
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : মানুষের আগ্রাসন, লোভে বা অপরিকল্পিত নগরায়নে উজাড় হচ্ছে বন। বনাঞ্চলের সঙ্গে কমছে প্রাণীর সংখ্যাও। খাদ্য ও বাসস্থানের সংকট, অবৈধ শিকার, পাচার, কীটনাশকের অতি ব্যবহারের মতো নানা কারণে প্রতি বছরই পৃথিবী থেকে কোনো না কোনো প্রাণী বিলুপ্ত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন প্রাণী বিলুপ্ত হওয়ার এই হার বাংলাদেশে আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের ২০১৫ সালের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে বিলুপ্ত প্রাণীর প্রজাতির সংখ্যা ৩১টি। বাংলাদেশ নিয়ে এই সংস্থার ২০০০ সালের প্রতিবেদনে সংখ্যাটি ছিল ১৩। অর্থাৎ ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে অন্তত ১৬টি প্রজাতির প্রাণী।
আইইউসিএন তাদের ২০১৫ সালের হিসেব অনুযায়ী বলছে বাংলাদেশে ১৬০০-এর বেশি প্রজাতির প্রাণী রয়েছে, যাদের মধ্যে ৩৯০টি প্রজাতিই বিলুপ্তির হুমকির মুখে রয়েছে। এই প্রজাতিগুলোকে আইইউসিএন লাল তালিকাভুক্ত করেছে।
এই ১৬০০ প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে ৫০টিরও বেশি প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে চিহ্নিত করেছে আইইউসিএন। যাদের মধ্যে সর্ব্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা কয়েকটি প্রাণী নিয়ে এই প্রতিবেদনে।
শকুন : বাংলাদেশে এক সময় সাত প্রজাতির শকুন ছিল। কিন্তু এর মধ্যে রাজ শকুন পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর মানে হচ্ছে গত ৪০ বছরে একটিও রাজ শকুন দেখা যায়নি দেশের কোথাও।
আইইউসিএন বলছে, শকুন এখন সংস্থাটির লাল তালিকাভুক্ত প্রাণী। এর মানে হচ্ছে, প্রকৃতি থেকে যদি কোন প্রাণীর মোট সংখ্যার ৯০ শতাংশই হারিয়ে গিয়ে থাকে তাহলে সেটি রেডলিস্ট বা লাল-তালিকাভুক্ত প্রাণী হয়। ১৯৭০ সালের শকুন শুমারিতে দেখা গিয়েছিল তৎকালীন
পূর্ব পাকিস্তান মানে আজকের বাংলাদেশে ৫০ হাজারের মত শকুন ছিল। বাংলাদেশে ২০০৮-০৯ সালে চালানো শুমারিতে দেখা যায় শকুনের সংখ্যা নেমে আসে ১৯৭২টিতে। এর কয়েক বছর পর ২০১১-১২ সালে শকুনের সংখ্যা আরো কমে দাঁড়ায় ৮১৬টিতে। আর সর্বশেষ ২০১৪ সালে শকুন কমতে কমতে দাঁড়ায় মাত্র ২৬০টিতে। অথচ এক সময়ে বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই দেখা মিলত বৃহদাকার এই পাখিটির।
চিতা বাঘ : সারা বিশ্বে বিপন্ন বা সংকটাপন্ন না হলেও বাংলাদেশে চিতা বাঘকে চরম সংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইইউসিএন।
পরিবেশবিদরা বলছেন, একসময় শহরের আশেপাশেও চিতা বাঘ দেখা যেত যার সংখ্যা কমতে কমতে এখন এই প্রাণীটি চরম সংকটাপন্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
‘আপনি পুলিশ অথবা মেডিকেল রেকর্ডে খোঁজ নিলে দেখবেন যে ৪০-৫০ বছর আগেও চিতাবাঘের আক্রমণে মানুষ আহত বা নিহত হওয়ার খবর রয়েছে। কিন্তু এখন জঙ্গলেও চিতা বাঘের দেখা পাওয়া দুষ্কর,” বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম।
বাংলাদেশে যে ধরনের চিতা বাঘ পাওয়া যায় সেটিকে ইন্ডিয়ান লেপার্ড বলা হয়, যার বৈজ্ঞানিক নাম প্যান্থেরা পার্ডাস। বাংলাদেশসহ পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, ভূটানে এই ধরনের চিতা বাঘ দেখা যায়। ভারতের বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভারতে এই ধরনের চিতার সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার। অন্যদিকে বাংলাদেশে এর সঠিক সংখ্যাই জানা যায় না।
