
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি্ : উপকূলীয় জনপদ আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা ও প্রাকৃতিক সম্পদের আধার। উষ্ণায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ধারায় সাম্প্রতিক দশকগুলোতে সুন্দরবনসহ উপকূলীয় জনপদের মানুষ প্রাণপ্রকৃতি বার বার মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। ২০০৭ ও ২০০৯ সালে ঘুর্ণীঝড় সিডর ও আইলার তান্ডবে শত শত কিলোমিটার উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কৃষিজমি, মৎস্যখামার ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় সামুদ্রিক লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ে। অতীতের মত এবারো আমাদের দক্ষিণের উপকুলীয় জনপদের প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যুহ সুন্দরবন প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের তান্ডব নিজের বুক পেতে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছে। ঘুর্ণীঝড় আইলা ও সিডরের সময়ে সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বহু বছর লাগবে বলে সে সময় বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছিলেন। সেই ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার আগেই সুন্দরবনের উপর বার বার উপকূলীয় দুর্যোগ হানা দিচ্ছে। প্রকৃতি আপন খেয়ালে সুন্দরবনের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সচেষ্ট হলেও আমরা নাগরিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ায় উপকূলীয় জনপদের মানুষ বার বার ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। একেকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর প্রথমেই উপকূলীয় বেড়িবাঁধ মেরামত, উন্নতকরণ, উকুলীয় সবুজবেষ্টনী এবং সংরক্ষিত বনভূমি রক্ষা ও উন্নয়নে যে ধরণের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন ছিল, সরকারিভাবে তা গ্রহণ ও বাস্তবায়ণ না হওয়ার দায়ভার বহন করতে হয় উপকূলীয় জনপদের প্রাণপ্রকৃতি ও লাখ লাখ মানুষকে।
গত ২৭ মে উপকূলীয় জেলাগুলোতে ঘূর্ণীঝড় রেমাল আঘাত হানার পর ব্যাপক ধ্বংসাত্মক ক্ষয়ক্ষতিতে শতাধিক উপজেলার মানুষের মধ্যে মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। সংবাদপত্রের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুসারে শুধুমাত্র খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় ১ লাখ ৩২ হাজার পরিবার বাড়িঘর বিদ্ধস্ত হয়ে গৃহহীন হয়েছে। পূর্ব সর্তকতার কারণে মানুষের প্রাণহানির সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও সুন্দরবনে হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণী এবং উপকূলীয় এলাকায় হাজার হাজার গৃহপালিত গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগী মারা গেছে। তবে শুধুমাত্র আর্থিক মানদন্ডে আমাদের উপকূলীয় প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যুহ সুন্দরবনের ক্ষতিসহ সামগ্রিকভাবে ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপ করা সম্ভব নয়। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই ক্ষতির অংক লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার চেয়ে বেশি। জমির ফসল, মাছের খামার, ফলফলাদির বাগান, গোলার ধান, ঘরবাড়ি ও গবাদি পশুসম্পদ হারিয়ে উপকূলীয় জনপদের লাখ লাখ মানুষ এখন আশ্রয়হীন, খাদ্যহীন, সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়েছে। তাদের পুর্নবাসিত করা, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অনেকের ঘরে স্বজন হারানোর শোক, সহায়সম্বল হারানো আর্তজনের আহাজারিতে উপকূলীয় জনপদের আকাশ-বাতাস স্তব্ধ হয়ে আছে। তিনদিন পেরিয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিয়ে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তেমন কোনো সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারিভাবে ত্রাণতৎপরতা, উদ্ধার ও পুর্নবাসন তৎপরতা এখনো শুরু হয়নি। অথচ প্রতিটি মানুষের প্রতিবেলা খাবার প্রয়োজন। সবকিছু হারানো দুর্গত দরিদ্র মানুষ সরকার ও বিত্তবান মানুষের সহায়তার আশায় বুক বেঁধে চেয়ে আছে। কোটি কোটি মানুষ এখনো বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কের বাইরে।
গত দেড় দশক ধরে বেশ কিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সরকার উন্নয়নের রোল মডেল প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। এসব অবকাঠামো উন্নয়নের সামাজিক-অর্থনৈতিক গুরুত্ব থাকলেও উপকূলীয় প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা, সুন্দরবন, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী, বেড়িবাঁধের যথাযথ উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তথাকথিত মেগা প্রকল্পের চেয়ে অনেক বেশি। আমাদের যে সম্পদ আছে তা সুরক্ষা করাই প্রথম কর্তব্য। তারপর অন্য কিছু। অনেক কিছু হলেও বঙ্গোপসাগরের ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ মেরামত ও সময়োপযোগী উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়া হলে রেমালের তান্ডবে শত শত কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার উপর এমন খড়গ নেমে আসত না। উপকূলীয় সম্পদের সুরক্ষার বাস্তবসম্মত উদ্যোগের সাথে জড়িয়ে আছে দেশের কোটি মানুষের কর্মসংস্থান, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নিশ্চিত সম্ভাবনা। এখন ঘর্ণীঝড় রেমালের ক্ষয়ক্ষতিকে সামনে রেখে এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে নতুন উদ্যোগ নিতে হবে। দুর্গত জনপদের লাখ লাখ পরিবারের খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের নিজ বাড়িঘরে ফিরে যেতে গৃহনির্মাণে পর্যাপ্ত অর্থসহায়তা দিতে হবে। সর্বস্ব হারানো প্রান্তিক কৃষক ও খামারিদের আবার কৃষিকাজ ও খামার শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী সহায়তা ও প্রণোদনা দিতে হবে। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের চেয়ে এই মুহূর্তে উপকুলীয় মানুষের সহায়তায় এগিয়ে যাওয়া সবচেয়ে জরুরি। দুর্গত পরিবারগুলোর জরুরি ত্রাণ সহায়তার পাশাপাশি বেড়িবাঁধ উন্নয়নসহ উপকূলীয় জনপদে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের উপযোগী শ্রমঘন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। উপকূলীয় জনপদকে অরক্ষিত রেখে, সেখানকার সাহসী, পরিশ্রমী মানুষদের দুস্থ অবস্থায় রেখে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ প্রত্যাশা করে দেশের সাধারণ মানুষ।
বাংলাদেশের গর্ব করার মতো যে কয়টি প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে, তার মধ্যে সুন্দরবন অন্যতম। জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কো এই বনকে অনেক আগেই ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রাণীকূল রক্ষার তাকিদ বরাবরই প্রতিষ্ঠানটি দিয়ে আসছে। এটি শুধু বাংলাদেশেরই সম্পদ নয়, বিশ্বেরও সম্পদ। সুন্দরবন দেশকে ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে রক্ষা করার অন্যতম প্রাকৃতিক বুহ্য। সর্বশেষ আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় আমফানের তীব্রতা ঠেকিয়ে দিয়ে নিজের সক্ষমতা আবারো প্রমাণ করেছে সে। দানবের