
শ্যামনগর প্রতিনিধি : সুন্দরবনে শিলাসহ ১৪ প্রজাতির কাঁকড়ার প্রজনন হয়। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাস কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুম। এ সময়ে সুন্দরবনে জলজ এই প্রাণীটি শিকার নিষিদ্ধ করেছে বন বিভাগ।
(০১জানুয়ারি-২০২৬) সুন্দরবনের নদী-খালে কাঁকড়ার প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত করতে দুই মাসের জন্য কাঁকড়া ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বন বিভাগ। নিষেধাজ্ঞা আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।১ মার্চ থেকে কাকড়া আহরণকারী সুন্দরবন এ প্রবেশ করতে পারবেন কাকড়া আহরণ করতে।
প্রজনন মৌসুমে কাঁকড়া রক্ষা করতেই এ উদ্যোগ বলে জানিয়েছেন খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ।
তিনি বলেন, প্রতিবছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি এ দুই মাস কাঁকড়া সুন্দরবনের নদী-খালে ডিম পাড়ে। সেই ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে বের হয়। এ সময়ে কাঁকড়া অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় থাকে। কাঁকড়ার প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
বন সংরক্ষক আরো বলেন, যদি এ সময় কাঁকড়া ধরা হয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। তাই প্রতিবছরের মতো এবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এ সময় কাঁকড়া ধরার অনুমতিপত্র ইস্যু বন্ধ থাকায় গভীর বনাঞ্চলে অবস্থান করা জেলেরা কেহ কেহ বাড়িতে অবস্থান করছেন আবার কেহ কেহ ভিন্ন কর্মসংস্থানে চলে গেছেন এলা মার্চ ২০২৬ থেকে আবার যথারীতি সুন্দরবনে কাকড়া আহরণ করতে যেতে পারবেন কাঁকড়া আহরণ কারেরা।
তবে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, প্রজনন মৌসুমে কয়েকটি চক্র নানা কৌশলে সুন্দরবনে ঢুকে কাঁকড়া ধরে। বন বিভাগের একশ্রেণীর অসাধু বনরক্ষী ও কর্মকর্তাদের সহায়তায় ওই সব চক্র কাঁকড়া ধরা অব্যাহত রাখে। এতে সাধারণ জেলেরা যেমন আর্থিক সঙ্কটে পড়েন তেমনি কাঁকড়া ধরা বন্ধ রাখার আসল উদ্দেশ্যে ব্যাহত হয়। পাশাপাশি কাঁকড়ার বংশবিস্তার এবং সুন্দরবনের জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা পরিবেশবাদীদের। তবে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করে জানা গেছে বনরক্ষীদের উপরে এই অভিযোগ কোন সত্যতা পাওয়া যায়নি। সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারি বন সংরক্ষক মশিউর রহমান এই প্রতিবেদককে জানান এই দুই মাসে কমপক্ষে সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতাধীন অবৈধভাবে কাঁকড়া আহরণের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের আটকসহ বিভিন্ন অপরাধের দায় কমপক্ষে ২৫ টি গণ মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পরিবেশবাদীরা আরো বলছেন, সুন্দরবনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।
পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক নাগরিক সংগঠন-জলবায়ু সচেতনতা এবং সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, প্রজনন মৌসুমে কাঁকড়া রক্ষা করা না গেলে এর এর বংশবিস্তার লোপ পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে পুরো সুন্দরবনের জীববৈচিত্রের উপর। পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক এ সম্পদ রপ্তানিতেও এর প্রভাব পড়বে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে জলভাগের পরিমাণ ১ হাজার ৮৭৪ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার, যা পুরো সুন্দরবনের আয়তনের ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ। সুন্দরবনের জলভাগে ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি ও ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া আছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি এ দুই মাস কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুম হওয়ায় ৫৯ দিনের জন্য জেলেদের সুন্দরবনে প্রবেশ করে কাঁকড়া ধরার অনুমতি বন্ধ রাখে বন বিভাগ।১ মার্চ থেকে আবার বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে সুন্দরবনের ঢুকবে কাঁকড়া আহরণকারীরা।
উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, অবস্থানগত কারণে খুলনার নয়টি উপজেলার মধ্যে সর্বদক্ষিণের সুন্দরবনঘেরা সমুদ্র উপকূলবর্তী উপজেলা কয়রার বেশিরভাগ মানুষই সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। এ জেলার সুন্দরবন প্রভাবিত অন্য উপজেলাটি হলো দাকোপ। এ উপজেলা দুটির সুন্দরবন-লাগোয়া গ্রামগুলোর মানুষরা মাছ-কাঁকড়া ধরা, গোলপাতা কাটা ও মধু আহরণের কাজ করেন। এবং সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর ও আশাশনি উপজেলা
দুটির কয়েকজন বনজীবী জেলে জানান, কাঁকড়ার ব্যবসা বেশ লাভজনক। যে কারণে প্রজনন মৌসুমেও কাঁকড়া ধরা বন্ধ হচ্ছে না সুন্দরবনে লোভে আর পেটের দা য়ে চুরি করে সুন্দরবনে প্রবেশ করছে কাকড়া আহরণকারীরা। অধিক লাভের আশায় একশ্রেণীর অসাধু জেলে বন বিভাগের কাছ থেকে মাছ ধরার অনুমতি নিয়ে বনে ঢুকে ডিমওয়ালা কাঁকড়া শিকার করেন।
সুন্দরবনের ভেতর থেকে কাঁকড়া ধরে নৌকায় করে লোকালয়ে নিয়ে আসা হয়। তারপর তা সুন্দরবনসংলগ্ন খুলনার কয়রা উপজেলার ঘড়িলাল, গোলখালি, আংটিহারা, কাটাকাট, দেউলিয়া এবং দাকোপ উপজেলার নলিয়ান, কালিনগর, কৈলাশগঞ্জ, রামনগর, বাজুয়া, চালনা ও পাইকগাছা বাজারে ডিপোতে বিক্রি করা হয়। সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলা ও আশাশনি উপজেলা বিভিন্ন হাট বাজার গ্রামগঞ্জে একটু আড়ালে বেচা বিক্রি হয়।
পশ্চিম সুন্দরবন বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান এই প্রতিবেদককে বলেন, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে কাঁকড়া ডিম পাড়ে। ডিমওয়ালা কাঁকড়ারা ক্ষুধার্ত থাকে, তাই সহজে ধরা যায়। এ সময় শিকার না করলে পরের বছর বেশি কাঁকড়া উৎপাদন সম্ভব। আমরা টহল জোরদার করেছি। কেউ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে বন আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাছানুর রহমান বলেন, কাঁকড়া শুধু অর্থনৈতিক নয়, সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় জনগণ, জেলে ও ব্যবসায়ীদের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন এই সামান্য আর কয়েকদিন বাকি আছে পহেলা মার্চ থেকে সুন্দর বনে কাকড়া ধরার জন্য আবার অনুমতি পাবে আহরণকারীরা।
বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার এলাকায় জলভাগ প্রায় ৩১ শতাংশ। এখানে ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি ও ১৪ প্রজাতির উভচর প্রাণী আছে। সুন্দরবনের সম্পদ আহরণের জন্য ১২ হাজার নৌকার অনুমতিপত্র দেওয়া হয়, যার এক-তৃতীয়াংশ কাঁকড়া ধরার জন্য বরাদ্দ। প্রজনন মৌসুমে কাঁকড়া ধরার অনুমতি বন্ধ থাকলেও মাছ ধরার অনুমতি বহাল থাকে।