বন্য প্রাণী নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর ২০২১ সালের অনুমান অনুযায়ী বাংলাদেশে চিতার সংখ্যা ৩০ থেকে ৫০টি। দক্ষিণাঞ্চলের পার্বত্য এলাকাগুলোর পাশাপাশি লালমনিরহাট, শেরপুর, কুড়িগ্রামসহ উত্তরাঞ্চলেও চিতা বাঘ দেখতে পাওয়া যায়।
উল্লুক : চার দশক আগেও বাংলাদেশের বনে প্রায় তিন হাজারের মত উল্লুক বা ওয়েস্টার্ন হুলক গিবন ছিল। ২০২১ সালের এক গবেষণায় দেখা যায় সেই সংখ্যা এখন নেমে এসেছে ২০০ থেকে ৩০০-তে। ঐ গবেষণায় দেখা যায় যে চট্টগ্রাম ও সিলেটের বনাঞ্চলে উল্লুকের উপস্থিতি রয়েছে।
বৈজ্ঞানিকভাবে হুলক হুলক নামে পরিচিত এই প্রাণীটির আবাস শুধু বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারেই। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতে এই প্রজাতির ২৬০০ উল্লুক রয়েছে, যার বেশিরভাগই আসামে। মিয়ানমারে কিছু রয়েছে, যার সংখ্যা পরিষ্কারভাবে জানা যায় না।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং ঐ গবেষণার প্রধান গবেষক হাবিবুন নাহার বলছেন, ‘এর আগে উল্লুক ছিল, এরকম উখিয়া, সাজেক ভ্যালি, চুনাতির মতো কয়েকটি বন থেকে এই প্রাণীটি হারিয়ে গেছে। আবার কিছু সংরক্ষিত বনাঞ্চলে প্রাণীটির সংখ্যা বাড়তে দেখা গেছে।’
তিনি বলছেন, বনাঞ্চলে বড় বড় গাছ কেটে ফেলা, খাদ্য সংকট, অবৈধভাবে উল্লুক শিকারের কারণে বনগুলো থেকে এই প্রাণীর সংখ্যা কমছে। উল্লুক যেহেতু বড় বড় গাছের মগডালে থাকে, লাফ দিয়ে যাতায়াত করে। সেখানে এরকম গাছ কেটে ফেলা হলে তাদের বাসস্থানের পরিবেশে নষ্ট হয় যায়, চলাফেরা সীমিত হয়ে যায়। আবার তারা যেসব খাবার খায়, সেই গাছগুলো কেটে ফেলা হলে খাবারের জন্যও সংকট তৈরি হয়। ফলে অনেক বন থেকে প্রাণীটি হারিয়ে গেছে।
অনেকে পোষার জন্য বেআইনিভাবে উল্লুক আটকে রাখে। কিছু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এই প্রাণীটি খাবার হিসাবেও খায়।
ঘড়িয়াল : সত্তরের দশকেও বাংলাদেশ, ভারতসহ পাকিস্তানের সিন্ধু নদী, উত্তর নেপাল ও ভূটানের নদীতে অহরহ দেখা মিলতো ঘড়িয়ালের। ১৯৭৪ সালেও পৃথিবীতে ৫ থেকে ১০ হাজার ঘড়িয়াল ছিল বলে উঠে আসে গবেষণায়।
তবে নদী ও জলাশয় দখল, অনিয়ন্ত্রিতভাবে মাছ ধরা ও শিকার করার প্রবণতার কারণে আশির দশকের শেষদিক থেকেই ঘড়িয়াল সারা বিশ্বে সংকটাপন্ন প্রাণী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আইইউসিএনের হিসেবে বর্তমানে ভারত, বাংলাদেশ ও নেপাল মিলে পৃথিবীতে মোট ২০০টির মত ঘড়িয়াল রয়েছে।
বাংলাদেশে ঘড়িয়ালের সংখ্যা সঠিকভাবে না জানা গেলেও আইইউসিএনের গবেষণা অনুযায়ী ২০০০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পদ্মা, যমুনা, মহানন্দা ও ব্রহ্মপুত্র নদীতে ৫৮ বার ঘড়িয়াল দেখা গেছে।
বনরুই : বিশ্বে ৮ প্রজাতির বনরুইয়ের দেখা মেলে। তারমধ্যে বাংলাদেশে মালয়, ভারতীয় ও চায়না বনরুই ছিল। এমন ধারণা থাকলেও বর্তমানে চায়না বনরুই ছাড়া অন্য প্রজাতির বনরুইয়ের দেখা মিলছে না। কেননা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পাচার হওয়া স্তন্যপায়ী প্রাণি হচ্ছে বনরুই।
গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে চট্টগ্রাম, সিলেট এবং মৌলভীবাজারের বিভিন্ন বনে চায়না প্রজাতির বনরুইয়ের দেখা মেলে। তবে তা বর্তমানে বিলুপ্তির শেষ প্রান্তে। মহা বিপন্ন হিসেবে আছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ পরিষদ (আইইউসিএন)। অবাধ শিকার, পাচার, বাসস্থান নষ্টের কারণে এখন তারা মহা বিপন্ন তালিকাভুক্ত।