মতো আছড়ে পড়া সুপার সাইক্লোন আমফানের তাণ্ডব থেকে ঢাল হয়ে সুন্দরবন বৃহত্তর খুলনার উপকূলীয় ১০ উপজেলার লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ও সম্পদ বাঁচাতে সহায়তা করেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঝড়টি বাংলাদেশ ও ভারতের উপকূলের ১০০ কিলোমিটারের কাছে আসার সময় এর বাতাসের গতি ঘণ্টায় ছিল ২২০ কিলোমিটার। কিন্তু সুন্দরবন অতিক্রমের পর বসতি এলাকায় আঘাতের সময় এর গতি কমে আসে ১৫১ কিলোমিটারে। অন্যদিকে সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের হিসাবে ঝড়টির সঙ্গে আসা জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা থাকার কথা ১৫ থেকে ১৮ ফুট। কিন্তু তা উপকূলে আছড়ে পড়ার সময় ১০ থেকে ১২ ফুটে নেমে আসে। অর্থাৎ ঘূর্ণিঝড় আমফানের গতি অন্তত ৭০ কিলোমিটার কমিয়েছে সুন্দরবন। এর জলোচ্ছাসের উচ্চতাও ৫ থেকে ৬ ফুট কমিয়েছে। ফলে ঝড়ে যে পরিমাণে ক্ষতি হয়েছে তার চেয়ে আরও অনেক বেশি ক্ষতির হাত থেকে উপকূলের মানুষ ও সম্পদ রক্ষা পেয়েছে। এর জন্য অবশ্য সুন্দরবনকেও বেশ ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতে হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে গঠিত সুন্দরবনের ক্ষতি নির্ধারণ কমিটির প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ঝড়ের সাথে লড়াই করতে গিয়ে উপড়ে পড়েছে অন্তত ১২৩০০টি গাছ। পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষতি মিলিয়ে আমফানে দুই কোটি ২৫ লাখ টাকার সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে সুন্দরবনের। এর আগে ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, রোয়ানু, বুলবুল ও ফণীর গতিও থমকে দিয়ে লাখো মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় ভূমিকা রেখেছে সুন্দরবন।
আল্লাহপাক কোনো কিছুই অনর্থক সৃষ্টি করেননি। প্রতিটি সৃষ্টির পেছনেই রয়েছে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য। যেমন তিনি পাহাড়কে সৃষ্টি করেছেন কীলক বা পেরেক স্বরূপ, যাতে পৃথিবীর ভূ-ভাগ অহেতুক নড়াচড়া করতে না পারে। এটা তিনি কোরআনে নিজেই বলেছেন। তেমনি, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনকে আমাদের জন্য করেছেন প্রাকৃতিক দেওয়াল, যা ঝড়-ঝাপটা থেকে বার বার আমাদের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করছে। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা উইনরক ইন্টারন্যাশনালের তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউট ‘সুন্দরবনের পর্যটন, ঘূর্ণিঝড় থেকে বসতবাড়ি সুরক্ষা এবং আহরিত সম্পদের আর্থিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক একটি গবেষণা করেছিল। তাতে দেখা যায়, ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’-এর সময় সুন্দরবন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৪৮৫ দশমিক ২৯ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ বাঁচিয়েছিল, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ চার হাজার কোটি টাকারও বেশি। গবেষকরা বলছেন, ৬ লাখ ৩ হাজার হেক্টর আয়তনের সুন্দরবন না থাকলে টাকার অঙ্কে ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি হতো। ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর আইলা, রোয়ানু, বুলবুল, ফণী এবং সর্বশেষ আমফানের গতি এবং জলোচ্ছাসের উচ্চতা কমিয়ে দিয়ে সুন্দরবন আমাদের ঠিক কী পরিমাণ জীবন ও সম্পদ বাঁচিয়েছে তা এককথায় কল্পনাতীত। শুধু কি ঝড়-ঝাপটা থেকেই সুন্দরবন আমাদের রক্ষা করছে? না, বরং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকার উৎসও এই সুন্দরবন। এ বন থেকে গোল পাতা, মধু, মোম, মাছ, কাঠ এবং অন্যান্য বনজসম্পদ সংগ্রহ করে জীবন চলে বিপুল সংখ্যক মানুষের। প্রতি বছর সুন্দরবন থেকে পর্যটন ও বন বিভাগের বিশাল অংকের রাজস্ব আয় হয়ে থাকে। বাংলাদেশ জনসংখ্যার দিক থেকে অতিঘনত্বের একটি দেশ। আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা এখানে অস্বাভাবিক বেশি। আর এই বিপুল জনগোষ্ঠির বেঁচে থাকার জন্য নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণের জন্য যে অক্সিজেন প্রয়োজন, আমাদের বায়ুমণ্ডলে তার সবচে বড় যোগানদাতা এই সুন্দরবন। পাশাপাশি মানুষ, পশু, পাখি প্রশ্বাসের সাথে প্রতি মুহূর্তে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে ছাড়ছে এবং মিল-কারখানা থেকে কার্বনসহ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর যেসব উপাদান নির্গত হচ্ছে সেসব শোষণ করে আমাদের বায়ুমণ্ডলকে পরিশুদ্ধ করছে এই বন।
আসলে আমাদের জাতীয় জীবনে সুন্দরবনের গুরুত্ব বলে শেষ করা যাবে না। কিন্তু তারপরও আমাদের জন্য এ অমূল্য সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে তদারকির কোনো বালাই নেই। বরং নানাভাবে এ বনকে ধ্বংস করার পাঁয়তারাই যেন চলছে। সুন্দরবনের চারপাশে শিল্পকারখানা স্থাপন করে, চিংড়ির ঘের দিয়ে, অবাধে গাছপালা কেটে বসতবাড়ি নির্মাণ করে সুন্দরবনকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এক সময় শুধু বাংলাদেশ অংশেই যে বনের আয়তন ছিল ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার, তা এখন দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার বর্গ কিলোমিটারের কাছাকাছি। ভারতের অংশ মিলিয়ে তা ৬ হাজার বর্গ কিলোমিটারের মতো হবে। তারপরও থেমে নেই বন ধ্বংসের প্রক্রিয়া। ২০১৭ সালে সংবাপত্রে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সুন্দরবন ঘেঁষে ৩২০টি শিল্পকারখানা গড়ে তোলার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় পরিবেশ কমিটি। ১৯৯৯ সালে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করলেও তার বরখেলাপ করে এসব শিল্পকারখানার অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলে পরিবেশবিদরা অভিযোগ করেছেন। বলা হচ্ছে, জাতীয় পরিবেশ কমিটি দেশের শিল্পায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের স্বার্থে এসব কারখানাকে অনুমোদন দিয়েছে। যদিও এসব এলাকায় কলকারখানাসহ যেকোনো উন্নয়নকাজ করার আগে বন বনের প্রাণীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন শর্ত দিয়ে বিধি করা হয়েছে। কিন্তু কয়লানির্ভর তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বোতলজাত করার কারখানার মতো মারাত্মক পরিবেশ দূষণকারী শিল্পকারখানাও স্থাপন করা হচ্ছে সুন্দরবনের পাশে। পরিবেশবিদরা মনে করছেন, এসব শিল্পকারখানা সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রতিবেশকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। যতই বন ও বনের প্রাণীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য শর্তের কথা বলা হোক, তাতে কোনো কাজ হবে না। সুন্দরবনকে ঘিরে শিল্পকারখানা গড়ে উঠার অর্থই হচ্ছে, এর ক্ষতিসাধন। রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক এবং এর বিরুদ্ধে সচেতন নাগরিক সমাজ আন্দোলন পর্যন্ত করছে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হলে সুন্দরবনের কী ধরনের ক্ষতি হবে তার বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে সরকারও বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে বদ্ধপরিকর এবং ইতোমধ্যে তারা এর নির্মাণ কাজ অনেকদূর এগিয়ে নিয়েছে।
