাই ইফতার-সেহরিতে এতিম-মিসকিন ও অসহায়-দরিদ্রদের জন্য একটা অংশ থাকা আবশ্যক। অনুরূপভাবে সেহরির কথাও এসে যায়। সমাজে এমন রোজাদারের অভাব নেই, যারা যথাযথভাবে সেহরি খাওয়ারও সুযোগ পায় না। তারা যেন রোজা পালনের জন্য খাদ্যকষ্ট ভোগ না করে, বিত্তবানদের সেদিকেও মনোযোগী হওয়া উচিত। রোজা পালনের মাধমে এই মমতাবোধ সৃষ্টি হয়ে থাকে। রোজাদারদের ইফতার করানোর মধ্যে যে মানবিক দিক রয়েছে তার তাৎপর্য সংক্রান্ত বহু হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ্ (সা.) পবিত্র রমজান মাসে দান-খয়রাতের ওপরও বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছেন, যাতে মানবীয় কল্যাণ রয়েছে। এই মাসে মোমেনের রিযিক বা জীবিকা বৃদ্ধি পায় বলেও রাসূলুল্লাহ্ (সা.) উল্লেখ করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম এই মাসে বিশেষভাবে অধিক পরিমাণে দানÑখয়রাত করতেন এবং তাদের বদান্য ও আত্মত্যাগের প্রবণতা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেত। তাদের জীবনে এ ধরনের অসংখ্য ঘটনার কথা জানা যায়। রমজান মাসে তাঁদের সহানূভুতি প্রদর্শনের দৃষ্টান্ত বিরল।
রাসূলুল্লাহ্ (সা.) আরও একটি মানবিক দিকের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। রমজান উপলক্ষে প্রদত্ত ভাষণে তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এই মাসে তার খাদেম বা কর্মচারীর শ্রমের বোঝা হ্রাস করবে, আল্লাহ্ তাআলা তাকে ক্ষমা করবেন এবং তাকে দোজখ হতে মুক্তি দান করবেন’। এই উক্তির মাধ্যমে রসূলুল্লাহ্ (সা.) এই মর্মে সকলকে উৎসাহিত করেছেন যে, রমজান মাসে মালিকরা যেন শ্রমিক-মজুরদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে এবং তাদের প্রতি শ্রম আদায়ে সহানুভূতি প্রদর্শন করে। অর্থাৎ রমজান মাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শনও এই মাসের পবিত্রতার কথা স্মরণ করে শ্রমিকদের শ্রম হ্রাস করা, অবশ্য শ্রমিকেরও রোজাদার হতে হবে, রোজা রাখার কারণেই সে মালিকের পক্ষ হতে এই সুযোগের অধিকারী হবে।
আল্লাহ্প্রদত্ত রিযিক বা জীবিকা দ্বারা মানুষের উপকার ও কল্যাণ সাধন করা রমজানের একটি বড় শিক্ষা। এই শিক্ষা কেবল রমজানেই সীমাবদ্ধ নয়, অন্যান্য সময়ের জন্যও তা সমানভাবে প্রযোজ্য। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর একটি হাদীসের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। হজরত ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে সবর্দা পাঁচশ মনোনীত ব্যক্তি বা চল্লিশ জন ‘আবদাল’ থাকে। যখন তাদের একজন মৃত্যুবরণ করে, তখন অপরজন দ্রুত সেই স্থান অধিকার করে। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, এসব লোকের বিশেষ কাজ কী? হুজুর (সা.) বললেন, অত্যাচারীদের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে এবং যারা মন্দ কাজ করে তাদের প্রতিও উপকার করে এবং আল্লাহ্ তাআলার প্রদত্ত রিজিক হতে মানুষের সঙ্গে হামদর্দী ও সহানুভূতিমূলক আচরণ করে। অর্থাৎ বান্দাগণের মধ্যে আল্লাহ্ তাআলার একটি মনোনীত বিশেষ দল সার্বক্ষণিকভাবে মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনে নিয়োজিত। তারা অত্যাচারী ও অন্যায়কারীদের প্রতিও সহানুভূতি প্রদর্শন করে থাকেন। কাজেই রমজানের মতো পবিত্র ও মহিমান্বিত মাসে দুঃখী-গরিব-মিসকিন ও অসহায় লোকদের এবং শ্রমিক মজুরের প্রতি বিত্তবান মালিক কর্তৃপক্ষ একটু সুদৃষ্টি দান করলে তা হবে রমজানের মহৎ শিক্ষারই অনুসরণ। সহানুভূতি প্রদর্শনের এই মাসে আরও নানাভাবে দুস্থ মানবতার সেবা করার প্রশস্ত ময়দান রয়েছে।