এগুলো ছাড়াও বনগরু, বনবিড়ালসহ বিভিন্ন ধরনের ভোঁদড়, বানর, কচ্ছপ বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
মেছো বাঘ : বাংলাদেশে আট প্রজাতির বিড়াল বা বাঘ দেখা যায়। এগুলোর মধ্যে মেছো বাঘ বা মেছো বিড়াল খুবই নিরীহ একটি প্রাণী। সারা বিশ্বেই মেছো বাঘ এখন একটি সংকটাপন্ন প্রাণী। ২০০৮ সালে এটি সংকটাপন্ন থেকে বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় স্থান পেয়েছিল। সে সময় বিশ্বজুড়ে মূলত ৫০টি জলাশয়ে অতিরিক্ত মেছো বাঘ হত্যার ঘটনা বিচারে নিয়ে এ বিপন্ন তালিকা তৈরি করা হয়।
প্রাণীটি বাংলাদেশেও বিপন্ন। এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দেশে মোট ৮২টি মেছো বাঘ আটক হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি বাঘ মেরে চামড়া ছাড়ানো হয়েছে।
সারা দুনিয়ায় ১০ হাজারের মতো মেছো বাঘ টিকে আছে। বাংলাদেশে কত মেছো বাঘ আছে তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে, বিশেষ করে পাকিস্তান থেকে তারা হারিয়ে গেছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন গ্রামেও এ বাঘ আর নেই। মূল কারণ আবাস হারিয়ে যাওয়া।
হাতি : বাংলাদেশে যে প্রজাতির হাতি দেখতে পাওয়া যায় সেটিকে এশিয়ান এলিফ্যান্ট বলা হয় যার বৈজ্ঞানিক নাম এলিফাস ম্যাক্সিমাস। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট ও ময়মনসিংহের পাহাড়ি অঞ্চলে এই হাতি পাওয়া যায়।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের হিসেবে, পৃথিবীতে এই ধরনের হাতির সংখ্যা বর্তমানে ২০ থেকে ৪০ হাজার। তারা বলছে গত ৭৫ বছরে এই প্রজাতির হাতির সংখ্যা প্রায় ৫০ ভাগ কমেছে।
আইইউসিএনের হিসেব মতে এই ধরনের হাতি বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, মিয়ানমারসহ ১৩টি দেশে রয়েছে। সংস্থাটির তালিকা অনুযায়ী বিশ্বে এই প্রাণীটি সংকটাপন্ন হিসেবে বিবেচিত হলেও বাংলাদেশে এটি ‘চরম সংকটাপন্ন’ অবস্থায় রয়েছে। তাদের ২০১৫ সালের প্রতিবেদনে জানায় যে বাংলাদেশের বনাঞ্চলে ২৮৬টি এবং বন বিভাগের নিয়ন্ত্রাণাধীন চিড়িয়াখানা বা সাফারি পার্কে আরো ৯৬টি হাতি রয়েছে। তবে এই সংখ্যা গত কয়েক বছরে আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।
শুধু ২০২১ সালেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৩০টির বেশি হাতি মারা হয়েছে বলে গত বছর এক সংবাদ সম্মেলনে জানায় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর জোট ‘বাংলাদেশ প্রকৃতি সংরক্ষণ জোট।’ তারা বলছে বাংলাদেশে বনাঞ্চলে হাতির সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ২০০।
হাতির আবাসস্থল ধ্বংস হওয়া, হাতি চলাচলের পথে বসতবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি হাতি সংরক্ষণে যথাযথ উদ্যোগ না নেয়া হাতির সংখ্যা কমে আসার বড় কারণ মনে করা হয়।খাদ্য-বাসস্থানের কারণেই যে বন্যপ্রাণীরা হারিয়ে যাচ্ছে, তা কিন্তু সঠিক নয়। নানাবিধ কারণেই দেশ থেকে বন্যপ্রাণীরা হারিয়ে যাচ্ছে এখন। প্রধান কারণগুলো হচ্ছে ১. বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল ধ্বংস করে দেওয়া। ২. অবাধে বৃক্ষ নিধন। ৩. খাদ্য সংকট। ৪. জলাশয় ভরাট। ৫. পাখিদের বিচরণক্ষেত্র হাওর-বাঁওড়সহ অন্যান্য জলাশয়ে অতিরিক্ত মাছ শিকার। ৬. চরাঞ্চলে জেলেদের উৎপাতের ফলে মৎস্যভুক পাখিরা বিপাকে পড়ছে। ৭. বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচারের