
সক্রিয় একাধিক দস্যুবাহিনী, চরম আতঙ্কে সুন্দরবনের জেলেরা
রকিব উদ্দিন পান্নু : গেল ১৩ ফেব্রুয়ারী গভীর রাত। সারাদিনের হাড়ভাঙ্গা খাটুনী শেষে সুন্দরবনের শেলার চরের জেলেরা তখন গভীর ঘুমে । রাত দেড়টার দিকে হানা দেয় একদল বনদস্যু। শেলার চরের ছয়জন বনরক্ষী তখন তাদের অস্র গোলা বারুদসহ অফিস কক্ষে তালা মেরে ভেতরে অবস্থান নেয়। বনদস্যুরা একে একে তুলে নিয়ে যায় ছয়জন জেলেকে।
একটি ফাকা গুলি ছুড়ে, বনদস্যুদের ভয় দেখানো দুরের কথা। নিজেরা ভয় পেয়ে সারারাত আর বের হয়নি কোন বনরক্ষী। পরদিন জনপ্রতি দুইলাখ টাকা করে মুক্তিপন দাবী করে বনদুস্যুরা ।
অপহৃত জেলেদের মুক্তিপন তাদের স্বজনরা জোগার করতে পারেনি। ফলে দুস্যদের এখন পর্যন্ত বন্দী রয়েছে ওই ছয় জেলে।
জেলেরা বলছেন, এর আগে সরকারের নানা সুবিধা নিয়ে যেসব বনদস্যু আত্মসমপর্ন করেছিলো তাদের বেশ কয়েকজন এবার নিজ নামের পরিচয়ে ফিরে এসেছে বনদস্যু হিসেবে। জঙ্গল এবং সাগরে দস্যুরা এতটাই ত্রাস সৃস্টি করেছে যে, ভয়ে তাদের নামও কেউ উচ্চারণ করেনা কোন জেলে। দস্যুদের সবার হাতেই রয়েছে বন্দুক, রাইফেলসহ একাধিক ধারালো অস্ত্র। এলাকার উঠতি বয়েসি বখাটে যুবকরা তাদের সঙ্গি হয়েছে। সঙ্গি হয়েছে কিছু অসাধু জেলে। যারা বেশিরভাগ রামপাল, মোংলা, মোড়েলগঞ্জ, সাতক্ষীরা, কয়রা এবং দাকোপের বাসিন্দা। এরা নিজেদের নামে সুন্দরবনে গড়ে তুলেছেন বনদস্যু বাহিনী। এ ধরনের অন্তত সাতটি দস্যু বাহিনী এখন সক্রিয় রয়েছে সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রান্তে।
শুটকি মৌসুম এখন শেষের পথে। এ সময়ে মহাজনেরা মুক্তিপনের জন্য এতটাকা জেলেদের দিতে কোন ভরসা পাচ্ছেনা। আবার এ মৌসুমে জেলেদের জালে মাছ হয়েছে কম। ফলে বেশিরভাগ জেলেই লোকসানে রয়েছে। এদিকে অপহৃত জেলেদের স্বজনরাও রয়েছে চরম উৎকণ্ঠায়। তাদের উদ্ধারে কেউ ভরসা হিসেবে এগিয়ে আসতে পারছেনা।
এই গল্পটা শুধু শেলার চরের নয়। আশেপাশে যতগুলো চর রয়েছে সবখানেই এখন চরম আতঙ্ক। নারকেলবাড়িয়া চর থেকে নিয়ে গেছে নয়জনকে জেলেকে। তারা এই প্রতিবেদন ( ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ) লেখা পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি। এর আগে দুই দফায় নারকেল বাড়িয়ার একাধিক জেলেকে বনদস্যুরা অপহরন করেছিলো। বেশিরভাগ মুক্তিপন দিয়ে ফিরে এসেছে। তবে এবার শেষ মুহুর্তে যারা অপহৃত হয়েছেন তাদের কপালে দুর্ভোগ নেমে এসেছে। মেহের আলী চর, আলোর কোল, দুবলা থেকেও অপহৃত হয়েছে একাধিক জেলে। অগভীর এবং গভীর সাগরে যেখানে জেলেরা মাছ ধরেন, সেখানেও এবার হানা দিয়েছে বনদস্যুরা। জাল এবং ট্রলারসহ সেখান থেকে শতাধিক জেলেকে তারা তুলে নিয়ে গেছে গেল পনের দিনে। কোথায় গেছে সেই অবস্থানও কেউ শনাক্ত করতে পারেনি। বরগুনা, পাথরঘাটা , মঠবাড়িয়া পিরোজপুরের একাধিক জেলে সেখান থেকে অপহৃত হয়েছে।
বনদস্যুদের হাতে এবার এমন গনহারে জেলে অপহরনের ঘটনা লোকালয়ে আতঙ্ক ছড়ালেও ঘুম ভাঙ্গেনি প্রশাসনের। নির্বাচন পুর্ববর্তী এবং পরবতী নানা ঘটনায় সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছেন এর উর্ধতন কর্মকর্তারা। যার ঘানি টানছেন অসহায় জেলে পরিবার গুলো।
তবে কিছুটা আশার আলো দেয়ার চেস্টা করছেন বাগেরহাট -৩ আসনের সংসদ সদস্য লায়ন শেখ ফরিদুল ইসলাম। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত এই প্রতিমন্ত্রী গনমাধ্যমকে বলছেন, বাগেরহাট এবং খুলনার ডিসিদের সাথে তিনি এ ব্যাপারে কথা বলেছেন। কথা বলেছেন, আইনশঙ্খলা বাহিনীর কর্তাদের সাথেও। অপহৃত জেলেদের যেন দ্রুত মুক্ত করা যায় সে লক্ষে কাজ চলছে।