নির্মাণাধীন এবং অনুমোদন প্রাপ্ত সুন্দরবন সংলগ্ন সকল কারখানা চালু হলে বনটি যে ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হবে, তাতে সন্দেহ নেই। যতই নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হোক না কেন, অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা ঘটলে এর প্রভাব যে সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রতিবেশের উপর পড়বে, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। দুর্ঘটনা না ঘটার গ্যারান্টি তো কেউ দিতে পারবে না। কয়েক বছর আগে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে শ্যালা নদীতে অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ ডুবে তেল ছড়িয়ে যাওয়ায় কী ভয়াবহ ক্ষতি সাধিত হয়েছে। বৃক্ষরাজির ক্ষতি সাধনের পাশাপাশি নদীর মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে নদীতে কয়লাবাহী জাহাজ ডুবির ঘটনাও ঘটেছে। অনুমোদনপ্রাপ্ত শত শত শিল্পকারখানা যখন পুর্নোদ্যমে চালু হবে, তখন সেগুলো থেকে নিঃসরিত বিষাক্ত ধোঁয়া ও কেমিক্যাল অবশ্যই সুন্দরবনের জন্য ক্ষতিকারক হয়ে উঠবে। এ ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে হয়তো দৃষ্টিগোচর হবে না, তবে বছরের পর বছর ধরে নিঃসরিত হতে থাকা ক্ষতিকর এসব উপাদানের প্রভাব সুন্দরবনের উপর নিশ্চিতভাবেই পড়বে। দেশে কলকারখানা স্থাপন, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান করার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তবে এজন্য কেবল সুন্দরবন এলাকাকেই কেন বেছে নিতে হবে? সুন্দরবন ঘেঁষে যেসব কলকারখানা স্থাপন ও চালুর অনুমোদন দেয়া হয়েছে, সেগুলো দেশের অন্যান্য স্থানে করা অসম্ভব ছিল না। সুন্দরবনের অস্তিত্ব ও স্বার্থ রক্ষায় সরকারকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত। এ কথা মনে রাখা দরকার, শিল্পকারখানা যে কোনো সময় যে কোনো স্থানে স্থাপন করা যেতে পারে। সুন্দরবনের ক্ষতি বা ধ্বংস হলে আরেকটি সুন্দরবন সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। তাছাড়া পরিবেশ রক্ষায় যেখানে দেশের মোট আয়তনের অন্তত ২৫ শতাংশ বন থাকা প্রয়োজন, সেখানে আমাদের দেশের আয়তনের ১০ শতাংশ বনভূমিও নেই। এই অবস্থায় যদি সুন্দরবনের আয়তন আরো সংকুচিত হতে থাকে তাহলে পরিবেশের উপর কতটা মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে তা ভাবনার বিষয়। আরো ভাবনার বিষয় হলো, পরিবেশবিদ এবং সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় সরকারকে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হলেও কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
আমাদের জাতীয় জীবনে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট সুন্দরবনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার শেষ নেই। এর অপরিহার্যতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল মানুষের সংখ্যাও দেশে কম নেই। তারপরও নানা কারণে সকলের সামনেই তিলে তিলে ধ্বংস হচ্ছে এ বনটি। এর জন্য সরকারের নীতি নির্ধারকরা যেমন দায়ী, তেমনি বন বিভাগসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কতিপয় অসাধু ব্যক্তির কাণ্ডজ্ঞানহীনতাও দায়ী। ফলে একদিকে অবাধে বন থেকে মূল্যবান কাঠ পাচার করা হচ্ছে, পশু-পাখি শিকার করে সুন্দরবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো সময় বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এসবের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততার খবরও পাওয়া যায়। কিন্তু কখনো উপযুক্ত প্রতিকার পাওয়ার সংবাদ পাওয়া যায় না। অন্যদিকে