ফলে আশঙ্কাজনক হারে এদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। এছাড়াও কবিরাজরা গ্রামীণ হাট-বাজারে বিভিন্ন ধরনের পশু-পাখির মাংস বিক্রি করার ফলে বন্যপ্রাণীরা হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে কবিরাজরা ধনেশ পাখি, বনরুই কিংবা শিয়ালের মাংস বাত-ব্যথার ওষুধ বলে চালিয়ে দিচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় কয়েক বছর আগে প্রথম চট্টগ্রাম অঞ্চলে ‘তক্ষক’ শিকার শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে দেশের সর্বত্রই তক্ষক শিকারির সংখ্যা বেড়ে যায়। সেই ধারাবাহিকতায় আজও তক্ষক শিকার করছে যুবকেরা। চলতি সপ্তাহে চুয়াডাঙ্গা ও খুলনার দোকোপা থেকে তক্ষকসহ কয়েকজন শিকারিকে গেপ্তারও করা হয়েছে।
এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার প্রেক্ষিতে বন্যপ্রাণীর বেশ কিছু প্রজাতি আজ দেশ থেকে হারিয়ে গেছে। কিছু প্রজাতি রয়েছে বিপন্নের পথে। আবার কিছু প্রজাতি রয়েছে মহাবিপন্নের পথেও। যেমন পাখিদের মধ্যে হারিয়েছে, ফ্লোরিকান ময়ূর, পিংক মাথা হাঁস ও রাজ শকুন। আর হারিয়ে যেতে বসেছে বাদিহাঁস, বালিহাঁস, দিগহাঁস, কালো তিতির, চন্দনা, বাংলা শকুনসহ নানান প্রজাতির পাখি। উল্লেখিত প্রজাতির মধ্যে বাংলা শকুনদের তো গলা টিপেই হত্যা করা হয়েছে। গবাদি পশুর ব্যথানাশক চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘ডাইক্লোফেনাক’ ওষুধের প্রভাবে প্রচুর বাংলা শকুন মারা গিয়েছে। যার কারণে ডাইক্লোফেনাক বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল। তবে শকুন রক্ষায় বাংলাদেশে বিশেষ পদক্ষেপ নিলেও বছর বছর এদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। এমনিই তো এদের সংখ্যা বর্তমানে হাতেগোনা বলা যায়। বিবিসি বাংলা মারফত জানা যায়, বাংলাদেশে ২০১৪ সালে পর্যন্ত ২৬০টি বাংলা শকুন থাকলেও সেই সংখ্যা কমতে কমতে বাংলা শকুন বর্তমানে মহাবিপন্নের তালিকায় স্থান পেয়েছে। বাংলা শকুন ছাড়াও দেশে আরও পাঁচ প্রজাতির শকুন রয়েছে। সেই প্রজাতির শকুনেরাও দেশে ভালো অবস্থানে নেই। নিয়মিত ওদের দেখাও যায় না এখন আর। ফলে আইইউসিএন শকুনদের লাল তালিকাভুক্তি করেছে।
শকুন ছাড়াও পাখিদের মধ্যে চন্দনার অবস্থাও সংকটাপন্ন। এই পাখিদের কয়েক দশক আগেও দেশের বিভিন্ন স্থানে সাক্ষাত পাওয়া যেত। হালে তেমন একটা নজরে পড়ে না। খাঁচায় বন্দি এবং উঁচু গাছ-গাছালি সংকটের কারণে এদের প্রজননে বিঘ্ন ঘটছে। ফলে প্রজাতিটি দেশে মহাবিপন্ন হয়ে পড়েছে। এদের বৈশ্বিক বিস্তৃতি ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল, ভূটান, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার পর্যন্ত। অথচ সেখানে ওরা ভালো অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রজাতিটি মহাবিপন্নের তালিকায় স্থান পেয়েছে। আবার বাদিহাঁস, দিগহাঁস, কালো তিতির এখন তো দেখাই যায় না। ওরাও মহাবিপন্নের তালিকায় স্থান পেয়েছে। এছাড়াও আরও ১৯ প্রজাতির পাখি মহাবিপন্নের তালিকায় স্থান পেয়েছে। উল্লেখ্য, যে কোন ধরনের প্রাণীর প্রজাতি যদি প্রকৃতি থেকে বছর দশেকের মধ্যে শতকরা ৫০ ভাগ বা তারও অধিক বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে সাধারণত সেই প্রজাতি মহাবিপন্নের তালিকায় স্থান পায়।