বিশ^ মুসলিমের বৃহত্তর ঐক্য-সংহতি, সাম্য ও সৌভ্রাতৃত্বের প্রতীক পবিত্র মাহে রমজান আল্লাহ্ তাআলার এমন একটি অবদান, যার মধ্যে নিহিত রয়েছে মানব কল্যাণের অপূর্ব দৃষ্টান্ত। সমগ্র মুসলিম জাতির জন্য বিধিবদ্ধ করা হয়েছে এই পবিত্র মাসের রোজা, প্রত্যেক দেশের সময়ানুযায়ী একই পদ্ধতিতে রোজা রাখার জন্য বিধি-বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে। রমজান মাসের রোজা পালনের এই খোদায়ী বিধানগুলো পর্যালোচনা করলে প্রমাণিত হয় যে, এতে ঐক্য-সংহতির এক অপূর্ব সমাবেশ ঘটেছে। সেহরি খাওয়া থেকে ইফতার পর্যন্ত দিবা ভাগের করণীয় ও বর্জনীয় কাজগুলো বিশে^র কোনো মুসলমানের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়নি, বরং প্রত্যেক দেশের মুসলমানের জন্য এক ও অভিন্ন নিয়ম করা হয়েছে। তবে বিশেষ পরিস্থিতির কথা ভিন্ন। যেমনÑ যেসব দেশে দিবা-রাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দিবা ভাগ অতি সংকীর্ণ বা তিন-চার ঘণ্টারও কম, সেসব দেশে মুসলমানগণ কীভাবে রোজা পালন করবে, সেটি স্বতন্ত্র বিষয়।
সারা দুনিয়ার মুসলমানগণের জন্য সাধারণভাবে রমজানকে রোজা পালনে ধর্মীয় বিধি-বিধানে কোনো তারতম্য রাখা হয়নি। সেহরি খাওয়ার জন্য সময় নির্ধারণ ও খাওয়ার অভিন্ন রীতিনীতি রয়েছে। এবাদত-বন্দেগী, জিকির, তসবীহ, তহলীল, কোরআন তেলাওয়াত প্রভৃতি নফল এবাদতকে রমজানের করণীয় বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আর একই সাথে দুনিয়াবী কাজ-কর্ম চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এসব বিষয়ে যে কোনো রোজাদার তার দায়িত্ব ও কর্তব্য স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যাবে। রাতের ইবাদতের মধ্যে তারাবীহ্র নামাজ সকলের জন্য সুন্নত হিসেবে ধার্য্য করা হয়েছে। ইবাদতের এই অভিন্নতা মুসলমানদের মৌলিক ঐক্যের একটি প্রকৃষ্ট প্রমাণ। সমগ্র দুনিয়ার মুসলমান রমজান মাসের রোজা পালনের মধ্যে উপবাস পালনের যে ঐক্য প্রদর্শন করে থাকে, সেটিও তাদের মধ্যে ইসলামী বৃহত্তর ঐক্যেরই প্রতীক। এসবই হচ্ছে রমজান মাসব্যাপী মুসলিম ঐক্য-বৈশিষ্ট্য। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ্ তাআলার রশ্মিকে তোমরা দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং মতবিরোধ করো না।’ এই শিক্ষা কোরআনের বহু স্থানে পরিলক্ষিত হয়। রমজান মাসই এই শিক্ষার অন্যতম প্রতীক।