অবাধে শিল্পকারখানা স্থাপন করতে দিয়ে গলায় ফাঁস পরিয়ে সুন্দরবনকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে অস্তিত্ব হারাতে পারে আমাদের প্রাকৃতিক দেওয়াল সুন্দরবন। আর সুন্দরবন অস্তিত্ব হারালে তার কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে তা ধারাণাও করা অসম্ভব। তবে ঘূর্ণিঝড় আমফান সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের মতামত থেকে একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে। দুর্যোগ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবন না থাকলে কলকাতা শহরে ঘূর্ণিঝড় আমফান যে তাণ্ডব চালিয়েছে, একই পরিণিত হতো ঢাকাসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর। ঘূর্ণিঝড়ের সময় ঢাকায় বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৭২ কিলোমিটার, আর কলকাতায় ছিল ১১২ কিলোমিটার। সুন্দরবন না থাকলে ঢাকাতেও ১০০ কিলোমিটারের বেশি গতি নিয়ে ঝড়টি চলে আসত। এ অবস্থায় এটি আমাদের সমুদ্র উপকূল থেকে শুরু করে ঢাকা অবদি কী পরিমাণ তাণ্ডব চালিয়ে মানুষের জীবন ও সম্পদ ধ্বংস করত তার হিসাব করাও অসম্ভব হয়ে পড়ত। ১৯৭০ এবং ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় দুটি আমাদের ভূখণ্ডে আঘাত করেছিল সুন্দরবন বহির্ভূত এলাকা দিয়ে। এই দুটি ঝড়ের আঘাতে বিপুল প্রাণহানি ও তাণ্ডবের কথা স্মরণ করলেই আঁচ করা সম্ভব হবে, যে সুন্দরবন অস্তিত্ব হারালে খুলনা-বাঘেরহাট এবং তৎসংলগ্ন এলাকাগুলোর অবস্থা কী ভয়াবহ হবে। শুধু তাই নয়, আজ যারা সুন্দরবন ঘিরে কলকারখানা স্থাপন করছেন কোনো কারণে যদি এ বন নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় তাহলে পরবর্তী কোনো ঝড়ে সেসব শিল্পকারখানাও যে উড়ে যাবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? কিংবা কলকাতায় ঘূর্ণিঝড় আমফান যে ধ্বংসলীলা চালিয়েছে সেই একই তাণ্ডবে ঢাকায় হলে কী ভয়াবহ অবস্থা হতো তা তো স্যাটেলাইট চিত্রগুলো দেখলেই অনুমান করা যায়।
সুন্দরবন আল্লাহপাকের দেয়া আমাদের জন্য এক অমূল্য নেয়ামত। এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঝড়-ঝঞ্জা থেকে যেমন আমাদের রক্ষা করছে। তেমনি নানা রকম বনজ সম্পদ দিয়ে, কার্বন শোষণ করে আমাদের বাঁচিয়ে রাখছে। এটি আমাদের বেঁচে থাকার অতি প্রয়োজনীয় উপাদান অক্সিজেন উৎপাদনেরও প্রাকৃতিক কারখানা। এ বনের কাছে আমাদের ঋণের শেষ নেই। তাই যে কোনোমূল্যে সুন্দরবনকে রক্ষা করাও আমাদের দায়িত্ব। আমরা আমাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে সুন্দরবন শুধু একাই ধ্বংস হবে না, বরং আমাদের ধ্বংসও অনিবার্য হয়ে উঠবে। তাই নিজেদের স্বার্থেই সুন্দরবনকে টিকে থাকার সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি আমাদের দীর্ঘ উপকূলজুড়ে এবং বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা দ্বীপগুলোতে পরিকল্পিত বনায়নের মাধ্যমে প্রাকৃতিক বেষ্টনীকে আরো মজবুত করতে হবে। এর জন্য যদি পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বিবেচিত শিল্পকারখানাগুলোকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটাই করতে হবে। সুন্দরবনে সক্রিয় চোরাকারবারী, বনদস্যুদের নির্মূল করতে হবে। পাশাপাশি বনবিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সুন্দরবন পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত সুন্দরবনের চির সবুজ সুদৃশ্য গহীন বনানীর পার্শ্বে সাগরের মাঝে স–র্যোদয় ও স–র্যাস্তের দৃশ্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর। বিশালায়তনের সুন্দরবনে অসংখ্য বৃক্ষরাজির মাঝে বসবাস করে অসংখ্য প্রজাতির অগনিত প্রাণিকূল। এ বনে বাস করছে বর্তমান পৃথিবীর সব চেয়ে সম্পদশালী ও নামকরা বন্য প্রাণী রয়েল বেঙ্গল টাইগার।