প্রাণীদের মধ্যে মহাবিপন্নের তালিকায় স্থান পেয়েছে ‘লজ্জাবতী বানর’। প্রাণীবিজ্ঞানীদের আশঙ্কা এটিও দ্রুত হারিয়ে যাবে দেশ থেকে। যার ফলে লজ্জাবতী বানর ‘রেড সিগন্যাল’-এর আওতায় রয়েছে। এর অন্যতম কারণ অবাধে বনভূমি উজাড়। লজ্জাবতী বানরের বাসযোগ্য স্থান হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও লাউয়াছড়ার গভীর জঙ্গলে। উঁচু গাছের মগডালে থাকতে এরা পছন্দ করে। জন-মানবের পদচিহ্ন নেই যেখানে, সেখানেই ওদের বাস। অন্য কারণটি হচ্ছে এদের প্রজননহারও সন্তোষজনক নয়। বছরে মাত্র একটি বাচ্চা প্রসব করে মাদী বানর। আবার এদের গড় আয়ুও সন্তোষজনক নয়। মাত্র ১০-১২ বছর বাঁচে, তাও যদি অনুকূল পরিবেশ পেয়ে থাকে।
বন্যপ্রাণীদের করুণ পরিণতির কথা ব্যক্ত করলে আফসোস করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। কারণে অকারণে বলির পাঁঠা হচ্ছে জন্তু-জানোয়ারগুলো। বাঘের বাচ্ছা মনে করে কত মেছো বিড়ালকে যে লোকজন পিটিয়ে মেরেছে তার কোন সঠিক হিসেব নেই। হিসেব নেই গুইসাপের করুণ মৃত্যুরও। শুধুমাত্র ওদের চামড়ার লোভে কতিপয় দুষ্কৃতকারীরা জ্যান্ত গুইসাপের চামড়া তুলে নিতো নব্বই দশকের দিকেও। পরক্ষণে গুইসাপটা মারা গেলেও করুণভাবে প্রাণ হারাতে দেখা গেছে। অজগর সাপের ক্ষেত্রেও তদ্রুপ। শুধুমাত্র চামড়ার লোভে অসংখ্য অজগরের প্রাণ হারাতে হয়েছে দেশে। ফলে দেশে অজগর তেমন একটা নজরে পড়ে না এখন আর। পাহাড়ি অঞ্চল তথা চা বাগান আর সুন্দরবনে সামান্য অজগরের বিস্তৃতি রয়েছে শুধু। ওরা খাদ্যসংকটে অনেক সময় লোকালয়ে এসে মারা পড়ে।
এভাবে অনেক বন্যপ্রাণী এ দেশ থেকে হারিয়ে গেছে। তার মধ্যে সম্বর হরিণ, হগ হরিণ ও প্যার্যাইল্ল্যাবানর উল্লেখযোগ্য। হনুমানের অবস্থা আরও করুণ। লাউয়াছড়া, যশোরের কেশবপুরে কোন রকম বেঁচে আছে। হাতিদের অবস্থাও তেমন ভালো নয়। খাদ্যের অভাবে ওরা মিয়ানমার ও ভারতে পাড়ি জমাচ্ছে। মারাও যাচ্ছে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। আর যে প্রাণীটা এখন বাংলাদেশে নজরেই পড়ছে না, সেটি হচ্ছে নীলগাই; অথচ গত চার দশক আগেও প্রাণীটা উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে চষে বেড়াত। দুষ্কৃতকারীদের নিষ্ঠুরতার বলি হয়ে ওরা এখন আর আমাদের ধারে কাছেও ঘেঁষছে না। মাঝে মধ্যে দিক হারিয়ে সীমান্তের ওপার থেকে দুই-একটা নীলগাই এপারে চলে এলে লোকজন ওদের দৌড়ে ধরে ফেলে জবাই করে। শুধু নীলগাই-ই নয়, দেখা যেত পদ্মার উচ্চ অব্বাহিকায় ঘড়িয়াল। ওই প্রজাতিগুলো এখন আর নেই! ভবিষ্যতে দেখাও যাবেনা আর। বিষয়টা ভাবতে কেমন লাগছে? কেমন লাগছে পরিবেশটা ভারসাম্য হারিয়ে পঙ্গু হতে দেখে? এ ধরনের জঘন্য কর্মকাণ্ড বন্ধ না হলে অদূর ভবিষ্যতে কুকুর-বিড়াল দেখতে হলেও চিড়িয়াখানায় যেতে হবে নয়া প্রজন্মকে। তাই আমাদের উচিত প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে বন্যপ্রাণীদের ওপর যেন নির্যাতন না ঘটে তার প্রতি সজাগ দৃষ্টি দেওয়া। অকারণে বন্য প্রাণীদের সঙ্গে শত্রুতা সৃষ্টি না করা। লিফলেটের মাধ্যমে সর্ব সাধারণকে বিষয়টা জানিয়ে দেওয়া। তাতে সবাই সচেতন হবে যেমন, তেমনি সতর্ক হবে দুস্কৃতকারীরাও।একসময় গণ্ডার ছিল দেশে। সেটি ব্রিটিশ আমলের কথা। আর সে সময় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের তথ্যভান্ডার করা হয়েছিল বলেই তথ্যটি জানা সম্ভব হয়েছে। -বলছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এমএ আজিজ। সুন্দরবনের প্রাণী নিয়ে জাতীয় জরিপের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বিভিন্ন সময় গবেষক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে বাঘ-হরিণ নিয়ে জরিপ হলেও নতুন