এই মাসের করণীয় কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ফিতরা’ প্রদান ব্যবস্থা। ফিতরা পাওয়ার যোগ্য কারা, কোরআনে তার বিশদ বিবরণ প্রদান করা হয়েছে। শারীরিক আত্মশুদ্ধি ও সংযম সাধনের সাথে সাথে আর্থিক পবিত্রতা অর্জনের এই ব্যবস্থার মধ্যেও মুসলমানদের ঐক্য চেতনা জাগ্রত করার নির্দেশ রয়েছে। সারা দুনিয়ার মুসলমানগণ পবিত্র রমজান মাসে শরীয়ত নির্ধারিত পরিমাণে নির্ধারিত বস্তু দ্বারা ফিতরা প্রদান করে কতিপয় নির্ধারিত শ্রেণির লোকের প্রতি মানবতা, সহানুভূতি ও সহমর্মিতা প্রদর্শনের এক অকল্পনীয় প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। সারা দুনিয়ার মুসলমানের মধ্যে একই দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। রমজান মাসের প্রতি, এই মাসের রোজার প্রতি সম্মান প্রদর্শন ফিতরা আদায়ের মধ্যে দেখা যায়। শরীয়তের দৃষ্টিতে সক্ষম রোজাদার এবং অরোজাদার নারী-শিশু সকলের জন্য ফিতরা নির্ধারণ করা হয়েছে। গরিব, ইয়াতিম, মিসকিন প্রভৃতি শ্রেণির-যারা ফিতরা পাওয়ার যোগ্য, তাদের সকলের সাহায্য সহযোগিতা ও সহমর্মিতা প্রদর্শনের এই আর্থিক ব্যবস্থা প্রতিটি স্থানে মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য। এতে মুসলিম ঐক্য-সংহতির অভিন্ন নিদর্শন এক বিরল ঘটনা। তাছাড়াও দান খয়রাতের মাধ্যমেও একই উদ্দেশ্য সাধিত হয়ে থাকে। সুতরাং ফিতরা, সাধারণ দান-খয়রাত, সদকাÑ এসবই হচ্ছে রমজান মাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উত্তম ব্যবস্থা। আর্থিক ক্ষমতা সৃষ্টির জন্য রমজানের এই অবদান মুসলিম জীবনের একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দিক, যা মুসলমানগণ রমজানের মাধ্যমেই অর্জন করতে পারে।
সারা দুনিয়ার মসজিদগুলোতে এই রমজান মাসে তারাবীহর পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট দিনগুলোতে ‘এতেকাফ’ প্রথা, শবে-কদরের এবাদত-বন্দেগিতে মুসলমানদের আত্মনিয়োগ এবং আধ্যাত্মিকতা চর্চায় যে সর্বব্যাপী চেতনা-অনুভূতির সৃষ্টি হয়ে থাকে তাতেও মুসলিম ঐক্য সংহতির ব্যাপকতা লক্ষ করা যায়। অনুরূপভাবে এই পবিত্র মাসে সক্ষম ধনী-বিত্তশালী-মুসলমানগণ ‘জাকাত’ প্রদানের মাধ্যমে আত্মিক পরিশুদ্ধতার সাথে সাথে আর্থিক পবিত্রতা অর্জন করে থাকে এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ্ তাআলার দরবারেও তারা উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হবে বলে তাঁরই ঘোষণা।সমগ্র মুসলিম জাহানে রহমাত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস মাহে রমজানের কঠোর সিয়াম সাধনা শুরু হচ্ছে। দীর্ঘ এক মাস রমজানের কঠোর পরিশ্রম ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে মহান আল্লাহ তা’আলা জাল্লা শানহু’র তাকওয়া অর্জন ও এর সামগ্রিক সুফল সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে পারলে বিশ্বব্যাপি মানবতার শান্তি ও সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত হবে। রমজানের রোজা সাধনার মাধ্যমে মানুষের অন্তরের রিপুকে মহান আল্লাহ তা’আলা জাল্লা শানহু’র তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিশ্চিত করা হয়। অন্তরের পশু প্রবৃত্তি তথা নফসে আম্মারাকে বশীভূত করে মানুষ নফসে লাওয়্যামা ও নফসে মুতমাইন্না (সর্বোচ্চ প্রশান্ত আত্মা) এর পর্যায়ে উপনীত হয়। প্রকৃত রোজাদার তাই এ মাসে আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংশোধনের পর্যায় উপনীত হয়। আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংশোধনের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তা’আলা জাল্লা শানহু’র নৈকট্য লাভ করে। আর সত্যিকার সিয়াম সাধনার মাধ্যমে সমাজ থেকে সকল অন্যায়, অনাচার, ব্যভিচার ও সন্ত্রাস দূরীভূত হয়। গোটা ব্যক্তি জীবনে নিরাপদ ও নির্বিঘেœ জীবন যাপনের নিশ্চয়তা লাভ করা যায়। আমাদের আলোচনা মাহে রমজান সম্পর্কে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান কি বলে।