অত্যন্ত সৌন্দর্যমন্ডিত এ বনে রয়েছে অফুরন্ত প্রাকৃতিক ধন ভান্ডার। আর এখানকার ধন ভান্ডার সদ্ব্যব্যবহারের জন্য সুন্দর বনের মধ্যে জালের মত ছড়িয়ে আছে প্রায় চার শতাধিক ছোট-বড় নদী ও খাল।
সুন্দরবনের পর্যটন, চিত্ত বিনোদন এবং শিক্ষা অতি চিত্তাহর্ষক। বন বনানীর শোভাময়ী দৃশ্য, পাখির কলকাকলী, হরিণের ঝাঁক, গাছে গাছে বানরের ক্রীড়া কৌতুক, নদীর কিনারে সকাল বেলায় অলস কুমিরের ঘুমন্ত দশা, বাঘের ঘাপটি মেরে থাকা এবং জ্যান্ত প্রাণী শিকার করে ভক্ষণ করা, নদ-নদীতে জোয়ার ভাঁটার খেলা, দুবলার চরের প্রাকৃতিক দৃশ্য ও রাস মেলার জনতার ঢল। গাছপালা ও প্রাণী স¤পদের নানারূপ বৈচিত্র, কটকা ও হিরণ পয়েন্টের সমুদ্র সৈকত ও অভয়ারণ্যে প্রাণিক‚লের অবাধে চলাফেরা সবই উপযুক্ত পর্যটন ও শিক্ষা বিনোদনের জন্য অতি সহায়ক উপকরণ।
সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার দক্ষিণ ভাগও সুন্দরবন। বাংলাদেশ ও ভারতের সুন্দরবনের অনুপাত মূলত ৬ঃ৪। বাংলাদেশের সুন্দরবন দক্ষিণ বঙ্গের তিনটি জেলা যথা- সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের দক্ষিণে ব্যাপক অঞ্চল নিয়ে ব্যাপৃত। এর উত্তরে সাতক্ষীরা জেলার শ্যাম নগর, কালীগঞ্জ ও আশাশুনি, খুলনার কয়রা পাইকগাছা ও দাকোপ এবং বাগেরহাট জেলা মংলা, রামপাল, মড়েলগঞ্জ ও শরণখোলা থানা অবস্থিত। পূর্বে পিরোজপুর জেলা মঠবাড়িয়া, ইন্দুরখানা, বরগুনার পাথরঘাটা ও পটুয়াখালীর কলাপাড়া থানা দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনার দক্ষিণাঞ্চলীয় সুন্দরবন ভ‚মি।
সুন্দরবনের নামকরণের মূলে কয়েকটি ধারণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য (ক) এ বন দেখতে সুন্দর (খ) সমুদ্রের নিকটে অবস্থিত, সমুদ্র শব্দ হতে যার উৎপত্তি (গ) সুন্দরী গাছের আধিক্য অর্থাৎ সমগ্র অঞ্চল ব্যাপী সুন্দরীগাছ দেখা যায়। (ঘ) কথিত আছে ইংরেজ আমলের বহু পূর্বে বিদেশী পর্যটকেরা সুন্দরবন দেখে একে “জংগল অফ সানডে ট্রিজ” নামে অভিহিত করতেন।
“সুন্দরী” অর্থ নানা প্রকার। এ সুন্দরী শব্দ হতে জঙ্গলের নাম হয়েছে সুন্দরবন। (ঙ) বরিশালের সুন্দা নামক নদী আছে ও সুন্দারক‚লের বন বিভাগকে সুন্দারবন বলা হতো এবং কালক্রমে উক্ত নাম সুন্দরবনে পরিণত হয়েছে। নামকরণে সুন্দরী গাছের আধিক্য। এ মতবাদটি সর্বাধিক সমর্থন যোগ্য।
নিম্নবঙ্গের গঙ্গার বহুশাখা প্রশাখা বিস্তৃত লবণাক্ত পল্লবময় অসংখ্য বৃক্ষ গুল্ম সমাচ্ছাদিত শ্বাপদ সংকুল-ভ‚-ভাগ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে স¤পূর্ণ ব্যতিক্রম ধর্মী। এখানে দু’বেলা জোয়ার ভাটা চলে, তকতকে পেড়ি কাদা দিয়ে চর বেষ্টিত। নদী ভাঙ্গন নিত্যদিনের ঘটনা। সাথে সাথে নতুন চরও গড়ে উঠেছে। এখানকার ভ‚-ভাগ দেশের উত্তরাঞ্চলের চেয়ে কয়েক মিটার নীচু। জঙ্গলের অধিকাংশ স্থান নদী বা খালের দ্বারা বহু বিভাজ্য।
সুন্দরবনের উদি¢দ বড় বৈচিত্র্যময়। এখানে দু’বেলা জোয়ারে বন-বনানী পানিতে থৈ থৈ করে। সারা জঙ্গল যেন পানির উপর ভাসতে থাকে। তবুও চারা গাছের অংকুর উদগম ঘটে, ছোট গাছ বড় হয় এবং শেষ পর্যন্ত বেড়ে উঠে স^চ্ছন্দে। কতকগুলো প্রজাতির ফল-বীজ গাছে থাকা অবস্থায়ই অংকুর উদগম ঘটে এবং নরম মাটিতে ফলবীজ পতিত হয়ে আটকে যায় পরে নীচ থেকে শিকড় ও উপরের দিক থেকে পাতা গজিয়ে গাছের বৃদ্ধি শুরু হয়। সুন্দরবনের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ গাছের প্রজাতি হলো সুন্দরী। এখানকার অন্যান্য প্রজাতির গাছ গুলো হলো- গেওয়া, গোলপাতা, গরান, বাইন, কাকরাম ভাতকাঠী, খলসি, কেওড়া, ওরা, পশুর, ধন্দুল হ্যাঁতল, আমুর কিরপা, শিংড়া, ঝানা, হুদো, ধানসি, বলা, হারগোজা, সুন্দরী তলা, নলখাগড়া প্রভৃতি। এসব কারণে সুন্দরবনের গুরুত্ব অপরিসীম।