করে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর তথ্যভান্ডার করা হয়নি। বর্তমানে অনেক প্রাণী বিলুপ্তির মুখে। তাই এখনই জীববৈচিত্র্যের তথ্যভান্ডার জানতে জরিপ করা না হলে আগামীতে কোনও প্রাণী বা উদ্ভিদ বিলুপ্ত হলে তা অজানাই থেকে যাবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণাক্ততা বৃদ্ধিসহ একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামাল দিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। নানা প্রতিকূলতার কারণে এরইমধ্যে এই বন থেকে হারিয়ে গেছে গণ্ডার, মিঠাপানির কুমির ও বুনো মহিষসহ নানা প্রজাতির প্রাণী। আরও কয়েক প্রজাতির প্রাণী এখন সংকটাপন্ন। কিন্তু সুন্দরবনে কত প্রজাতির কী কী প্রাণী ও উদ্ভিদ আছে, তা কখনও জানার চেষ্টাই করেনি বাংলাদেশ।
গবেষকরা বলছেন, গত একশ বছরে বন্যপ্রাণীর পাশাপাশি এই বন থেকে নীরবে হারিয়ে গেছে নানা প্রজাতির উদ্ভিদ, গাছ এবং নানা প্রজাতির সরীসৃপ ও প্রাণী। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হলেও আজও সুন্দরবনের পূর্ণাঙ্গ জীববৈচিত্র্যের জরিপ করতে পারেনি বনবিভাগ। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু-বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে উদাসীন।
প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ নিরবচ্ছিন্ন জোয়ার-ভাটার ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন। এর মধ্যে বাংলাদেশ অংশের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার। সুন্দরবন শুধু পৃথিবীর মৌলিক বাস্তুসংস্থানই নয়, একই সঙ্গে বিশাল জীববৈচিত্র্যের ভান্ডার। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর থাকায় ১৯৯২ সালে সুন্দরবনকে রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করে ইউনেস্কো।
পরিবেশবিদরা বলছেন, ঝড়ঝঞ্ঝা, ঘূর্ণিঝড় আম্ফান, সিডর ও আইলার মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে উপকূলকে শক্তিশালী ঢাল হিসেবে রক্ষা করে আসছে সুন্দরবন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, প্রতিকূল ও নেতিবাচক পরিস্থিতির কারণে বনের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য এখন সংকটাপন্ন। বনের ভেতর মিষ্টিপানির জলাশয়গুলোতে বেড়েছে লবণাক্ততা। এতে মিষ্টিপানি পানে অভ্যস্ত বাঘসহ বন্যপ্রাণীরা নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায়ই অকালে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। রক্ষা পাচ্ছে না জলজপ্রাণী ডলফিনও।
২০১৯ সালে সুন্দরবনের জন্য ১০টি হুমকি চিহ্নিত করে ইউনেস্কো। এতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া, দূষণ, অবৈধ তৎপরতা ও পশুর নদের খননকে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। গবেষকরা বলছেন, বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাস, বিচরণ ও খাদ্যশৃঙ্খল সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের শ্বাসমূলের কারণে তা মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর কাছে এক আকর্ষণীয় আশ্রয়ও। এই বনে আছে লতাগুল্ম থেকে শুরু করে মাঝারি ও উঁচু- সব ধরণের বৃক্ষ। একসময় প্রচুর ফলদ বৃক্ষ থাকলেও লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় সেগুলো কমে গেছে। সরীসৃপের মধ্যে শঙ্খচূড় বা রাজগোখরা বিশ্বজুড়ে মহাবিপন্ন প্রজাতির তালিকায় রয়েছে। স্তন্যপায়ী প্রাণী ভোঁদড়ও এখন শুধু সুন্দরবনেই দেখা যায়। তবে এই প্রাণীগুলো কয়টি বা কী অবস্থায় রয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই।