অভিজ্ঞ গবেষক ও চিকিৎসকগণ দেখতে পেয়েছেন, সর্বক্ষণ অনিয়মিত আহার, সীমাতিরিক্ত ভোজন ও দূষিত খাদ্য খাওয়ায় শরীরের কোষে কোষে এক প্রকার বিষাক্ত উপকরণ ও উপাদানের সৃষ্টি হয় এবং তা জৈব বিষ হিসাবে জমা হয়। বার বার প্রতিদিন এমনটা ঘটার কারণে দেহের নির্বাহী ও কর্মসম্পাদন অঙ্গ- প্রতঙ্গগুলো বিষাক্ত উপকরণ ও জৈব বিষ দমনে অক্ষম হয়ে পড়ে। ফলে তখন শরীরে জটিল ও কঠিন রোগের জন্ম হয়। দেহের মধ্যকার এমন বিষাক্ত ও দূষিত উপাদানগুলো অতিদ্রুত নির্মূলকরণের নিমিত্তে পাকস্থলিকে মাঝে মধ্যে বিশ্রামে রাখা একান্ত প্রয়োজন। রোজাই এর একমাত্র সহায়ক। যার বিকল্প কল্পনা করা যায় না।
১৯৬০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ডা. গোলাম মোয়াজ্জেম কর্তৃক ‘মানব শরীরের উপর রোজার প্রভাব’ শীর্ষক গবেষণামূলক নিবন্ধ অনুযায়ী জানা যায়, রোজায় শরীরের ওজন সামান্য হ্রাস পায় বটে, তবে তা শরীরের কোন ক্ষতি করে না বরং শরীরের মেদ কমাতে রোজা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অপেক্ষা অধিক কার্যকর। তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার আলোকে আরও জানা যায়, যারা মনে করেন রোজা রাখলে শূল-বেদনার প্রলোপ বৃদ্ধি পায়, তাদের এ ধারণা সঠিক নয় বরং ভোজনে তা বৃদ্ধিপায়।
পাকিস্তানের প্রবীন প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ হোসেনের নিবন্ধ থেকে জানা যায়, যারা নিয়মিত সিয়াম পালন করে সাধারণত তারা বাতরোগে, বহুমূত্র, অজীর্ণ, হৃদরোগ ও রক্তচাপজনিত ব্যধিতে আক্রান্ত কম হয়।
ডা. ক্লাইভ সহ অন্যান্য চিকিৎসা বিজ্ঞানী পর্যন্ত স্বীকার করেছেন, ইসলামের সিয়াম সাধনার বিধান স্বাস্থ্যসম্মত এবং ফলপ্রসূ, আর তাই মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার রোগ- ব্যাধি তুলনামূলকভাবে অন্য এলাকার চেয়ে কম দেখা যায়।
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম কম খাওয়ার জন্য বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। ক্ষুধা লাগলে খেতে বলেছেন এবং ক্ষুধা না লাগলে খাওয়া বন্ধ করার জন্য উপদেশ দিয়েছেন যা চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্মত। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে দীর্ঘজীবন লাভ করার জন্য খুব বেশি খাওয়ার প্রয়োজন নেই। এখন আধুনিক বিজ্ঞান ও কিছু অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মতামত উল্লেখ্য করা হলো।
জার্মানির ডাক্তার ফেডারিক হভম্যান (জন্ম ১৬৬০ মৃত্যু ১৭২৪) বলেছেন, “রোজার মাধ্যমে মৃগীরোগ, গ্যাস্ট্রিক ও আলসারের চিকিৎসা করা যায়।”
ইটালির বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী মাইকেল এংলো ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন। ৯০ বছর বয়স পার হওয়া সত্ত্বেও তিনি কর্মক্ষম ও কর্মঠ ছিলেন। তাকে এর রহস্য সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, আমি বহু দিন আগ থেকেই মাঝে মাঝে রোজা রেখে আসছি। আমি প্রত্যেক বছর এক মাস, প্রত্যেক মাসে এক সপ্তাহ রোজা রাখি এবং দিনে তিন বেলার পরিবর্তে দুই বেলা খাবার খাই।