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি জাতীয় দৈনিকের খবরে প্রকাশ বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান এলাকার পরিবেশকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে- এ দিকে হাইকোর্টের নির্দেশের প্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষ থেকে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের দাখিল করা প্রতিবেদনে জানানো হয় যে সুন্দরবনের আশ-পাশ এলাকার ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ১৯০টি শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে যার মধ্যে ২৪ টি লাল চিহ্নিত।
বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আশরাফুল কামালের সমম্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ সরকারের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনটি জমা দেওয়ার পর এ বিষয়ে জারি করা রুলের শুনানির জন্য প্রযোজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের কথা বলেছেন ৯ মে ২০১৮ শুনানির দিনও ধার্য করা হয়।
এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের দেয়া প্রতিবেদনে বলা হয় হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী সুন্দরবন সংলগ্ন সংকটাপন্ন এলাকার বিদ্যমান শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকাসহ পূর্ণাঙ্গ তথ্যাদির বিবরন দাফতরিক নথি পর্যালোচনা ও সরেজমিনে পরিদর্শন কালে দেখা যায় খুলনা বিভাগের বাগেরহাট জেলায় ৭৮ টি, খুলনা জেলায় ৯২টি এবং সাতক্ষীরায় ২০ শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার মধ্যে অবশ্য ৪০টির মতো শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বলে পরিবশেবাদীদের মতামত ব্যক্ত করেেছন।
উল্লেখ্য ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করে। পরিবেশ দূষণ যাতে ভয়াবহ রুপ নিতে না পারে এবং সুন্দরবনের জীব বৈচিত্র্যে যাতে কোন রূপ নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে এ লক্ষ্য সামনে রেখে সতর্কতা মূলক ব্যবস্থা হিসাবে ১৯৯৯ সালের ৩০ আগস্ট সুন্দরবন রিজার্ভ ফরেষ্টের চারদিকে ১০ কিলোমিটার বিস্তৃত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসাবে ঘোষণা করা হয়।
এ বিষয়ে রিট আবেদনের পক্ষে ব্যারিষ্টার মো. জাকির হোসেন বলেন সরকার আদালতে একটি রিপোর্ট পেশ করে বলেছে যে সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার মধ্যে ২৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মাটি, পানি ও বায়ু দূষণকারী অর্থাৎ লাল শ্রেণির অর্ন্তভুক্ত। এসব শিল্প প্রতিষ্ঠান কোন ভাবেই সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে থাকতে পারবেনা। পরিবশেগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা (অ্যানভায়রনমেন্টাল ক্রিটিক্যাল এরিয়া-ইসিএ) অর্ডিন্যান্স ১৯৯৯ অনুযায়ী প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকার মধ্যে এ ধরণের শিল্পপ্রতিষ্ঠান থাকার সুযোগ নেই। এ ছাড়া বাকি যে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো আছে সেগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব এর থেকেও বেশি।
রিট আবেদনটিতে বলা হয়, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ১৯৯৯ সালের ৩০ আগস্ট এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সুন্দরবনের সংরক্ষিত বন এলাকা এবং এর চার পাশে ১০ কিলোমিটার এলাকাকে পরিবেশগত সঙ্কটাপন্ন ্এলাকা ঘোষণা করে।