২০১৬ সালের ইউনেস্কোর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামীতে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের আরও ক্ষতি করবে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র।
গবেষকদের মতে, গত একশ বছরে সুন্দরবন থেকে বহু প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বুনো মহিষ, পারা হরিণ, বুনো ষাঁড়, ছোট ও বড় এক শৃঙ্গি গণ্ডার, বার শিঙ্গা, চিতা বাঘ। বিলুপ্ত হয়েছে সাদা মানিক জোড়া কান ঠুনি, বোঁচা হাঁস, গগন বেড়, জলার তিতিরসহ বিভিন্ন পাখি। এ ছাড়া দুই প্রজাতির উভচর, ১৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৫ প্রজাতির পাখি এবং পাঁচ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী এখন সংকটাপন্ন। কিন্তু সুন্দরবনের কোন প্রজাতি কী অবস্থায় আছে, তা ব্রিটিশ আমলের পর আর পূর্ণাঙ্গ জরিপ করে জানার চেষ্টা করা হয়নি।
বাগেরহাট জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, ১৭৫৭ সালে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীরের কাছ থেকে স্বত্বাধিকার পাওয়ার পরপরই সুন্দরবন এলাকার মানচিত্র তৈরি করেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ওই সময় সুন্দরবনের আয়তন ছিল এখনকার দ্বিগুণ। ১৮২৮ সালে ব্রিটিশ সরকার সুন্দরবনের স্বত্বাধিকারিত্ব অর্জন করে। এলটি হজেয ১৮২৯ সালে সুন্দরবনের প্রথম জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। সুন্দরবনের জন্য ১৮৯৩-৯৮ সময়কালে প্রথম বন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণীত হয়।
বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর সংখ্যা ও আবাসস্থল, রোগবালাই এবং সংরক্ষিত এলাকার বৈশিষ্ট্য ও প্রতিবেশ নিয়ে জরিপের জন্য ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ১৫৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকার ‘সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্প’ অনুমোদন করে সরকার। এ প্রকল্পের আওতায়ও জীববৈচিত্র্যের পূর্ণাঙ্গ জরিপ করা সম্ভব নয়, বলছেন বন কর্মকর্তারা। তবে বাঘ ও বাঘের শিকার প্রাণীÑ হরিণ ও শূকরের মতো প্রাণীর সংখ্যা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বনবিভাগের কর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর রহমান এই প্রতিবেদক কে বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ জরিপ তো কখনও করা হয় না। তবে সুন্দরবনের ইতিহাসে এ বছরই প্রথম আমরা ইকোলজিক্যাল মনিটরিং করতে যাচ্ছি। এ প্রকল্পের আওতায় নির্দিষ্ট কিছু স্থল ও জলজপ্রাণী, উদ্ভিদের জরিপ করা হবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বনবিভাগের একজন পদস্থ কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সুন্দরবনে পূর্ণাঙ্গ জীববৈচিত্র্যের জরিপ করতে আন্তরিকতা ও অর্থÑ দুই-ই প্রয়োজন। এত ব্ড় বনে জরিপ চালাতে বড় ধরনের আর্থিক বরাদ্দ লাগবে। কিন্তু সরকার বরাদ্দ দেয় না তাই সম্ভব হচ্ছে না।