ক্যাব্রিজের ডাক্তার লেখার জিম। তিনি ছিলেন, ফার্মাকোলজি বিশেষজ্ঞ। সব কিছু গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে তার স্বভাব। তিনি রোজাদার ব্যক্তির খালি পেটের খাদ্য নালীর লালা, স্টোমাক সিক্রেশন সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরী পরীক্ষা করেন। এতে তিনি বুঝতে পারলেন, রোজার মাধ্যমে ফুডপার্টিকেলস বিহীন পাকস্থলি দেহের সুস্থতার বাহন। বিশেষত পাকস্থলীর রোগের আরোগ্য গ্যারান্টি।
মহাতœা গান্ধীর ইচ্ছা। মহাতœা গান্ধীর উপোস থাকার ঘটনা সর্বজন বিদিত। ফিরোজ রাজ লিখিত ‘দাস্তানে গান্ধী’তে লেখা রয়েছে, তিনি রোজা রাখা বা উপবাস পছন্দ করতেন। তিনি বলতেন মানুষ খাবার খেয়ে নিজের দেহকে ভারী করে ফেলে। এরকম ভারী অলস দেহ দুনিয়ার কোনো কাজে আসে না। তাই তোমরা যদি তোমাদের দেহ কর্মঠ এবং সবল রাখতে চাও তবে দেহকে কম খাবার দাও। তোমরা উপস থাকো। সারা দিন জপ তপ করো আর সন্ধ্যায় বকরির দুধ দিয়ে উপবাস ভঙ্গ করো। (দাস্তানে গান্ধী)
সিগমন্ডনারায়েড মনস্তত্ত্ব বিজ্ঞানী এর মন্তব্য। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট মনস্তত্ত্ব বিশারদ। তার আবিস্কৃত থিওরী মনস্তত্ত্ব ক্ষেত্র পথ নির্দেশকের ভূমিকা পালন করে। তিনিও রোজা এবং উপবাসের একনিষ্ট সমর্থক ছিলেন। তিনি বলেন, রোজার মাধ্যমে মস্তিস্কের এবং মনের যাবতীয় রোগ ভালো হয়। মানুষ শারিরিক ভাবে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকুল পরিস্থিতির মূখো- মূখি হয়। কিন্তু রোজাদার ব্যক্তির দেহ ক্রমাগত চাপ সহ্য করার যোগ্যতা অর্জন করে। রোজাদার ব্যক্তি খিচুনি এবং মানসিক রোগ থেকে মুক্তি লাভ করে। এমনকি কঠিন রোগ থেকে মুক্তি লাভ করে এবং এ রোগের সম্মুখিন হওয়া থেকে বিরত থাকে।
আলেকজান্ডার গ্রেট এবং এরিস্টল। উল্লিখিত দু’জনই ছিলেন নামকরা ব্যক্তিত্ব। নিজ নিজ ক্ষেত্রে তারা বিশ্বখ্যাত। তারা মাঝে মাঝে ক্ষুধার্ত বা উপবাস থাকাকে দেহের সুস্থতা ও সবলতার জন্য খুবই উপকারী বলে মনে করেন। আলেকজান্ডার গ্রেট বলেন, আমার জীবনে অনেক ব্যতিক্রমধর্মী অভিজ্ঞতা এবং ঘটনা দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি, সকাল সন্ধা যে আহার করে সে রোগ মুক্ত। আমি ভারতে এরকম প্রচন্ড উষ্ণ এলাকা দেখেছি। যেখানে সবুজ গাছ পালা পুড়ে গেছে। কিন্তু সেই তীব্র গরমের মধ্যেও আমি সকালে এবং বিকালে খেয়েছি। সারাদিন কোনো প্রকার পানাহার করিনি। এর ফলে আমি অনুভব করেছি এক নতুন অফুরন্ত প্রাণ শক্তি। (আলেক জান্ডার গ্রেট, মাহফুজুর রহমান আখতারী)।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র প্রফেসর’স মোরপান্ড বলেছেন, আমি ইসলাম সম্পর্কে মোটামুটি জানার চেষ্টা করেছি। রোজা অধ্যায় অধ্যায়নের সময় আমি খুবই মুগ্ধ ও অভিভূত হয়েছি। চিন্তা করেছি ইসলাম তার অনুসারীদের জন্য এক মহা ফর্মুলা দিয়েছে। ইসলাম যদি তার অনুসারীদের কোনো বিধান না দিয়ে শুধু রোজা দিত তবুও এর চেয়ে বড় নেয়ামত আর কিছু হত না। বিষয়টি নিয়ে আমি একটু গভীর চিন্তায় মনোনিবেশ করলাম। তাই বাস্তব অভিজ্ঞতার জন্য আমি মুসলমানদের সাথে রোজা রাখতে শুরু করলাম। দীর্ঘ দিন যাবৎ আমি পাকস্থলি রোগে ভূগছিলাম এবং কিছুদিন পর আমি সুস্থ্যতা বোধ করলাম। দেখলাম রোগ অনেকটাই কমে গেছে। আমি রোজা চালিয়ে গেলাম এতে দেহ আরো উন্নতি পরিবর্তণ উপভোগ করলাম। কিছুদিন পর লক্ষ্য করলাম আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছি। এক মাস পর আমি নিজের মাঝে এক অসাধারন পরিবর্তন অনুভব করলাম। (রসালানঈ দুনিয়া)
পাকিস্থানে বিদেশী বিশেষজ্ঞদের সার্ভে রিপোর্ট। রমজান মাসে নাক, কান, গলার অসুখ কম হয়। জার্মানি, ইংল্যান্ড এবং আমেরিকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎকদের একটি টিম এ সম্পর্কে গবেষণা করার জন্য এক রমজান মাসে পাকিস্তান আসে। তারা গবেষণা কর্মের জন্য পাকিস্তানের করাচী লাহোর এবং ফয়সালাবাদ শহরকে মনোনীত করেছেন সার্ভে করার পর তারা যে রির্পোট দিলেন তার মূল কথা ছিলো নি¤œরুপ। মুসলমানরা নামাজের জন্য যে অজু করে সেই অজুর কারণে নাক, কান গলার অসুখ কম হয়। খাদ্য কম খাওয়ার কারণে পাকস্থলী এবং লিভারের অসুখ কম হয়। রোজার কারণে তারা মস্তিস্ক এবং হৃদরোগের আক্রান্ত কম হয়।রহমাত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস রমজানুল মোবারক ফিরে এসেছে। এ মাস সিয়াম সাধনার। আত্মসংযমের। ধৈর্য, ত্যাগ, সহানুভূতি, সহমর্মিতা অর্জনের। মানবিক গুণাবলী অনুশীলনের। এ জন্য এ মাস অতি পবিত্র। মুসলিম জাতির জন্য তো বটেই অন্যান্য জাতির নিকটও এ মাসটি অতি পবিত্র, বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ মাসে মানব জাতিকে সঠিক পথপ্রদর্শনের জন্য যেমন মহাগ্রন্থ আল-কুরআন নাজিল হয়েছে, তেমনি অন্যান্য আসমানী কিতাবও নাজিল হয়েছে এ পবিত্র মাসেই। এ মাসের মধ্যে অবস্থিত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম কুরআনের নুজুল, তেমনি হযরত ইব্রাহীমের ছহিফা এ মাসের প্রথম কিংবা তৃতীয় তারিখে অবতীর্ণ হয়। অষ্টাদশ কিংবা দ্বাদশ তারিখে জবুর প্রাপ্ত হন হযরত দাউদ (আ.) ৬ষ্ঠ দিবসে তৌরাত পান হযরত মুসা (আ.)। দ্বাদশ কিংবা ত্রোয়দশ তারিখে ইঞ্জিল প্রাপ্ত হন হযরত ঈসা (আ.)। এরূপ সব আসমানী কিতাব এ মাসে নাজিল হওয়ায় সব জাতির নিকট এ মাস যেমন পবিত্র, তেমনি এর পবিত্রতা রক্ষার জন্য যত্নবান হওয়া উচিত প্রত্যেককেই। পবিত্রতা বা সম্মান রক্ষার অর্থ যার ওপর রোজা রাখা ফরজ তার রোজা রাখা, অধীনস্ত অন্যান্যের রোজা রাখানো। সব রকমের অন্যায়, অশ্লীলতা, বেলেল্লাপনা, নোংরামী, চরিত্রবিধ্বংসী ও নৈতিকতাবিরোধী কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকা ও অন্যান্যেরও বিরত রাখার চেষ্টা করা, রাস্তা-ঘাটে প্রকাশ্য দিবালোকে ধূমপানসহ সর্বপ্রকার পানাহার বন্ধ রাখা। ঝগড়া-ঝাটি, ফ্যাসাদ, কলহ-কোন্দল এড়িয়ে থাকা এবং তা যাতে সৃষ্টি হতে না পারে সেজন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো। সব ব্যাপারে সংযমশীলতার পরিচয় দেয়া। কুরআন তিলাওয়াত, চরিত্র গঠনমূলক আলোচনা অনুষ্ঠান, ইবাদত-বন্দেগি ইত্যাদির মাধ্যমে মুত্তাকী হওয়ার জন্য সৎ ও ভালো হওয়ার সাধনায় ব্রতী হওয়াই এ মাসের দাবি। যত্নের সাথে