পূর্ণাঙ্গ জরিপ না হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘সুন্দরবনে বাঘ, হরিণ বা কুমিরের মতো যে মূল প্রাণী আছে, তা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে এবং সেগুলোর তথ্য-উপাত্ত আছে। তবে প্রতিটা প্রাণী ধরে ধরে জরিপ করার প্রয়োজন হয় না এবং নানা কারণে সম্ভবও হয় না।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ও বন্যপ্রাণীবিদ প্রফেসর মনিরুল হাসান খান বলেন, সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা এখন প্রকল্পনির্ভর। তাই জরিপগুলো বিক্ষিপ্তভাবে হচ্ছে। প্রকল্পনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী, গবেষক ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করলে সুন্দরবনের পূর্ণাঙ্গ জরিপ সম্ভব।
ব্রিটিশ আমলে সুন্দরবনের উদ্ভিদের ওপর জরিপ করেন স্কটিস উদ্ভিদবিদ ডেভিট প্রেইন। ১৯০৩ সালে প্রকাশিত প্রেইনের প্রতিবেদনে সুন্দরবনে মোট ২৪৫টি শ্রেণি এবং ৩৩৪টি প্রজাতির উদ্ভিদ নথিভুক্ত করা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রেইনের প্রতিবেদনের পর গত একশ বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। এতে সুন্দরবনের বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ প্রজাতি ও তাদের শ্রেণীকরণের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়ে গেছে। ব্যক্তিপর্যায়ে কয়েকটি প্রজাতি ছাড়া এত বছর ধরে বনজ প্রকৃতিতে কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছে, তা নিয়ে গবেষণা বা জরিপ করা হয়নি এবং এখনও হচ্ছে না।
প্রকৃতি ও উদ্ভিদ-বিষয়ক গবেষক মোকারম হোসেন এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘সুন্দরবনে প্রাণী নিয়ে আংশিক কিছু জরিপ হলেও ব্রিটিশ আমলের পর উদ্ভিদ নিয়ে কোনো গবেষণা ও জরিপ হয়নি। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে উদ্ভিদ ও প্রাণী হারিয়ে যাচ্ছে। সারা বিশ্ব এখন জীববৈচিত্র্য রক্ষায় উদ্ভিদ সংরক্ষণে জোর দিচ্ছে। কারণ উদ্ভিদের উপস্থিতি না থাকলে বাস্তুতন্ত্রে ব্যাঘাত ঘটবে। সুন্দরবনের প্রাণবৈচিত্র্যের স্থিতিশীলতা রক্ষায় উদ্ভিদের জরিপে জোর দিতে হবে।’ বাংলাদেশে ‘বাঘ বাঁচায় সুন্দরবন, সুন্দরবন বাঁচাবে লক্ষ জীবন’ আর বিশ্বে ‘তাদের বেঁচে থাকা আমাদের হাতে’ প্রতিপাদ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। তবে নানা অজুহাতের পরিস্থিতিতে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বা বাঘের অন্যতম আবাসস্থল সুন্দরবন-সংলগ্ন বাগেরহাট ও খুলনায় দিবসটি উপলক্ষে কোনো কর্মসূচি ছিল না। বন বিভাগের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইনে আলোচনা সভার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে এই দিবস পালনের কার্যক্রম।
এদিকে, জরিপ অনুযায়ী গত চার বছরে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনে সর্বশেষ ২০১৫ সালে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। ক্যামেরা ট্র্যাকিং পদ্ধতিতে বাঘ জরিপে বাঘের সংখ্যা এখন ১১৪টি। ২০২৪ সালের জরিপে বাংলাদেশের সুন্দরবনে ১১ টি ভাগ বেড়ে বর্তমানে ১২৫টি,বাঘ রয়েছে ।চোরাশিকার বন্ধে স্মার্ট পেট্রোলিং চালুকরণসহ সরকারের নানা উদ্যোগের কারণে বাঘের সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে, সরকারের নানা উদ্যোগেও বিপদমুক্ত হতে পারছিল না সুন্দরবনের বাঘ। সুরক্ষার অভাবে বিপন্ন হয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। ২০০৪ সালে যেখানে সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা ছিল ৪৪০, সেখানে এখন বাঘ ছিল১১৪টি। ২০২৪ সালের সুন্দরবনের বাঘ গণনা জরিবে ১১ টি বাঘ বেড়ে,বর্তমানে ১২৫টি, বাঘ রয়েছে ।
২০০৪ সালের জরিপের তথ্য অনুযায়ী ৪৪০টি বাঘের মধ্যে খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় ৮৯টি পুরুষ, ১৭০টি ।