দীর্ঘ একটি মাস যদি গোটা জাতি এই সাধনায় আত্মনিয়োগ করে তবে তার মনমানসিকতার পরিবর্তন সম্ভব। রমজানের উদ্দেশ্য যাতে সফল হয়, এ জন্য সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা চালানো উচিত প্রতিটি লোকের। বিশেষ করে, সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের এ ব্যাপারে পালন করা উচিত বিশেষ ভূমিকা। কারণ, আমাদের আর্থিক অভাব, অনটন আছে একথা সত্য, কিন্তু আজকে সবচেয়ে বড় অভাব হচ্ছে সততার, ন্যায়নিষ্ঠার, দায়িত্ববোধের, সৎ চরিত্রের, যার অভাবে একটা জাতি কখনও নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না, আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে না। আমাদের জনগণ, জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে প্রায় সকলেই রমজানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকে। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এজন্য চেষ্টাও চালায়। কিন্তু একশ্রেণির অসৎ অতিলোভী ব্যবসায়ী, কিছু দায়িত্বহীন উচ্ছৃংখল, বখাটে যুবক এর পবিত্রতা বিনষ্টের জন্য যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই তৎপর হয়। এ ধরনের হীন মানসিকতাসম্পন্ন ব্যবসায়ীদের কথা অবশ্য আলাদা। লোভ তাদের পশুরও অধম করেছে। শকুন যেমন মড়া দেখলে খুশি হয়, তেমনি এরা মানুষের দুর্দশা দেখলে আনন্দিত হয়। একে মনে করে মুনাফা লোটার, স্ফীত হয়ে ওঠার একটা মোক্ষম মওকা। বানে, বন্যায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগে অগণিত মানুষ যখন হাহাকার করে, তখন তারা মাল আটকে রেখে মওজুদারির মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করার ধান্ধায় থাকে। জিনিসপত্রের দাম দ্বিগুণ, ত্রিগুণ বাড়িয়ে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার প্রতিযোগিতায় উঠে-পড়ে লেগে যায়। রমজানকেও এরা মোক্ষম সুযোগ মনে করে মানুষের রক্ত চোষার ঘৃণ্য তৎপরতায় লিপ্ত হয়। এদেরই কারসাজিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম হু হু করে চড়ে যায়। চলে যায় সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। উপর দিয়ে ধার্মিকতার যতই ভড়ং দেখাক না কেন, এদের কাছে রমজানের আবেদন ব্যর্থ হয়ে যায়। আত্মশুদ্ধি বা কৃচ্ছতা নয়, লোভ-লালসাই বর্ধিত হয় এদের। আর চরিত্রহীন উচ্ছংখল যুবকেরা রমজানকে মনে করে মহাগজব। তাদের শয়তানি, বদমাইশি চালানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ার ভয়ে তারা তৎপর হয়ে ওঠে। সমাজ ভালো হয়ে গেলে তাদের নষ্টামি আর নোংরামির অবারিত মওকা হারিয়ে যাবে। এ আতংকে তারা অস্থির হয়ে ওঠে রমজানের ডাক শুনেই।
রমজান মাস সহানুভূতি ও সহমর্মিতার মাস। রাসূলেপাক (সা.) একে আখ্যায়িত করেছেন শাহরুল মাওয়াছাত বা সমবেদনা ও সহমর্মিতার মাস বলে। গরিব-দুঃখী, দুস্থ, অনাথ, কাঙ্গালদের ব্যথা-কষ্ট দূর করার জন্য এ মাসে আরও অধিক যত্নবান হওয়া উচিত। কেবল ধনীরাই দান করবে, তা নয়। তারা তাদের মতো করবে, আমরাও পারি আমাদের মতো করতে। আমার ইফতারির জন্য ৫টা আইটেমের জায়গায় ৩টা আইটেম করে বাকি দুটো বা দুটোর পয়সা দিতে পারি আমাদের অভাবগ্রস্ত নিকট-প্রতিবেশীকে। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, রাসূলে করিম (সা.)-এর সেই সাবধান বাণী, খোদার কসম, সে ব্যক্তি মোমেন নয়, যে পেট পুরে আহার করে আর তার প্রতিবেশী অনাহারী ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাত কাটায়। রাসূলে করিম (সা.) আরও বলেছেন, আর যদি না পারো তবে তোমাদের তরকারিতে একটু বেশি করে সুরওয়া বা ঝোল দিও এবং তা প্রতিবেশীকে পৌঁছিও। কত বাস্তব ও যুক্তিপূর্ণ একথা। আসলে লাখ টাকা দান করাই বড় কথা নয়, আমার যা আছে তা থেকে যতটা সম্ভব দেয়াই বড় কথা। এটা একটা মানসিকতা। আমরা প্রত্যেকেই যদি নিজ নিজ প্রতিবেশীর দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হতাম, তবে সমাজে এ হাহাকার থাকতে পারতো না। নিজ বাড়ির আশপাশের ৪০ ঘর হচ্ছে প্রতিবেশী। প্রত্যেকেই যদি এ ৪০ ঘরের খোঁজ-খবর রাখে, সাধ্যানুযায়ী তাদের অভাব-অভিযোগ, দুঃখ-কষ্ট লাঘবের জন্য সচেষ্ট হয়, তবে সমাজের অবস্থা পাল্টে যেতে পারে। ধর্মপরায়ণতা প্রদর্শনীর ব্যাপার নয়, অন্তরের। তেমনি সওয়াব আড়ম্বরতার মধ্যে নেই, তা নিয়ত বা মননের মধ্যে। যিনি দোকানদার তিনি রোজাদারদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এই পবিত্র মাসের ফজিলতের প্রতি লক্ষ্য রেখে যদি যা ন্যায্যমূল্য তাই রাখে বা অন্য সময়ের তুলনায় একটু কম রাখে তবে অবশ্যই সে এর জন্য সওয়াব পাবে। এভাবে প্রত্যেকে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে নিজ নিজ সাধ্যসীমার মধ্যে কিছু না কিছু অবশ্যই করতে পারে।
রমজান মাসে ভালো ভালো খাবার আর ভূরিভোজনের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। সারা দিন অনাহারে থাকার মাসুল সুদে-আসলে পুরিয়ে নেয়ার জন্য সেহরি ও ইফতারিতে অধিক আয়োজন ও খাওয়ার প্রতিযোগিতা চলে। আসলে এতে রোজার মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়। এ মাস তো কৃচ্ছ্রতা সাধনের। সংযম সাধনার। রোজার মূল উদ্দেশ্য কামভাব ও প্রবৃত্তি দমন। কিন্তু অতিরিক্ত আহারের দ্বারা তা সফল হলো কোথায়? শেখ সাদী বলেছেন, পেট ও শরীর পূজারীরা অন্তর জ্ঞান ও সূক্ষ্মতন্ত্রের আলোক থেকে বঞ্চিত থাকে। তাই অপচয় না করে বরং দৈনন্দিন রুটিন খাবার থেকে কিছু বাঁচিয়ে পাশের অনাহারী লোকদের মুখে যদি তা তুলে দেয়া যায় এর দ্বারাই রোজার মূল লক্ষ্য হাসিল করা সম্ভব। আল্লাহ পানাহার করেন না। নিদ্রা-তন্দ্রা তাকে স্পর্শ করতে পারে না। তিনি রাব্বুল আলামীন, মহান প্রতিপালক, রোজার মধ্যে দিয়ে তার এই গুণাবলী আত্মস্থ করার চেষ্টা চালানো হয়। তাই আজকে আমাদের প্রার্থনা, আমরা যেন রোজার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হই এবং রমজানের দাহনে সব পাপ-পংকিলতাকে ভস্মিভূত করে পবিত্র দেহ, মন ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারি।ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম রোজা। তা পালনের সময় হলো মাহে রমজান। এর উদ্দেশ্য তাকওয়া। তাকওয়া অর্থ খোদাভীতি। আল্লাহর ভয়ে সব মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকা। সংযম অবলম্বন করা। এই পুণ্যটি হাসিলে যতসামান্য পণ্য বা অর্থের বিষয় আছে। তবে এ খরচ মোটেই ইসলামের আরেক স্তম্ভ হজ পালনের ধারেকাছে নয়। পরিমাণে অনেক কম।